15/07/2022
সাপ সম্পর্কে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা :
সাপ সম্পর্কে ভুল ধারণার কোন কমতি নেই। এর পিছনে কিছু কারণও রয়েছে। সাপ সম্পর্কে এ দেশের সাধারণ মানুষের যা জ্ঞান, তা এসেছে সাপুড়েদের থেকে। ফলে সাপ সম্পর্কে নানা প্রকার বিভ্রান্তিকর ও অমূলক ধারনা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। নিচে এর কিছু উল্লেখ করা হলো :
🐍সাপের মণি :
সাপের মাথায় এ জাতীয় কোন পাথুরে পদার্থ আদৌ তৈরী হয়না। সাপুড়েরা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে নানা চটকদার কথা বলে। আর মাঝে মাঝে তারা মণি হিসাবে যা দেখায় তা হলো মুক্তা বা অন্য কোন পাথর যা কোনভাবেই মণি নয়।
🐍লেজ দিয়ে আঘাত করলে পা পঁচে যাওয়া :
অনেকেরই ধারণা দাঁরাশ (Coluber mucosus) সাপ লেজ দিয়ে আঘাত করে এবং এই আঘাত যেখানে লাগে সেখানে পচন ধরে ইত্যাদী। কিন্তু এই ধারনা সত্য নয়। সাপের মাথা চেপে ধরলে সাপ লেজ দিয়ে হাত পেঁচিয়ে ধরবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দাঁড়াশ সাপের ক্ষেত্রে কোন বিশেষত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উপরন্তু এটি নির্বিষ ও মানুষের উপকারি বন্ধু। কারণ, এদের প্রধান খাদ্য ইঁদুর। অন্যান্য বিষধর সাপও এদের খাদ্য তালিকায়।
🐍সাপ মানেই বিষধর :
সাপ মানেই বিষধর নয়। পৃথিবীতে প্রায় ২৫০০ থেকে ৩০০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। তার মধ্যে মাত্র ৫০০ প্রজাতির সাপ বিষধর। আমাদের দেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ থাকলেও বিষধর সাপ রয়েছে মাত্র ২০ প্রজাতির। বিষধর সাপ ও নির্বিষ সাপের মধ্যকার পার্থক্য সাধারণ মানুষ কেন, যারা সাপ নিয়ে গবেষণা করেন তাদের পক্ষেও চেনা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে সাপের কামড়ের দুর্ঘটনা যদি কোথাও ঘটেই যায় তাহলে জানা থাকলে যে কেউ বলে দিতে পারে এটি বিষধর সাপের কামড়, নাকি নির্বিষ সাপের কামড়। বিষধর সাপের কামড় হলে দুটি দাঁতের দাগ কিছুটা দূরত্বে থাকবে। অন্যদিকে নির্বিষ সাপের কামড় হলে বেশ কয়েকটি দাঁতের কামড়ের দাগ থাকবে। বিষধর সাপের কামড়ে দুর্ঘটনা ৫০ ভাগেরও কম।
🐍সাপের দুধপান :
অনেকের ধারণা, দুধরাজ (Elaphe radiate) নামক সাপ গরুর পা পেঁচিয়ে বাঁটে মুখ লাগিয়ে দুধপান করে। কেন এই ধারণার উৎপত্তি? উত্তরটা খুবই সহজ। উপমহাদেশের বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু এবং দেবী মনসার বাহন হবার কারণে, সাপকে উচ্চ শ্রেণীর খাদক, এবং সম্মানযোগ্য প্রাণী হিসেবে একটা ধারণা অনেকের মধ্যে প্রচলিত আছে। সাপুড়েরা অতীতে যে কাজটি করতো তা হলো, সাপকে দীর্ঘ সময় জল থেকে দূরে রেখে তাদের তেষ্টা দারুণভাবে জাগাতো। তারপর জনতার সামনে তৃষ্ণার্ত সাপের সামনে দুধের বাটি রাখতো। বেচারা সাপ তেষ্টার চোটে সেই দুধই পান করতো। এভাবে সাপের দুধপানের বিষয়টি জনমনে প্রচলিত হয়ে গেছে।
