12/09/2018
আশুরা : তাৎপর্য, করনীয় ও বর্জনীয়
-
মাহফূজ আল-হামিদ
আরবী বর্ষপঞ্জী তথা হিজরী চান্দ্রবর্ষের প্রথম মাস মুহাররাম। ‘মুহাররাম’ শব্দের অর্থ- অলঙ্ঘনীয় পবিত্র। ইসলামে এ মাসটি চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। আর মুহাররাম মাসের ১০ তারিখ আশুরা নামে সু-পরিচিত। আরবীতে ‘আশারা’ মানে ১০, আর সে কারণে দিনটিকে ‘আশুরা’ বলে অভিহিত করা হয়। ইসলামে আশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিবস। মুহাররামের ৯ তারিখ দিবাগত রাত থেকে আশুরা উদযাপন শুরু হয়। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বিভিন্ন কারণে বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত, মর্যাদাময় ও শোকাবহ। বহু ঐতিহাসিক ঘটনা এই তারিখে সংঘটিত হয়েছিল। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই ১০ই মুহাররাম তথা আশুরা দিবসের একটি বিশেষ গুরুত্ত্ব পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। মুহাররামে রয়েছে অনেক বিজয় আর গৌরবমাখা ঐতিহ্যের স্মৃতি।
-
আশুরা ও মুহাররমে সংঘটিত উল্লেখযোগ্য গঠনাবলী:
১. আশুরার দিনে মহান আল্লাহ বিশ্বজগত সৃষ্টির সূচনা করেন।
২. এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) -এর দেহে প্রাণ সঞ্চারিত হয়।
৩. এই দিনে পৃথিবীর বুকে প্রথম বৃষ্টিপাত হয়।
৪. এই দিনে আল্লাহ পাক তাঁর অনেক নবীকে স্ব-স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন।
৫. এই দিনে নূহ (আ:)-এর কিস্তি ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলো এবং মহাপ্লাবন শেষে তিনি জুদী পর্বতশৃংগে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ১/১৩২)
৬. এই দিনে নীল নদে ফেরআউনের ভরাডুবি হয় এবং বনী ইসরাঈলরা ফের’আউনের কবল থেকে রক্ষা পায়। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ১/১৩২)
৭. এই দিনে হযরত ইব্রাহিম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি লাভ করেন।
৮. এই দিনে হযরত ইউনুস (আ.) দজলা নদীতে মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেন। (আল-কামিল ফিত-তারীখ ১/১২২)
৯. এই দিনে দাউদ (আ:)-এর তাওবা কবুল হয়েছিলো।
১০. এই দিনে হযরত সুলায়মান (আ.) তাঁর হারানো আংটি ও রাজ্য ফিরে পান।
১১. এই দিনে দীর্ঘ ১৮ বছর মারাত্মক রোগে ভোগার পর হযরত আইয়্যূব (আ.) দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে সুস্থতা লাভ করেছিলেন।
১২. এই দিনে সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর হারিয়ে যাওয়া পুত্র হযরত ইউসূফ (আ.) আবার মিলিত হন।
১৩. এই দিনে আল্লাহ তা'আলা ঈসা (আ:)-কে উর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন।
১৪. কাফেরদের অবর্ণনীয় অত্যাচার আর নিপীড়িনের কারণে আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রিয়নবী (সা.) -কে মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দিয়েছিলেন এই মুহাররাম মাসেই। তিনি সেখানে আনসারদের অপূর্ব আপ্যায়ণ পেয়ে কাফেরদের যন্ত্রনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
১৫. ৭ম হিজরীর মুহাররাম মাসেই মুসলমানরা গাজওয়ায়ে খাইবারে বিজয় লাভ করে। (উসদুল গাবাহ ১/২১)
১৬. মাদায়েন এবং কাদিসিয়ার যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয় লাভ করে মুহাররাম মাসে।
১৭. অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হয়েছিলেন এই আশুরার দিনে।
১৮, বর্ণিত আছে যে আশুরার দিবসেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।
-
আশুরায় হুসাইন (রা.) -এর শাহাদাত বিষয়ে ঐতিহাসিক ভিন্নমত:
আশুরাতে হুসাইন (রা.) কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন –এটিই বহুল প্রচলিত মত। তবে এর ঐতিহাসিক যথার্থতার ব্যপারে মতানৈক্য রয়েছে। কারণ কারবালার ইতিহাস গভীরভারে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ কিতাবে আছে হযরত হুসাইন (রা.) ৮ অথবা ১০ ই জ্বিলহজ্জ তারিখে মক্কা থেকে রওনা করেন, আর ২রা মহারম কারবালার ময়দানে পৌঁছেন। মধ্যখানে তাঁদের যাত্রাকালের সময় হল মাত্র বাইশ বা তেইশ দিন। দ্বিমত পোষণকারীদের বক্তব্য হলো, ভৌগলিক হিসাবে মক্কা থেকে কারবালার দুরত্ব প্রায় সাড়ে নয়শত মাইল। তখনকার যুগে প্লেন বা জাহাজের কোন ব্যবস্থা ছিল না। উটের সফরে ৭২ জন (মতান্তরে আরো কিছু কম -বেশি) ছোট, বড়, বৃদ্ধ, বিবি-বাচ্চা সহ একটি কাফেলার সফর। খাওয়া-দাওয়া, উজু-এস্তেঞ্জা, নামাজ এবাদত বন্দেগী ও প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ইত্যাদির চুলচেরা বিশ্লেশন করলে এটা প্রমানিত হয় যে, বাইশ বা তেইশ দিনে কোন ক্রমেই উল্লেখিত কাফেলা মরুভুমিতে সাড়ে নয় শত মাইল সেই যুগে পাড়ি দিতে সক্ষম নয়! এই রকম একটি কাফেলা এক দিনে সর্বোচ্চ ২৫/৩০ মাইল মাইল পাড়ি দিতে পারে এটাই স্বাভাবিক। যার ফলে ইবনে জরির সাআ’ (রা.)-এর বর্ণনা নকল করে বলেন, হুসাইন (রা.) -এর শাহাদাত ১০ই মুহাররাম নয়, বরং ২২ শে সফর। কারবালা সম্পর্কে যতগুলো কিতাব রচয়িত হয়েছে, তার অধিকাংশ গুলোতেই ১০ই মহাররমের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এর পিছনে নাটের গুরু ছিল ইয়াহুদী ও ইরানী মাজুসিরা। কারণ, যদিও মূসা (আ.) থেকে শুরু করে আমাদের রাসুল (সা.) -এর যামানা পর্যন্ত ইয়াহুদিরা এই দিনে খুশিতে রোজা রাখতেন। কিন্তু এই মাসেই হযরত আলি (রা.) -এর হাতে তাদের বিখ্যাত সিপাহসালার মারহাবের মৃত্যু হওয়ায় তাদের কাছে খুশির মাসটা হয়ে উঠে বেদনাবিঁধুর। অপর দিকে সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্বাস (রা.) এর নেতৃত্বে মাদায়েন ও কাদিসিয়ার যুদ্ধে ইরানী মাজুসীদের বিখ্যাত রুস্তুমের পরাজয় হওয়ায় ইরানী মাজুসীদের কাছেও মাসটি হয়ে উঠে বেদনাবিঁধুর। এরপর থেকে উভয় সম্প্রদায় এই মাসে শোক পালন করা শুরু করে। এইভাবে বেশ কিছু কাল অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর তারা ভাবল আমরা এই মাসে শোক পালন করি আর মুসলমানরা এই মাসে নববর্ষের আমেজে মেতে থাকে এটা কী করে হতে পারে? তখন তারা আবূ মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়া সহ তাদের আরো কিছু লেখক এজেন্টের মাধ্যমে ইতিহাসকে বিকৃত করার সুচনা করে। আর বলে আমরা এই মাসে আমাদের নেতার কথা স্বরণ করে তাদের নামে শোক পালন করি, তোমরা তোমাদের মহান নেতা হুসাইন (রা.) –এর শাহাদাতের শোক পালন না করে নববর্ষের আনন্দে মেতে থাক এটা কেমন কথা হল? মিখনাফ কারবালা বিষয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক কিতাব রচনা করেছেন। তা থেকেই পরবর্তিতে আরো অনেক কিতাব রচয়িত হয়েছে। তারপর থেকে সময়ের পরিবর্তনে মুসলমানরাও মহাররম মাসে আনন্দের পরিবর্তে বিকৃত ইতিহাসকে অনুসরণ করে ১০ই মহাররম শোক পালন করা শুরু করে, যা আজ অবদি চলে আসছে। আবু মিখনাফ ছিল শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম একজন। মুহাদ্দিসগণের কাছে তার বর্ণিত হাদীসগুলো জঈফ ও মাউজু হিসাবে বিবেচিত। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/২২০) আর কারবালার ইতিহাস বর্ণনাকারীদের মাঝে মুলে হলেন আবু মিখনাফ।
