02/06/2026
শহরের এক কোণে যখন ট্রাফিক সিগন্যালটা লাল হয়ে ওঠে, তখন থমকে দাঁড়ায় চার চাকার বিলাসবহুল গাড়ি থেকে শুরু করে রিকশা-বাইকের এক দীর্ঘ সারি। আর ঠিক তখনই তীব্র রোদের পিচঢালা রাস্তায় সচল হয়ে ওঠেন ট্রাফিক সার্জেন্ট ইমরান।
দুপুরের সূর্যটা যেন আজ আগুন ছড়াচ্ছে। বাতাসে ধুলো আর কালো ধোঁয়ার মিশ্রণ। ইমরান ঘেমে নেয়ে একাকার, কিন্তু তার হাতজোড়া অবিরাম চলছে—গাড়ি থামানো, পথচারীদের পারাপার করা, আর জটলা পাকানো রিকশাগুলোকে লাইনে আনা।
ঠিক সেই সময় সিগন্যালে আটকে থাকা একটা এসি বাসের ভেতরে বসে জানলা দিয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রায়হান সাহেব। রায়হান সাহেব পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। মাসের শেষ, জ্যামের ক্লান্তি আর অফিসের কাজের চাপে তার মেজাজটা এমনিতেই খিটখিটে হয়ে আছে। ইমরানকে ওভাবে হাত নাড়াতে দেখে তিনি মনে মনে ভাবলেন, "কী দরকার বাপু এত ওভার-অ্যাক্টিং করার? একটু ছায়ায় দাঁড়ালেই তো হয়। এই পুলিশগুলোর জন্যই যত জ্যাম বাড়ে! কার আগে কাকে ছাড়বে, সেই ধান্দায় থাকে।"
সাধারণ মানুষের চোখে পুলিশ মানেই তো একটা চেনা ছক—হয় ক্ষমতার অপব্যবহার, না হয় অলসতা। রায়হান সাহেবের ভাবনায় যখন এই নেতিবাচকতা ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা।
হঠাৎ সিগন্যাল অমান্য করে একটা বেপরোয়া কাভার্ড ভ্যান তীব্র গতিতে মোড়ের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। একই সময়ে এক বৃদ্ধ পথচারী লাঠিতে ভর দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, যিনি ভ্যানটির গতি খেয়ালই করেননি। বাসের জানালা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে রায়হান সাহেবের বুকটা ধক করে উঠল, "গেল রে লোকটা!"
কিন্তু চোখের পলকে, নিজের জীবনের পরোয়া না করে সার্জেন্ট ইমরান রাস্তার মাঝখানে লাফিয়ে পড়লেন। একহাতে বৃদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন নিরাপদ দূরত্বে, আর অন্যহাতে ভ্যানটিকে থামার জোরালো সংকেত দিলেন। কাভার্ড ভ্যানটি বিকট শব্দে ব্রেক কষে ইমরানের ঠিক দুই ইঞ্চি সামনে এসে থামল।
এক সেকেন্ডের এদিক-ওদিক হলে আজ একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত। ইমরান বুক ভরে একটা শ্বাস নিলেন, পরক্ষণেই বৃদ্ধকে টেনে তুলে জিজ্ঞেস করলেন, "দাদু, চোট পাননি তো?" বৃদ্ধের চোখ তখন কৃতজ্ঞতার জলে ভেজা।
বাসের ভেতর বসে পুরো দৃশ্যটা দেখলেন রায়হান সাহেব। তার কপালে জমে থাকা বিরক্তির ভাঁজগুলো মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। যে মানুষটাকে একটু আগে তিনি মনে মনে দোষ দিচ্ছিলেন, সেই মানুষটাই নিজের জীবন বাজি রেখে আরেকটা প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। রায়হান সাহেব বুঝলেন, এই তীব্র গরমে, ধুলোবালি আর ধোঁয়ার মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো 'ওভার-অ্যাক্টিং' নয়, এটা এক অমানুষিক পরিশ্রম আর দায়িত্ববোধ।
সিগন্যাল যখন সবুজ হলো এবং বাসটি ইমরানকে পার হয়ে যেতে লাগল, রায়হান সাহেব জানলা দিয়ে মাথাটা একটু বের করলেন। ইমরানের সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি আলতো করে একটু হাসলেন এবং মাথা ঝুঁকিয়ে একটা নীরব ধন্যবাদ জানালেন।
ইমরানও পাল্টা একটা স্যালুট দিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিলেন। সাধারণ মানুষের একটুখানি স্বীকৃতি আর এই নীরব সম্মানটুকুই তো তাদের মতো হাজারো পুলিশ সদস্যের দিনান্তের সব ক্লান্তি আর পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে।