25/11/2025
মাদরাসা পরিচালনার নিয়ম কানুন
১ম পর্ব:
পৃথিবীতে দ্বীন টিকিয়ে রাখার জন্য মাদরাসা জরুরী। কিন্তু মাদরাসা দ্বারা তখনই দ্বীন রক্ষার খেদমত আশা করা যায়, যখন মাদরাসার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে সহীহ উসূল অনুযায়ী চলবে এবং মাদরাসাকেও সহীহ উসূল অনুযায়ী চালাবে। অন্যথায় না দ্বীনের হেফাযত হবে আর না নিজেদের উন্নতি সাধন হবে বরং সময় আর অর্থ নষ্ট ছাড়া কিছুই হবে না। প্রত্যেকটা মাদরাসা যেন দ্বীন রক্ষার একেকটা কেল্লায় পরিণত হতে পারে তাই নিম্নে মাদরাসার কমিটি, ছাত্র, শিক্ষক ও মুহতামিম এর জন্য দিকনির্দেশনামূলক সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করা হলো। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের উক্ত আলোচনার উপর আমল করার তাওফিক দান করুন!
১. আমরা মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি হই আর মুহতামিম হই বা সাধারণ শিক্ষক হই, আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য দু’টি কাজ করতে হবে।
ক. কোন হক্কানী বুযুর্গের সুহবত অবলম্বন করতে হবে এবং তার সাথে ইসলাহী সম্পর্ক কায়েম রাখার মাধ্যমে দিলের দশটা রোগ থেকে মুক্ত হওয়া এবং দশটি গুণ অর্জন করার মেহনত করতে হবে।
খ. নিজের ঈমান ও আমলের তরক্কীর জন্য দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত করতে হবে। কারণ ব্যক্তি যতক্ষণ নিজের উন্নতির ফিকির না করে সে যতই উম্মতের ফিকির করুক তার দ্বারা কোন কাজ হয় না। খুব ভাল করে জানা দরকার,কোন ব্যক্তি নিজের ঈমান আমলের উন্নতির চিন্তা ফিকির না করলে তাকে দিয়ে আল্লাহ ইসলামের কাজ নিবেন না। বস্তুত নিয়ত থাকবে নিজের উন্নতির, এর মধ্য দিয়ে অন্যের উন্নতিও হয়ে যাবে। নিজের ফিকির না করে আগে অন্য লোককে ঠিক করতে গেলে শুরুতেই তার থেকে অহংকার প্রকাশ পায়। আর আল্লাহ তা‘আলা অহংকারী থেকে দ্বীনের খেদমত নেন না।
২. আমাদের মাদ্রাসা জীবিত মাদরাসা না মৃত মাদরাসা? মৃত মাদরাসা বলে ঐ মাদরাসাকে যেখানে শিক্ষকদের সকল মেহনত ছাত্রদের মধ্যে সীমিত; বাইরের জনগণের দ্বীনী উন্নতির জন্য তাদের কোন ফিকির ও মেহনত নেই।
একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয় ছাত্রের নামে এবং তা পরিচালিত হয় টাকার মাধ্যমে। ছাত্র এবং অর্থ এই দুই জিনিসতো আসবে জনগণ থেকে। আর জনগণ এগুলো তখনই দিবে যখন তাদের জন্য আমাদের মেহনত থাকবে এবং তাদের মধ্যে দ্বীন থাকবে। আর এটাই মূলনীতি কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে। তাদেরকে কিছুই দিব না, শুধুই চাইতে থাকবো, তাহলে কিছুই পাওয়া যাবে না। যে মাদরাসা শুধুই ছাত্রদের পিছনে মেহনত করে, বাইরে কোন মেহনত করে না সেটা হল মৃত মাদরাসা। আর যে মাদরাসা ছাত্রদের উপর মেহনত করার সাথে সাথে বাইরের মানুষের ঈমান-আমল ও কুরআন সহীহ করে দেয়া, জরুরী মাসায়িল শিখানো ইত্যাদির মেহনত করে সেই মাদরাসা হলো জিন্দা মাদরাসা। জনগণের দীনি তরক্কীর জন্য মাদরাসা পরিচালক এবং আসাতিযায়ে কেরাম নিম্নোক্ত উপায়ে মেহনত করতে পারেঃ
আম জনতা ও এলাকাবাসীর উপর দুই লাইনে মেহনত করবেঃ
(ক) তাবলীগের লাইনে ।
(খ) দাওয়াতুল হকের লাইনে।
তাবলীগের দ্বারা ঈমান শিখাবে আর দাওয়াতুল হকের দ্বারা যাবতীয় আমলের মেহনত করবে। যেমনঃ নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, বিবাহ-শাদী কাফন-দাফন ইত্যাদি সুন্নাত মোতাবেক করার প্রশিক্ষণ দেয়া। তাবলীগের দ্বারা জনগণের ইমান মজবুত হবে এবং তাদের মাঝে আমলের আগ্রহ পয়দা হবে। আর দাওয়াতুল হকের মাধ্যমে তাদের আমল বিশুদ্ধ ও সুন্নাত তরীকায় হবে এবং তারা সহী সুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে শিখবে।
প্রয়োজনে আশপাশের একেক গ্রামকে একেক শিক্ষকের দায়িত্বে দিয়ে দিবে। তারা ঐ গ্রামের মানুষকে তাবলীগে পাঠাবে। আমলী মশকের মাধ্যমে উযু নামায ও যাবতীয় আমলের সুন্নত তরীকা শিখাবে। নূরানী পদ্ধতিতে ২/৩ মাসে চক স্লেটের মাধ্যমে তাদের কুরআন সহী করে দিবে। এভাবে ২/৩ মাস চলার পর তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে পর্যায়ক্রমে কাজ করবে।এতে কোন গ্রামের কোন লোক মাদরাসার বিরুদ্ধে থাকবে না; বরং প্রতিটি লোক মাদরাসার পক্ষে এসে যাবে। আর এভাবেই মাদরাসা জিন্দা মাদরাসা হবে। নতুবা মাদরাসা মুর্দা থেকে যাবে।
শুধু শিশু ছাত্রদেরকে পড়ালে হবে না; পাকা দাঁড়ীওয়ালাদেরকেও ছাত্র বানাতে হবে, যাদের কবরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। মুহতামীম সাহেব সর্বস্থানে তদারকী করবেন। কোন উস্তাদ কতটুকু কাজ করলেন তার তদারকী করবেন। এবং ঐ সকল গ্রামবাসীর ইন্টারভিউ নিবেন। দায়িত্বশীল উস্তাদগণ স্ব-স্ব এলাকায় গিয়ে আসরের নামায আদায় করবেন এবং মাগরিবের আগ পর্যন্ত উক্ত মেহনত করবেন।
ছাত্রদের উপর দুই লাইনে মেহনত করতে হবে:
(ক) তা‘লীম।
(খ) তরবিয়াত।
তা‘লীম অর্থ কিতাব পড়ানো আর তরবিয়াত হল কিতাবের ছাপানো লেখাগুলো তার শরীরে ছেপে দেয়া অর্থাৎ তাদের আমলী জীবন গঠন করে দেয়া, বাংলাতে যাকে বলে শিক্ষা-দীক্ষা। এর জন্য উস্তাদদের ‘সুহবাত ইয়াফতাহ’ হতে হবে এবং ছাত্রদেরকে হক্কানী শাইখের সুহবতে বসার ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব সামনে আসতেছে.............
লেখকঃ মুফতি মনসুরুল হক হাফিজাহুল্লাহ, কপি