আমরা আপাতত সে বিতর্কে না জড়িয়ে যদি এ বিষয়ক অতি প্রচলিত ঐতিহাসিক বক্তব্যকে সঠিক ধরে নেই যে, আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে হুসাইন (রা.) নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেছেন, তাতেও আশুরার দিবসের তাৎপর্য কমবে না এবং আশুরা দিবসে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহেরও কোন হেরফের হবে না।
-
আশুরা উপলক্ষ্যে করণীয়:
মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই আশুরাতে সংঘটিত ঘটনাবলি মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে রয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্রান্তিকালে করণীয় ও বর্জনীয় অসংখ্য নির্দেশনা এ আশুরার ঘটনাবলিতে বিদ্যমান। প্রতি বছর এ দিনটি যখনই মানুষের কাছে ধরা দেয়, তখনই মনে হয় যেন আশুরা তার শিক্ষার ভাণ্ডার নিয়ে আমাদের নতুনভাবে ডাকছে। এ দিনের আবেদন ফুরানোর নয়। আর তাই আশুরাকে আমাদের সুন্দরভাবে উদযাপন করতে হবে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এ দিনকে যেভাবে উদযাপন করেছেন এবং উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদেরও ঠিক সেভাবেই উদযাপন করতে হবে। আশুরার ফজিলত অগণিত। সে ফজিলত লাভের আশায় মুসলমানরা তো বটেই ইয়াহুদিরাও এ দিবসে রোজা পালন করে। এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগমন করলেন, দেখলেন মদিনার ইয়াহুদিরা আশুরার দিবসে রোজা পালন করছে। তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলল, এই দিনটা আমাদের কাছে বেশ গুরুত্বপুর্ণ। কারণ, এই দিনে আল্লাহ তা'আলা মুসা (আ.) এবং তাঁর সম্প্রদায় বনী ইস্রাঈলকে ফেরআউনের কবল থেকে মুক্ত করেছেন এবং তার উপর বিজয় দান করেছিলেন। তারই শুকরিয়া হিসাবে এই দিনে নবী মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিনে রোজা রাখি। রাসূল (সা.) বললেন, এই রোজা রাখার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমিই অগ্রাধিকার রাখি। তারপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ مَا هَذَا قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ فَصَامَهُ مُوسَى قَالَ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ (বুখারী- ১৯০০, মুসলিম-২৬৫৩, ইবনে মাজাহ-১৭৩৪, আবূ ইয়ালা-২৫৬৭, আহমদ-২৬৩৯, শরহে ইবনে বাত্বাল-৭/১৬৫)
শুধু ইয়াহুদিরাই নয়, মক্কার কুরাইশরাও এই দিনে রোজা রাখত। এই সম্পর্কে হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন,كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَصُومُهُ قُرَيْشٌ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُهُ فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ صَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تَرَكَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَمَنْ شَاءَ صَامَهُ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ - জাহেলিয়্যাতের যুগে কুরাইশরাও আশুরার দিবসে রোজা পালন করত। রাসুল (সা.) নিজেও রোজা রাখতেন। যখন তিনি মদিনায় হিজরত করলেন, তখন নিজেও রোজা রেখেছেন এবং লোকদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজাকে ইচ্ছাধিন করে দিলেন। (বুখারী-১৮৯৮, মুসলিম-২৬৩২, তিরমিযী-৭৫৩, আবূ দাঊদ-২৪৪২, বাইহাক্বী-৮৪৯৪, মোআত্বা-৬৫১, হিব্বান-৩৬২১, আহমদ-২৩৪৯১)
