26/01/2026
শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুন্দর আগামীর ভবিষ্যৎ পৃথিবী শিশুদের ওপর নির্ভরশীল। যে কারণে শিশুদের নিয়ে পরিবার সমাজ তথা রাষ্ট্র স্বপ্ন বুনে। প্রতিটি শিশু স্বচ্ছ কাঁচের মতো, তাদের ছোট্ট মস্তিষ্কে নিকট পরিবেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, তাদের সামনে উপস্থাপিত প্রতিটি বিষয় গেঁথে যায় স্থায়ীভাবে। তারা অতিমাত্রায় কল্পনা বিলাসী, স্বপ্নচারী হয়ে থাকে। অফুরান স্বপ্ন যেন শেষ নেই। শিশুরা সর্বদা অনুকরণ প্রিয়।
পৃথিবী বিখ্যাত রাশিয়ান শিক্ষাবিদ লেভ ভিগটস্কি বলেছেন, “ অন্যদের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে পরিণত করি”।
শিশুর বেড়ে ওঠায় অনুকূল পরিবেশ তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পারিবারিক বন্ধন, ভ্রাতৃত্ববোধ, সামাজিকতা, সৃজনশীলতা, সহানুভূতি, শিষ্টাচার, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আদর্শ প্রভৃতি বিষয়গুলোর অনুধাবন শিশুকাল থেকেই বিকাশ লাভ করে। কাজেই শিশুর নৈতিক, মানবিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, নান্দনিক প্রভৃতি গুণাবলির বিকাশ শিশুকাল থেকেই গঠিত হয় যা পরবর্তী জীবনে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশু জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো শৈশবকাল। শিশুর বেড়ে ওঠার জন্যে এ সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় পারিবারিক পরিবেশ যেন নিরাপদ ও শিশুবান্ধব হয় তার প্রতি যেমন অভিভাবকদের যত্নশীল থাকা প্রয়োজন একইভাবে বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিশুবান্ধব রাখার প্রতি শিক্ষকদের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সকল গুণাবলী, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার যাবতীয় ব্যবস্থা পরিবারে ও বিদ্যালয়ে সুনিশ্চিত থাকা প্রয়োজন।
শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে পিতা-মাতা, পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের নিবিড় ভালবাসা যেমন দরকার তেমনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের দায়িত্ব-কর্তব্য থাকা দরকার।
শিশুবান্ধব পরিবেশ বলতে শিশুর চলাফেরা ও কাজ-কর্মের প্রতিটি স্থানকে শিশুদের উপযোগী হওয়া বুঝায়। যেমন- শিশুর স্বাস্থ্যসম্মত বাসগৃহ যেখানে পর্যাপ্ত আলোবাতাস ও সবকিছু সুসজ্জিত থাকা। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি, দূষণমুক্ত নির্মল বায়ুর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত বাসগৃহ নিশ্চিত করার জন্যে। বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও শিশুবান্ধব পরিবেশ বলতে স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামোর পাশাপাশি ভয়ভীতিহীন, আনন্দায়ক ও আকর্ষণীয় শিখন পরিবেশ খুবই প্রয়োজন।
শিশু জন্মের পর থেকেই তার পরিচর্যা শুরু হয় তার মার হাত ধরে। শিশুর প্রথম পাঠশালা হলো তার পরিবার। বলা যায় মা’ই শিশুর প্রথম শিক্ষক। মায়ের কাছ থেকেই শিশুর শিখন শুরু হয়ে যায়। মায়ের শিক্ষা ও সহজাত প্রবৃত্তি শিশুর মনোজগতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। মায়ের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সান্নিধ্য ও ইতিবাচক মনোভাব শিশুর সকল গুণাবলি বিকাশে সরাসরি প্রভাব ফেলে। শিশুরা যখন কারও সাথে কথা বলে, খেলাধুলা করে, ভালো-মন্দ কাজ প্রত্যক্ষ করে তখনই তাদের শিখন হয়। কাজেই শিশুর সকল গুণাবলী বিকাশে পরিবারের অভিভাবকদের সুপরিকল্পিতভাবে শিশুর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে যাতে শিশুরা তাদের স্বপ্নপূরনের উপযুক্ত হয়।
শিশুদের ছোট্ট মস্তিষ্কে প্রথম থেকেই নীতিবাক্যগুলো প্রবেশ করাতে। যেমন- হবে-সদা সত্য বলিব, মিথ্যা বলা মহাপাপ, জীবে দয়া করবে, গুরুজনদের শ্রদ্ধা ও মান্য করবে, ছোটদের স্নেহ করবে, চুরি করা মহাপাপ ইত্যাদি।
বয়স অনুসারে গঠনমূলক কাজ শৈশবকাল থেকেই শেখাতে হবে। যেমন- নিজের কাজ নিজে করা, পরিধেয় কাপড় গুছিয়ে গুছিয়ে রাখা, পড়ার টেবিল গুছিয়ে রাখা, পরিস্কার-পরিছন্ন থাকা ইত্যাদি।
