07/05/2026
আজ ৭ মে।
দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাকে অপহরণ করা হয় আজকের দিনে।
১৯৭১ সালের ৭ মে, দিনটি ছিল শুক্রবার। এই দিনে পাকি হানাদার বাহিনী আর তাদের সহযোগীরা নারায়ণগঞ্জ থেকে রণদা প্রসাদ সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাকে অপহরণ করে গুম করে। তাঁদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়। অসংখ্য মানুষ পূর্ব বঙ্গ থেকে স্রোতের মতো দেশান্তরী হয়ে পশ্চিম বাংলায় যান। সেই সময়ে এই দানবীরকে কলকাতায় থেকে যাবার অনুরোধ করা হয়। সেই অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। কলকাতা ট্রাম কোম্পানী কেনার প্রস্তাব পায়ে ঠেলে কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্যের পাট চুকিয়ে সেখানকার অঢেল সম্পদের মায়া ত্যাগ করে রণদা প্রসাদ সাহা নিজের মাতৃভূমিতে পাকাপাকিভাবে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে রণদা প্রসাদ সাহা তার সকল ব্যবসা, কল-কারখানা, সম্পত্তি এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনার জন্য ‘কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’ গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে, স্বজনরা রণদা প্রসাদ সাহাকে পালিয়ে যেতে বলেছিল! যে মানুষটি ১৯৪৭ সালে স্রোতের উল্টোদিকে যাত্রা করার সাহস করেছিলেন ১৯৭১-এ পালিয়ে যাবার কথা তিনি ভাবতেও পারেননি। তার মাথায় শুধুই ছিল মানব কল্যাণের ভাবনা।
১৮৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর সাভার উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের কাছৈড় গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম তাঁর। পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ পোদ্দার এবং মাতার নাম কুমুদিনী দেবী। মাত্র সাত বছর বয়সে তাঁর চোখের সামনে বিনা চিকিৎসা আর অবহেলায় মায়ের মৃত্যু হয়। তাঁর অনন্দময় শৈশব থমকে যায় মার অকাল মৃত্যুতে। এই মৃত্যুই সাত বছরের ডানপিটে বালকের জীবনের দর্শন বদলে দেয়। বালক মনে মনে সংকল্প করে মানুষের জন্য, মানবতার জন্য কিছু করতে হবে। তাই কিশোর রণদা বাড়ি ছেড়ে কলকাতা চলে যান । অচেনা-অজানা পরিবেশে পেটের তাগিদে জীবন বাঁচাতে কুলিগিরি, রিকশা চালানো, ফেরি করা, খবরের কাগজ বিক্রির মতো বিচিত্র কাজ করেন। কলকাতায় সারাবাংলা থেকে কাজের সন্ধানে ছুটে আসা ভুখা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ক্ষুব্ধ রণদা স্বদেশী আন্দোলনে যোগদান করে কয়েকবার কারাবরণ করেন।
১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ভারত থেকেও অসংখ্য তরুণ সেনাবাহিনীতে নাম লিখায়। বাংলার সেই কিশোর যোগ দেয় বাঙালিদের প্রথম সামরিক সংগঠন বা ইউনিট ‘বেঙ্গল এ্যাম্বুলেন্স কোর-এ। যুদ্ধ শেষে রেলওয়ে বিভাগের টিকিট কালেক্টরের চাকরি হয়। ১৯৩২ সালে এই চাকরি থেকে অবসর নেন। নিজের সঞ্চয় আর অবসর ভাতার এককালীন অর্থ দিয়ে শুরু করেন লবণ ও কয়লার ব্যবসা। বছর চারেকের মধ্যেই ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠেন তিনি। কয়লার ব্যবসায় লাভ বেশি হওয়ায় লবণের ব্যবসা বাদ দিয়ে কয়লার ব্যবসায় মনোযোগ দেন। ১৯৩৯ সালে জমিদার নৃপেন্দ্রনাথ চৌধুরী, ডা. বিধান চন্দ্র রায়, বিচারপতি জে. এন. মজুমদার ও নলিনী রঞ্জন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘বেঙ্গল রিভার সার্ভিস’। অল্প কিছুদিনের মধ্যে অন্যান্য শরিকদের কাছ থেকে সব অংশ কিনে নিয়ে তিনি কোম্পানির একক মালিকানা লাভ করেন। তারপর থেকে শুধুই এগিয়ে যাওয়া। কোম্পানির লঞ্চ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নারায়ণগঞ্জে একটি ডকইয়ার্ড নির্মাণ করেন। পূর্ববঙ্গে এটিই ছিল প্রথম ডকইয়ার্ড। ১৯৪০ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জের জর্জ অ্যান্ডারসন কোম্পানির সকল সম্পদসহ পাট ব্যবসা কিনে নেন। এভাবে যে কিশোর তার মাকে হারিয়েছে বিনে চিকিৎসায়, বেড়ে উঠেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে, হয়ে উঠে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একজন।
ব্যবসার পাশাপাশি দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ১৯৩৮ সালে মির্জাপুরে মায়ের নামে কুমুদিনী হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং একই সময়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগ হিসেবে ঠাকুরমার নামে ‘শোভাসুন্দরী ডিসপেন্সারি’ চালু করেন। নারী শিক্ষার প্রসার করে নারীর ভাগ্যোন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৪০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভারতেশ্বরী হোমস। প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন তার পিতামহী ভারতেশ্বরী দেবীর নামানুসারে। ১৯৪৩ সালে কুমুদিনী হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৪৪ সালের ২৭ জুলাই বাংলার গভর্ণর লর্ড আর জি কেসি ২০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। ১৯৫৩ সালে কুমুদিনী হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা চালু হয়। সেটাই পূর্ববঙ্গে প্রথম ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসালয়। ১৯৭০ সালে কুমুদিনী হাসপাতালে ৫০ শয্যার যক্ষা ওয়ার্ড চালু করা হয়। ১৯৪৩ সালে রণদা প্রসাদ সাহা টাঙ্গাইলে মেয়েদের জন্য কুমুদিনী মহিলা কলেজ স্থাপন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি পিতার নামে মানিকগঞ্জে দেবেন্দ্র কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দেশের এবং পশ্চিম বঙ্গের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ১৯৪৩ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে রণদা প্রসাদ সাহা কলকাতা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় চার মাস ধরে বেশকিছু লঙ্গরখানা পরিচালনা করে ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্য যোগান দেন। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মানবতার কল্যাণে রেডক্রস তহবিলে বিপুল অর্থ প্রদান করেন। স্কুল-কলেজ, চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল ছাড়াও তিনি জনস্বার্থে কমিউনিটি সেন্টার, পাবলিক হল, নাট্যমঞ্চ ইত্যাদি নির্মাণ করেন। ১৯৫৮ সালে রণদা প্রসাদ সাহার অর্থায়নে ঢাকা সেনানিবাসের সিএমএইচ-এ প্রসুতী বিভাগ স্থাপন করা হয়।
বৃটিশ সরকার ১৯৪৪ সালে তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার সমাজ সেবার জন্য তাঁকে ‘হেলাল এ পাকিস্তান’ খেতাব প্রদান করে। কিন্তু তিনি সেই খেতাব প্রত্যাখান করেন বাঙ্গালীদের উপর নির্যাতনের কারণে।
ভারত ভাগের পর নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে এসেই প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই মানুষটি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’ । দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে, নানান ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে রণদা প্রসাদ নিজ কর্মগুণে যে বিশাল সম্পদের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন তার পুরোটাই ব্যক্তিগত ভোগে খরচ না করে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করে গেছেন। আজো তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। মাতৃভূমির জন্য নিজের সব সম্পদ তুলে দিয়ে মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা এই মানুষটিকে ছাড়েনি পাকি হায়েনারা।
১৯৭৮ সালে রণদা প্রসাদ সাহা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পান। ১৯৮৪ সালে ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ সমাজ সেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করে। বাংলাদেশ সরকারের ডাক বিভাগ ১৯৯১ সালে রণদা প্রসাদের স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০২০ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেছে ভারতেশ্বরী হোমস।
রণদা প্রসাদ সাহাকে ভালোবেসে সকলে ডাকতো ‘জ্যাঠা মনি' বলে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জানান দেয় তিনি আছেন। আমাদের মাঝেই আছেন। আমাদের মনের মনিকোঠায় বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
হে মহা মানব একবার এসো ফিরে
শুধু একবার চোখ মেলো
এই গ্রাম নগরীর ভীড়ে ॥