21/04/2016
রুপকথা
-----------------------------
***** তৃপ্ত সুপ্ত *****
আনন্দ গল্প লিখতে লিখতে আমি ক্লান্ত। আজ
একটা দুখী মেয়ের গল্প বলি? গল্পটা একটা
রুপকথার গল্প, কারন আমার কাছে এটা রুপকথা মনে
হয়। আমি লেখক, আমার গল্প বাস্তবধর্মী না
রুপকথা, তা নির্ধারন করার ক্ষমতা আমার আছে। তবে
রুপকথার মেয়েরা বড় বুদ্ধিমান হয়। ঘুঁটে কুড়োনী
মেয়েই হোক কিংবা রাজকন্যা কিরণমালা। কিন্তু আমি কি
করে যেন একটা বোকা মেয়ের গল্প লিখে
ফেললাম।
যেহেতু এটা আধুনিক রুপকথার গল্প, তাই গল্পের
শেষে শুভ সমাপ্তি হবে কিনা, তার নিশ্চয়তা আমি
দিতে পারবোনা। আমার গল্পটা রাজকন্যার
জীবনের গল্প, তবে আজকাল অহরহ
রাজপুত্রদের সাথেও এমনটা হচ্ছে। আমি বরং
প্রার্থনা করি, আমার গল্প পড়বে যেসব রাজপুত্র
রাজকন্যারা, তাদের জীবনে যেন এমন রুপকথা
তৈরী না হয়।
~~~~~
আজ আমি অনেক খুশি। কারণটা শুনলে আপনাদেরও
খুব মজা লাগবে। আজ আমাকে দেখতে আসবে,
মানে বিয়ের জন্য আরকি। আমি জানি আমাকে সবাই
বেহায়া ভাবছেন। ভাবছেন কি বিয়ে পাগল
মেয়েরে বাবা। তাতে অবশ্য আমার কিছু আসে যায়
না। বেহায়া ভাবলে বেহায়া, আমি মারাত্মক খুশি।
আজকের দিনটার জন্য আমি গত ৬ বছর ২ মাস ২৪ দিন
ধরে অপেক্ষা করছি। আমি প্রেম করতে করতে
ক্লান্ত। এবার সংসার করব। বান্ধবীরা সব চুটিয়ে সংসার
করছে। আমি ই এখনো প্রেমের গন্ডি পার হতে
পারলাম না। আর কত? আব্বু রোজ রোজ নিত্য নতুন
বায়োডাটা নিয়ে আম্মুকে ভায়া করে আমার কাছে
পাঠায়। আমার না শুনতে শুনতে দুজনেই ক্লান্ত।
শেষে প্রায় বাধ্য হয়েই আম্মুকে বলেই
ফেললাম, একজনকে ভালোবাসি।
আমার আম্মুটা এত ভালো না !! কি সুন্দর আব্বুকে
রাজী করিয়ে ফেলেছে। আমিতো ভয়েই
মরে যাচ্ছিলাম, আব্বু যা রাগী। যাই হোক এখন আমি
বুঝে গেছি, আমার আব্বু আম্মু আসলে দুজনেই
ভিষন ভিষন ভিষন ভালো। উফ, খুশীতে নাচতে
ইচ্ছা করছে আমার।
ব্যাপার গুলো অবশ্য এত সহজও ছিলো না। ওর
ফ্যামিলি কিছুতেই রাজী হচ্ছিলো না। আমার বেলায়
সবকিছুই কেমন জানি উল্টোপাল্টা। সারা জীবন
জেনে এলাম, মেয়ের বাবা কিছুতেই রাজী হয় না।
নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর মেয়ের বাবা অবশেষে
নায়ক নায়িকা দুজনের মাথায় হাত রেখে বলেন,
তোমাদের ক্ষমা করলাম, সুখী হও। আর আমার
বেলায়? আব্বু অবশ্য ব্যাপার গুলোতে তত বেশি
খুশী না, তাও রাজী তো অন্তত হলো, তাই না?
কিন্তু ওর বাবাটা কিছুতেই রাজী না। কারন আছে
অবশ্য। ও তো এখনো তত ভালো চাকরী
করেনা। ছোটখাটো একটা চাকরী, বেতনও
যৎসামান্য। অবশ্য ব্যাপার না। ওই সামান্যতেই আমি
ঠিকঠাক সব ম্যানেজ করে নেবো। অনেক
ভালোবাসি আমি ওকে।
আর সেও এমন গাধার গাধা, কবে থেকে বলছি
মাকে বোঝাও, বাবাকে একটু বোঝাবে। তা না,
সে উল্টো নিজেই আমাকে আরো অপেক্ষা
করতে বলে। আরে গাধা, এমনিতেই আমরা
সমবয়সী, তার উপর আমি বাড়ির বড় মেয়ে। কিভাবে
এত অপেক্ষা করি? আমার সমস্যাটা কি আপনারা বুঝতে
পারছেন?
যদি টিনেজার হতাম, ব্যাগ প্যাক করে দুজনে পালাতাম।
কিন্তু এখন? তাছাড়া আমার বাবা মাকেই বা আমি ব্যাখা
দেবো? তারা তো মেনে নিল আমার সব দাবী !!
তাও কিভাবে আব্বু আম্মুর সম্মানটা নষ্ট করবো
আমি ?
কি যে বিপদ গেলো কটা দিন আমার উপর দিয়ে, এটা
শুধু আমি ই জানি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত এর যে
একটা হেস্তনেস্ত হয়েছে, তাতেই আমি খুশী।
ওর মা নিজে আমাকে বলেছেন, আজ আমাকে
ওরা দেখতে আসবে।
সকাল থেকেই বাসায় উৎসব উৎসব একটা আমেজ।
আমার মায়ের পাগলামী দেখে আমি হাসবো না
কাঁদব বুঝতে পারছিনা। সকালে উঠেই যে রান্নাঘরে
ঢুকেছেন, বের হবার আর কোন নাম নেই। কত
শত রান্না যে করেছেন, তা হিসেব করতে
গেলে আমারই মাথা খারাপ হয়ে যাবে। কিছু বললেই
শুধু এক জবাব। আমার প্রথম মেয়ের বিয়ে, আমি
কোন কমতি রাখতে চাইনা। কেউ যেন কোন খুঁত
না ধরতে পারে। বেশ সুখী সুখী আমেজ
চারিদিকে। শুধু আব্বুর মুখের দিকে তাকালে বুকটা
কেমন যেন চিনচিন করে উঠছে। কি যেন একটা
নেই ওখানে। কি যেন একটা. . . . .
অবশ্য এত ভাবার সময় আমার নেই। ভালোয় ভালোয়
সব মিটে গেলে হয়। আব্বু ঠিক একসময় বুঝতে
পারবে, আমি ভুল করিনি। আমি আপাতত রুপচর্চায় ব্যাস্ত।
ওদের বাড়ি থেকে ওর খালা, ফুফু আরও কে কে
যেন আসবে। আমাকে ওরা কখনো দেখেনি।
তাছাড়া প্রথম বারের মত আমাকে কেউ দেখতে
আসবে। তাও আমার প্রিয় মানুষটার প্রিয় মানুষগুলো,
আমারতো একটু সেজেগুজে থাকাই উচিত, তাইনা?
এখন বাজে ছটা। ঠিক সাড়ে ছটায় ওদের চলে
আসার কথা। আমি রেডি, আম্মুও আম্মুর নাস্তা সমেত
রেডি। আমার ফোনটা বাজছে, ওরা রওনা দিয়েছে
বোধহয়। এই গাধাটা আবার আমাকে না জানিয়ে একটা
কাজও করতে পারেনা। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ গাধা যাকে
বলে আরকী।
ওরা আসবেনা। আমার সত্যি এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা,
ওরা সত্যি আসবেনা। ওই কলটা আমার সবচেয়ে প্রিয়
মানুষটারই ছিলো। যে আমাকে জানালো, ওরা
আসবেনা, আর কোনদিনও না। ওর বাবা এই বিয়েতে
রাজী নয়। আমি যেন তার জন্য অপেক্ষা না করি।
অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হই। যেন অনেক
সুখী হই। অনেক অনেক অনেক সুখী. . . . . .
গত ছটা বছরের প্রতিটা দিন আমার চোখের সামনে
ভাসছে। আমাদের দুজনকে দেখে হিংসে
করতো অনেকেই। ছবির মত একটা জীবন ছিল
আমাদের। সবকিছু মাপা মাপা, হিসেব করা। আমি তো
আমার রুমের পর্দা থেকে শুরু করে বাচ্চাদের নাম
পর্যন্ত ভেবে রেখেছি। আমি কোনদিন বড়
কোন স্বপ্ন দেখিনি, ভেঙে যাবে বলে।
কারো খারাপ চাইনি কখনো। এই একটা মানুষকে ছাড়া
আর কাউকে ভাবিনি কল্পনাতেও। কি করে
বোঝাবো, কতটা ভালোবাসি, আর কতটা
ভালোবাসলে আমার স্বপ্নগুলো এভাবে
ভেঙ্গে যেতো না? কতোটা. . . . . ??
সেকি কাঁদছিলো? নাহ, তার কন্ঠে আমি কোন
কান্নার রেশ শুনিনি। আমার ভিষন ভয় লাগছে। দরজার
ওপাশে আমার পুরো পরিবার অপেক্ষা করছে। কি
বলবো আমি তাদের? সন্ধ্যাতারার কাছ থেকে
জানতে চাইলাম আমি কি করব। মনে হল তারাও আমার
ভাগ্যের মত আমার দিকে তাকিয়ে নিরবে উপহাস
করছে।
~~~~~