09/11/2025
ক্বদীম-কঠিন নেসাব:
কিছু মাকাসেদ ও ফাওয়ায়েদ
--মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ
نحمده ونصلي على رسوله الكريم. أما بعد:
১. কদীম নেসাবের উদ্দেশ্য অনেক, কিন্তু সর্বমূল উদ্দেশ্য হলো ইলম অর্জনের এস্তেদাদ তৈরি। নেসাবের কিতাবের বাইরে রয়ে যাওয়া হাজারো কিতাব পড়ে বুঝে হজম করে ইলম ও তাফাক্কুহ অর্জন এবং ইলম বিতরণের যোগ্যতা তৈরি।
২. ক্বদীম নেসাবের মূল মাকসাদ এস্তেদাদ এবং 'কলবে য়াকজাঁ'। 'জবানে হুঁশমান্দ' ক্বদীম নেসাবের মূল মাকসাদ নয়, 'মালুমাতের এজাফা'ও নেসাবের মূল মাকসাদ নয়। মূল মাকসাদ আলেম হওয়ার যোগ্যতা তৈরি, নেসাবের বাইরের ইলমি কিতাব পাঠের যোগ্যতা ও মানসিকতা তৈরি।
৩. আরবি বোঝা, লেখা এবং বলতে পারা তিনওটা আরবি নেসাবের মাকসাদ। তবে উলুমে ইসলামিয়ার মূল মাসাদির থেকে মাসায়েল বোঝা এবং ফাহম হাসিল করাটা প্রধান মাকসাদ। বুঝ-সমঝের যোগ্যতা ব্যাহত হয়, এমনভাবে লেখা-বলার চর্চা মোনাসেব নয়। এখন আরবি বলতে পারার জন্য মুখের চর্চা বৃদ্ধি করা হচ্ছে এবং সে আলোকে পাঠ দান করা হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে তাহকীক বিমুখতা ও সতহিয়্যত বাড়ছে কি না ভেবে দেখা দরকার।
৪. পাঠ্য নেসাব এস্তেদাদ গঠনের উপযোগী হতে হয়, ইলমের এজাফা এর মূল মাকসাদ নয়। পাঠ্য নেসাব যদি এত সহজ হয় যে, মেধা খাটানো ছাড়াই ব্যক্তিগত মোতালায় পাঠোদ্ধার হয়ে যায়, তাহলে তা নেসাব হওয়ার উপযোগী নয়। আগের কালে এজন্য 'মতন' তৈরি করে নেসাব করা হতো।
৫. নেসাব অপরিবর্তীয় কিছু নয়। যুগের আহলে ইলমের পরামর্শে এস্তেদাদ গঠনমুখী ওজস্বী সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। তবে নেসাবের কিতাবের ভাষা-বর্ণনা-উস্থাপনা সহজ-সাহল-হালকা হতে পারে না, ভারী ও ব্যাক্ষাসাপেক্ষ হতে হয়। অন্যথায় এস্তেদাদ গঠনের লক্ষ্য ব্যাহত হয়।
৬. এস্তেদাদ গঠনের মূল কিতাবগুলোর মাঝে কিছু তো এমন, যেগুলোর বিকল্প পেশ করা বলা যায় অসম্ভব। আর কিছু বুনিয়াদি কিতাবের উত্তম-উপযুক্ত বিকল্প আসার আগ পর্যন্ত প্রয়োজনে সহযোগী কিতাব সাথে রাখা যায়।
৭. ইলমি-ফন্নী ভাষারীতিতে উপস্থাপিত ক্বদীম নেসাবের মোয়াক্কার কিতাবাদি পাঠ দানের দ্বারা সংশ্লিষ্ট কিতাবই শুধু উদ্দেশ্য নয়, বরং সুকঠিন ইলমী বিষয়বস্তু বোঝার যোগ্যতা ও মানসিকতা তৈরি করাও উদ্দেশ্য।
৮. পুরানো কিতাব ও বিষয়বস্তুর প্রতি 'ওয়াহশাত' ও 'নফরত' সালাফ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ইলম থেকে মাহরুম হওয়ার বড় কারণ। শুধু জাদীদ আর সহজ পড়ালে ছাত্রের মাঝে এই রোগ দেখা দেয়। তাই জটিল-কঠিন ভীতি দূর করা, পুরানো ইলমী বিষয়ের প্রতি আগ্রহ পয়দা করা, ভারী শাস্ত্রীয় বিষয় আয়ত্ব করার মানসিকতা ও সাহস সৃষ্টি করা একান্ত কাম্য। এর জন্য ক্বদীম নেসাব যথাসম্ভব বহাল রাখা এবং প্রতিস্থাপন করা দরকার।
