16/06/2025
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে বিসিএস প্রস্তুতি নিব নাকি ব্যাংক এর? বিসিএস এর প্রস্তুতি নিলে কি ব্যাংক পরীক্ষায় টিকব না? নাকি ব্যাংকের জন্য প্রস্তুতি নিলে বিসিএস হাতছাড়া হয়ে যাবে?
সেসব প্রশ্নের উত্তর জানিয়েছেন জনাব নাজিরুল ইসলাম নাদিম, সহকারি কর কমিশনার (৩৮তম বিসিএস) ও সাবেক ব্যাংকর।
চাকরিপ্রার্থীদের বড় একটি অংশের পছন্দ বিসিএস ও ব্যাংকিং ক্যারিয়ার। প্রস্তুতির জটিলতা এড়াতে অনেকে এর একটি বেছে নেন। অথচ মাথা খাটালে দুটির প্রস্তুতি একসঙ্গেই নেওয়া সম্ভব। ব্যাংক ও বিসিএসের চাকরির প্রস্তুতি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
একটু সময় নিয়ে ব্যাংক ও বিসিএসের বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করলে উভয় পরীক্ষার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। একটু ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখবেন, ব্যাংক ও বিসিএসের পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন ও সিলেবাসে খুব বেশি ভিন্নতা নেই। তাই পৃথকভাবে প্রস্তুতি না নিয়ে পরিকল্পিতভাবে সমন্বিত প্রস্তুতি নিন এ দুই পরীক্ষার জন্য। চাইলে ব্যাংকের প্রস্তুতি দিয়েই বিসিএসে ভালো করা যায়।
আবার একইভাবে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিলেই হয়ে যায় ব্যাংকের প্রস্তুতি।
ব্যাংকের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সময় ১ ঘণ্টা। অন্যদিকে বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে এই পরীক্ষায় সময় ২ ঘণ্টা। বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে মোট নম্বর ২০০, অন্যদিকে ব্যাংকে ১০০ নম্বর।
বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা যায় ০.৫ নম্বর। আর ব্যাংকে কাটা যায় ০.২৫ নম্বর। ব্যাংকের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সাধারণত বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি) এবং কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে ব্যাংকের প্রিলিমিনারি প্রস্তুতির বাইরে অতিরিক্ত ভূগোল, সাধারণ বিজ্ঞান এবং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসনের ওপর প্রস্তুতি নিতে হয়।
👉বাংলা
বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য ৩৫ নম্বর বরাদ্দ থাকে।
ব্যাংকের প্রিলিমিনারির বাংলা অংশেও ২৫ নম্বর বরাদ্দ থাকে। ব্যাংকের প্রস্তুতির জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীন, মধ্য যুগ ও আধুনিক যুগের সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হয়। এর পাশাপাশি বাংলা ব্যাকরণের বিভিন্ন অংশ; যেমন—বানান, বাক্য শুদ্ধি, পরিভাষা, সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দ, ধ্বনি, বর্ণ, শব্দ, পদ, বাক্য, প্রত্যয়, সন্ধি ও সমাসের ওপর ভালো দখল থাকতে হবে। বিসিএসের জন্য বাংলা বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া থাকলে ব্যাংকের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় এ বিষয়ে আর আলাদা প্রস্তুতি নিতে হবে না।
👉ইংরেজি
বিসিএসের ইংরেজি গ্রামার ও সাহিত্য অংশ মিলিয়ে মোট ৩৫ নম্বর থাকে। এখানে গ্রামার অংশে ২০ নম্বর থাকে, অন্যদিকে ব্যাংকের পরীক্ষায় ইংরেজি অংশে থাকে ২৫ নম্বর। ইংরেজি বিষয়ে ব্যাংক ও বিসিএসের সমন্বিত প্রস্তুতি নিতে চাইলে ইংরেজি গ্রামারের বিভিন্ন অংশে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সাধারণত ইংরেজি অংশে Parts of speech, Number Gender, Right from a verb, Subject verb agreement, Tense, Conditional sentence, Correction, Synonym Antonym, Analogy, Phrase and idioms, Spelling, Preposition ইত্যাদি বিষয় থেকে প্রশ্ন আসে। এ ছাড়া ইংরেজি Vocabulary অংশে দক্ষতা অর্জন করে যে কেউ প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় নিজেকে এগিয়ে রাখতে পারেন। ইংরেজি শব্দার্থ ভাণ্ডার মজবুত থাকলে এবং তা প্রয়োগ করার সক্ষমতা অর্জন করলে প্রিলিমিনারি ও লিখিত উভয় পরীক্ষায় ভালো নম্বর তোলা সম্ভব।
বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ইংরেজি সাহিত্যে ১৫ নম্বর বরাদ্দ। তবে ব্যাংকের প্রিলিমিনারিতে ইংরেজি সাহিত্য থেকে প্রশ্ন আসে না বললেই চলে। সুতরাং শুধু ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে পড়লেই বিসিএসের ইংরেজি অংশের প্রস্তুতি হয়ে যায়।
👉গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা
গণিতে ভালো করলে ব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনেকটাই এগিয়ে থাকা যায়। বিসিএসের প্রিলিমিনারির ২০০ নম্বরের মধ্যে গণিতে বরাদ্দ ১৫ নম্বর। অন্যদিকে ব্যাংকের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ১০০ নম্বরের মধ্যে শুধু ২০ নম্বর থাকে গণিতে। ব্যাংক ও বিসিএসের প্রিলিমিনারির জন্য পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতির বিভিন্ন অংশসহ সেট, বিন্যাস ও সমাবেশ, পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। পাটিগণিত অংশে ভালো করতে হলে পরিমাপ, লাভ-ক্ষতি, শতকরা, সুদ/মুনাফা, অনুপাত, গড়, বয়স, সংখ্যা, সমীকরণ, দূরত্ব, সময়-কাজ ইত্যাদির অঙ্কগুলো বেশি বেশি অনুশীলন করতে হবে। এর পাশাপাশি বীজগণিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি ইত্যাদির জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত বই থেকেও প্রস্তুতি নিতে হয়।
বাংলা মাধ্যমে গণিতের সমাধানের পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমেও গণিতের সমাধান অনুশীলন করা জরুরি। এর ফলে সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংক, আইবিএ-এমবিএ ভর্তি বা বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরির প্রস্তুতিতেও এগিয়ে থাকা যায়। গণিত প্রস্তুতির সময় চেষ্টা করবেন দ্রুত সঠিকভাবে সমাধান করার। খাতায় লিখে গণিত সমাধান করলে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যাংক ও বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিও হয়ে যাবে।
ব্যাংক পরীক্ষায় মানসিক দক্ষতা থেকে আলাদা নম্বর বরাদ্দ না থাকলেও বিসিএস প্রিলিমিনারিতে ১৫ নম্বরের প্রশ্ন আসে। মানসিক দক্ষতার জন্য গণিতে দক্ষতা থাকার পাশাপাশি ভাষা, স্থানাঙ্ক, বানান, সমস্যা সমাধান ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হয়।
👉সাধারণ জ্ঞান
ব্যাংকের প্রিলিমিনারিতে সাধারণ জ্ঞান অংশ থেকে সাধারণত ২০ নম্বরের প্রশ্ন থাকে। বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে সাধারণ জ্ঞানের দুই অংশের (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি) ওপর মোট ৫০ নম্বরের প্রশ্ন থাকে। বিসিএসের সিলেবাস অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি বিষয়ে প্রস্তুতি নিলে ব্যাংকের সাধারণ জ্ঞান অংশের জন্য আলাদা প্রস্তুতির দরকার হয় না। বাংলাদেশ বিষয়াবলি অংশে বাংলাদেশের জাতীয় ও ঐতিহাসিক বিষয়, কৃষি, অর্থনীতি, শিল্প, সংবিধান, রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থা প্রভৃতি অংশ থেকে প্রশ্ন আসে। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি অংশে বৈশ্বিক রাজনীতি, বিশ্ব ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সংগঠন, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ইস্যু ইত্যাদি অংশ থেকে প্রশ্ন থাকে। ব্যাংকের জন্য বাড়তি প্রস্তুতি নিতে ব্যাংক বিষয়ক অন্যান্য জ্ঞান, সাম্প্রতিক ব্যাংকিং খাতে পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিভিন্ন খবর সম্পর্কে জানাশোনা থাকতে হবে।
👉কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি
ব্যাংক ও বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি অংশে প্রায় সমান নম্বর বরাদ্দ থাকে। উভয় পরীক্ষায়ই কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি অংশে ১০ নম্বর থাকে। সিলেবাস ও প্রশ্নের ধরন প্রায় একই হওয়ায় ব্যাংক ও বিসিএসের জন্য কম্পিউটার অংশে কোনো ভিন্ন প্রস্তুতির দরকার হয় না। কম্পিউটার অংশে ভালো প্রস্তুতির জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের আইসিটি বইটি দারুণ সহায়ক হতে পারে। বিসিএসের সিলেবাস সামনে রেখে প্রস্তুতি নিলে এবং একই সঙ্গে ব্যাংকের বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করলে কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি অংশে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবেন