14/08/2026
পরীক্ষা বিষয়টা যে কতো ভয়াবহ মানসিক চাপের, সেটা বাংলাদেশে বড়ো না হলে বুঝা এবং বুঝানো কঠিন।
আমার ছেলে, তাহান, এই সোমবার থেকে গ্রেড-থ্রি শুরু করলো। সাত বছর বয়স। স্কুলে যায়। ব্যাগ খালি থাকে। ব্যাগে থাকে পানির বোতল। লাইট জ্যাকেট। কিংবা হোম ওয়ার্ক দিলে, সেটার সমাধান।
প্রাইভেট নাই। স্কুল থেকে বাসায় এসে পড়ার চাপ নাই। হোম ওয়ার্কের তেমন চাপ নাই। বস্তুত স্কুল থেকে এসে পড়েই না। হঠাৎ তার গ্রাফিক নোভেলের প্রতি ঝোঁক এসেছে। একের পর এক গ্রাফিক নোভেল পড়ছে। ডগ ম্যান, ক্যাট কিড, ইনভেস্টিগেইটরস–এমন আরো সিরিজ কিনে বাসা ভর্তি হয়েছে। ওর গ্রাফিক নোভেলের জন্য শিঘ্রই একটা বড়ো শেলফ দরকার। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা বলে কিছু নাই। রোল নম্বর বলে কিছু নাই।
এদিকে, বাংলাদেশে আমার বোনের বাচ্চাদের দিকে তাকালে আমার খারাপ লাগে। আমি যেই চাপ নিয়ে বড়ো হয়েছি, ওদেরকেও সেই একই চাপের সংস্কৃতিতে বড়ো হতে হচ্ছে। ক্লাস ২-৩'র বাচ্চার জন্য বুয়েটের স্টুডেন্ট খুঁজে বেড়াও। স্কুলে সারাদিন থাকার পর বাসায় এসে পড়ো। পড়ো আর পড়ো। বার্ষিক পরীক্ষা, রোল নম্বর—এই চাপ নিয়েই থাকো।
আমার মা আমাকে ভোরে তুলে দিতেন। ভোর বেলায় উঠে পড়লে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। মনে থাকবে। বাধ্য ছেলের মতো আমি ঘুম থেকে উঠে পড়ছি। দিনের পর দিন। স্কুল জীবনে পড়ালেখা করা ছাড়া অন্যকিছু করার মতো সাহস ও সুযোগ আমার ছিলো না।
পুরো একটা জাতির সন্তানরা সকাল-সন্ধ্যা, ভোরবেলা, স্কুলে, স্কুল থেকে ফিরে বাসায়–শুধু পড়ছে আর পড়ছে। অথচ, আমাদের যারা শিক্ষার নীতি-নির্ধারক, তারা কি প্রশ্ন করে—এতো পড়েও কেন আমাদের ছেলে-মেয়েরা পৃথিবী জয় করার মতো কিছু করতে পারে না?
আমি যখন স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে গেলাম, তখনও দেখেছি, ওদের স্টুডেন্টরা বাসায় গিয়ে তেমন পড়েই না। যা পড়ার, সেটা ইউনিভার্সিটিতেই শেষ। নাওয়া-খাওয়া ভুলে, দিন-রাত পড়াশুনার সংস্কৃতি আমি বিদেশে দেখিনি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বেশি জিপিএ পাওয়ার যে এক পারিবারিক ও সামাজিক চাপ–সেটাও দেখিনি। মাসব্যাপী পরীক্ষা নেই। অভিভাবকদের দিনভর প্যারেশানি নেই। অথচ দুনিয়ার সব আবিষ্কার-উদ্ভাবন করে ওরা।
এগুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
জার্মানরা ঘড়ির কাটা মেপে মেপে কাজ করে। পড়াশুনা করে। তাহলে জার্মানরা কী করে কয়েকশ বছর ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, দার্শনিক, গণিতবিদ, শিল্পী, খেলোয়াড়ের জন্ম দিয়েছে?
আমি জার্মানীর স্টুডেন্টদের ভোরবেলায় উঠে পড়তে দেখিনি। প্রাইভেট আর কোচিং করতে দেখিনি। জার্মানীর কোন স্কুল-কলেজের গেইটে তো কোচিং-এর পোস্টারে ভরা থাকে না।
তাহলে ওদের সন্তানরা কি করে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো মেধাবী হয়?
এগুলো না ভাবলে, যুগের পর যুগ আমাদের সন্তানরা শুধু পড়েই যাবে। কিন্তু পৃথিবী চালাবে ওরাই।
……………………..
RAUFUL ALAM
(কমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ফুটনোট)