৯. শিক্ষা ও তালীম-তরবিয়তের ভিতর কঠিনতা, শাসন-শাস্তি, প্রশিক্ষণ ও কষ্টসহিষ্ণুতার বিষয় থাকে। কথায় আছে কঠিন প্রশিক্ষণ সহজ যুদ্ধ। স্বভাবগতভাবেই শিক্ষা কঠিন বিষয়, সহজ কিছু নয়। মেধার উপর চাপ প্রয়োগ ছাড়া মেধা শাণিত হয় না, 'তাশহীযে আযহান' হয় না। ইলমী এবং ফন্নী কিতাব বোঝার আগ্রহ-যোগ্যতা পয়দা হয় না। ফলে অনেক ওলামায়ে কেরাম শিক্ষাকে সহজ, আনন্দময় এবং আরামদায়ক করতে চাওয়াকে শিক্ষার স্বভাব ও উদ্দেশ্য পরিপন্থী বলে মনে করেন।
১০. দ্বীনী ইলমের বিষয় শেকড়মুখী। সমঝ-ফাহম, নজরিয়া ও ফিকির এবং আওসাফ হতে হয় সম্পূর্ণ সালাফের। আর ইলমের আসবাব ও বাহনেও 'কদামতপছন্দী' ওলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। তারা জাদীদ জিনিস পরীক্ষা-নিরীক্ষার দীর্ঘস্তর পার হওয়ার পর গ্রহণ করেন, তড়িঘড়ি করেন না। এই তরিকা 'আসলাম' ও নিরাপদ।
১১. ইলমের জন্য মেধা, সবর ও মুজাহাদা জরুরি। কদীম ও কঠিন নেসাব দ্বারা মেধা তীক্ষ্ণ করা এবং ইলমের জন্য সবরের মানসিকতা সৃষ্টি করা উদ্দেশ্য। কিন্তু অনেকে জাদীদ ও সহজ নেসাব তৈরি করছে স্বল্প মেধার কষ্টবিমুখদের কথা ভেবে। ফলে যারা স্বল্প মেধাবী, তাদের তো নয়ই, মেধাবীদেরও কাঙ্খিত এস্তেদাদ হচ্ছে না। আসলে স্বল্প মেধার কষ্টবিমুখদের 'আলেম' বানাতে চাওয়া ঠিক না, তাদেরকে দ্বীনদার বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। হযরত থানবী রহ, এমনটাই বলতেন।
১২. নেসাবের কিতাব হয়তো ১০০টি, কোনো মেধাবী ছাত্র পাঁচ-ছয় বছরে সব পড়েও ফেলতে পারে। কিন্তু নেসাব শুধু কিতাব নয়, শিক্ষকও। নেসাবের প্রতিটি কিতাবের সাথে একজন শিক্ষক থাকেন। কদীম নেসাবে সেই শিক্ষকের জীবনের যাবতীয় ইলমি অর্জন, সমঝ-ফাহম এবং অভিজ্ঞতাও নেসাব। আর ছাত্রের আমলি তরবিয়তও নেসাব। সুতরাং বর্ষ না কমিয়ে নেসাবের কিতাবের সাথে শিক্ষকের সান্নিধ্যে নির্ধারিত সময় কাটানো দরকার, আমলি তরবিয়ত অর্জন করা দরকার। এর জন্য 'ফুল কোর্স' জরুরী।
১৩. শুধু নেসাবের কিতাবে যতটুকু লেখা আছে, ততটুকুর মাঝে পাঠদান সীমাবদ্ধ করা উচিৎ নয়। নেসাবের কিতাবের সাথে সাথে উস্তাদের 'তাকরীর' ও রাহনুমায়ী অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখন আমরা নেসাবের কিতাবের প্রতি যত গুরুত্বারোপ করছি, কিন্তু নেসাবের যিনি পাঠদাতা, যিনি ছাত্র গড়ার মূল কারিগর, সেই উস্তাদের মোতালা বৃদ্ধি ও মানসম্পন্ন করার বিষয়ে জোর দিচ্ছি না। ফলে একজন শিক্ষক, যাকে বলে আহলে ইলম, তা হতে পারছেন না। শুধু ছাত্ররা পরীক্ষায় ভালো ফল করছে, কিন্তু একজন শিক্ষক যাকে বলে 'আহলুল ইলম' ও 'আহলুদ দলিল' হয়ে গড়ে উঠছেন না।
