01/01/2026
রোজার ঈদের পর পর আমার বাসায় ভাই, ভাবী, ইনকিলাবের সবার দাওয়াত ছিলো। বাসায় ঢুকেই ভাই সোজা চলে গেলো ডাইনিংয়ে, ফ্রিজ খুলে বলতেছিলো
আপা, ডাল ভাত তরকারী কি করছেন?
করছিলাম পোলাউ, রোস্ট, রেজালা। ডাল, ভাত, ভর্তা তো করি নাই। ভাই একটু আফসোস নিয়ে বললো, পোলাউ মাংস পেট ভইরে খাওয়া যায় না। এরপর ফ্রিজের বাটিগুলো খুলতে লাগলো। একটা বাটিতে লাউশাকের তরকারি ছিলো, আগের দিনের রান্না। ভাই সেইটাই মজা করে খাইলো ...
এমন ছিলো ভাইয়ের কাছে তার আপার বাসা যে ঢুকেই কোন ফর্মালিটি ছাড়াই ফ্রিজ খোলা যায়! ভাই এমনই মিশুক ছিলেন, সরল প্রাণবন্ত ছিলেন।
এরপর ডিনার করবে, টেবিলে খাবারের বাটি দেখে কি যেনো ভাবতেছিলো৷ আমি জিগ্যেস করছিলাম,
" ভাবীরে মিস করতেছেন?" ( ভাতিজা তখন অনেক ছোট, তাই ভাবী আসে নাই।)
ভাই সেই চিরচেনা হাসি দিয়া বললো, " এতো ভালো আয়োজন বউরে ছাড়া খাওয়া যায়?"
আমি বললাম, " আপনারা খান, আমি আগেই ভাবীর জন্য আলাদা রেখে দিছি।" (ব্যাক করার সময় বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় ভাই আর খাবারগুলো নেয় নাই। তাড়াহুড়ো করে চলে গেছিলেন।)
ভাই খাইলেন, খাওয়ার পর বলছিলো, " আপা, আরেকদিন শুধু ডাল আলু ভর্তা করবেন আর সবজির তরকারি। "
ভাই, ভালো যেকোন কিছুতে ভাবীকে ইয়াদ করতেন।
ভাবীরে তো সাংসারিক কাজে সাহায্য করতেন। নিজে ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, থালাবাসন ধোয়া এসব তো ভাই করতেনই, কেয়ারিংও ছিলো। আরেকদিনের ঘটনা বলি,
ঈদে ভাবীর জন্য দুইটা থ্রিপিস গিফট দিছিলাম। জানি এসব বিপ্লবীরা বউ পরিবাররে শপিংয়ে নিয়ে যাবে! সেই ফুরসত তারা পায় না। অরিজিনাল পাকিস্তানি অরগ্যাঞ্জা। ভাই চেক করার পর ফোন করে বলতেছিলো,
"আপা, থ্রিপিসগুলা খুবই সুন্দর হইছে কিন্তু আমি তো তখন খুলে দেখি নাই, এখন দেখলাম যেইটা পাকিস্তানি সুন্দর বেশি আপনার ভাবী ওইটা পরতে পারবে না। তার স্কিনের সমস্যা হয় সুতি ছাড়া অন্য কিছু পরলে। আপনি মনে কষ্ট নিয়েন না, আপনার ভাবী তো এইটা পরতে পারবে না, শুধু শুধু নষ্ট হবে সুতির কিছু থাকলে এক্সচেইঞ্জ করে দেন।"
ভাইয়ের কথা শুনে ভাবতেছিলাম, সারাটা দিন দেশ আর মানুষের জন্য সংগ্রাম করা ভাই, বউয়ের কোন ফেব্রিক্সটায় সমস্যা হবে, তাও খেয়াল রাখছে!
ভাবীকে নিয়ে প্রায় সময় ভাই অনেক প্রশংসা করতেন। প্রায় সময় আফসোস করতেন যে, ভাবীকে যেই সময়টা দেয়ার কথা ছিলো দিতে পারে না, এসব নিয়ে ভাবীর অভিযোগ নাই, ভাবী আরো ভাইয়ের কাজে সাপোর্ট দেয় ...
আজকে ৩২ শে ডিসেম্বর, বিশটা দিন পার হয়ে গেছে, ভাবী ভাইকে দেখে না ... স্বামী হারানোর শোক অনেক, ভালো স্বামী হারানোর শোক আরো বেশি।
একটু ভালো খাবার খেলেও যেই স্বামী তার স্ত্রীকে ইয়াদ করতেন, ভার্সিটির ক্লাস, ইনকিলাব মঞ্চ, মিছিল, রাজপথ সামলে বাসায় যেয়ে আবার স্ত্রীর কাজে সাহায্যও করতেন, ক্লান্ত বলে এক্সকিউজ দেখাইতেন না ... স্ত্রীর কোন ফেব্রিক্সে সমস্যা এতোটুকু খেয়ালও যিনি রাখছেন, তার স্ত্রী স্বামী ভক্ত, স্বামীকে দেয়া ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে না তো কে করবে?
আপনারা যারা বলেন না, " আমরা সবাই ওসমান হাদী"
নাহ, আপনারা ওসমান হাদী হতে পারবেন না। ব্যক্তি জীবনে সৎ, কর্মঠ, পরিবারের কাছে দায়িত্ববান, কেয়ারিং পুরুষ না হলে কেউ ওসমান হাদী হইতে পারবে না।
আজকে ৩২ শে ডিসেম্বর, বিশটা দিন হয়ে গেলো ভাতিজা বাবাকে দেখে না, যার বাবা জুলাইয়ের শহীদ সন্তানদের বুকে নিয়ে কাঁদছে আজকে তার বাবা শহীদ!
আব্বাজানরে কে বুকে নিয়ে কাঁদে ???
ওর সামনে কেউ কাঁদতে পারে না, ভাবীও পারে না। ও কান্না করে ... বাপকে পায় না তো কান্নাই ওর বাবাকে খুজে বেড়ানোর ভাষা।
আজকে ৩২ শে ডিসেম্বর এই হত্যাকান্ডে জড়িত সকল আসামীদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত, ভাইয়ের প্রতি ইনসাফ না করা পর্যন্ত আমাদের ডিসেম্বর শেষ হবে না।
আমাদের সময় আটকে গেছে ১২ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় ...
#মারফিয়া