Knowledge Hub BD - জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার

  • Home
  • Bangladesh
  • Khulna
  • Knowledge Hub BD - জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার

Knowledge Hub BD - জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Knowledge Hub BD - জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার, Educational Research Center, Khulna.

জ্ঞানই শক্তি — আর আমরা সেই শক্তির কিছুটা পৌঁছে দেওয়ার সামান্য চেষ্টা করছি আপনার নিকটে।
ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজ, মনোবিজ্ঞান, এবং জীবনের গভীর দৃষ্টিভঙ্গির গল্প — সবই এক জায়গায়।
প্রতিদিন জানুন নতুন কিছু, ভাবুন নতুনভাবে।
🌐 জ্ঞান ছড়াক, আলো ছড়াক!

মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যা আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবের মধ্যে এক তীব্র হাস্যকর সেতুবন্ধন রচনা করে। একসময় আমিও ছিলাম সেই ...
25/12/2025

মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যা আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবের মধ্যে এক তীব্র হাস্যকর সেতুবন্ধন রচনা করে। একসময় আমিও ছিলাম সেই সেতুর কারিগর, যার ক্যানভাসে সেজে উঠেছিল একটি সরল কিন্তু রসময় ভুল বোঝাবুঝির চিত্র।

টিউশনির পাট চুকিয়ে একদিন ছাত্রীকে বললাম, "তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল, কিছু দিন ধরেই বলতে চাচ্ছি। কিন্তু কীভাবে যে বলি!"
এই বাক্যটিই যেন এক বীজ পুঁতে দিল। এরপর থেকে প্রতিদিন পড়ানো শেষে এক গভীর কৌতূহল নিয়ে সে জানতে চাইত, "স্যার, আপনি না আমাকে কী যেন একটা বলতে চেয়েছিলেন? আজকে বলেন!" আর আমি হেসে উত্তর দিতাম, "থাক, আজ থাক। আরেক দিন বলব।"

পঞ্চম দিনে এসে সে জানাল, পরের দিন দুপুরে পড়তে পারবে না, ফিরতে সন্ধ্যা হবে। আমি যেন সন্ধ্যার পরই আসি। পরদিন সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে আমি স্তম্ভিত। বাড়ি শূন্য, কেবল সে একা!

আরও অবাক হয়ে দেখলাম সেই চিরকালের সালোয়ার-কামিজ পরিহিতা মেয়েটি আজ এক ঝলমলে শাড়িতে সেজেছে কড়া সাজ, চোখে গভীর কাজল। এমনিতেই সে সুন্দর, আজ যেন অন্য এক লাবণ্যে ভরা।
জানতে চাইলাম, পরিবারের সবাই কোথায়?

লাজুক হেসে তার স্বীকারোক্তি: "সন্ধ্যার পর সবাই মামাতো বোনের জন্মদিনে গেছে। আমি শরীর খারাপের মিথ্যে অজুহাতে তাদের পাঠিয়ে দিয়েছি। আর দুপুরে আপনাদের বেড়াতে যাওয়ার গল্পটিও ছিল মিথ্যে! সব আপনার জন্যই, স্যার।"

সে হাসিতে যেন ছিল অভিমানের ছোঁয়া। "আপনি অনেক দিন ধরেই কিছু একটা বলতে চাইছেন। আজকে বাসায় কেউ নেই, আজ বলুন। কী বলতে চান?"

যে কথা প্রণয়ের নয়, প্রাত্যহিকের..!

ঘরভর্তি সেই নীরবতা, সেই গভীর দৃষ্টি, আসলে কী বলার জন্য তৈরি হয়েছিল সেই মঞ্চ? আমার ভেতরের শিক্ষক তখনো দ্বিধায় ভুগছে, আর ছাত্রীর চোখে ততক্ষণে জমা হয়েছে গভীর প্রত্যাশা।

আমি আমতা আমতা করে বললাম, "আসলে তোমাকে কথাটা কীভাবে যে বলি! আমার লজ্জা করছে। কিছু মনে করবে না তো?"