উল্লেখ্য, মুসলমানদের উপর রোজা ফরজ হয় হিজরতের ২য় বৎসর শাবান মাসের ২৮ তারিখ সোমবার। (সুবুলুস সালাম-২/৩০৫, নাইলুল আওত্বার-২/৪৯৯, আত তাহরিক- ৩/৯/০৮)
তবে ইয়াহুদিরা আশুরা উপলক্ষে এক দিন রোজা রাখে। তাদের রোজার সাথে যেন মুসলমানদের রোজার সাদৃশ না হয় তাই মুসলমানদেরকে আশুরার রোজার সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখে আরো একটি রোজা বৃদ্ধি করে রাখা উচিৎ। এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ - আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে মুহাররামের ১০ম তারিখের সাথে ৯ম তারিখেও রোজা রাখব। (মুসলিম-২৬৬২, ইবনে মাজাহ-১৭৩৬, মুসনাদে আহমদ-১৯৭২, কানজুল উম্মাল-৮/৫৭৩, মিশকাতুল মাসাবীহ ২০৪১, আউনুল মা’বুদ-৫/৩২৯, তুহফাতুল আহওয়াজি-২/২৯৫, ফাতহুল মুবিন-২/৩০১)
উপরের হাদীসে যদিও রাসুল (সা.) ৯ তারিখের কথা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, তথাপি কেউ যদি ৯ তারিখের রোজা না রেখে আশুরার রোজার সাথে ১১ তারিখে মিলিয়ে রোজা রাখে, তাতেও সমস্যা নেই। কারণ, এ সম্পর্কে অন্য হাদীসে রাসুল (সা.) বলেন,صُومُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَخَالِفُوا فِيهِ الْيَهُودَ صُومُوا قَبْلَهُ يَوْمًا أَوْ بَعْدَهُ يَوْمًا - তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং এই দিনে ইয়াহুদিদের রোজার বিরোধিতা কর। তোমরা আশুরার রোজার সাথে এক দিন আগে অথবা এক দিন পরে করে আরো একটি রোজা রাখ। (খুজাইমাহ-২০৯৫, বাইহাক্বী-৮৪৯১, আহমদ-২১৫৫, আল-মুসনাদ আল-জামে‘-২০/২৮৩)
-
আশুরার রোজার ফজিলত:
হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ - রমজানের রোজার পর সবচেয়ে বেশি ফজিলতপুর্ণ রোজা হল মহাররমের রোজা। (মুসলিম-২৭৪৭, তিরমিযী-৪৩৮, নাসাঈ-১৬১২, আবূ দাঊদ-২৪২৯, বাইহাক্বী-৮৫০৬, হিব্বান-৩৬৩৬, আহমদ-১০৫৩২, হাকেম-১১৫৫, তুহফাতুল আহওয়াজী-২/১৯৭, আল-মুগনী-৩/১৯৯)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’ (বুখারী ১/২১৮)
হযরত আলী (রা.) -কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূল (সা.)-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তা‘আলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’ (জামে তিরমিযী ১/১৫৭)
অন্য হাদীসে নবী করীম (সা.) বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/১৫৮)
উপরোক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ১০ই মুহাররমের তাৎপর্য কেবল কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এদিনে যে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী রয়েছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে আশুরার মর্যাদা ও গুরত্ব। যা পালিত হয়ে আসছে হাজার বছর ধরে।
-
আশুরায় বর্জনীয়:
বর্তমানে আশুরাকে ঘিরে অনেক কু-সংস্কার ও মারাত্মক অনৈসলামিক কাজকর্ম করা হয়। তার মাঝে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার। এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো হল, তওবা-ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক চলাই মুসলমানের একান্ত কর্তব্য।
-
তাযিয়া কাকে বলে?
অভিধানে তাযিয়া বলা হয় বিপদগ্রস্ত লোককে শান্তনা দেওয়াকে। শরীয়তের পরিভাষায় তাযিয়া হল কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিন পর্যন্ত শোক পালন করা। বর্তমানে তা’জিয়া রুপ হল- ইমাম হুসাইনের রওজার মত করে এক রওজা তৈরী করা, সেখানে লাল চাদর দেওয়া, মোমবাতি-আগরবাতি, গোলাপজল, বিভিন্ন মিষ্টি প্রাসাদ ইত্যাদি দেওয়া, কালো কাপড় পরিধান করা, এই মাসে বিয়ে-শাদী না করা, শোক গাঁথা কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করা, মিথ্যা ঘটনাপুঞ্জী বর্ণনা করা, কৃত্রিম সমাধি তৈরী করা এবং নারী-পুরুষ ছোট-বড় সকলেই বরকতের জন্য একে স্পর্শ করা আর এর নীচ দিয়ে আসা-যাওয়া করা। ধারণা করা হয়, এতে বয়স বৃদ্ধি পায়, বিপদ দূর হয়। হুসাইন (রা.) -এর কথা স্বরণ করে হায় হুসাইন, হায় হুসাইন বলে গাল আর বুক চাপড়ানো। তাঁর কাছে নিজের ভবিষ্যত মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করা। মানুষ নিজ হাতে একটা কবর তৈরী করে তার কাছেই কি ভাবে প্রার্থনা করতে পারে? আল্লাহ তায়ালা বলেন اتعبدون ما تنحتون ؟ তোমরা কি তার ইবাদত করো? যাকে তোমরা নিজ হাতে তৈরী করেছো? যারা এরূপ করে, তারা কিন্তু সওয়াবের উদ্দেশ্যেই করে থাকে। এই দিনে রোজা রাখার কথা স্পষ্ট সহীহ হাদীসে বিদ্যমান যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু যারা তা’যিয়া করেন তাদের অনেকেই সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আমল রোজা রাখার কথা বেমালুম ভুলে যান। তাদের অনেকেই নিজেদেরকে আলী (রা.) -এর বিশেষ শিষ্য বলে জোর দাবি করেন। অথচ, রাসূল (সা.) হযরত আলী (রা.) -কে এই বলে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেছিলেন যে, যেখানে কবরকে শক্তভাবে তৈরি করতে দেখবে, তাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে। কিন্তু শিয়ারা তার উল্টা কাজ করেও কীভাবে নিজেদেরকে আলী (রা.) এর শিষ্য বলে দাবি করে?
-
মুসলমানরা খুশির মাসে শোক পালন করে কেন?
এর জবাব সন্ধান করতে গেলে দেখা যায়, রাসুল (সা.) -এর আদরের নাতি [জান্নাতি যুবকদের নেতা হযরত হুসাইন (রা.)] -এর কারবালার প্রান্তরে নির্মম শাহাদত বরণের কথা। বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। জান্নাত প্রত্যাশি প্রতিটি যুবকই তার নেতার এই নির্মম শাহাদাত দিবসে শোক পালন করতে আগ্রহী হবে এটাই স্বাভাবিক যদি কুরআন ও হাদীসের অনুমোদন পাওয়া যায়। কিন্তু নবী (সা.)-এর শিক্ষা তো এমন- ‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’ অন্য হাদীসে নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপড়ায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে।’ উম্মে হাবীবা (রা.) বলেন, لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি- যে মহিলা আখেরাত ও আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে তার জন্য বৈধ নয় যে, সে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করে। কিন্তু তার স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারবে। (বুখারী-৫০২৪, মুসলিম-৩৭০৯, তিরমিযী-১১৯৬, নাসাঈ-৩৫৩৩, আবূ দাঊদ-২২৯৯, ইবনে মাজাহ-২০৮৬, বাইহাক্বী-১৫৯৩২, হিব্বান-৪৩০৪)
রাসূল (সা.) আমাদেরকে তিন দিনের বেশি শোক পালন করার অনুমতি দেননি। তাহলে? তাহলে কি আমরা কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ করব? যার বিনিময়ে আমরা জান্নাতি হতে পারব এবং সেখানে হুসাইন (রা.) -এর নেতৃত্বে থাকতে পারব। নাকি কুরআন ও হাদীসের বিরোধী কাজ করে জাহান্নামী হব? যেখানে তার কোন সহযোগীতা আমরা পাওয়ার যোগ্যতা রাখব না?
-
মাতম যদি বৈধই হত তবে আরো যাদের শোকে মাতম করা উচিত?
কেউ যদি মাতম করতে চায়, তাহলে সর্বপ্রথম বিশ্বনবী জনাব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর জন্য মাতার করা উচিত। যাঁকে কাফেররা জীবনব্যাপী কত কষ্ট আর যন্ত্রনা দিল! এক সময় আপন মাতৃভুমি ছাড়তেও বাধ্য হলেন। পর্যায়ক্রমে আবূ বকর (রা.) যিনি ইসলামের প্রথম খলীফা, ওমর (রা.), যিনি মসজিদে ফজরের নামাজ আদাই করা অবস্থায় শহিদ হয়েছেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৬/২৫৯। উসমান (রা.) যিনি ৩৫ হিজরীর ১৮ই জিলহাজ্ব নিজের বাসভবনে আততায়ী কর্তৃক নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। আলি (রা.), যিনি ৪০ চল্লিশ হিজরির ১৭ই রমজান শুক্রবার কুফার মসজিদে ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পর খারেজীদের দ্বারা নিয়োজিত আততায়ী আব্দুর রহমান ইবনে মালজুম এর বিষাক্ত ছুরি দ্বারা মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। এর তিন দিন পর ৬৩ বৎসর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৬/২৫৯, ৮/২২১)। হাসান (রা.) ও অসংখ্য সাহাবী, যারা ওহুদ, বদর সহ বিভিন্ন যুদ্ধের ময়দানে কেবলমাত্র ইসলামের পতাকা উড্ডীন করতে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কই? তাদের জন্য তো কাউকে মাতম করতে দেখা যায় না। তথাপি তা’যিয়া আর মাতম পালনকারী শিয়া স¤প্রদায়ের লোকেরা আবূ বকর ও ওমর (রা.) -কে কাফের বলে গালি দেয় (নাউজুবিল্লাহ)।
-
আশুরার শিক্ষা:
১. হজরত মুসা (আ.) ও ইবরাহিমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া:
আশুরার দিন হজরত মুসা (আ.)-এর বিজয়ের ইতিহাস স্মরণ করতে হবে। তিনি যেভাবে আল্লাহর পথে অবিচল থেকে ফেরাউনের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন, ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরও বাতিলের পথকে রুদ্ধ করে ইসলামের আলোয় আলোকিত সমাজ গঠনের প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা গড়তে হবে।
২. কারবালার বিরল দৃষ্টান্ত:
আল্লাহতায়ালা মহররম মাসের দশ তারিখকে কারবালার ঐতিহাসিক বিরল দৃষ্টান্তের জন্যও মনোনীত করেছেন। এ দিনে নবী দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারবর্গ যে আত্মত্যাগের মহা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অপূর্ব। হিজরি ৬০ সনে ও ইংরেজি ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এ দিনে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্মরণকালের মানব ইতিহাসের নির্মমতম হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) সপরিবারে এদিন ফোরাতের কিনারে শাহাদতের পানি পান করেন। নীতি ও আদর্শের জন্য, সত্য ও ন্যায়ের জন্য অবলীলায় প্রাণ উত্সর্গ মানব ইতিহাসে সত্যিই বিরল। অপ্রতিরোধ্য বাতিল ও শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে তেজদীপ্ত ঈমানদারের দুর্বল প্রতিরোধের যে ইতিহাস আশুরার দিনে কারবালা প্রান্তরে রচিত হয়েছে, তা অনন্য ও কালজয়ী। যুগ যুগ ধরে এ ঘটনা মানুষকে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রত্যয়ী হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
আশুরার দিন কারবালা প্রান্তরে মানবেতিহাসের যে নির্মম কাহিনী রচিত হয়েছিল তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের মজবুত ঈমান। তাই আমাদের ঈমানি চেতনায় বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবন পরিচালনা করতে হবে। কারবালার প্রান্তরে হজরত হুসাইন (রা.) সপরিবারে আত্মত্যাগ করে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, যে মস্তক আল্লাহর কাছে নত হয়েছে সে মস্তক কখনও বাতিল শক্তির কাছে নত হতে পারে না। আল্লাহর পথে অটল থাকতে মুমিনরা তাদের জীবনকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। তাই আজকের মুসলমানরা সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথ নিতে পারলেই কেবল আশুরার তাৎপর্য্য প্রতিফলিত হবে।
-
লেখক:
প্রিন্সিপাল, আল-ইত্তেহাদ আন্তর্জাতিক মাদরাসা
বনশ্রী আবাসিক এলাকা, মৌলভীবাজার- ৩২০০।