বিদ্যালয় একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। শিশুর সামাজিক বিকাশে বিদ্যালয়ের ভুমিকা অপরিসীম। বিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো শিক্ষার্থী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলো কোমলমতি শিশু। পরিবার থেকে শিশু বাইরের পৃথিবীতে পদার্পন করে মূলত বিদ্যালয়ে আগমনের মাধ্যমে। যদিও বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কিছুটা পরিচয় তাদের আগেই ঘটে থাকে। কিন্তু অজানা জগৎকে জানতে বুঝতে বিদ্যালয়ে আগমন হলো পরিবারের বাইরে শিশুর প্রথম পদক্ষেপ। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু হলেও তাদের গড়তে শিক্ষকদের ভূমিকাই আসল। পরিবারের সদস্যদের বাইরে শিশুর প্রধান ভরসাস্থল হলো শিক্ষক। শিশুবান্ধব বিদ্যালয়ের পরিবেশ তৈরি শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যালয়ে আগমনের পর প্রথম কার্যক্রম হলো দৈনিক সমাবেশ। দৈনিক সমাবেশের মাধ্যমে শিশুর নৈতিক শিক্ষা লাভের পাশাপাশি ঐক্য, দলীয় মনোভাব, মিলেমিশে কাজ করা ও শরীর চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দৈনিক সমাবেশের আয়োজন যতটা সুশৃঙ্খল ও শিশুবান্ধব হবে শিশুরা ততই মনযোগী হবে এবং তাদের বিভিন্ন গুণাবলীর বিকাশ ঘটবে। বিদ্যালয়ে শিশু বিচরণের অধিকাংশ সময় কাটে শ্রেণিকক্ষে কাজেই শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের মেধা, বয়স, রুচি ও সামর্থ্য শ্রেণি শিক্ষকের জানা আবশ্যক। শিশুরা যাতে ভয় না পায় সেজন্য পাঠ উপস্থাপনের শুরুতেই তাদের সাথে কুশল বিনিময় করা এবং ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ছড়া, গান, গল্প, কবিতা, ছবি ইত্যাদির যে কোন একটি দিয়ে পাঠদান শুরু করা যাতে শিশুদের সাথে সহজেই মিশে যাওয়া যায়।
বিষয়বস্তু উপস্থাপনের সময় বাস্তব উদাহরন, পাঠ সংশ্লিষ্ট উপকরণ ব্যবহার করা যাতে পাঠদান সহজ ও আকর্ষনীয় হয়। শিখন শেখানো কার্যাবলির প্রতিটি ধাপে শিশুদের প্রতি আন্তরিক মনোভাব ও বন্ধুসূলভ আচরণ করতে হবে। বিদ্যালয়ের অন্যান্য পরিবেশ শিশুবান্ধব করার জন্য নিয়মিত বাগান পরিচর্যা, শ্রেণিকক্ষে ছবি আঁকা, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ইত্যাদি বিষয়গুলো শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত খেলাধুলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলে।
বাংলাদেশ সরকার শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে অতি সম্প্রতি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সাফ সিএসএসপি প্রকল্প শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি তারা শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিশুবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বলে জানা যায়। সাফ-এর কর্ম-এলাকায় সর্বস্তরে শিশুবান্ধব নীতিমালার চর্চা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং পরিবার ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে চর্চার বিষয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে। এছাড়াও শীঘ্রই সরকারি উদ্যোগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমাজসেবা থেকে শিশুকল্যাণ বোর্ড গঠন করা হবে বলে জানা যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে শিশুর সার্বিক কল্যাণ, লালন-পালন, বিকাশ ও অংশগ্রহণ সংক্রান্ত অধিকারসমূহকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে জাতিসংঘের শিশু অধিকার বিষয়ক সনদের ৫৪টি অনুচ্ছেদের বিভিন্ন ধারাসমূহে। অনুচ্ছেদ ২৭ এর ২ নং ধারায় বলা আছে পিতামাতা কিংবা শিশুর দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সামর্থ ও সংগতি অনুয়ায়ী শিশুর উন্নয়নের জন্য উপযোগী জীবন যাপনের মান নিশ্চিত করা। শিশু সনদে বর্ণিত ধারাসমূহ সকল শিশুর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। শিশুর শিক্ষা, লালন-পালন, পরিচর্যা, সুরক্ষা এবং বেড়ে ওঠার ভিত বৈষম্যহীন ও সমতার ভিত্তিতে রচনা করতে হবে।
শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে। স্বপ্ন না দেখালে তারা যোগ্য মানুষ হতে পারবে না। কাজেই একদিকে পিতা-মাতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের যত্নবান হতে হবে শিশুদের প্রতি। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ যারা আমাদের সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ তাদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুর বাসযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টিতে সম্ভাব্য সকল সুযোগ সৃষ্টিতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের ভুমিকা রাখার বিকল্প নেই।