10/08/2026
ফলাফল শুধু শিক্ষকের ব্যর্থতা নয়—এটি আমাদের সবার জন্য আত্মসমালোচনার সময়
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। আমরা এই ফলাফলে সন্তুষ্ট নই এবং শিক্ষক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতেও প্রস্তুত।
আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মোট ১৪১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার্থী ছিল। এর মধ্যে ১ জন পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল। উপস্থিত ১৪০ জনের মধ্যে ৪০ জন কৃতকার্য হয়েছে এবং ১০০ জন অকৃতকার্য হয়েছে। পাসের হার ২৮.৫৭%। এর মধ্যে ১ জন শিক্ষার্থী GPA-5 অর্জন করেছে।
এই ফলাফল আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম—এ কথা স্বীকার করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই।
তবে একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
এই ফলাফলের দায় কি শুধুই শিক্ষকদের?
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারাদেশের পাসের হার ৬২.২৫%। অর্থাৎ আমাদের প্রতিষ্ঠানের ফলাফল জাতীয় গড়ের চেয়েও অনেক নিচে।
কিন্তু একটি ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হলে শুধু একটি সংখ্যা দেখলে হবে না। দেখতে হবে—একজন শিক্ষার্থী সারা বছর কীভাবে পড়াশোনা করেছে, কতদিন নিয়মিত বিদ্যালয়ে এসেছে, বাড়িতে কত ঘণ্টা পড়েছে, অভিভাবক কতটা খোঁজ নিয়েছেন, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা সময় দিয়েছে এবং শিক্ষক যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা কতটা অনুসরণ করেছে।
আমরা শিক্ষকদের দায় অস্বীকার করছি না।
যেখানে শিক্ষকের গাফিলতি আছে, সেখানে শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থী শনাক্ত করা, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আরও কার্যকর হতে হবে। এই ফলাফল আমাদের নিজেদের কাজকেও নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ দিয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে একটি কঠিন সত্যও আমাদের স্বীকার করতে হবে—
শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কয়েক ঘণ্টা সময় দিতে পারেন; একজন শিক্ষার্থী তার বাকি সময়টা কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও তার ফলাফলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
আজকের বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী বইয়ের চেয়ে মোবাইলের পর্দায় বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফেসবুক, টিকটক, রিলস, গেম, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, ঘোরাঘুরি—এসবের জন্য যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বের করা যায়, তাহলে পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় না থাকার দায় সম্পূর্ণভাবে শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?
আর এখানে অভিভাবকের ভূমিকাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সন্তান কখন পড়ছে, কখন ঘুমাচ্ছে, কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকের নজরদারি প্রয়োজন। বিদ্যালয় একা কোনো শিক্ষার্থীর পুরো জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার—দোষ চাপানোর সংস্কৃতি নয়, সমাধানের সংস্কৃতি চাই।
শিক্ষক বলবেন না—“সব দোষ শিক্ষার্থীর।”
শিক্ষার্থীও বলবে না—“সব দোষ শিক্ষকের।”
অভিভাবকও বলবেন না—“স্কুলই সব করবে।”
বরং আমাদের বলতে হবে—
শিক্ষক তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।
শিক্ষার্থী তার পড়াশোনার দায়িত্ব নেবে।
অভিভাবক সন্তানের প্রতি প্রয়োজনীয় নজরদারি ও সহযোগিতা করবেন।
আর প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে এই তিন পক্ষের সমন্বয় নিশ্চিত করবে।
একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষার আগের কয়েক মাস নয়, পুরো বছর নিয়মিত পড়াশোনা করে; একজন অভিভাবক যদি সন্তানের পড়াশোনা ও মোবাইল ব্যবহারের ওপর নজর রাখেন; আর একজন শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন—তাহলে ফলাফল অবশ্যই পরিবর্তন করা সম্ভব।
এই ফলাফল তাই শুধু শিক্ষকদের জন্য সতর্কবার্তা নয়; এটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান—সবার জন্য একটি আয়না।
আমরা কাউকে অপমান করতে চাই না, কাউকে দায়মুক্তিও দিতে চাই না।
আমরা চাই—যে যেখানে দায়ী, সে সেখানে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করুক।
এবারের ফলাফল আমাদের জন্য শেষ কথা নয়। বরং এখান থেকেই আমরা আরও কঠোরভাবে দুর্বলতা চিহ্নিত করব, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন করব, অভিভাবকদের আরও সম্পৃক্ত করব এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।
ফলাফল খারাপ হয়েছে—আমরা তা মেনে নিচ্ছি।
কিন্তু ব্যর্থতার দায় শুধু একজনের নয়।
সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
আসুন, পরস্পরকে দোষারোপ না করে একটি প্রশ্ন করি—
“আগামী বছর আমরা কে কতটা বদলাব?”
সেখান থেকেই হয়তো শুরু হবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পথ।