30/09/2023
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মাতা আয়েশা ফয়েজের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকিতে আয়েশা ফয়েজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নাতনী অপলা হায়দারের স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি প্রকাশ করা হলো-
আমার নানুঃ আয়েশা ফয়েজ
আজীবন নানু চলে যাওয়া মানুষের নামে খতম পড়তেন আর এখন আমরা তার নামে পড়ি। জীবনের এই চক্র খুব নিষ্ঠুর। কদিন ধরে নানুর কথা খুব মনে হচ্ছে, ছোটবেলায় কয়েক বছর আমি আর আমার বড়বোন পিরোজপুর ছিলাম। একটা শব্দ ছিল ওটা শুনলে বুঝতাম নানু আসছেন। মাঝে মাঝে মিলত, মাঝে মাঝে মিলত না। মিললে দেখতাম মনি খালাকে নিয়ে কালো ফ্রেমের চশমা পরে আমার নানু গেট খুলে ঢুকছেন। সে কী আনন্দ!! আমি আর আমার বোন নানুর ব্যাগের পাশে গিয়ে বসতাম। নানু তার মধ্য থেকে নানা ধরণের চকলেট বের করে দিতেন। আবার আমরা যখন ঢাকা ছেড়ে পিরোজপুর চলে আসতাম। তখন দুইবোন গলা ছেড়ে কাঁদতাম। নানুর মুখের পান কাগজে মুড়িয়ে আনতাম। আচারের মত জমিয়ে জমিয়ে খেতাম। কী দিন ছিল।
ঢাকায় এলে বড়মামার বাসায় উঠতাম। নানু বিকেলে আমাদের ছয়বোনকে(মামাতো, খালাতো মিলিয়ে) মাথায় তেল দিয়ে দিতেন। সে ছিল কঠিন তেল! জুলফি দিয়ে চুয়ে চুয়ে পরত, এমন টাইট হত বেণী দুটি যে চোখে পানি এসে যেত। দুই বেণী শেষ হয়ে গেলে আমরা আয়নার সামনে গিয়ে জুলফির তেল টুকো মুছে হাতে মেখে ফেলতাম।
কোন পরীক্ষা, চাকরির ইন্টারভিউ আসলে নানুকে দোয়ার জন্য বলা হত। নানু শুনে বলতেন, ‘আল্লাহ্ মেহেরবান'’ এই শব্দটায় যে কত খানি ভরসা লুকিয়ে ছিল তা শুধু নানুর মুখে শুনলে বুঝা যায়। আমার খুব শখ ছিল আমার একটা উপন্যাসের মোড়ক উন্মোচন করবেন নানু। সেবার নানুর খুব শরীর খারাপ ছিল। বইমেলা শেষ হয়ে যাবার সময় হয়ে যাচ্ছে অথচ নানু সুস্থ্য হচ্ছেন না। পরে নানু একরকম মনের জোরেই তেইশ ফেব্রুয়ারিতে মোড়ক উন্মচন করলেন। কী খুশি ছিলেন নানু সেদিন। খুব মনে পরে নানুর আমাদের প্রতি অবদান গুলো।
আমার যখন বাচ্চা হবে তখন চুল খুব লম্বা হয়ে গেল এদিকে আমি শুনেছি এই দেশে চুল বাচ্চাদের ক্যান্সার হাসপাতালে ডোনেট করা যায়! আমি করতে চাইলাম। কে জানি আমার সহধর্মীকে বলল প্রেগ্ন্যান্সিতে চুল কাটলে বাচ্চার ক্ষতি হয়। আমি কখনও কুসংস্কার বিশ্বাস করি না। কিন্তু বাচ্চা হবার সময় সব মাদের মন দুর্বল থাকে আমারও তাই হল। আমি নানুকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। অন্য যে কোন বয়স্ক মানুষ হলে হয়ত বলতেন থাক দরকার নেই, অমুকে যেহেতু বলছে। নানু শুনে বললেন, ‘কখনো না। আগের যুগে মেয়েরা চুল লম্বা রাখবে ঘরে থাকবে এসব ভাবত ওখান থেকে এসব এসেছে। তুমি দান করোতো নানা।’ আমি নানুর কথায় ভরসা পেয়ে করলাম।
আমার দেখা বুদ্ধিমান দশজন মানুষের মাঝে নানু একজন। একটি ছোট্ট উদাহরন দেই। নানু চলে যাবার কিছুদিন আগে আমেরিকা থেকে নানুকে ফোন দিলাম। নানু ফোন ধরে কিছু শুনছিলেন না। আমি চিন্তা করব দেখে নানু বললেন, ‘অমি নানা, আমি শুনছি না কিন্তু ভাল আছি। চিন্তা কর না।’ ২০১২ র ২৭ সেপ্টেম্বর আমরা আমেরিকা আসি আর নানু ২০১৪ এর সেই ২৭ সেপ্টেম্বরই চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে! সেইদিন নীষা ফোন দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘অমি আপু, নানু মারা যাচ্ছে। আমরা হাসপাতালে।’ আমি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ফোন ধরে আছি। আমি কিছু করতে পারছি না, নানুকে দেখতে পারছি না। ইস কী কষ্ট দূরে থাকার। পরদিন যখন দাফন করা হবে নানুকে নেয়া হচ্ছিল ঠিক সেই সময় আমার এত অস্থির লাগছিল যে বলে বুঝাতে পারব না আমি আবার ছোট বোনকে ফোন দেই। নীষা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘অমি আপু নানুকে নেয়া হচ্ছে।’ আচ্ছা আমি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে কীভাবে বুঝলাম নানুকে চির বিদায় জানানো হচ্ছে?! আসার আগে নানু আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না নানা, আমার দীর্ঘ আয়ু।’ নানু, আপনি আপনার কথা না রেখেই চলে গেলেন! এই কালে আমার সাথে আপনার দেখা হল না, পরকালে দেখার অপেক্ষায় রইলাম নানু।
অপলা হায়দার
আয়েশা ফয়েজের নাতনি।