29/10/2020
আমি বিস্মিত আমি অভিভূত।
(২৯.১০.২০২০ ইং)
আমাদের পাশের(উত্তরে) গ্রাম গাংনী। সে গ্রামের চরপাড়ার ছেলে রিমন। বয়সে তরুন। মাত্র বাইস তেইশ বছর তার পৃথিবীর আলো বাতাস সৌন্দর্য উপভোগ করা হয়েছে। রিমন থাকে গাজীপুর। আমি কখনো তাকে দেখেছি বলে মনে হয় না। সে ছেলেটা গত আগষ্ট মাসে হঠাৎ অসুস্থ হলো। রোগটা হল, শরীর থেকে রক্ত ক্ষরণ। তার আত্বীয়রা-বন্ধুরা তাকে ঢাকার উত্তরার একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করালো। হাসপাতাল থেকে বলা হলো তাকে দ্রুত রক্ত দিতে হবে। রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ। যে কোন নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত দুষ্প্রাপ্য, সহজে মেলে না। আমার রক্ত নেগেটিভ গ্রুপের, এ নেগেটিভ। অবশ্য, সেটা জানতে পারার লম্বা একটা ইতিহাস আছে।
আমার বয়স তখন একুশের মত। খুলনায় থাকি। খোকনের (কাজী মাহবুবর রহমান সাহেবের বড় ছেলে) মার অপারেশন হবে। তাতে রক্ত লাগবে। খোকনের মার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। আমি তখন টগবগে তরুন। তাই আমার রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করা হলো। খোকনের মার রক্তের গ্রুপের সাথে আমার রক্তের গ্রুপ মিলে গেল। দু’জনের রক্তের ম্যাচিং-এ কোন বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। ব্যাস, আমার এক ব্যাগ রক্ত নিয়ে খোকনের মাকে দেয়া হলো। অপারেশন সাক্সেসফুল। সে কবেকার কথা! সেই থেকে আমি জানি আমার রক্তের গ্রুপ এ পজেটিভ। আমার সব রেকর্ডপত্রেও রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ দেখানো হয়-আছে।
২০১৫ সালে হজ্বে যাবার নিয়ত করলাম। নিয়মানুযায়ী রক্তের গ্রুপ ও অন্যান্য টেষ্টের রিপোর্ট জমা দিতে হবে। পরীক্ষাগুলো কোথায় করাতে হবে তাও বলা আছে। স্যাম্পল হিসেবে সেখানে রক্ত দিলাম। রিপোর্ট হাতে পেয়ে আমিতো থ। রিপোর্টে আমার রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ উল্লেখ করা হয়েছে। আমি ল্যাবকে বললাম তা কি করে হয়? রক্তের গ্রুপতো কখনো পরিবর্তন হয় না। অনেক আগের রিপোর্টে-পরীক্ষায় আমার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। এ পজিটিভ রক্তে আমি আমার এক ভাবীকে রক্তও দিয়েছি। এখন আমার রক্ত কি করে এ নেগেটিভ হয়। আমার কথা শুনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একেবারে হা। আমাকে বললো আবার রক্ত দিন। দিলাম, কিন্ত এবারে প্রাপ্ত রক্তের গ্রুপও এ নেগেটিভ, পজেটিভ নয়। খুলনায় খুলনা প্যাথলজি নামে একটা প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরী আছে। তার মালিক আমাদের মাগুরার প্যাথলজিষ্ট ডাঃ আবু সাইদ। তিনি তখন খুলনা মেডিকেল কলেজে প্যাথলজি বিভাগের প্রধান। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তিনি পরীক্ষা করে জানালেন আমার রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ।
আমার বুঝতে আর বাকী রইলো না যে আমার রক্তের গ্রুপ দুষ্প্রাপ্র হওয়ায় খোকনের মাকে রক্ত দেবার নামে ক্লিনিকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আমার রক্ত সংগ্রহ করে অন্য কোথাও বিক্রি করেছে বা প্রয়োজনে তার কোন আত্বীয় রোগীকে দিয়েছে এবং অধিকতর সহজপ্রাপ্য কারো এ পজিটিভ রক্ত জোগাড় করে খোকনের মার শরীরে ঢুকিয়েছে। কাজটা অত্যন্ত গরহিত ও ঝুকিপূর্ণ ছিল।
রিমনের বন্ধুরা তার জন্য রক্ত সংগ্রহে ঝাপিয়ে পড়লো এবং সফলকামও হলো। রিমনকে রক্ত দেয়া হলো, চিকিৎসা চললো। কিন্ত রিমনের অবস্থার উন্নতি হলো না। তার বন্ধুরা বিচলিত ও চিন্তিত হলো। কিন্ত ভেঙ্গে পড়লো না। ফেসবুকে ম্যাসেঞ্জারে ইমোতে তারা একে অন্যের সাথে অনবরত যোগযোগ করলো-রিমনের অবস্থার খবরাখবর রাখলো ও তার জন্যে রক্তের ব্যবস্থা করলো। তারা দেখলো উত্তরায় যে ক্লিনিকে রিমনকে ভর্তি করা হয়েছে তা অত্যন্ত ব্যায়বহুল। তা ছাড়া সেখানে তার যথাযথ চিকিৎসাও হচ্ছে না। তাই তারা পরস্পরে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিল রিমনকে ঢাকার অন্য ভাল ও কম খরচের হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। আন্তরিক প্রচেষ্টা ও যোগাযোগে তারা রিমনকে দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতো পারলো। এটা সত্যি অতি প্রসংশনীয়। যাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সহযোগীতায় তা করা সম্ভব হয়েছে আমি তাদেরকে অন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, বাহবা দেই।
বিএসএমআরএমইউ তেও রিমনের রোগ এখনো ধরা পড়েনি। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্ত যাচ্ছে। সে কারণে প্রায় নিত্য তার শরীরে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন পড়ছে। কোথায় মিলবে দুষ্প্রাপ্য বি নেগেটিভ গ্রুপের এত রক্ত? কিন্ত আমি দূরে থেকে অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করছি রিমনের বন্ধুরা ঠিকই সে রক্তের জোগাড় করছে। কেও সাভার থেকে, কেও জয়দেবপুর থেকে আবার কেও অন্যত্র থেকে। ডোনার সংগ্রহ, দূর থেকে তাদের ঢাকা আনা, রক্ত গ্রহণ, ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মেটানো চাট্রিখানি কথা নয়। কিন্ত রিমনের বন্ধুরা দু’মাসের অধিক সময় ধরে ঠিকই তা করে যাচ্ছে। সে চেষ্টায় তাদের ক্লন্তি নেই, ব্যর্থতা নেই। সত্যি তারা অকুতোভয় বীর সেনানী। হারতে তারা জানে না।
হতাশ হয়ে রিমনের পরিবার তাকে বাড়ী নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্ত তার বন্ধুরা তা হতে দিল না। তারা জানতো বাড়ীতে রিমনের জন্য কোথায় মিলবে দুষ্প্রাপ্য এত রক্ত। আর কেইবা তার শরীরে সে রক্ত ঢুকাবে। টোটকা চিকিৎসায় সে মারা যাবে। রিমন এখনও ঢাকায় বিএসএমআরএমইউ তে চিকিৎসাধীন আছে। তার শ্বাস প্রশ্বাস বইছে। বাড়ীতে নিয়ে গেলে তার শ্বাস প্রশ্বাস এতদিনে থেমে যেত।
সত্যি আমি অবাক, বিস্মিত। বন্ধুরা বন্ধুর জন্য এমন ভাবে করে তা আমি রিমনের বেলায় স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। রিমনের জীবন ধন্য। সে অনেক অকৃত্রিম বন্ধু পেয়েছে। বন্ধুদের অপ্রাণ চেষ্টায় ও প্রার্থনায় সে এখনও শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে। তার বন্ধুরা মূত্যুকে ধমকে দিয়েছে। ফিরাতে পারবে কিনা জানিনে। আসলে শত্রুর সামনে রুখে দাড়াতে পারলে অতি শক্তিশালী শত্রুও ভয় পায়-থমকে দাড়ায়, অনেক সময় পিছুও হটে। রিমনের আত্ববিশ্বাসে, তার বন্ধুদের অপ্রতিরোধ্য বাধার সম্মুখে রিমনের আগ্রাসী মূত্যও এবারের মত পিছু হঠবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যাশা। বন্ধুদের এত চেষ্টা, এত শ্রম যদি ব্যর্থ হয় (সৃষ্টিকর্তা যেন তা না করেন) রিমন ওপারে শান্তি পাবে এ ভেবে যে তার অনেক অকৃত্রিম বন্ধু ছিল, যা সব মানুষের ভাগ্যে জাটে না।
এ সবের মাঝে আমি আশার আলো দেখতে পাই। আমার এলাকার নবীনেরা তরুনেরা এত বদ্ধুভাবাপন্ন! মানুষের জন্য মানুষ এ তাদের উপলদ্ধি! তবে কেন এলাকায় এত দলাদলি মারামারি হানাহানি খুনখারাপী থাকবে। নতুন প্রজম্ম, নবীনেরা এ সব দলাদলি মারামারি হানাহানি ধূয়ে মুছে দেবে। এলাকায় ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রয়োজনে চরিত্রবানদের নিয়ে এলাকায় হিলফুলফুজলের মত কমিটি গঠিত হবে। তাদের প্রচেষ্টায় এলাকা থেকে অন্যায় অসত্য ভেদাভেদ হানাহানি মারামারি উবে যাবে।
রিমনের জীবন বাঁচাতে তার বন্ধুদের প্রচেষ্টা দেখে আমি অবাক-বিস্মিত। সত্যি তা অতুলনীয়। তার বন্ধুদের সে প্রচেষ্টা সফল হোক, রিমন সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক সৃষ্টি কর্তার কাছে এ প্রর্থনা করি।
লেখাঃ M.a. Alim