22/09/2026
সম্প্রতি কুমিল্লা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত দু’টি মর্মান্তিক ঘটনা সারা দেশের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। কুমিল্লায় মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর অপ্রতিম, যাকে তারই বয়সে অনেক বড় তথাকথিত বন্ধুদের দ্বারা সুপরিকল্পিতভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। অন্যদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য ভাত খাওয়ার মতো তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে প্রহার ও ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু—এই দুটি ঘটনা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান চিত্রকে কোনো আড়াল ছাড়াই নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর আমাদের সাধারণ প্রবণতা থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা বা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। নিঃসন্দেহে, সমাজে অপরাধ দমন এবং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, একটি ১৬ বা১৭ বছরের কিশোরের মনে যখন হত্যার মতো হিংস্রতার জন্ম নেয়, কিংবা উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে সহপাঠীর ওপর এমন পাশবিক আক্রমণের মানসিকতা তৈরি হয়—তখন কি কেবল পুলিশ বা আইনি ব্যবস্থা দিয়ে এই পতন রোধ করা সম্ভব? আইন দিয়ে অপরাধের শাস্তি দেওয়া যায়, কিন্তু অপরাধের বীজ যেখানে অঙ্কুরিত হয়—মানুষের চেতনা ও মনন—সেখানে আইন পৌঁছাতে পারে না। আইনের ভয় মানুষকে সাময়িকভাবে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু মানুষকে মানবিক ও নীতিবান করে তুলতে পারে না। আমাদের প্রধান সমস্যাটি কেবল আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতায় নয়, বরং সমস্যাটি অনেক গভীরে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—আমরা বস্তুগত উন্নয়নকে জীবনের একমাত্র সূচক বানিয়ে ফেলেছি। গত কয়েক দশকে আমাদের দেশের সেতু, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল, টানেল কিংবা মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার বাহ্যিক মান ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক ও বস্তুগত কাঠামোর আড়ালে একটি জাতির মূল ভিত্তি—'মানবিক মূল্যবোধ' ও 'নৈতিক সূচক'—দিন দিন উপেক্ষিত ও ধ্বংস হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র যখন কেবল আর্থিক প্রবৃদ্ধি, দৃশ্যমান অবকাঠামো ও আধুনিকায়নকে সাফল্যের একক মাপকাঠি মনে করে, তখন সেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবার ও নৈতিকতার চর্চা দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজ কেবল ডিগ্রি অর্জন ও জিপিএ-৫ পাওয়ার কারখানায় পরিণত হয়েছে; সেখানে নীতি, সহানুভূতি, সহনশীলতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ শেখানোর প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ প্রায় বিলুপ্ত। পরিবার ও সামাজিক কাঠামোর বিচ্যুতিও এখানে সমানভাবে দায়ী। কিশোর বা তরুণদের মানসিক বিকাশ, তাদের সঙ্গ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব এবং চারপাশের সহনশীলতাহীন পরিবেশ তাদের ধাপে ধাপে সংবেদনহীন করে তুলছে। সামান্য তুচ্ছ ঘটনাতেও চরম হিংস্র হয়ে ওঠার মানসিকতা প্রকাশ করছে যে, সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কোথায়? প্রথমত, রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে যে, নৈতিক ভিত্তিহীন অবকাঠামোগত উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত একটি সহিংস ও অমানবিক সমাজ তৈরি করে। বস্তুগত কাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবার ও সমাজকে আবার সক্রিয় হতে হবে। কেবল বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানই অভিভাবকত্বের শেষ কথা হতে পারে না; সন্তানের মানসিক সঙ্গী হওয়া, তার আচার- আচরণ পর্যবেক্ষণ করা এবং তাকে সৎ ও সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। তৃতীয়ত, আইনি ব্যবস্থার সঠিক ও প্রভাবমুক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী পার পেয়ে না যায়। তবে মনে রাখতে হবে, বিচার কেবল অপরাধের পরবর্তী ব্যবস্থা; অপরাধের মানসিকতা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার ভেতরেই। কুমিল্লা ও খুলনার ঘটনা দুটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও জাতীয় নীতি-নৈতিকতার সংকটের লাল সংকেত। আইন দিয়ে অপরাধী দমন হতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নের দিকে অবিলম্বে নজর দিতে হবে।