28/09/2026
ক্যাডেট সম্পর্কে অনেকে অনেক সস্তা মন্তব্য করেন
তাদের জন্য এই লেখাটা। 👇
অনেক অনেক ধন্যবাদ Khalid Mahmud Sajid
এত সুন্দর করে পুরোটা বিষয় তুলে ধরেছো।
ক্যাডেট কলেজ নিয়ে সস্তায় সমালোচনা করেন?
- বাইরে দাঁড়িয়ে একটা বহুল পরীক্ষিত ও সম্মানজনক শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে আঙুল তোলা খুবই সহজ। কিন্তু সেই ব্যবস্থার পেছনের কঠিন মানসিক শক্তি, ত্যাগ, দিন-রাত ঘাম ঝরানো পরিশ্রম এবং ইস্পাতকঠিন অনুশাসনের গল্প বোঝার মতো পরিপক্কতা বা যোগ্যতা সবার থাকে না।
যারা ক্যাডেট কলেজ, ক্যাডেটদের জীবনধারা কিংবা এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নিয়ে না বুঝে ট্রল করেন, মনগড়া কথা বলেন কিংবা নেতিবাচক বিষ ছড়ান—তাদের উদ্দেশ্যে কিছু অখণ্ডনীয় পরিসংখ্যান এবং খাঁটি সত্য তুলে ধরলাম।
১/ ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষাকে যারা অন্যান্য সাধারণ ভর্তি পরীক্ষার সাথে মিলিয়ে ফেলেন, তারা পরিসংখ্যানের দিক থেকে কতটা অজ্ঞ তা একটু দেখলেই বোঝা যায়। এটিকে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সবচেয়ে কঠিন এবং তীব্রতম প্রতিযোগিতা বলা চলে।
* প্রতি বছর সারাদেশ থেকে ১২টি ক্যাডেট কলেজে (৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের) মাত্র ৬০০টি আসনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত পরীক্ষায় বসে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ শিক্ষার্থী। গাণিতিক হিসাব করলে চান্স পাওয়ার হার দাঁড়ায় মাত্র ১.৫% থেকে ২%!
বুয়েট (BUET) ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার হার প্রায় ৩% - ৪%।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU) ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার হার প্রায় ৪% - ৫%।
মেডিকেল (MBBS) ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার হার প্রায় ২.৫% - ৩%।
Meaning, ১২-১৩ বছরের একটা পিচ্চিকে যে যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়, তার সফলতার শতকরা হার দেশের যেকোনো উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষার চেয়েও কঠিন!
* একটি মাত্র সিটের জন্য লড়াই করে ৫৫ থেকে ৬৫ জন পরীক্ষার্থী। যে শিশুটি সারাদেশের ৯৮.৫% প্রতিভাবান প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে নিজের সততা ও যোগ্যতায় জয়ী হয়েছে, তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজের মেধা আর অর্জনের স্কেলটা একবার মেপে নেওয়া উচিত।
২/ শৈশব বিসর্জনের গল্প (যা সমালোচকরা কখনো বুঝবে না)-
ক্যাডেটদের যারা "সুখী পরিবারের সুবিধাভোগী" বা "বন্দী জীবনযাপনকারী" বলে অপপ্রচার চালান, তারা কি জানেন ১২ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে থাকার যন্ত্রণা ঠিক কতটা ভয়াবহ?
* যখন সমবয়সী অন্য ছেলেমেয়েরা মায়ের হাতের রান্না খেয়ে, বাবার কোল ঘেঁষে, রাতে ড্রয়িংরুমে টিভি দেখে বা শান্তিতে ঘুমায়—ঠিক তখন ১২ বছরের একটি পুঁচকে ক্যাডেট ঘরের মায়া ত্যাগ করে অচেনা এক রুমে রাত জাগে।
* প্রথম প্রথম কতো রাতে বালিশে মুখ গুঁজে নিরবে কেঁদেছে সেই বাচ্চাগুলো, তার হিসাব কি কোনো সমালোচক রাখতে পেরেছে? ডিউটি ক্যাডেটের হুইসেলের শব্দে জেগে উঠে আবার নিজের চোখের জল মুছে তারা মাঠে নেমে পড়ে ড্রিল করার জন্য।
* এখানে অসুস্থ হলে মায়ের হাতের সেবা মেলে না, জ্বর হলে পরম মমতায় মাথায় হাত রাখার কেউ থাকে না—নিজেদের অসুস্থতা নিজেদেরই সামলে নিতে হয়।
* এই যে এত কম বয়সে নিজের কান্না চেপে রেখে একাকী লড়াই করা, নিজের কাপড় নিজে ধোয়া, নিজের জুতা নিজে পালিশ করা এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার ক্ষমতা—এই মানসিক শক্তি বাইরের কোনো নরম পরিবেশে মানুষ হওয়া শিশুর পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
৩/ ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি কতগুলো ছাঁটাই ধাপের মধ্য দিয়ে যায়, তা সমালোচকদের অজ্ঞতার কারণে তাদের মাথায় ধরে না:
[ প্রাথমিক আবেদন ও প্রস্তুতি ]
↓
[ ৩০০ নম্বরের সুকঠিন লিখিত পরীক্ষা (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান) ]
↓ (৮৮% - ৯০% পরীক্ষার্থী বাদ)
[ শারীরিক পরীক্ষা (Medical Board) ]
(উচ্চতা, ওজন, আই-সাইট, নক-নি, ফ্ল্যাট ফুট ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ চেক)
↓ (১৫% - ২০% বাদ)
[ ভাইভা ও সুয়েবিলিটি (Suitability) টেস্ট ]
(উপস্থিত বুদ্ধি, কনফিডেন্স, মানসিক পরিপক্কতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা)
↓
[ ফাইনাল মেরিট লিস্ট ]
(চূড়ান্ত ৬০০-৬৫০ জন বাছাই)
১. লিখিত পরীক্ষা (৩০০ নম্বর): মাত্র ৩ ঘণ্টায় ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়। গণিত ও ইংরেজিতে এমন সব অ্যানালিটিক্যাল প্রশ্ন থাকে যা সাধারণ পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক গভীরে গিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
২. মেডিকেল বোর্ড: শুধু পড়াশোনায় ভালো হলে চলে না। চোখ, পায়ের গড়ন (Knock Knee, Flat Foot), মেরুদণ্ডের সোজা অবস্থা, রক্তচাপ, কালার ব্লাইন্ডনেস—সবকিছু মিলিটারির কঠোর স্ট্যান্ডার্ডে টেস্ট করা হয়। সামান্যতম শারীরিক ত্রুটি থাকলে হাজার নম্বর পেয়েও বাদ পড়তে হয়।
৩. সাইকোলজিক্যাল ভাইভা: অফিসারদের বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে একটি শিশুর মানসিক স্থায়িত্ব, চাপের মধ্যে শান্ত থাকার ক্ষমতা এবং সততা যাচাই করা হয়।
এই তিনটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর টপকে যারা বের হয়, তারা রক্তে-মাংসে গড়েন হলেও মানসিকভাবে এক একজন ইস্পাতের তৈরি যোদ্ধা।
৪/ 'বন্দীত্ব' নয়, এটি আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকার মাস্টারক্লাস-
সমালোচকদের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র হলো—"ক্যাডেট কলেজে নাকি বাচ্চাদের বন্দী করে রাখা হয়, স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়।"
বাস্তবতা হলো, যেটাকে তারা 'স্বাধীনতাহীনতা' বলেন, আধুনিক বিশ্বে সেটাকেই বলে সেলফ-ডিসিপ্লিন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। যেটাকে আপনারা স্বাধীনতা বলেন, সেটা আসলে বর্তমান যুগে মোবাইল অ্যাডিকশন, ফালতু রাত জাগা, সময় নষ্ট করা আর লক্ষ্যহীন জীবনের নামান্তর। আর ক্যাডেট কলেজ যেটা শেখায়, তার নাম ডিসিপ্লিন ও টাইম ম্যানেজমেন্ট। ১২-১৩ বছরের একটি শিশু যেখানে সাধারণ স্কুলে পড়ার সময় মোবাইল গেম, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাডিকশন বা সময় নষ্ট করার চক্করে পড়ে নিজের ভবিষ্যত অনিশ্চিত করে ফেলে, সেখানে একজন ক্যাডেট শেখে সময়ের সঠিক ব্যবহার।
* ক্যাডেট কলেজ কখনোই শুধু ভালো জিপিএ-৫ পাওয়ার কারখানা নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির মূল শক্তি এর All-round Development System। যে শৃঙ্খলার কারণে একজন তরুণ জীবনের যেকোনো প্রতিকূলতায় শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাকে যারা 'বন্দীজীবন' বলে আখ্যা দেয়, তাদের শৃঙ্খলার মূল অর্থ বোঝাতেই বড় অভাব রয়েছে। দেশের সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, চিকিৎসা ক্ষেত্র, প্রকৌশল, কর্পোরেট বিশ্ব থেকে শুরু করে বহির্বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ক্যাডেটদের কৃতিত্বের ইতিহাস নতুন করে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।
* ক্যাডেট জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তাদের বন্ধন। সিনিয়র-জুনিয়রের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একই হাউজে থাকার দরুণ যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তা সারাজীবন একে অপরের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
৫/ দেশ ও জাতির প্রতি অবদান: কোথায় নেই ক্যাডেটরা?
যারা বলেন "ক্যাডেট কলেজ থেকে পড়ে কী হয়?", তাদের চোখের সামনে পরিসংখ্যান ও সফলতার ইতিহাস তুলে ধরা দরকার:
* সশস্ত্র বাহিনী (Army, Navy, Air Force): বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের একটি সিংহভাগ অংশ ক্যাডেটদের মধ্য থেকেই আসে, যারা দেশের সীমান্ত রক্ষায় ও শান্তি রক্ষায় জীবন বাজি রেখে কাজ করেন।
* প্রশাসন ও বিচার বিভাগ: বিসিএস (BCS) ক্যাডার, সরকারি শীর্ষ আমলা, কূটনৈতিক এবং বিচার বিভাগে ক্যাডেটদের দক্ষতা বহুবার প্রমাণিত।
* চিকিৎসা ও প্রকৌশল: দেশের বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ কিংবা শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর ক্যাডেটদের সাফল্যের হার প্রায় শতভাগ।
* বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব: নাসা (NASA), গুগল, মাইক্রোসফট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, কিংবা হার্ভার্ড, এমআইটি (MIT), অক্সফোর্ডের মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশী হিসেবে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অসংখ্য ক্যাডেট মুখ উজ্জ্বল করছেন।
গঠনমূলক সমালোচনা আর হিংসা থেকে আসা বিষোদ্গার—দুটি এক জিনিস নয়। নিজের জীবনে কষ্ট না করে, কোনো রক্ত-ঘাম না ঝরিয়ে, ঘরে বসে বসে অন্যের কঠোর ত্যাগকে সস্তায় ট্রল করা খুবই সহজ কাজ। যেকোনো সুপ্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ভালো-মন্দ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু না জেনে, না বুঝে কিংবা নিজের ব্যর্থতা আর হিংসা থেকে যারা ক্যাডেট কলেজকে বা ক্যাডেটদের ট্রল করেন—তারা মূলত নিজেদের অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন।
কিন্তু সত্য হলো—আজ থেকে ৫০ বছর পরেও ক্যাডেট কলেজের ইতিহাস, তাদের শৃঙ্খলা এবং তাদের তৈরি করা নেতৃত্ব এই দেশের বুকে সশব্দে মাথা উঁচু করে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। আর যারা আজকে না বুঝে কাদা ছিটাচ্ছে, কালকেও তারা ঠিক সেভাবেই পিছিয়ে থাকবে।
ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়া এবং সেখানে ৬টি বছর নিজেকে গড়ে তোলা কোনো ভাগ্যের খেলা নয়। এটি এক দীর্ঘ সাধনা, রাত জাগা পরিশ্রম, পরিবারের মায়া ত্যাগ করা এবং কঠিন অনুশাসনের ফসল। তাই সস্তায় মন্তব্য করার আগে আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখুন, আর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—জীবনের অর্জনের তালিকায় ওই ১২ বছর বয়সী বাচ্চাগুলোর ১০ ভাগের ১ ভাগ ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা আপনার আছে তো?
✍️লেখক : খালিদ মাহমুদ সাজিদ
৪৩ তম ব্যাচ, বরিশাল ক্যাডেট কলেজ।