🐍প্রতিহিংসা :
অনেকের ধারণা, সাপ একবার কারও দ্বারা আক্রান্ত হলে সে আক্রমণকারীকে চিনে রাখে এবং রাতে এসে কামড়ে দিয়ে যায়। এটা সম্পূর্ণরূপে কাল্পনিক ধারণামাত্র।
🐍 জিভ দিয়ে শোনা :
সাপ চলাফেরার প্রয়োজনে বার বার জিহ্বা বের করে তা আসলে শোনার জন্য নয়। সাপের জিহবার অগ্রভাগে “জেকবসন অর্গান” নামে একধরনের গ্রন্থি আছে যা দ্বারা সাপ বায়ুস্থ বিভিন্ন পদার্থের অস্তিত্ব অনুভব করে। এটিকে ঘ্রাণ নেয়াও বলা যেতে পারে।
🐍পিচ্ছিল সাপ :
আমাদের দেশের সকলের ধারনা সাপ পিচ্ছিল। কিন্তু এটি সত্য নয়। সাপ পিচ্ছিলতো নয়ই বরং খসখসে। সাপের গা থেকে কোন প্রকার পিচ্ছিল পদার্থ নিঃসৃত হয়না।
🐍দু’মুখো সাপ :
দু’মুখো সাপ নিয়েও আমাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। ধারণাটি এমন শক্তিশালী যে, বিশ্বাসঘাতকদেরও আমরা ‘দু’মুখো সাপ’ বলি। অথচ আমরা অনেকেই জানি না, দুমুখো সাপ বলতে কিছু নেই। আমরা যে সাপকে দু’মুখো বলি সেই সাপের মাথা একটিই। সমস্যাটা হয় এ জন্য যে, এ ধরনের সাপের মাথা এবং লেজ প্রায় একই রকমের। ফলে কোনটি মাথা আর কোনটি লেজ তা সহজে শনাক্ত করা যায় না। তাছাড়া পিছু হটার সময় এ সাপ পিছন ফেরে না, ব্যাক-গিয়ারে পিছিয়ে যায়। এই পিছিয়ে যাওয়া দেখেই অনেকে ধরে নেন, ওটা দু’মুখো সাপ।
🐍সাপের পা :
আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, সাপের পা দেখলে রাজা হওয়া যায়। কিন্তু সাপের কোন পা নেই। তাই সাপের পা দেখে রাজা হবার কোন সম্ভাবনাও নেই।
🐍সাপ নিজের বিষ নিজে শোষণ করে:
সাপ নিজের বিষ শোষণ করার কোনো প্রশ্নই আসে না। এ ধারণার জন্ম দিয়েছে সাপুড়েরা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে লোকজনের অজ্ঞানতার সুযোগে একচেটিয়া ব্যবসা গড়ে তুলেছে তারা। এদেরকে ওঝা বলা হয়। সাপে কাটা রোগীর জন্য মানুষ তাদের ডেকে আনে এবং এসব ওঝারা এমন ভাব দেখায়, যেন যে সাপে কামড় দিয়েছে সে সাপটিকে এনেই বিষ শোষণ করাবে। এজন্য আসার সময় অনেক দিনের ক্ষুধার্থ সাপ রোগীর বাড়ির কাছাকাছি কোনো ঝোপে ছেড়ে দিয়ে আসে। (সাপ মাসের পর মাস না খেয়ে বাঁচতে পারে, তবে দুর্বল হয়ে পড়ে) এরপর রোগীর বাড়িতে এসে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করে এবং বলে, সাপ বাড়ির কাছে এসে গেছে। এমন ভাব দেখায়, যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং একসময় ঝোপে হাত দিয়ে সাপ বের করে নিয়ে আসে। মানুষ সাপুড়ের এই বাহাদুরিতে মুগ্ধ হয়।
তথ্যসূত্র : 'বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী' - বাংলা একাডেমী, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট