21/11/2025
ইসমাইল মেসের রাতের ছায়া — সাজিয়ারার মোড়
২০১১ সালের শীত। মাগুরা পলিটেকনিকের ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে রহিম। রাজবাড়ীর গ্রামের বাড়ি থেকে মাগুরা অনেক দূর, আর শহরে তার কোনো আত্মীয়ও নেই। ক্লাস শুরুর নোটিশ আসতেই সে সিদ্ধান্ত নিল—মেসে উঠতেই হবে।
শনিবার সকাল। কাঁপানো শীতের মাঝে রহিম মাগুরায় পৌঁছে বায়না মোড়ে নামল। তারপর অটো ধরে সোজা পলিটেকনিকের গেটে দাঁড়াল। গেটজুড়ে ঝোলানো মেসের নোটিশগুলোর মাঝেই দেখা হলো এক বড় ভাই—মকবুল ভাইয়ের সাথে। তিনি সাজিয়ারার মোড়ের স্টেশনারির ব্যবসায়ী। শুনে নিলেন রহিম কোথায় থাকবে, তারপর বললেন—
“ইসমাইলের একটা মেস আছে সাজিয়ারার মোড়ের ঢাল বেয়ে নিচে। শান্ত জায়গা। চাইলে দেখে আসো।”
রহিম গেল। ঢাল বেয়ে নিচে নামতেই টিনের ছাউনি দেওয়া পুরনো দোতলা মেসটা দেখা গেল। চারপাশে ভয়ানক নীরবতা। ঘরগুলো যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষায় আছে। সে সিট ঠিক করল এবং সেদিনই উঠেও গেল।
মেসে অনেক ছেলেরা ছিল—কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ… শুরুতে সবই স্বাভাবিক চলছিল। আড্ডা, গল্প, ক্লাস—সব ঠিকঠাক। কিন্তু সেই শান্ত রাতগুলো যেন অন্য কিছু লুকিয়ে রেখেছিল।
প্রথম ঘটনার দিনটা রাত আড়াইটায়। সবাই গভীর ঘুমে। হঠাৎ—
ধাম! ধোঁওম!!
এমন শব্দ টিনের ওপর হলো যেন কেউ বিশাল পাথর ছুঁড়ে মারল। রহিম চমকে উঠে বসে পড়ল। মনে হলো গাছের ফল পড়েছে। সকালে উঠে দেখল—গাছ আছে, কিন্তু ফল নেই। বন্ধুরা হাসল, “টিন পুরনো, শব্দ হয়।”
রহিমও ভুলে গেল।
কিন্তু দুই দিন পর, একই সময়, রাত আড়াইটায় আবার—
ধাম! ধাম!! ধাম!!!
এবার শব্দটা ঠিক রহিমের মাথার উপর। দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই সে দেখল—হলুদ বাল্ব টিমটিম করছে, চারপাশে কুয়াশার মতো অন্ধকার। বাতাস নেই, কিন্তু ঠান্ডা শীতলতা ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ছে। ছাদের দিকে তাকাতেই দেখল—টিন কাঁপছে… কিন্তু উপরে কিছুই নেই। কোনো গাছ নেই, কোনো মানুষ নেই।
রহিম বুঝল—এটা স্বাভাবিক কিছু নয়।
ঘরে ফিরে দরজা লাগাতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দরজাটা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে খুলে গেল। মনে হলো কেউ ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে যেন কারো ঠান্ডা নিঃশ্বাস। রহিম ঘুরে তাকাল—কেউ নেই। কিন্তু ছাদের দিকে তাকিয়েই জমে গেল—টিনের ওপর ভেজা পায়ের দাগ, যেন কেউ ভিজে পা নিয়ে টিনের ওপর হাঁটছে। অথচ সেদিন তো কোনো বৃষ্টি হয়নি।
ভয়ে পরদিন সে ইসমাইল ভাইকে জিজ্ঞেস করল। ইসমাইল ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“দেখো রহিম… এই মেসে আগে একজন ছেলে থাকত। একা। শীতের এক রাতে, ঠিক তোমার ঘরের উপরের ঘরটায় সে মারা যায়। তিন দিন পর লাশ পাওয়া যায়। তারপর থেকে নতুন কেউ এলেই রাত দু’টায় ছাদে হাঁটার শব্দ হয়…”
রহিমের বুকের ভেতর কাঁপুনি বয়ে গেল।
সেই রাতেই সবকিছুর শেষ হলো। ২টা বাজার সাথে সাথে আবার—
ধাম! ধাম!!! ধোঁওম!!!
এবার শব্দটা থেমে গেল রহিমের মাথার একদম ওপরে। ঘরের ভেতর হঠাৎ বরফের মত ঠান্ডা। মনে হলো কেউ ঘরের ভেতর হাঁটছে… ধীরে ধীরে… মেঝে সামান্য কেঁপে উঠছে। তারপর বালিশের পাশে কেউ দাঁড়াল। রহিম নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে থাকল।
ঠিক তখনই—
একটি ঠান্ডা, কর্কশ গলা ফিসফিস করে বলল—
“রহিম… এই জায়গা ছেড়ে দে…”
রহিম চোখ খুলে দেখল—ঘরে কেউ নেই।
কিন্তু বালিশের পাশে একটা গভীর হাতের দাগ।
সেই রাতের পর রহিম আর বেশিদিন ইসমাইল মেসে থাকেনি।
কিন্তু আজও সে যখন সাজিয়ারার মোড় দিয়ে যায়, মনে হয়—
টিনের ওপর ভেজা পায়ের শব্দ আবার তাকে ডেকে বলে—
“ফিরে যা…”
তোমাদের সাথে ঘটে যাওয়া কোন গল্প থাকলে ইনবক্স করতে পারো।