10/03/2024
আলহামদুলিল্লাহ! আমলের মৌসুম রমাদ্বানুল মুবারাক আমাদের মাঝে সমাগত। এ মাসের প্রতিটি এবাদতের বদলা সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশী। মুমিনের হৃদয়ও তাই এ সময়ে আমলের দিকে ঝুঁকে যায়। এদিকে অলসতা, অনভ্যাস কিংবা ব্যস্ততার কারণে সেভাবে আমল বাড়ানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমল বৃদ্ধি করে অধিক নেকী হাসিলের চেষ্টা করা যায়। এখানে আমলের সাথে ফজিলতও উল্লেখ করা হল। সেই কারণে লেখা দৈর্ঘ্য বেড়ে গেছে। একই সাথে একজন সবগুলো না পারলেও কয়েকটি তো পারবে ইনশাআল্লাহ। নিজের অবস্থা অনুসারে একটা শিডিউল করে নেওয়া যায়।
★ফজর ও এশার সালাত জামাতে আদায়ঃ সারারাত্রি এবাদতের নেকি
যে লোক এশার সালাত জামাআতে পড়ল সে যেন অর্ধেক রাত্রি দাড়িয়ে সালাত আদায় করল। আর যে লোক ফজরের সালাত জামাআতে পড়ল সে যেন সারা রাত জেগে (তাহাজ্জুদের) সালাত পড়ল (মুসলিম)। অর্থাৎ ফজরের জামাত এশার জামাআতের চেয়েও উত্তম।
★জামাতের সাথে তারাবীহ ও বিতরঃ সারারাত্রি এবাদতের নেকি
জামাতের সাথে তারাবীহ ও বিতর আদায় করা এবং শেষ পর্যন্ত ইমামের পেছনে নামায আদায় করা। হাদীসে এসেছে- “যে ব্যক্তি ইমামের সাথে কিয়ামুল লাইল (রাতের নামায) আদায় করে যতক্ষণ না ইমাম নামায শেষ করেন; আল্লাহ্ তার জন্য গোটা রাত নামায আদায় করার সওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন।”[সুনানে নাসাঈ, ও অন্যান্য: নাসাঈর ‘রমযানের কিয়াম অধ্যায়’]
তারাবীহতে কুরআন খতম করা সুন্নাহ। তবে, 3G/4G গতিতে ও মন্ত্রের মত তিলাওয়াত করে যেখানে পড়া হয়, সেখানে না পড়ে ধীরে ও তারতিলের সাথে পড়া হয় এমন জায়গায় সালাত আদায় করা উচিত।
★তাহাজ্জুদঃ রমাদ্বানুল মুবারাকে তাহাজ্জুদ পড়া অনেক সহজ হয়ে যায়। সাহরির জন্য তো আমাদেরকে উঠতেই হয়। একটু আগে উঠে অল্প হলেও তাহাজ্জুদ পড়ার সুযোগটা মিস করা বোকামী! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বকরির দুধ দোহন পরিমাণ অল্প সময়ের জন্য হলেও তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ে উৎসাহ দিয়েছেন। (মুন্তাখাব হাদিসঃ সুন্নাত ও নফল নামায)
শেষ রাত্রি হল দোয়া কবুলের সময়। প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর প্রায় সবগুলোতে এসেছে- “আল্লাহ তা’আলা প্রতি রাতের শেষাংশে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং ঘোষণা দেন যে, কোনো প্রার্থনাকারী আছ কি? যার প্রার্থনা আমি কবুল করব। প্রয়োজন প্রার্থনার কোনো লোক আছ কি? যার প্রয়োজন আমি পূর্ণ করে দেব। এবং কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি? যাকে আমি ক্ষমা করে দেব।”
★সালাতুদ দ্বুহাঃ এটি চাশতের নামায নামেও প্রসিদ্ধ। যখন সূর্যের তাপ একটু প্রখর হয়, তখন এ সালাত আদায় করবে। সাহরির পরের ঘুম সম্পন্ন করে ওঠার পর ফ্রেশ হয়ে অনায়াসে ২/৪ রাকাত পড়ে নেওয়া যায়।
