18/05/2021
ইসরায়েলের আরব ও মুসলিম জনসংখ্যা বর্তমানে ২০ শতাংশ। এরা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে না। ৪০ বছরের মধ্যে আরব, মুসলিম এবং জায়নবাদবিরোধী আলট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিরা জনসংখ্যার অর্ধেকে পৌঁছাবে। কোনো গণতান্ত্রিক উপায়ে জনসংখ্যার অর্ধেক কেন, ২০ শতাংশকেও অধিকারহারা করা যায় না। ইসরায়েল তাই একই সঙ্গে জায়নবাদী ও গণতান্ত্রিক থাকতে পারে না। পারছেও না। দুই বছরে পরপর চারটি নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। টেকসই কোয়ালিশনও গড়ে উঠছে না। এই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ঢাকতেই তাদের যুদ্ধ দরকার, ঘৃণার রাজনীতি দরকার। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ভরাডুবি ঠেকাতে তাই বলি করেছেন আল–আকসা মসজিদ ও তার পাহারাদার ফিলিস্তিনিদের।
জায়নবাদীরা ১৯৪৮ সালে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে গায়ের জোরে ইসরায়েল কায়েম করার সময় বলেছিল, বৃদ্ধরা মরে যাবে আর তরুণেরা ভুলে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। ফিলিস্তিনিরা ৭০ বছর ধরে রক্ত দিয়ে জেরুজালেম ও আরব ভূমির সম্পূর্ণ বেহাত হওয়া ঠেকিয়ে যাচ্ছে। তাদের যে গণহত্যা করেও থামানো যাবে না, তা ২০১৪ সালের গাজা আর ২০০৬ সালের লেবানন দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিরোধী আরব একাও বিজয়ী হতে পারবে না। বিশ্বক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলের যে লক্ষণ ফুটে উঠেছে, তার মাঝখানের ফাঁকটাই তাদের দরকার।
এটা তো গেল ভূরাজনীতির সম্ভাব্য সমীকরণ। নৈতিক অঙ্কেও ইসরায়েল দেউলিয়া। ১৯৪৮ সালের আগে পৃথিবীতে ইসরায়েল বলে বাস্তব কোনো দেশ ছিল না। পৃথিবীতে ইহুদি নেশন বা জাতি বলেও কিছু ছিল না। ছিল রাষ্ট্র ও ভূখণ্ডহীন ইহুদি সম্প্রদায়। বাইবেল কথিত ‘ল্যান্ড অব ইসরায়েল’ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝাত না, বোঝাত ইহুদিদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রকে। বাস্তবে ইহুদিরা ছিল কেনান ও জুডাহ নামের অঞ্চলে। খ্রিষ্টজন্মের আগে ও পরে মাত্র কয়েক শ বছর জেরুজালেমে ইহুদি রাজত্ব থাকলেও এর ভিত্তিতে প্রাচীন নগরীর সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাস ও বর্তমান দখল করা নিপাট ডাকাতি।
৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানদের দ্বারা জেরুজালেম থেকে ইহুদিদের বিতাড়নেরও প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। মিসর থেকে ইহুদিদের দেশান্তরও উপকথা, ঐতিহাসিক সত্য নয়। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর মোজেস অ্যান্ড মনোথিইজম (১৯৩৯) বইয়ে তা দেখিয়েছেন। ডিএনএ পরীক্ষা বলছে, ইসরায়েলি ইহুদিদের ৯০ শতাংশই নৃতাত্ত্বিকভাবে আদি বনি ইসরায়েলের বংশধর নয়। বরং তাদের রক্তে বইছে মধ্যযুগীয় পূর্ব ইউরোপীয় খাজারি রক্ত। পনেরো শতকে খ্রিষ্টান ও মোঙ্গল আক্রমণে তারা মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। এই ইউরোপীয় ইহুদিরা হিব্রু ভাষায়ও কথা বলত না। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক স্লোমো স্যান্ডের বেস্টসেলার বই দ্য ইনভেনশন অব জুয়িশ পিপল এবং দ্য ইনভেনশন অব দ্য ল্যান্ড অব ইসরায়েল জায়নবাদীদের যাবতীয় দাবিকে অথই পানিতে ফেলে দিয়েছে।
স্লোমো স্যান্ড দাবি করেন, ফিলিস্তিনিরাই আসলে মুসলমান হওয়া আদি ইহুদির বড় অংশ। আর যিশুও ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি যুবক। ইহুদিরা যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত হয়ে যদি মাথা তুলতে পারে, তাহলে যিশুর পুনরুত্থানের মতো পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনের পুনরুত্থানও সম্ভব। তা জরুরিও। কেননা, ফিলিস্তিনিরা আজ ইহুদিদের মতোই হলোকস্টের শিকার; বিশ্বমানবতার অপর নাম। ফিলিস্তিনকে মুক্ত না করে তাই মানবতা মুক্ত হতে পারবে না।