নবীন আবৃত্তিকার Muhammad Abul Hasnat এর কণ্ঠে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা "কেউ কথা রাখেনি"।
রাহবার সাহিত্য ফোরাম
সাহিত্য মনের খোরাক, সাহিত্য মনুষ্যত্?
শিক্ষিত হতে চাই
-সাব্বির আহম্মেদ
বাড়ছে শিক্ষা, বাড়ছে শিক্ষা, বাড়ছে পাশের হার
শিক্ষিত আছে কজন দেশে খোজ খবর নাই তার
পাশ করাই আজ হয়ে গেছে শিক্ষার মানদন্ড
শিক্ষিত থাকছে তলায়,চূড়ায় উঠছে ভন্ড।
শিক্ষাকে বানিয়ে দিয়েছে বাঙালী রঙ্গমঞ্চের খেলা
তাই দিয়ে খেলছে তারা দিন-দুপুর সারাবেলা।
সাহিত্য থেকে ক্রমেই আমরা চলে যাচ্ছি দূরে
দিনের বেলা আলো থাকলেও চলছি যেনো অন্ধকারে।
মনুষ্যত্ব জাগ্রত করতে শিক্ষার হয়েছে জন্ম
কালের বিবর্তনে ভুলে গেছে বাঙালি এ ধর্ম
করুন দশা হয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার
দৃষ্টিকোণ না বদলালে নেই এর থেকে নিস্তার।
যে শিক্ষায় সৃজনশীলতা নেই,নেই সাহিত্য রস
সে শিক্ষা আয়ত্ত্ব করে করতে চাইনা পাস
কোথায় গেলো কিশোর সমাজ?কোথায় বালকের দল!
শিক্ষিত হতে চাই, পাস করতে নয় গর্জে উঠে বল!
11/06/2020
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত
দেশ কাল পাত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ইতিহাস। সাহিত্যের ইতিহাসও তারই অন্তর্ভুক্ত। নদীর মতো ইতিহাসের গতি কখনও ঋজু পথ ধরে চলে, কখনও বা ভুজঙ্গ গতিতে। সাহিত্যের ইতিহাসের চরিত্র, সাহিত্যকে কেন্দ্র করে নানান উৎসব সেই ধারা অবলম্বন করে বিবর্তিত হয়। সে সব আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই সহস্র বর্ষব্যাপী বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে।
ভারতবর্ষের একটি বৈশিষ্ট্য ঐতিহ্যমণ্ডিত ভৌগলিক সংস্থার মধ্যে এক-ভাষাভাষী সংহত নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় সহস্রাধিক বৎসর ধরে যে জীবনাদর্শন আদি মানসিক স্বরূপ ও শিল্প সমুৎকর্ষ বিকাশ লাভ করেছে তার শ্রেষ্ঠ প্রতীকের নাম বাংলা সাহিত্য।
আর্দ্র ভূমির দেশ বাংলাঃ স্থল, জল আর বায়ুপ্রবাহ এ দেশের স্থাবর সংস্কৃতির প্রতি অকৃপণ দাক্ষিণ্য দানে কিছুটা বিরূপ। অবিশ্বাস্য ভাবে অল্প সময়ের মধ্যে মঠ, মন্দির, মসজিদ কালের কবলে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। রাজপ্রাসাদ ও পর্ণ কুটিরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না, শতাব্দী কালের ব্যবধানে। স্থাপত্য শিল্প, চিত্র, পুঁথি, লোককথা, লোককাহিনী সবকিছুই অচিরকালের মধ্যে কীটের ভোজে পরিণত হয়। ফলে বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্প গৌরব প্রত্নতত্ত্বের গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়।
মহাকালের রক্তচক্ষু অর্থাৎ বাংলায় আগত বিভিন্ন পর্যটক শাসক গোষ্ঠীর সংস্কৃতি এ দেশের সংস্কৃতি অবহেলা করে এবং বর্ষা বাদল, কীটপতঙ্গের গ্রাস এড়িয়ে যে বিপুল পুঁথি সম্ভার এ তাবৎ কাল রক্ষা পেয়েছে তার মধ্যেই প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি বাঙালির যথার্থ মনঃ প্রকৃতি, শিল্প চেতনা ও আত্মপরিচয় ধরা পড়েছে।
আমাদের প্রাচীন শিল্পের গৌরব আজ অনেকটা ধ্বংসস্তুপে সমাধি লাভ করলেও গ্রাম বাঙলার শৌর্যবীর্যের প্রমাণও ইতিহাসের বিবর্ণ পৃষ্ঠায় নথিভুক্ত হয়ে আছে। মৃত্তিকার উপরে দেহের যেমন প্রতিষ্ঠা, দেহের ভিতরে যেমন মনের প্রতিষ্ঠা আর সাহিত্য হলো সেই মনের অলঙ্কার।
আমরা প্রাচীন বাঙলার সাহিত্য পড়ে বাংলার জনপদের জীবন যাত্রার রেখাচিত্র অঙ্কন করে ফেলতে পারি।
বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে চর্যাপদ নিয়ে সবার আগে আলোচনা করতে হবে। চর্যাপদ হলো
বাংলায় বিভিন্ন জাতির আগমন ও শাসনে গড়ে ওঠে বিভিন্ন ধাপের সংস্কৃতি। কিন্তু সবই তার জীবন যাত্রার মানের উপর। এ দেশ আর্য, সেন, পাল, মোঘল ও ইংরেজ সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা শিল্পসমৃদ্ধির এক সংস্কৃতির দেশ। ‘উত্তর-পূর্বদিকের ময়ূরভঞ্জের শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।’ এই সীমার মধ্যে বাংলা ভাষার বিকাশ, বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য। এই ভূখন্ডই ঐতিহাসিক কালের বাঙালির কর্ম কৃতির উৎস এবং ধর্ম-কর্ম-নর্ম ভূমি।
সেই মতে আমরা বাংলার শিল্প সাহিত্য ও জীবন যাত্রার মানকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি। সাহিত্য গড়েই ওঠে জীবনযাত্রার মানের উপর তাই এখানে আমি জীবনযাত্রার মানের কথা বলতে চেয়েছি।
যেমনঃ প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ।
প্রাচীন যুগের সাহিত্যঃ বাঙলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে চর্যাচর্যবিনশ্চয় নিয়ে আলোচনা করতেই হয় যদিও এর নাম চর্যাগীতিকোষ। সংক্ষেপে চর্যাপদ। শুধু বাংলা ভাষা কেনো, সমস্ত পূর্ব ভারতের নব্য ভাষার প্রথম হ্রন্থ এই ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’। পুঁথিটির প্রকৃত নাম ‘চর্যাগীতিকোষ।’ এটি আবিষ্কারের আগে সাহিত্যের ইতিহাসলেখকরা মনে করতেন, ময়না-মতির গান, গোরক্ত বিজয়, শুন্য পুরাণ, ডাক ও খনার বচন, রূপকথা এইগুলি প্রাচীনতম বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টান্ত। বাংলা ভাষায় লেখা প্রাচীনতম সাহিত্যি দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামে বৌদ্ধ তান্ত্রিক পদসঙ্কলনকেই উপস্থাপিত করতে পারা যায়। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই পুঁথি আবিষ্কার ও সম্পাদনা করে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের হারানো দৃষ্টান্ত উদ্ধার করেন। নেপাল রাজদরবারে পুঁথির সন্ধান করতে গিয়ে ১৯০৭ খ্রীস্টাব্দে অনেকগুলি পুঁথির সাথে বাংলা ভাষায় লেখা চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের পুঁথি আবিষ্কার করেন। তবে সে পুঁথির ভাষা বাংলা হলেও এর ভাষা বেশ কঠিন ছিলো। এর সাথে দেয়া একটি সংস্কৃত ‘টিকা’ দেওয়া ছিলো বলে শাস্ত্রী মহাশয় এর কিঞ্চিৎ অর্থ উদ্ধার করতে পারেন। টিকাকারের নাম মুনিদত্ত। বৌদ্ধতন্ত্রে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন। মুনিদত্তের সংস্কৃত টীকা এবং ডঃ বাগচী আবিষ্কাৃত তিব্বতী অনুবাদের সাহায্যে চর্যাপদের আক্ষরিক অর্থ ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা এখন অনেকটা সহজসাধ্য হয়েছে। অনেক দেশি বিদেশি পন্ডিত চর্যাপদ নিয়ে নানা গবেষণা করেছেন, এখনও তার বিরাম হয়নি।
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ নেপাল থেকে যে সমস্ত পুঁথি আবিষ্কার করেন, তার মধ্যে যেগুলি তাঁর মতে প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত মনে হয়েছিলো, সেগুলিকে একত্র করে বাংলা ১৩২৩ সালে(১৯১৬খ্রীঃ) বঙ্গীয় সাহিতবয পরিষদ থেকে “হাজার বছরের পুরানো বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ হান দোহা” এই নামে সুসম্পাদিত করে তিনি প্রকাশ করেন। এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’, সরহ ও কৃষ্ণ আচার্যের দোহা, এবং ডাকা বর্ণ। তিনি সবগুলিকেই প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালের ভাষা তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’-ই শুধু প্রাচীনতম বাংলা ভাষায় লেখা। অন্য তিনখানির ভাষা বাংলা নয়। শৌরসেনী অপভ্রংশের ভগ্নাবশেষ ঐ ভাষার মেরুদন্ড। পরে এই গ্রন্থ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে- এর ভাষাতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, সমাজদর্শণঅতীব কৌতূহলপ্রদ। অবাঙ্গালী কিছু পন্ডিতেরাও যেমন রাহুল সাংস্কৃতায়ণ এই গ্রন্থ নিয়ে সমান উৎসাহে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। চর্যাপদের ভাষাতত্ত্ব আলোচনা করে ডঃসুনিত কুমার চট্রোপাধ্যায়, ঢঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রভৃতি পন্ডিতেরা মনে করেন এর রচনাকাল দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে হওয়াই সম্ভব। ভাষাতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, দার্শনিকতা এবং আদিম বাংলা সাহিত্যের সার্থক দৃষ্টান্ত হিসেবে চর্যাচর্যবিনিশ্চয় একখানি স্বরণীয় সঙ্কলন। এটি আবিষ্কৃত না হলে আদিমযুগে বাংলা সাহিত্যে ও বাংলা ভাষা অজ্ঞাতই রয়ে যেতো। সে দিক থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত চর্যাচর্যবিনিশ্চয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাঙলা সাহিত্যের ভিত্তি তাই প্রাচীন সাহিত্যের উপর। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শ্লোক, উপকথার উপর নির্মিত আমাদের প্রাচীন বাঙলা সাহিত্য। যেমনঃ আয়ুর্বেদগ্রন্হ, ব্যাকরণ অভিধান, ন্যায়শাস্ত্রাদি, টীকাটিপ্পনী ইত্যাদি। বাঙলা সাহিত্যের আলোচনার পূর্বে বাংলাদেশে রচিত সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্যের আলোচনার যৌক্তিকতা লেখা প্রয়োজন। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী বা তার অল্প কিছু আগে মাগধী অপভ্রংশের নির্মোক ত্যাগ করে বাংলা ভাষার জন্ম হয়। তবু এই অপরিণত ভাষা সাহিত্য কর্মেও কিছু কিছু ব্যবহৃত হতে থাকে৷
গুপ্ত-পাল-সেনযুগের বহু শিলালিপির সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব শাসনামলে বিভিন্ন সভাকবি তাদের কাব্যে স্নিগ্ধ কবিত্বের স্বাদুতা স্পর্শ করেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিত কাব্য রচনা করেন৷ এ কাব্যে তিনি একাধারে রামচন্দ্রের কাহিনী ও পালরাজা রামপাল ও তার ছেলে মদন পালের কাহিনী উল্লেখ করেছেন। সেনযুগে অর্থাৎ লক্ষণসেনের সভায় সংস্কৃত সাহিত্যের বিশেষ চর্চা হয়েছিলো। বৈষ্ণব পদসাহিত্যিক জয়দেবের গীত-গোবিন্দের প্রভাব অপরিসীম। তার অপূর্ব বাণী, বাক্যরীতি, রূপগল্প, আবেগের তীব্রতা ও ভক্তির সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা আধুনিক যুগেও মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলার শ্রেষ্ঠ সাধকেরা জয়দেবের প্রভাব অস্বীকার করতে পারেননি।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাঙালি সাহিত্য রসিকেরা আর এক কবি চণ্ডিদাসকে এক ও অদ্বিতীয় মনে করতেন। তিনি খুব সরল বাংলা ভাষায় রাঁধা কৃষ্ণ বিষয়ক অতি উৎকৃষ্ট পদ লিখেছিলেন। এ সময়কার সাহিত্যকে বৈষ্ণব সাহিত্য বলে। প্রাচীন সাহিত্যে আর এক কবি বিদ্যাপতি। বিদ্যাপতির পদাবলীর সংখ্যা পাঁচ শতেরও বেশি। তবে বিদ্যাপতির থেকে চন্ডিদাস ছিলেন অধিক জনপ্রিয় কবি।
উপসংহারে বলা যায় প্রাচীন সাহিত্য ছিলো পুরোটাই দেবদেবীর উপর শ্লোক-কথা। যা রাজসভায় চর্চা হতো।
মধ্যযুগীয় সাহিত্যঃ
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো মঙ্গলকাব্য। খ্রীঃ পঞ্চদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত এমনকি তারও পরে অনেক মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। এখনো পল্লী অঞ্চলে কোনো কোনো দেব দেবীর ঘটা করে পূঁজা হয়। এখানে দেবদেবীর মহিমা বিষয়ক গান করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ হিংস্র শ্বাপদের মুখ থেকে বাঁচবার জন্য চন্ডীদেবীর পূজা, সাপের বিষদন্ত থেকে আত্মরক্ষার জন্য দেবী মনসার পূজা, বসন্ত রোগ থেকে বাঁচতে বাশুলী, নিম্নবংগের মানুষ হিংস্র বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে দক্ষিণরায় ও বনবিবির পূজো করে আসছে। বনবিবি প্রকৃতপক্ষে মুসলমানের কল্পনাপ্রসূত এক দেবমূর্তি। গাজী কালুর গীত। এদের ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রাম বাংলার এক সংস্কৃতি। যা তাদের কল্পনায় গড়া নিজেদের মঙ্গলের জন্য এক উপসনা মাত্র। একসময় ভ্রাহ্মণ কবিরাও তাদের মহিমা প্রচারে কাব্য রচনায় মহানন্দে আত্মনিয়োগ করলেন। এদের কয়েকজন কবি যেমনঃ বরিশাল জেলার কবি বিজয়গুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গের বিপ্রদাস পিপলাই, ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় লোক কথার কবি নারায়ন দেব। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো তার বেশ কিছু পুঁথি রয়েছে। মঙ্গলকাব্যে বেশ কয়েকজন কবির কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমনঃ’সা বিরিদ খাঁ’ ইনি চট্টগ্রামের কবি। শাহ আব্দুল করিম তার পরিচয় বের করেন। ‘কঙ্ক’ ময়মনসিংহে কঙ্ক নামে বিদ্যাসুন্দরের যে এক কবির আবির্ভাব হয়েছিলো এ খবর একদা প্রায় কেউই জানতো না। সাহিত্যের ভক্ত চন্দ্রকুমার দে নামক এক ব্যাক্তি এই কবির পরিচয় সংগ্রহ করেন। দে সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আমরা ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার বহু আখ্যান পেয়েছি। এ আখ্যানে ‘লীলার বারমাসি’ একটি বিখ্যাত পালাগান পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ষোড়শ শতাব্দীতে সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রভূত উন্নতি ও পরিবর্তন হয়েছে। শ্রী চৈতন্যদেব এর সাহিত্য চর্চায়। শ্রী চৈতন্যদেবের পৈতৃক বাড়ি শ্রীহট্ট অর্থাৎ বর্তমান সিলেটে।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে আর একটি নাম পাওয়া যায় আর তা হলো ‘নাথ’ সাহিত্য। নাথ সাহিত্যও সাধারণত লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। দীনেশচন্দ্র তার বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের প্রথম সংস্করণে(১৮৯৬) সর্বপ্রথম সাহিত্যের ইতিহাসে এই ছড়া পাঁচালীর সম্বন্ধে অতি আলোচনা করেন।
মধ্যযুগের দিকে কিছু মুসলিম কবি সাহিত্যিকের নাম পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে আবির্ভূত অধিকাংশ মুসলমান কবি সংস্কৃত সাহিত্যের সু পণ্ডিত ছিলেন।
সপ্তদশ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ মুসলিম কবি দৌলত কাজী, আলওয়াল। সাহিত্য প্রেমি মুন্সি আব্দুল করিম তার সংগ্রহ ও তালিকা কৃত যাবতীয় পুঁথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ গ্রহণ করে৷
তারা ইসলামি রোমান্টিক প্রেমের গল্প লেখেন। তবে তার পিছনে রয়েছে সূফি সাধনার ইঙ্গিত। মধ্যযুগে বাংলা কাব্য সাহিত্যে রোমান্টিক মানবীয় প্রেমের আখ্যান রচনার প্রথম কৃতিত্ব মুসলমান কবিদের প্রাপ্য। হিন্দু কবিরা প্রায় সব সময়ে দেবতা দেবকৃপাধীন মানুষের কথা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এদিক দিয়ে সাহিত্যে এক পরিবর্তন আনেন মুসলিম লেখকগন।
যেমনঃ সপ্তদশ শতাব্দীতে দৌলতকাজীর ‘সতীময়না’, ‘লোরচন্দ্রানী’ রোমান্টিক আখ্যান হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করে।
আধুনিক যুগঃ
প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগের পরে বাংলা সাহিত্যের উদ্দাম জোয়ার ভাটার টানে মন্থরগতি হয়ে পড়ে। এর কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্রমিক অবক্ষয়। চারদিকে শাঠ্য ষড়যন্ত্রের লীলাখেলা, লোভাতুর স্বার্থের সর্প-জিহ্বা বিস্তার আর তারই সঙ্গে বাংলার মধ্যযুগীয় সাহিত্যের মৌলিক অবদান প্রায় শূন্যে পর্যবসিত হতে চলেছিলো। কারণ, তখনকার সকল সাহিত্যচর্চা ছিলো রাজসভাকে কেন্দ্র করে। তাই রাজ্যপট কি হয় কি হয়, এরকম পটভূমিকায় মৌলিক সাহিত্য আশা করা যায় না।
‘ব্রাহ্ম মুহূর্তের পূর্বক্ষণ অধিকতর গাঢ় অন্ধকারে আবৃত থাকে, পরে ধীরে ধীরে তমিস্রায় ঘোর কেটে যায়, তার পর সূর্যোদয়।’ বাঙ্গালির সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধের সঙ্গে এই চিত্রকল্পটি ব্যবহার করা যেতে পারে। উনিশ শতকে বাঙ্গালির সাহিত্যে নব জন্মান্তর হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্মচারীদের বাংলা শিখবার জন্য ১৭৭৮ সালে হেলহেড সাহেব’A Grammar of the Bengal Language’ লিখলেন। এ দেশে সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে বাংলা বর্ণ ব্যবহৃত হলো। অনেকে কোম্পানীতে চাকরির সু্বিধার জন্য vocabulary বাঙ্গালির অভিধানের চাহিদা মিটিয়েছিল। এই সব ছাপাখানা, নতুন ভাষা শেখা বাঙ্গালি শিল্প সাহিত্যের মোড় ঘুরে গেলো পুরোটা।
তবে ইংরেজ শাসনামলে পুরাতন সমাজ সংস্কৃতি অর্থাৎ অন্ধ কুসংস্কার যেমন ভেঙ্গে পড়েছিলো তেমনি বাংলায় নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলো শিল্প সাহিত্যে উন্নত জীবন যাত্রার মানে তৈরী হয়েছিলো।
পুরাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্ধ কুসংস্কার থেকে নতুন পথে আনতে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান অতুলনীয়। আকস্মিক ও আশ্চার্য এ পরিবর্তন এলো ইংরেজ শাসনকালে ইংরেজী ভাষার মারফতে। মধ্যযুগীয় ও ঘরকুনো বাঙালির চেতনায় ভূগোল-ইতিহাসের সীমা সহসা বেড়ে হেলো। ইংরেজি ভাষার মারফতে বাঙালি সর্বপ্রথম এই বিচিত্র দুনিয়ার পরিচয় পেলো।
মধ্যযুগের পদাবলী পাঁচালী ও দেবদেবীর লীলাকীর্তন ছেড়ে বাঙালি সাহিত্যিকগণ মাটির বুকে নামলেন। মৃত্তিকার মানবজীবনের অপার বিস্ময় উপলব্ধি করলেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগীয় মানসিকতা যথার্থ আধুনিক হলো। উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির মনের আগল ঘুচে গেলো, সে জন্য বাংলা সাহিত্যে বিশাল বিশ্বের ছায়া পড়লো। বিচিত্র জীবনের কল্লোল ধ্বনিত হলো, পশ্চিম সমুদ্রপাড় থেকে মুক্তির ঝড়ো হাওয়া এসে খাঁচার পাখির দুর্বল পাখার মধ্যে সাগর সঙ্গীত শুনিয়ে গেলো। তারপর খাঁচার শলা ভেঙ্গে গেলো। হংস বলাকা পাখা মেলে নীল আকাশের বুকে উড়ে গেলো। সামনে তখন তার প্রসারিত নীল গগনাঙ্গন। আর নিম্নে কলমন্দ্রমুখর সমুদ্রতরঙ্গ। এক কথায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যে দেবদেবী যেমন নতুনরূপে ঠাই পেলো তেমনি জীবনের বিশাল প্রত্যয় নিয়ে বিচিত্র বর্ণ সুষমায় ফুটে উঠলো। যাকে আমরা আধুনিক বা মডার্ন বলি। উনবিংশ শতকে বাংলা সাহিত্যে সেই আধুনিক বাণী সঞ্চারিত হলো। বড় রকমের পার্থক্য ঘটলো আত্মপ্রকাশের বাহন ও বিষয়বস্তুতে। গোটা পুরাতন বাংলা সাহিত্য ছন্দকে আশ্রয় করেছিলো অর্থাৎ পুঁথি ও গীতিকবিতা। আর আধুনিক যুগে গদ্য হয়ে উঠলো বাংলা সাহিত্যের প্রধান বাহন। মোটকথা উনিশ শতকে পুঁথির যুগের অবসান এবং মুদ্রণের যুগের সূচনা হয়।
তবে এরই মাঝে একদল কবি তৈরী হয়েছিলো যারা শিক্ষাদীক্ষায় বিশেষ জ্ঞান না থাকলেও মুখে মুখে গান রচনা করে ফেলতেন এদের কবিয়ালা বলা হয়। জমিদারদের স্থুল রুচি মেটাবার জন্য এই কবিয়ালরা দুই দলে ভাগ হয়ে আসরে দাড়িয়ে গান গাইতেন। যাকে বলে কবি লড়াই। সেই কবিযুদ্ধে সাহিত্যের রুচি, শালীনতা ও ভদ্রতার মুখ রক্ষা হতো না।
তবে অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে একদল রহস্যবাদী সাধক যাঁরা বাউল নামে পরিচিত ছিলেন এবং ঐ নামে একটি উপসম্প্রদায় গড়ে তুলেছিলেন। তারা যে অনেকগুলো উৎকৃষ্ট আধ্যাত্মসঙ্গীত রচনা করেছিলেন তা অষ্টাদশ শতাব্দী পাঠকের পক্ষে অভিনব মনে হতে পারে। এদের মধ্যে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ফিকির চাঁদ বাউল নামে পরিচিত ছিলো। জাতিসম্প্রদায়ের চিহ্নহীন একদল ভক্ত বিশুদ্ধ ঈশ্বরপ্রেমে বিশ্বাসী হয়ে বাউল নামে পরিচিত হয়েছিলো। বাউল শুধু গানের জন্য গান বাঁধেননি, তাঁদের গান সাধনার ইঙ্গিত বহন করে সাধনারই অঙ্গীভূত। তাঁরা মনে করেন প্রত্যেক মানুষের মাঝেই আছে ‘অধর চাঁদ’ মনের মানুষ আছেন।
বাংলাদেশে লালনের ফকির যে সব আধ্যাত্মিকতা গান বেঁধেছেন তা এক বাংলা সাহিত্যের এক সম্পদই। কুষ্টিয়ায় লালন ফকিরের সমাধীতে এখনো শ্রদ্ধা জানাতে হিন্দু মুসলমান সমাবেত হয়। বিদেশে লালন গান বেশ সমাদৃত।
বাস্তব জীবনকে সাহিত্যের উপাদান হিসেবে গ্রহন করতে হলে এর ভাষা হতে হবে সর্বজনবিদিত সহজ সরল। আর সে ভাষা হলো গদ্য। বস্তুতঃ বাংলা গদ্যই উনিশ শতকের বাঙালির চিন্তাধারাকে সুতীক্ষ্ম করেছে, যৌক্তিক পারম্পর্য বিন্যস্ত করেছে। কথা সাহিত্য ও নাটকের ভাষা জুগিয়েছে।
গদ্যের মধ্য দিয়েই একটা জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের যথার্থ সংবাদ পাওয়া যায়। শুধু পুঁথি-কাব্যে পুরো বৈশিষ্ট্য ধরা যায় না। তাই গদ্যকে বলা হয়েছে লেখক প্রতিভার নিকষ পাথর। নিকষ পাথরে ঘষে ঘষে সোনার মূল্য নির্ণয় করা হয়, তেমনি গদ্য রচনার মধ্য দিয়ে লেখকের যথার্থ প্রতিভা ধরা পড়ে এবং গদ্যরচনাই একটা জাতির সাবালকত্ব ঘোষণা করে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা গদ্য সাময়িক পত্রিকা ও বিতর্ক সঙ্কুল আন্দোলনের মধ্যেই বন্দী হয়ে ছিলো, বৃহত্তর সাহিত্যে কর্মে তখনও তার বিশেষ ডাক পড়েনি। কারণ, সামাজিক ভাঙ্গাগড়ার যুগ, নানা সমস্যায় দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সংশয়ে সকলে জর্জরিত। এ সকল উদ্বিগ্নের কথা অবশ্য তখনকার পত্র-মর্মরের মধ্যে পাওয়া যায়। তবে সমাজ মানসিকতার সঙ্গে আন্তরিক যোগ রেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার পাঠকসমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো।
অক্ষয়কুমার ছিলেন বৈজ্ঞানিক, তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও সমাজতত্ত্ববিদ। তিনি তার সাহিত্যে ঈশ্বরতত্ত্বে আস্থা রেখেছিলেন কিন্তু সকল অলৌকিকতা বর্জন করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রচন্ড বিস্ময়রূপে আমাদের মাঝে প্রতিভাত হয়েছেন। তার বিচিত্র জীবনকথা, অসাধারণ মেধা,তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধি এ সমস্ত আজ প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে।
ইংরেজিতে লেখা তার,’ এডুকেশন রিপোর্টগুলো যে কোনো ব্রিটেন বাসীর ঈর্ষার কারণ উদ্রেক করেছিলো। শিক্ষা বিশেষত আধুনিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, স্ত্রী শিক্ষা প্রচারে তার দান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়। বিধবাবিবাহ প্রচার, বহুবিবাহকে নিরোধ প্রভৃতি ব্যপারে তিনি যে বীর্যবান পৌরুষ ও হৃদয়বান ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা গোটা বাংলাদেশে তার সমতুল্য কোনো দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। তার মধ্যে পুরাতন বাঙ্গালিয়ানা ও নবীন ইউরোপিয়ানার যে বিস্ময়কর সমন্বয় হয়েছিলো তার কথা দেশবাসীরা শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণে রেখেছেন। মানবতাই তার জীবনের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস।
রাজা রামমোহন বাঙ্গালির মন-বুদ্ধিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে জাতির মূঢ়তার চটকা ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিলেন বিদ্যাসাগর এই হতভাগ্য জাতির চরিত্রে প্রেম ও পৌরুষকে জাগাতে চেয়েছিলেন।
বাংলা গদ্যের জনকত্ত্ব নিয়ে প্রায়শই সুধীমহলে তর্ক রয়েছে। কেউ বলেন রামমোহন, কেউ বলেন এ গৌরব বিদ্যাসাগরের প্রাপ্য। বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের কক্ষ ভুক্ত আর এক পণ্ডিত তারাশঙ্কর তর্করত্ন। তিনি বাংলা গদ্যে,’কাদম্বরী’ গ্রন্থের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্থ থেকে মুসলমান সমাজে নবজাগরণের সূত্রপাত হয়, যার প্রধান পথদ্রষ্টা হচ্ছেন আলীগড়ের বিখ্যাত মুসলমান নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান। তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য আলীগড়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন। বাংলার মুসলমান সমাজ ক্রমে ক্রমে আধুনিক শিক্ষা ও জীবন ধারার প্রতি আকৃষ্ট হলেন। অনেক কৃতবিদ্যা মুসলমান লেখক উনিশ শতকের শেষভাগে গদ্য পদ্য রচনায় আবির্ভূত হলেন। তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মীর মোশারফ হোসেন। যিনি ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করে বাংলা সাহিত্যে যথাযথ স্থান করে নিয়েছিলেন।
উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই বাংলা সাহিত্যে যথার্থ আধুনিকতার সূচনা হয়। পূর্ববর্তী পর্বে যারা প্রস্তুতি ও প্রয়াস, দ্বিতীয়ার্ধে তার পূর্ণ বিকাশ লাভ করে।
উনিশ শতকের আর এক বিস্ময় ভূদেব। তিনি মধুসূদনের সহপাঠী ছিলেন।
একাধিক মূল্যবান গ্রন্থের লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র। ‘আলালের ঘরের দুলাল'(১৮৫৮) তার উল্লেখযোগ্য একটি গ্রন্থ।
বাংলাদেশের এক অদ্ভুত মানুষ অদ্ভুততর সাহিত্য প্রতিভা নিয়ে আবির্ভাব হয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ ওরফে হুতোম প্যাঁচা। তার লেখা নাটক,’সাবিত্রী সত্যবান’ নামকরা। মুখের ভাষায় মুখের আদল ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। তিনি তা অবলীলাক্রমে সেই কঠিন কাজ সহজ করে ফেলেছেন। হুতোমই বিশুদ্ধ মুখের বুলিকে সাহিত্যকর্মে প্রয়োগ করে দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর অর্ধশতাব্দী পূর্বে।
বাংলাদেশে একসময় গীতিকবিতার শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে।(১৮৬২-১৮৯৬) এরপর
রবীন্দ্রনাথ গীতিকবিতার অযুত ঐশ্বর্য নিয়ে এলেন। গীতিকবিতার কয়েকজন উল্লেখযোগ্য কবি হলেনঃ বিহারীলাল চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, অক্ষয় কুমার বড়াল, তার বিখ্যাত কাব্য,’এষা'(১৯১২)।
দেবেন্দ্রনাথ সেন তার,’গোলাপ গুচ্ছ’ ‘অশোকগুচ্ছ’, নির্ঝরিণী’ রবীন্দ্রনাথের যুগেও পাঠককে অভিভূত করেছিলো।
ঢাকা জেলার ভাওয়াল পরগণার অধিবাসী গোবিন্দ্রচন্দ্র দাস বাংলা গীতি কবিতার এক বিরল পথের পান্থ। তার লেখা ‘প্রেম ও ফুল, কস্তুরি উল্লেখযোগ্য।
বাংলা সাহিত্যে পদ্য গদ্য নিয়ে প্রথম দিকে তুমুল চর্চা হলেও উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনার ব্যাপারে খুব কম লেখক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। প্রবন্ধ রচিত হয় প্রধানত মানুষের চিন্তা,মনন ও তত্ত্বের উপর। আর উপন্যাস রচিত হয় মানুষের জীবনের গল্পের উপর৷
বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাসিক এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন'(১৮৭২)পত্র শুধু মাসিক পত্রের আদর্শ নয় এর মধ্য দিয়ে সমগ্র বাঙ্গালী সমাজ আত্ম দর্শনের বীজমন্ত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যেমন রবীন্দ্র যুগ বলা হয়ে থাকে তেমনি উনবিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশককে বঙ্কিমযুগ বলা হয়। যুবক রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার একজন অন্তরঙ্গ ভক্ত। তিনি বঙ্কিমের আদর্শে কয়েকটি প্রবন্ধও লিখেছেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী'(১৮৬৫), কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, চন্দ্রশেখর, রজনী, কৃষ্ণকান্তের ইউল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী, রাধারাণী, তার সর্বশেষ উপন্যাস ‘সীতারাম'(১৮৮৭) সালে প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি আরও সাত বৎসর জীবিত ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ বঙ্কিমচন্দ্র তখন আর উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত হননি। তবে তিনি প্রবন্ধ,নিবন্ধ,শাস্ত্র সংহিত, গীতা তত্ত্ব প্রভৃতি নিয়ে অধিকতর ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
বঙ্কিম ছাড়াও বেশ কিছু ঔপন্যাসিকের নাম পাওয়া যায় বাংলায়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রবীন্দ্র যুগ নাম দেয়া হয়। মাত্র বারো বছর বয়স থেকে শুরু করে আশী বছর পর্যন্ত যিনি অবিশ্রান্ত ভাবে কবিতা লিখেছেন, গান বেঁধেছেন,, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ-নিবন্ধে কোটালের বান ডাকিয়েছেন তার কাব্য পরিক্রমা যতো সংক্ষেপেই বলি না কেনো, তার সীমা শুধু বেড়েই যাবে। প্রাণশক্তির এতো প্রাচুর্য, আবেগের এতো গভীরতা, রোমান্টিক মানসের এভাবে কল্পস্বর্গ পরিক্রমা বিশ্বের সঙ্গে বিশ্বাতীতের, সীমার সঙ্গে অসীমের, খণ্ডের সঙ্গে পূর্ণের এই মিলন-লীলা কোনো যুগের কোনো একজন কবির মধ্যে পাওয়া যায় না। ব্যাস-বাল্মীকি-হোমার-শেলী-কীটস, হাইনে গ্যাটে এককভাবে কোনো একটি কবি প্রতিভার সঙ্গেই তার তুলনা হয় না।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার কলাকৃতি, মনোভূমি ও প্রাণাবেগ আলোচনার জন্য স্বতন্ত্র কয়েকটি অধ্যায় প্রয়োজন।
এখানে তাকে নিয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা করার জন্য পাঠকের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
১৮৮২ সাল থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত মোট চার বছরের মধ্যে তার যে কাব্যগুলো প্রকাশিত হয় তাকে আমরা উন্মেষ পর্ব বলতে পারি। তিনি যেনো মহাকাশ সঞ্চার করে পৃথিবীর মাটিতে নেমে এলেন। এ সময় তার লেখা ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত, প্রভাত সঙ্গীত, ছবি ও গান, ভানু সিংহ ঠাকুরের পদাবলি, কড়ি ও কোমল।
রবীন্দ্রনাথ ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বৎসরের মধ্যে লেখা এই পর্বটিকে কেউ কেউ সর্বশ্রেষ্ঠ পর্যায় বলতে চান। শিল্পরূপ, আবেগ, রোমান্টিকতা ও গভীর প্রত্যয়ের এমন সমন্বয় অন্য পর্বে এতোটা হয়েছে কিনা সন্দেহ। ‘মানসী’ ‘সোনার তরী’ ‘চিত্রা’ ‘চৈতালি’ এই চার খানি কাব্যের মধ্যে কবি-চেতনার এক অভূতপূর্ব বিকাশ দেখা যায়। এ পর্বে তিনি নিসর্গ প্রেম, সৌন্দর্য ও জীবন। দেবতা তত্ত্বের বিচিত্র ঐশ্বর্য ও শিল্পের কলাকৃতির সাহায্যে জগৎ ও জীবনের মাঙ্গলিক রচনা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশর সাধারণ সমাজে গীতাঞ্জলির জন্য সর্বপ্রথম সার্বজনীন গৌরব লাভ করেছিলেন। তিনি যে সুধী সমাজে অভিনন্দিত হয়েছিলেন তারও অন্যতম প্রধান কারণ এই গীতাঞ্জলি। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হলেন।
রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের সর্বশেষ পরিণত পরিপক্ক আমরা বলাকা নামানুসারে চিহ্নিত করতে পারি। ‘বলাকা’ ‘পরবী’ ‘মহুয়া’ এই পর্বের তিনখানি কাব্য রবীন্দ্রনাথের পৌঢ় জীবনের প্রসন্ন স্নিগ্ধতার মধ্যে রচিত হলেও এর প্রত্যক খানিতে জাগ্রত জীবনবোধ।
১৯২৯ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে বারো বৎসরের অতিবৃদ্ধ কবির বারোখানি কাব্য প্রকাশিত হলো। বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে পৌছেও কবিগুরুর সজীব মন ও উজ্জ্বল প্রাণশক্তির কিছুমাত্র খর্বতা হয়নি।
বুদ্ধিকেন্দ্রিক বাতায়ন থেকে এবং সংস্কারমুক্ত নির্মোহ মন নিয়ে যিনি উনবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানবাদী চৈতন্যের বিচিত্র রূপ নির্মাণ করেছিলেন সেই অক্ষয়কুমার দত্তের পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তার উৎকৃষ্ট কাব্যগুলোর মধ্যে ‘বেণু ও বীণা’ ‘তীর্থ সলীল’ ‘কুহু ও কেকা’ ‘অভ্র ও আবির’ উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ তাকে ছন্দরাজা বলতেন।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের হুঙ্কার দিয়ে বীরদর্পে সামনে এসেছিলেন আর এক মহান কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের জীবন ও সাহিত্যও অল্প পরিসরে লিখে শেষ করার নয়।
নজরুলের জীবন ও কাব্য দুইই বিস্ময়কর, অভিনব, উৎসকেন্দ্রিক। তিনি একেবারে সামরিক হুঙ্কার দিয়ে কাব্য-প্রাঙ্গনে প্রবেশ করলেন।
স্বয়ং কবিগুরু যৌবন মূর্তি নজরুলকে অতিশয় স্নেহ করতেন। একদা তিনি পাঠকসমাজে নয়নতারা স্বরূপ গণ্য হয়েছিলেন। বিদেশি সরকারের রক্তচক্ষু অবহেলা করে দূরন্ত কবি কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে ও সামরিক পত্রে আগুনের ফুলকি ছড়াতে লাগলেন। যার সামান্যতম স্পর্শে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভয়াবহ অগ্নিকান্ড শুরু হতে পারতো। এজন্য তাকে কিছুদিন কারারুদ্ধ থাকতে হয়েছে। ইদানিং আর কোনো কবি ও লেখক এতোটা উদ্দীপনা, উৎসাহ, ও উচ্ছাস সঞ্চার করতে পারেননি।
তার ‘বিদ্রোহী’ ‘অগ্নিবীণা’ ‘বিশের বাঁশি’
বাংলাদেশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের মতো তার কবিতা ও গান এতো পরিচিত ও বিশাল ভান্ডার যে স্বল্প পরিসরে অধিক উদ্ধৃতি সম্ভব নয়।
বাংলা সাহিত্যকে অলঙ্কৃত করেছেন আরো অনেক কবি সাহিত্যিক। যেমনঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দোপাধ্যায়।
নব-নবিনের দল চিরকালই নতুনের মোহে তাঁদের সমসাময়িক কালকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলে মনে করেন। নবীন সাহিত্যিকেরা রবীন্দ্র প্রভাব ছাড়িয়ে সুকঠোর বাস্তব মাটির ওপর সাহিত্যকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। মনোবিকার, সমাজবিকার, রাজনৈতিক, বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক দারিদ্র্যতা প্রভৃতি বস্তুগ্রাহ্য কারনে মানুষের মনোজীবন ও ভাবজীবনের অদ্ভুত পরিবর্তনের দিক নির্দেশ করে।
বুদ্ধদেব বসু সর্বপ্রথম দৃঢ়তার সাথে নতুন কাব্যসাধনার নন্দীপাঠ করেছিলেন। তিনি একদা তরুণ সমাজের মন হরণ করেছিলেন।
আধুনিক বাংলা কাব্যে যাঁদের স্পর্শে যথার্থ ব্যক্তিস্বারুপ্য লাভ করলো, একটা নতুন দিগন্ত খুলে গেলো তারা হচ্ছেন কবি জীবনানন্দ দাশ, কবি জসিম উদ্দিন এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। দুজনের আয়ুর প্রহর শেষ হয়ে গেছে কিন্তু দুজনেই আধুনিক বাংলা কাব্যে মৃত্যুঞ্জয় হয়ে রইলেন।
এ কালে অনেক নতুন ও প্রবীণ কবি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতাকে কৃষ্টিগত অনুশীলনে পরিণত করেছেন। তারা বাংলা সাহিত্যকে কুজনে গুঞ্জনে মুখর করে রেখেছেন। কোনো এক বিদেশি সমালোচক বলেছিলেন যে সভ্যতা ও বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কবিতা ও উপন্যাসের কাল শেষ হয়ে যাবে। তার এ ধারনা সম্পূর্ণ অমূলক তা গত অর্ধশতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়।
কবি কিশোর সুকান্ত ভট্টাচার্যের(১৯২৬-১৯৪৭) কবিতা কবি কর্মের এক পরম বিস্ময়। মাত্র একুশ বছর বয়সের মধ্ডেই তিনি যে পরিণত প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন এবং ভাষা, ছন্দ ও বাকপ্রতিমা সৃষ্টিতে যে সূক্ষ্মতা দেখিয়েছেন তাতে মনে হয় বিধাতা তাঁকে আর একটু দীর্ঘজীবী করলে আধুনিক বাংলা কবিতার দিগন্ত আরো নতুন সৃষ্টি সম্ভাবনায় পূর্ণ হয়ে উঠতে পারতো।
১৯৭১ সালে রক্তস্নাত বাংলাদেশ নবজন্ম লাভ করলো, বীর শহীদদের মুমূর্ষু কণ্ঠ থেকে কবিগুরুর গান ধ্বনিত হলোঃ ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।
পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে বাংলা সাহিত্য যেনো আরো এক ধাপ উঁচুতে পৌছে গেলো। বাংলার মানুষের দুঃখ দুর্দশার সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যের আকাশও ক্রমে মেঘমুক্ত হলো। দরিদ্র মাঝিমাল্লা কৃষাণদের মুখে ভাটিয়ালি গান শোনা গেলো। জসীম উদ্দিন ও বন্দে আলী মিঞা অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের কালেই গ্রামীণ জীবনকে কেন্ত্র করে কিছু কিছু উৎকৃষ্ট রাখালি কবিতা ও আখ্যান লিখেছেন।