আবু যার (রা) বলেন, নবীয়ে আকরাম বলেছেন, মানুষের দেহের প্রত্যেক জোড়া ও গিটের জন্য (শুকরিয়াস্বরূপ) প্রতিদিন সকালে দান করা তাঁর জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব। ... দু রাক’আত দোহার (চাশতের) সালাত আদায় করলে এ দানের দায়িত্ব পালিত হয়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম ১/৪৯৮, নং ৭২০। )
★নফল সালাতঃ সম্ভব হলে প্রত্যেক ওয়াক্তের আগে/পরে ২/৪ রাকাত নফল পড়ে নেওয়া যায়।
১. যোহরের পর দু রাকাতঃ যে ব্যক্তি যোহরের আগে চার রাকাআত এবং পরে চার রাকাআত নামায পড়বে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।” (সুনান নাসাঈ, হা/ ১৮১৭ ও তিরমিযী হা/৪২৮)
যোহরের পরে দু রাকাআত (নিয়মিত সুন্নতে মুআক্কাদা) এর সাথে আরও দু রাকআত যুক্ত করে মোট ৪ রাকাআত।
২. আসরের পূর্বে চার রাকাতঃ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে ব্যক্তি আসরের পূর্বে চার রাকআত সুন্নত পড়ে।” [আবূ দাউদ ১২৭১, তিরমিযী ৪৩০]
৩. মাগরিবের থেকে এশার মধ্যবর্তী সময়ের নফলঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে ও তাঁর সাহাবীগণ মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করতেন বলে সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তাবিয়ী হাসান বসরী বলতেন, মাগরিব ও ইশা’র মধ্যবর্তী সময়ের নামাযও রাতের নামায বা তাহাজ্জুদ বলে গণ্য হবে। [ রাহে বেলায়েত- আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ.]
★ তিলাওয়াতঃ কুরআন তিলাওয়াত সর্বোত্তম নফল ইবাদত বলে বর্ণিত হয়েছে। রমাদ্বান কুরআনের মাস। তাই বেশী বেশি তিলাওয়াত করা উচিৎ। কম পক্ষে একটা খতম তো দেওয়া চাই। বেশি পারলে ভাল। অবশ্য খতমের সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে অতি দ্রুত পড়াটা কাম্য নয়৷ এতে নেকির বদলে গুনাহ হতে পারে। বরং মাখরায ও তাযবিদ মেনে, সুন্দরভাবে যতটুকু পড়া যায়, সেটাই আমলনামায় নেকি হিসেবে জমা হবে ইনশাআল্লাহ।
একই সাথে কুরআন যেহেতু পথনির্দেশক তাই কেবল এর আরবি তিলাওয়াতে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থ পড়া ও তার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা সর্বোপরি কুরআন এর ওপর আমলের চেষ্টা করাই আসল কাজ। এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল, নিজ থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা না দেয়া। কোন বিধানগত ইস্যুতে কোন সিদ্ধান্ত না নেয়া। বরং আল্লাহর বড়ত্ব, ইসলামের মাহাত্ম্য, কুফরের অনিষ্ট, আখেরাত, জান্নাত জাহান্নাম এসকল আলোচনা এবং উপদেশমূলক আয়াতগুলো থেকে উপদেশ হাসিল করা উচিৎ। তাই কোন আলিমের সাথে যোগাযোগ রেখে কুরআন অধ্যয়ন উত্তম। এছাড়া, নির্ভরযোগ্য আলিমদের অনুবাদ ও তাফসির দ্বারাও উপকৃত হওয়া যায়।
★ যিকরঃ যে সর্বদা যিকরের দ্বারা তার জবানকে তরতাজা রাখবে, সে হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে- কাজেই চলতে, ফিরতে, কাজ করার সময়-সব অবস্থায় জবানকে যিকরে ব্যস্ত রাখা হবে খুবই অল্প বিনিয়োগে বিশাল এক অর্জন। উপরে উঠতে আল্লাহু আকবর, নিচে নামতে সুবহানাল্লাহ এবং সমতলে চলার সময় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ার কথা এসেছে। (কিতাবুস সুন্নাহ) এছাড়া সব সময় সহজেই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়া যায়- হাত বা শরীর দ্বারা অন্য কাজ করতেই করতেই৷ শুরুতে এটা একটু দুঃসাধ্য মনে হলেও অল্পতেই অভ্যাসে এসে যায়। এবং বিশেষভাবে ইস্তিগফার ও দরুদ শরিফের আমলের ব্যাপারেও যত্নবান হওয়া চাই।
★ দোয়া করাঃ স্বাভাবিক দোয়া কবুলের মুহূর্ত ছাড়াও রমাদ্বানে দোয়া কবুল হবার কথাও হাদিসে এসেছে। কাজেই, সাধ্যমত অধিক পরিমাণে দোয়া করা উচিৎ। দোয়ার মধ্যে নিজের কৃত গুনাহ থেকে ক্ষমা চাওয়া, নিজের, পিতামাতার ও সকল মুসলমের জন্য প্রয়োজন পূরণ, বিপদ দূরীকরণ ও গুনাহ মাফের দোয়া করা চাই। যখন বান্দা অন্যের জন্য কিছু চায়, আরেকজন ফেরেশতা “তার জন্যও অনুরূপ হোক” এই দোয়া করে থাকেন। বান্দা যখন সব মুসলিমের জন্য ক্ষমা চায়, তখন প্রত্যেক মুমিন নর ও নারীর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে বদলা দেন বলে হাদিসে এসেছে।
★ রমজানের বিশেষ ক্ষমা
রোযার সাথে গোনাহমাফির সম্পর্ক খুব গভীর। রমযানের ফরয রোযা যেমন গোনাহ মিটিয়ে দেয় তেমনি বছরের বিভিন্ন সময়ের নফল রোযাও গোনাহ মিটিয়ে দেয়।
১. রমযান মাস : দুই রমযানের মাঝের গোনাহ মিটিয়ে দেয়
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন-..এক রমযান থেকে আরেক রমযান এর মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহের কাফফারা- গোনাহ মোচনকারী; যদি ওই ব্যক্তি কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে (ওই ব্যক্তির যদি কবীরা গোনাহ না থাকে)। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৩
২. রমযানের রোযা : গোনাহ পুড়িয়ে ছাই করে দেয়
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮
৩. রমযানে কিয়ামুল লাইল (রাতের নামায) : পাপের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযানের রাতে নামাযে (সালাতে) দণ্ডায়মান হয়, তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৭
৪. লাইলাতুল কদরে কিয়ামুল লাইল : পুণ্যের পাহাড় আর ক্ষমার দরিয়া
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে (সালাতে) দণ্ডায়মান হবে, তার পূর্ববতী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০১
★ সামগ্রিক লক্ষ্যণীয়ঃ
১. জামাতের সাথে ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।
২. রোযার কোয়ালিটি ঠিক রাখা। এমন কাজ থেকে বিরত থাকা, যা রোজার বরকত নষ্ট করে দেয়।
৩. আল্লাহর কালামের সাথে খাস সম্পর্ক পয়দা করা।
৪. সুযোগমত অল্প হলেও নফলের অভ্যাস করা।
৫. বেশি বেশি দোয়া করা।
৬.অতীত গুনাহ থেকে তওবা করে নতুন জীবন আরম্ভ করার নিয়ত করা।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের আমলের তৌফিক দিন।
[মাসিক আল কাউসার ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগৃহীত ও সংকলিত]