১৪. ক্বদীম নেসাবের রীতি হলো-- উস্তাদ তার বিস্তৃত মোতালা থেকে তাঁর তাহকীক ছাত্রের সামনে তুলে ধরবেন, আর ছাত্র উস্তাদের তাকরীরের আলোকে নেসাবের কিতাব এবং অন্যান্য 'মাসাদির' থেকে নিজেও মোতালা করবে। এতে উস্তাদ যেমন ধীরে ধীরে আহলে ইলম হয়ে উঠবেন, তেমনি ছাত্রও এস্তেদাদ সম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে।
১৫. কিতাবকে শায়খ না বানিয়ে উদ্ভাদকে শায়খ বানানো দরকার। কিন্তু নেসাবের কিতাব সহজ হয়েগেলে ছাত্রের কাছে উচ্চাদের গুরুত্ব হ্রাস পায়, ছাত্রের মেধা নিষ্ক্রীয় থেকে যায়, মেধার কসরত কমে যায়। যে কিতাব এত সহজ যে, উস্তাদ শুধু বলবেন, 'অমুক পৃষ্ঠা থেকে অমুক পৃষ্ঠা পড়া।' ব্যস, উস্তাদের কাজ শেষ। ছাত্রের কাজ মুখস্ত চর্চা করা। এতে ছাত্রের মেধা যেমন কাজে লাগছে না, উস্তাদের তাকরির ও রাহনুমায়ীরও দরকার হচ্ছে না। এটা অনভিপ্রেত।
১৬. কদীম নেসাবে পাঠ্য কিতাবের চেয়েও উস্তাদ গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র গড়ার মূল কারিগর উস্তাদ, নেসাবের কিতাব তার সহায়ক। তাই মূল ইলম ও সমঝ-ফাহম শিখবে উত্তাদের কাছে। সুতরাং উদ্ভাদ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী নানান কিতাব মোতালা করবেন, তিনি তাঁর সারনির্যাস ছাত্রের সামনে তুলে ধরবেন এবং সংশ্লিষ্ট কিতাবাদির সন্ধান দিবেন। ছাত্র উস্তাদের তাকরীর এবং নেসাবের কিতাবের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কিতাবাদি থেকেও সাহায্য নিয়ে পাঠ তৈরি করবে, বিষয়বস্তু আত্মত্মস্থ করবে। এভাবে উস্তাদ-শাগরিদের ইলমি 'মোস্তাওয়া' উপরে উঠতে থাকবে এবং উভয়ের মাঝে রূহানী ও দ্বীনী বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ় হতে থাকবে।
১৭. ক্বদীম নেসাব পাল্টানোর বাড়তি চেষ্টা না করে 'তরিকে তালিম' সহীহ করা দরকার। ছাত্রের মেধা থেকে কাজ নিলে এই নেসাব থেকেই যোগ্য ব্যক্তি তৈরি হবে। জাদীদ ও সহজ নেসাবের 'তরিকে তালিম' সহীহ হলে যতটুকু হবে, তার চেও বেশি হবে বলে মনে হয়।
১৮. ছাত্র গড়ার ফিকিরের সাথে সাথে উস্তাদ গড়ার ফিকিরও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে পড়ে একজন উদ্ভাদের ইলমি-আমলি তরক্কির জন্য, তাদরীস-তাসনীফ ও মোতালার কাজে অগ্রসর হওয়ার জন্য উৎসাহ দান এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। সালাফের কর্মপদ্ধতি থেকে এ দিকটির গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।
১৯. এখন কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় এমতেহানগুলোর সুয়ালাত কিতাবের মতন, উস্তাদের তাকরীর ও প্রশিদ্ধ আরবি হাশিয়া ও শরাহমুখী না হওয়ার কারণে ছাত্ররা নোট-গাইডমুখী হচ্ছে। অথচ লেখাপড়া হওয়া দরকার ইলম-কিতাব-মতন এবং উস্তাদমুখী।
২০. যেখানে আহলে ইলম ও আহলে দিল আছেন, যেখানে এন্তোদাদ গড়ার ফিকির আছে, সেখানে ছাত্রদের ভীড় হওয়া উচিৎ। মারকাজী পরীক্ষার ফলাফল ভালো, শুধু এই বিবেচনায় সেরা মাদরাসা নির্বাচন করা ঠিক নয়।
২১. পরীক্ষা ও নোট-গাইড নির্ভর পড়াশোনা আত্মত্মঘাতী। ছাত্রের লেখাপড়া ও দরস 'মতন' নির্ভর, আরবি মা'খাজমুখী, ইলম এবং উদ্ভাদমুখী হওয়া জরুরি।
২২. ছাত্রদের তরবিয়তও অর্জিত হবে মূলত উস্তাদের সোহবত থেকে। এর জন্য কিছু সহযোগী কিতাব সংযুক্ত করা যেতে পারে।
২৩. সময়ের প্রয়োজনে জাদীদ ও ক্বদীম ফনের কোনো কিতাব বৃদ্ধি করার অবকাশ নেসাবে থাকা দরকার। তবে পাঠ্যক্রমে সংযোজন, বিয়োজন, সহজায়ন ইত্যাদি সুনিয়ন্ত্রিত না হলে নেসাবে 'প্রক্ষেপণের' আশংকা বাড়বে।
২৫. প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিশুশিক্ষা- আরবি, বাংলা, অংক, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি, ভূগোল ইত্যাদি সহজ-নতুন পাঠ্যপুস্তকে পাঠ দান করা যায়। তবে তাও জাতীয় কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিৎ। আর মাধ্যমিক স্তর থেকে শিক্ষাকে সহজ না করে যথাসম্ভব কদীম এবং ওজনদার রাখা কাম্য।
(একটি সতর্ক মত হল, নাহবেমীর বা হেদায়েতুননাহু পর্যন্ত নেসাব 'জাদীদ' হওয়াটা আসল, এর উপরের জামাতে নেসাব 'কদীম' হওয়াটা আসল )
২৬. নেসাবের যে সমস্ত কিতাব পরিবর্তনের বিষয়ে মুরুব্বিগণ এখনও এক মত হতে পারেননি, যার কারণে কিতাবগুলো নেসাবে বহাল আছে, সেসকল কিতাবের বিষয়ে ছাত্রদের ভিতর বিরূপ মনোভাব তৈরি না করে, উপরোক্ত ফাওয়ায়েদগুলো স্মরণ রেখে, ধৈর্যের সাথে সহীহ তরিকায় পাঠ দান অব্যাহত রাখা একান্ত কর্তব্য।
২৭. ক্বদীম নেসাবের ছাত্রদের জন্য জাদীদ নেসাবের কিতাবগুলো সংগ্রহ করে এস্তেফাদা করা কর্তব্য, একেবারে গাফেল-বেখবর থাকা মোনাসেব নয়।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরের ছত্রগুলো কদীম নেসাবের একজন মুদাররিসের অনুভব-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশমাত্র। এর মাঝে যথার্থতা কতটুকু তা বিচার করবেন হাযরাতে ওলমায়ে কেরাম। আল্লাহ তাআলা খায়রের ফায়সালা করুন, সকলকে হেফাজত করুন, আমীন।)
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العلمين
বিনীত বান্দা
আবু সাবের আব্দুল্লাহ
জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা
১৮/১১/১৪৪৩হি.
১৯/৬/২০২২ঈ.