এ কালের ভাবভাবনা, জীবন যন্ত্রণক, নিঃসঙ্গতা প্রভৃতি মানসিক নৈরাজ্য বোধ কয়েকজন বর্ষীয়ান কবিকে আকর্ষণ করেছে। আহসান হাবিব, সিকান্দার, আবু জাফর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সানাউল হক, আতাউর রহমান, আবদুর সাত্তার, মাযহারুল ইসলাম, কবি শামসুর রহমান এরা জীবনের কবি। তাদের সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে জীবন সম্বন্ধে বৃহত্তর উপলব্ধি, প্রগতির প্রতি বিশ্বাস, স্বদেশের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ। এসেছেন আল মাহমুদ, আবু বকর সিদ্দিক। রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ।
বাংলায় নারী শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন বেগম রোকেয়া। তিনি এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন৷ মহিলা কবিদের মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল, মাহমুদা খাতুন, জাহানারা ইমাম, হামিদা রহমান, খোদেজা খাতুন প্রভৃতির কাবিতায় দেশপ্রীতি, নিসর্গপ্রীতি, প্রেম, সৌন্দর্য এবং আনন্দবেদনাময় রোমান্টিকতার এক নিটোল লাবণ্য সৃষ্টি করেছে।
শুধু মৌলিক কবিতাতেই নয় বাংলাদেমের লেখকগণ কথা সাহিত্যেও অজস্র সোনার ফসল ফলিয়েছেন। সংখ্যার দিক দিয়ে উপন্যাসের সংখ্যাই বেশি।
সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর লাল সালু, কাঁদো নদী কাঁদো, আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ি, জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে, শওকত ওসমানের জননী, শহিদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক, সারেং বউ, ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সাহিত্যসমাজ আর একটি শাখায় বীরদর্পে অগ্রসর হয় আর তা হলো শিশু সাহিত্যে। হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, মীর মোশারফ হোসেন, উল্লেখযোগ্য।
পরিশেষে বলা যায় যে সাম্প্রদায়িক হানাহানি, দেশবিভাগ, মন্বন্তর, উদ্বাস্তু সমস্যা, প্রতিক্রিয়া শীলও প্রধর্ষী রাজনীতি এবং নৈতিক অবক্ষয় সত্ত্বেও পশ্চিম ও পূর্ব বঙ্গের বাংলা সাহিত্য যে বিচিত্র ঐশ্বর্য, জীবনবোধের যে অযুথ বৈচিত্র, সমবাদী-বিষমবাদী সুরের যে অর্কেস্ট্রা ধ্বনিত হযেচে এবং আজও হচ্ছে তা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে গর্ব করার মতোই। এক ভাষাভাষী দুই বাংলা ধর্মমত ও রাজনৈতিক কারনে আলাদা হলেও ভাষা ও সাহিত্যের দিক থেকে এই জন প্রবাহ একই মানবমিলন-মহাসাগরের তীরে সমবেত।
10/06/2020
া_পড়েই_কবি_সাহিত্যিক!!!
-কবি এম.এ বাসিত আশরাফ
আজকাল মানুষ বই পড়েনা। বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্ম এই রোগে আক্রান্ত । সাহিত্য যাদের পাঠ্য বিষয় কেবল সেইসব ছাত্র ছাত্রীরাই বই নিয়ে একটু আধটু ঘাঁটাঘাঁটি করে, তার বাইরের একটা বৃহত্তর অংশ বই থেকে অনেকটা দূরে। বছরে একবার বইমেলাতে গিয়ে বইটা কিনতেই হয় নাহলে স্টেটাস মেইনটেইন হয়না তাই কেনে। আর বছরের বাকি সময় তারা বই এর থেকে অনেক দূরে। তবে ব্যতিক্রম যে নয় তা নয়; তবে তা খুবই সামান্য।
কিন্তু আপনি যদি ফেসবুক খোলেন। একটা সম্পূর্ণ অন্য চিত্র দেখবেন। #এখানে গড়পড়তা সবাই লেখক লেখিকা। বলতে গেলে পাঠকের থেকে লেখক বেশি। সবাই খারাপ লেখে বলছিনা, অনেকেই ভালো লেখে। কিন্তু অনেক ভালো লেখাও হারিয়ে যায় এত লেখার ভিড়ে। যারা একবার প্রচার পায়, তারা যতই একঘেয়ে লিখুক তাদের লেখা লোকে পড়ে। তারা পড়ে কিন্তু সমালোচনা করে না। এতে পাঠক এবং লেখক উভয়পক্ষেরই ক্ষতি হয়। লেখক ও নতুন কিছু লেখার আগ্রহ দেখায় না, পাঠকরাও নতুন কিছু পড়ার সুযোগ পায়না। অনেকে আবার গঠনমূলক সমালোচনাও সহ্য করতে পারেনা। সেই একঘেয়ে তুমি আমি আর আমি তুমি পারমিউটেশন আর কম্বিনেশন। একটা সমাজের নিখাদ চিত্র, একটা অসম্ভব সুন্দর কোনো দৃশ্য, একটা জীবনের গল্প খুব কম মানুষের লেখায় দেখতে পাই। আমি একজন পাঠক হিসেবে একটু অন্যরকম লেখা পড়া পছন্দ করি। খুব স্বচ্ছন্দ গতিতে কেউ একটা জীবনের একটা টুকরোর বর্ণনা দিয়ে যাবে.. সেগুলো পড়েও শান্তি। কিন্তু মানুষ লিখবে কি করে।সে তো পড়ছেই না। না পড়লে, না দেখলে নতুন কিছু লিখবে কি করে। ফেসবুকে লাইক আর কমেন্টের ভিড়ে তারা নতুন কিছু ভাবারও চেষ্টা করছেনা।
তারপর আসে কবিতা। দুটো লাইনের শেষ দুটো শব্দের ছন্দ মিললেই সেটা কবিতা হয়ে যায়না। এখনকার কিছু "কবিতা" পড়ে এমন মনে হয় তাদের প্রথম লাইনটা উত্তর মেরু থেকে আমদানি করা হলে দ্বিতীয়টা আসে দক্ষিণ মেরু থেকে! কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে ছন্দ মিলে যাওয়ার জন্য লোকে সেগুলো গোগ্রাসে গিলছে। কবিতা পুরোটা যদি আপনার শরীর হয় তাহলে হাত পা অন্যকারোর লাগাবেন না। পুরোটা নিয়ে যেন একটা গল্প বলা যায়, পুরোটা নিয়ে যেন আপনার শরীরটা দাঁড়ায়। একটু সজাগ হন। কারোর লেখায় কিছু বুঝতে না পারলে তাকে প্রশ্ন করুন। কেউ যদি একঘেয়ে একইরকম লেখে তাকে বলতে শিখুন।তাতে উভয়েরই লাভ।
বই পড়ুন। উপহারে বই দিন মানুষকে। পড়ার অভ্যেস তৈরি হলে অনেক কিছু জানা যায়। অনেক কিছু দেখা যায়। অনেক কিছু শেখা যায়।
25/05/2020
বিখ্যাত কবিদের কাব্যে যেভাবে এসেছে ঈদের কথা
- হাবীব রহমান
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ।’
—কাজী নজরুল ইসলাম।
ঈদ আমাদের জীবনে আনন্দ, সীমাহীন প্রেম প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে হাজির হয়। আহবান জানায় সকল মলিনতা আর কলুষতাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে, হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে, পরস্পর প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে।
ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ এক নেয়ামত। হাদিসে এসেছে— ‘রাসূল (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন, মদিনাবাসির বিশেষ দু’টি দিন ছিলো। এ দু’টি দিনে তারা খেলাধুলা আমোদ-ফুর্তি করতো। নবীজী (সা.) জানতে চাইলেন এ দু’টি দিনের তাৎপর্য কি?
মদিনাবাসি উত্তরে জানালো, আমরা জাহেলি যুগে এ দু'দিন খেলাধুলা করতাম। নবীজী বললেন, আল্লাহ দু’টি দিনের পরিবর্তে শ্রেষ্ঠ দু’টি দিন তোমাদের দিয়েছেন। একটি হলো ঈদুল ফিতর ও আর অন্যটি ঈদুল আযহা।’ [সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪]
মুসলমানদের জন্য প্রধান দু’টি উৎসব হলো ঈদ। একটি হলো ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আযহা। এ দু’টি দিনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ। তাই তো ঈদ নিয়েই আমাদের অগ্রজ পথিকৃৎ কবিরা লিখেছেন অসংখ্য কবিতা।
ঈদ নিয়ে লিখেননি এমন কোনো মুসলিম কবি-সাহিত্যিক বা লেখক হয়ত মিলবেই না। কাজী নজরুল ইসলাম, কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবির কবিতা এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে।
ঈদ নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সেই উচ্চকিত কণ্ঠ তো কখনো ভুলবার নয়—
‘পথে পথে আজ হাঁকিব, বন্ধু ঈদ মুবারক! আস্সালাম
ঠোঁটে ঠোঁটে আজ বিলাব শিরনী ফুল-কালাম
বিলিয়ে দেওয়ার আজিকে ঈদ।’
কায়কোবাদের কবিতাটা তো কোনভাবে ভুলতেই পারি না। কি অসাধারণ উচ্চারণ—
‘আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনপ্রাণ
জাগায়ে মোস্লেম যাবে গাহ আজি মিলনের গান
ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিষ্মান রবি
জীবন সার্থক হবে, হইবে যে এ দরিদ্র কবি।’
গোলাম মোস্তফার চোখে ঈদের চাঁদটা কেমন? তিনি লিখেছেন এভাবে—
‘আজ নূতন ঈদের চাঁদ উঠেছে নীল আকাশের গায়
তোরা দেখবি কারা ভাই-বোনেরা আয়রে ছুটে আয়
আহা কতই মধূর খুবসুরাৎ ঐ ঈদের চাঁদের মুখ
ও ভাই তারও চেয়ে, মধুর যে ওর স্নিগ্ধ হাসিটুক
যেন নবীর মুখের হাসি দেখি ওই হাসির আভায়।’
চল্লিশ দশকের কবি ফররুখ আহমদের উচ্চারণে ঈদ এসেছে এভাবে—
‘আকাশের বাঁক ঘুরে চাঁদ এল ছবির মতন
নতুন কিশতি বুঝি এল ঘুরে অজানা সাগর
নাবিকের শ্রান্ত মনে পৃথিবী কি পাঠালো খবর
আজ এ স্বপ্নের মধ্যে রাঙা মেঘ হল ঘনবন।’
শাহাদাত হোসেন তার ‘শাওয়ালের চাঁদ’ কবিতায় লিখছেন—
‘তোমার আগমে আজি বরিহ্নহ্ন অশান্তির
নিভে যাক, হাহাকার মহা-মহামার
বিশ্ব নিখিলের; ডুবে যাক প্রশান্তির
গভীর অতলে; রূপ-রস গন্ধভারে
দগ্ধসৃষ্টি হোক পুন ঋতুপর্ণা রূপা।’
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অজস্র গদ্যের পাশাপাশি আবার ‘রমজানের চাঁদ’ নিয়ে কবিতাও লিখেছেন—
‘পুনরাজ রমজানের এই অগ্রচর
বসন্ত ঋতুর যথা দূত পিকবর
অথবা এ বিধাতার শরীরিণী বাণী
রোজাব্রত পালিবার যাকিছে সবায়
কিংবা পাঠায়েছে এযে পূর্বে ঈদরাণী
যেমনি পাঠায় ঊষা শুক্র তারকায়।’
বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলামের 'খুশির ঈদ' গান ছাড়া বাঙালির ঈদুল ফিতরের আমেজ যেন অপূর্ণই থেকে যায়। ঈদুল ফিতর এলেই চারদিকে বেজে ওঠে তার গান—
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ।’
ঈদের নতুন চাঁদ সকলের তরে আনন্দময় হয় না বা সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনে না। গরিব-দুঃখিদের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় না। তাদের মনের আকুলতা ফুটে উঠেছে কবি তালিম হুসেনের 'ঈদের ফরিয়াদ' কবিতায়—
‘ঈদ মোবারক, সালাম বন্ধু, আজি এই খুশরোজে
দাওয়াত কবুল করো মানুষের বেদনার মহাভোজে
কহিবো কি আর, চির-মানুষের ওগো বেদনার সাথী
ঈদের এদিন শেষ হয়ে আসে, সমুখে ঘনায় রাতি।’
ঈদ থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা আমাদের জীবন রাঙাতে পারি, তবেই আমাদের ঈদ উৎসব স্বার্থক হবে। ঈদ এলে যেভাবে ধনী-গরীব, বাদশা-ফকির ভেদাভেদ ভুলে যাই, সারা বছর সেই ভেদাভেদের দেয়ালকে উপড়ে ফেলতে হবে।
কবি গোলাম মোস্তফার ভাষায়—
‘আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লাভিয়াছে হর্ষে
আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়াছে রাখিতে হবে সারা বর্ষে
এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য, নিখিল মানবের মিলন জন্য
শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশীষ স্পর্শে।’
মূলত মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদহীনতা ভুলে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব, মমত্ব, প্রেম, ভালোবাসা জাগ্রত করাই ঈদ উৎসবের মূল লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য প্রাধান্য দিয়ে প্রায় শত বছর ধরে বাংলা সাহিত্যের কবি ও নিবন্ধকাররা ঈদ নিয়ে তাদের প্রিয় অনুভূতির উৎসারণ করে চলেছেন।
আধুনিক কবিরাও ঈদের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছেন। ঈদকে ঘিরে কাব্যচর্চা করতে গিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অভেদ মানুষের জয়গানেই মুখরিত হয়ে উঠেছেন কবিরা। ভালোবাসা আর সাম্যের পঙক্তি রচনাতেই তারা সিদ্ধহস্ত থেকেছেন। এভাবেই বাংলা সাহিত্যে শত কবির কবিতায় বিষয় হিসেবে ঈদ উৎসব হয়ে উঠেছে মানুষের সমান অধিকারের আসল রূপকল্প।
আর ঈদ উৎসবের সেই সাম্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি সুফিয়া কামাল যথার্থই বলেছেন—
‘কাল ঈদগাহে ধনী-দরিদ্র মিলবে যে বুকে বুকে
কাল ঈদগাহে ধনীর ধনের দীনও হবে ভাগীদার
পুরাতে হইব কত দিবসের খালি অঞ্জলি তার।’
#সবাইকে_ঈদ_মোবারক
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Telephone
Address
Maulvi Bazar
3200