27/08/2024
নিয়ামতপুর উচ্চ বিদ্যালয়, একজন প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথাঃ
হাওড় এলাকার গেটওয়ে, প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত নিয়ামতপুরে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় কিছু শিক্ষানুরাগী গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৫২ ইং। একসময় এ বিদ্যালয়টি ছিলো এ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। দূরদূরান্ত হতে অসংখ্য শিক্ষার্থী এখানে শিক্ষালাভ করতে ছুটে আসতো। এখানে দূরের শিক্ষার্থীদের জন্যে স্কুলের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো 'মেস'। তাছাড়া স্কুলের আশপাশের বাড়ীগুলোতে জায়গীরের ব্যবস্থাও ছিলো। নিকট দুরত্ব হতে (তিন চার মাইল) প্রতিদিন পায়ে হেটে স্কুলে আসাযাওয়া করতো অনেক শিক্ষার্থী।
এ স্কুল অনেক মেধাবী ছাত্রের জন্ম দিয়েছে। এ স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে কাজ করেছেন, করছেন। বর্তমানে এ স্কুলটি 'স্কুল ও কলেজ' এ রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু আগের সেই জৌলুষ, খ্যাতি, সুনাম হাওয়ায় উবে গেছে। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
মরহুম জনাব, মোহেব্বুর রহমান (এমএ বিএড)।
তিনি জাতীয় পর্যায়ের কোন রাজনীতিবিদ নন। ডাকসাইটে কোন আমলা নন। তিনি বড় কোন ব্যবসায়ী নন। খ্যাতিমান কোন দানবীর নন। বিপুল বিত্তশালী কেউ নন।
তিনি অতিসাধারণ একজন মানুষ, একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক।
তিনি ছিলেন ম্যাট্রিক ১৯৪৫ ইং ব্যাচের ছাত্র। ৪৭ ইং সনে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। শিক্ষকতা কালীন সময়ে তিনি সাফল্যের সাথে বিএড কোর্স সমাপ্ত করেন। উল্লেখ্য যে, তার বিএড ট্রেনারের মধ্যে দুজন ছিলেন অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট খাঁটি ইংরেজ (ব্রিটিশ।) তিনি ছিলেন একজন ইংরেজী স্কলার। তাঁর লেখা ইংরেজি ব্যাকরণের বই পাকিস্তান আমলে হাইস্কুলে পাঠ্য ছিলো। তিনি এসএসসি ইংরেজীর এক্সামিনারও ছিলেন।
মাত্র তেইশ বছর বয়সে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি নিয়ামতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। যোগ দেন স্কুল প্রতিষ্ঠার দু'বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৪ ইং সনে। একটানা ৩৬/৩৭ বছর অত্র স্কুলে প্রধান শিক্ষকতা করেন। কাজে যোগ দিয়েই তিনি স্কুল গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও দাতা জনাব মরহুম আব্দুল মান্নান মিয়া, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মরহুম আব্দুল লতিফ ফকির, ও মূলদাতা প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মরহুম জনাব আব্দুল হামিদ মাষ্টার স্যার সহ অন্যান্য সবাই তার উপর সর্বময় কর্তৃত্ব অর্পণ করে নিশ্চিন্ত থাকেন। তিনিও এর প্রতিদান দিতে এতোটুকুনও বিলম্ব করেননি, কার্পণ্যতা দেখাননি। তিনি প্রথম দু'বছর স্কুল থেকে একটি টাকাও মাইনে নেননি।
(উল্লেখ্য যে, তিনি মোটেও অস্বচ্ছল, দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেননা। বাবা মরহুম মৌলভী গোলাম মোস্তুফা (ফাজিল ১৮৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) ছিলেন একজন ইসলামিক স্কলার। আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষার উপর তার ছিলো অসাধারণ দখল, পাণ্ডিত্য। পাকুন্দিয়া উপজেলার অন্তর্গত হোসেন্দী উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনি ছিলেন একাধারে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, দাতা ও শিক্ষক। ২৮/১৪ হাত আয়তনের নিজ বাড়ীর বাংলাঘরটি স্কুলঘর তৈরীর কাজে দান করে দিয়েছিলেন। যদিওবা এ দানটি ছিলো নিতান্তই সামান্য। পরবর্তীতে এ স্কুল পরিদর্শনে আসেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ও বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী আব্দুল আলিমের মতো বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ।)
উপরন্তু স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের মাইনেসহ অন্যান্য খরচ জোগাতে ব্যক্তিগত তহবিল থেকেও অর্থব্যয় করেন। দাতা, উদ্যোক্তা মরহুম আব্দুল মান্নান মিয়ার দেয়া ৭০০/- সাতশত টাকা অনুদান ঘর নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে ব্যয় হয়ে যায়। এ কারনে তিনি তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সহকারী শিক্ষক ও অন্যান্যদের নিয়ে চাঁদা সংগ্রহের কাজে হাওড় এলাকা চষে বেড়ান। বৈশাখের খরতাপ উপেক্ষা করে তিনি সদলবলে স্কুল পরিচালনা ব্যয় নির্বাহে ধান ও নগদ অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি স্কুলের আশপাশের জমির মালিকদের স্কুলে জমি দান করতে উৎসাহিত, উদ্বুদ্ধ করেন। তার আহবানে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই স্কুলের নামে জমি দান করেন। স্কুলের ব্যয় নির্বাহে তিনি স্কুলের নামে দানকৃত স্কুল সংলগ্ন জমিতে ধান চাষ করেন এবং পঞ্চাশ মণ ধান উৎপাদন করেন। পরবর্তীতে তাকে খেলার মাঠে পরিণত করেন। স্বেচ্ছাশ্রমে সংগৃহীত চাঁদার টাকায় তিনি একটি শানবাঁধানো ঘাটের পুকুরসহ বিপুল হিন্দু সম্পত্তি ক্রয় করেন। বর্তমানে অসংখ্য দোকানঘর, গরুর হাট, বাঁশমহাল এ জমির অন্তর্ভুক্ত। গোল্লানাথ নামের হিন্দু ভদ্রলোকের কাছ থেকে তিনি এ জমি ক্রয় করেন ন্যায্যমূল্যে। যথাযথ মূল্য পরিশোধে জমি কেনার একবছর পর তিনি অতিরিক্ত আরো পাঁচশো টাকা গোল্লানাথকে প্রদান করেন। শানবাঁধানো এ পুকুরটি গোল্লানাথের পুকুর হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলো। তিনি এ পুকুরটিসহ স্কুলের মালিকানাধীন অন্য আরেকটি পুকুরে মাছচাষ করতেন। বিশালাকৃতির রুই, কাতলা, মৃগেল ধরা পড়তো জেলেদের জালে। হাটে বিক্রি করতেন। কিন্তু একটি মাছও তিনি ঘরে আনতেননা নিজের কিংবা পরিবার পরিজনের জন্যে। প্রায় শতকোটি টাকার সম্পত্তি স্কুলের নামে গড়ে দিয়ে এসেছেন। এক শতাংশ জমিও নিজের নামে লিখে নেননি। সর্বজনাব, মরহুম আব্দুল মান্নান, মরহুম আব্দুল হামিদ মাষ্টার স্যার, মরহুম আব্দুল লতিফ, ডাঃ আব্দুল হামিদসহ উদ্যোক্তাদের সবাই মৃত্যুবরণ করে দেশ স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই। যতোদিন বেঁচে ছিলেন ততোদিন মরহুম আব্দুল মান্নান মিয়ার দিনের অধিকাংশ সময় তাঁর সাথেই কাটতো। অন্যতম উদ্যোক্তা ও জমিদাতা মরহুম আব্দুল হামিদ মাষ্টার স্যার ছিলো তারই অধীনস্থ একজন সহকারী শিক্ষক। উদ্যোক্তা মহল তার নেয়া কোন উদ্যোগ, সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপে বিঘ্ন সৃষ্টি করেননি। বাধা প্রদান করেননি। জ্ঞান, কর্ম, ত্যাগ, সততা, পরোপকারিতা স্কুল নিবেদিতপ্রাণ এ মানুষটিকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসিয়ে দেয়। স্কুল পরিচালনায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে দেয়। সবার প্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করে দেয়। কালের পরিক্রমায় 'হেডমাষ্টার স্যার' নামের আড়ালে প্রকৃত নামটি ঢাকা পড়ে যায়। ওই অঞ্চলে সবাই ওনাকে 'হেডমাষ্টার স্যার' হিসেবে চেনে, জানে, সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে। উদ্যোক্তাদের সবাই ছিলেন উদার হৃদয়ের মানুষ। তাদের মৃত্যুর পর আরো বিশবছরের অধিক সময় তিনি প্রধান শিক্ষকতা করে গেছেন সাফল্যের সাথে। উদ্যোক্তা মহল শিক্ষার যে মহান বীজ বপন করে গিয়েছিলেন তা মহীরুহ রুপ লাভ করে তারই হাত ধরে।
একচালা একটি বড় টিনের ঘরের উপর নিয়ামতপুরে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি শুরুতে ছিলো একটি জুনিয়র হাইস্কুল (৮ম শ্রেণী)। তিনি একে হাইস্কুলে রূপান্তরিত করেন। ছাত্রদের বাড়ী থেকে ধরে এনে বুঝিয়ে শুনিয়ে স্কুলের খরচে এস এস সি পরীক্ষায় অংশগ্রহনের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন। আন্তরিক প্রচেষ্টায় দশজনের একটা ব্যাচ তৈরী করতে সক্ষম হন তিনি। তারা সবাই পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং পাঁচজন উত্তীর্ণ হয়। আর এরাই ছিলো নিয়ামতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এস এস সি প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থী।
তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক। অনেক জ্ঞানী গুণী শিক্ষকের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন তিনি। মূল বিদ্যালয়টি যে জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তার অধিকাংশ ভূমির দাতা ছিলো মরহুম আব্দুল হামিদ মাষ্টার স্যার। খেলার মাঠেরও কিছু অংশের জমির দাতা ছিলেন তিনি। তিনি উদ্যোক্তাদের একজন, দাতা ও অত্র স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি ক্লারিক্যাল কাজগুলোরও দেখভাল করতেন। তিনি অত্যন্ত গুণী শিক্ষক ছিলেন। দাতা, উদ্যোক্তা ও বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাকে হেডমাষ্টার হিসেবে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। পরবর্তীকালে এর প্রতিদানে পূর্বদিককার একতলা পাকা ভবনটি মরহুম আব্দুল হামিদ মাষ্টারের নামে নামকরণ করে তাকে সম্মানিত করেন। যা আব্দুল হামিদ মাষ্টার ভবন নামে পরিচিত। মরহুম শাহনেওয়াজ স্যার গণিতে এবং আব্দুল ওয়াহাব স্যার ইংরেজীতে অত্রাঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। অসমাপ্ত...