সে আরও এগিয়ে এলো, তার গভীর দৃষ্টি আমার চোখের দিকে নিবদ্ধ। যেন সে প্রস্তুত, জীবনের সবচেয়ে বড় প্রণয়-স্বীকার শোনার জন্য।

"প্লীজ স্যার, বলেন। আমি কিছুই মনে করব না। আপনার মনের কথাটা শোনার জন্যই তো আজকে সন্ধ্যার দিকে আসতে বলেছি!"
সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, চোখের এই গভীরতা, শাড়ির এই আভিজাত্য, এই নীরব সন্ধ্যা এ সবকিছুর মূল্যে আমার ভেতরের সত্যটি প্রকাশ করা অনিবার্য।

আমি সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললাম:
"আসলে কথাটা হচ্ছে... মানে কথাটা হচ্ছে, ইদানিং হাতটা খুব টানাটানি যাচ্ছে। তোমাদের এখানে প্রায় তিন মাসের বেতন আটকে আছে।"

সাসপেন্সের এই হঠাৎ পতন, ভালোবাসার বদলে জীবনের রূঢ় বাস্তবতা! সেদিনের সেই শূন্য বুকভরা প্রত্যাশা, এক লহমায় পরিণত হলো বকেয়া বেতনের হিসাবে।

প্রণয়ের ভাষা নয়, সেদিনের কথাটি ছিল
বাজারের ফর্দ, ক্ষুধার ক্রন্দন।

শূন্য পকেটে শিক্ষকতা, জীবন বড় রসময়,
প্রেম নয়, সে তো কেবলই অর্থের টানটান বন্ধন।

#টিউশনিলাইফ #মজারঘটনা #রসবোধ #বাস্তবতা

সাংবাদিক মুন্নী সাহা এখন কই আছেন আমার জানা নেই। তবে তিনি অতি অবশ্যই আমার এই লেখা পড়বেন। এর মাঝে নিশ্চয় আপনারা জেনে গিয়েছ...
08/12/2025

সাংবাদিক মুন্নী সাহা এখন কই আছেন আমার জানা নেই। তবে তিনি অতি অবশ্যই আমার এই লেখা পড়বেন। এর মাঝে নিশ্চয় আপনারা জেনে গিয়েছেন, মুন্নী সাহার ব্যাংক একাউন্টে ১৩৪ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। এর বেশিরভাগ টাকাই তিনি তুলে নিয়েছেন। এখন মনে হয় আছে ১৪/১৫ কোটি টাকা।

২০০৮ সালে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এশিয়ান স্টাডিজে মাস্টার্স শেষ করে এক মুহূর্তও আর দেরি করি নি। সোজা বাংলাদেশে চলে গিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছে- সাংবাদিকতা করবো। কিংবা খবর পাঠ করবো। সে অনুযায়ী আবেদন করতে শুরু করলাম।

এর মাঝে ঢাকার নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হসাবে জয়েন করেছি। কিন্তু আমার তো ইচ্ছে- সংবাদ মাধ্যমে কাজ করার। তাই আবেদন করে যাচ্ছিলাম। এক সময় এনটিভি থেকে ডাক আসলো। দুইটা ইন্টার্ভিউ দেয়ার পর ফাইনাল ইন্টার্ভিউ দিতে গেলাম তখনকার এনটিভির মালিকের রুমে। তিনি আমাকে বললেন

- আপনার যে যোগ্যতা। আপনি কি আদৌ এ কাজ করবেন?

আমি হেসে বললাম

- করবো বলেই তো আবেদন করেছি।

তিনি এবার হেসে বললেন

- আপনি অনেক ভালো জায়গায় পড়াচ্ছেন। বরং সেখানেই থাকুন।

আমি এবার হেসে বললাম

- এর মানে আমার চাকরিটা হচ্ছে না; তাই তো?

- না না। আপনি চমৎকার করে কথা বলেন। আপনি চাইলে জয়েন করতে পারেন। কিন্তু আমার ধারণা আপনি যেখানে আছেন, সেখানে থাকাই ভালো।

এরপর আমাকে অফার দেয়া হয়েছিলো সংবাদ পড়তে। কিন্তু আমার মা যেতে দিলেন না। এত কিছু লেখার কারন হচ্ছে- আজ যখন দেখতে পেলাম মুন্নী সাহার ব্যাংক একাউন্টে ১৩৪ কোটি টাকা! তখন সোজা গিয়ে খানিক গুগল করলাম। যদিও আমি উনাকে চিনি। এরপরও ভালো করে জানার জন্য।

তিনি ইডেন কলেজ থেকে বিএসসি (ডিগ্রী) পাশ করেছেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রিলিমিনারী মাস্টার্স করেছেন। এছাড়া ভোরের কাগজ এবং এটিএন নিউজে সাংবাদিকতা করেছেন। এই হচ্ছে উনার যোগ্যতা। মানে সাংবাদিকতা করতে এসে উনার ভাগ্য খুলে গিয়েছিলো।

ঢাকায় গুলশান লিঙ্ক রোডের পাশে ডুপ্লেক্স বাড়ি আছে। ব্যাংকে শত শত কোটি টাকা! তাহলে বুঝতে পারছেন তো- কারা সাংবাদিকতা করতো? আর আমরা কেমন সংবাদ পেতাম!

আমি শুধু চিন্তা করছিলাম- আমাদের পক্ষে কি এক জীবনে এত টাকা ইনকাম করা সম্ভব? পড়াশুনা পেছনেই প্রায় ৩০ বছর কাটিয়ে দিয়েছি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স করেছি। এরপর সুইডেনে আরেকটা মাস্টার্স। ইংল্যান্ডে পিএইচডি করে এখন এস্তনিয়ায় ছোট একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। ইউরোপে থাকছি ২০ বছর হতে চলেছে।

পৈতৃক সূত্রেই আমি মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারে মানুষ। বাবার ঢাকায় একটা অতি সাধারণ বাড়ি আছে। গ্রামে কিছু সম্পত্তি। এই টাইপ আরকি। সেই আমার পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না পুরনো বাড়িটা ভেঙে একটা নতুন বাড়ি বানানো। মানে জায়গা আছে। কিন্তু বাড়ি বানানোর টাকা নেই। আশপাশের লোকজন এসে প্রায়ই বলে- ভেঙে পড়বে না-তো!

অথচ দেখেন মুন্নী সাহারা শত কোটি টাকার মালিক বনে গিয়েছেন। কারন উনারা দিনে-রাতে বিকিয়েছেন। লিখতে গেলে অনেক কিছু লেখা যায়। কারন আমি উনাকে কিছুটা হলেও চিনি এবং জানি। শুধু এত টুকু বলি- ওই আমলে অনেক মানুষকে বলতে শুনেছি- মুন্নী সাহার মত হতে চাই।

আমি এসব শুনে ভাবতাম- একটা মানুষ, যে কিনা সকাল-বিকাল বিকোচ্ছে। ছেলে-মেয়েগুলো কিনা এর মত হতে চায়! কোন দিন শুনেছেন- কেউ এই আমাদের মত হতে চায়? যে জীর্ণ বাসায় থাকে, রিকশায় কিংবা সিএনজিতে করে এখানে-ওখানে যায়।

মুন্নী সাহাররা এমনি এমনি তৈরি হয় না। এদের তৈরি করা হয়। যাদের দেখে পুরো সমাজ এদের মত হতে চায়। শাসক গোষ্ঠী এভাবেই কিছু চকচকে মানুষ তৈরি করে রাখে। আর পুরো সমাজ ওই চকচকের পেছনেই ছুটে বেড়ায়।

লেখক-আমিনুল ইসলাম

সেদিন পুরো আদালত নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাঠগড়ায় টলতে টলতে যখন ৯১ বছরের হেলেন প্রবেশ করলেন, তখন মনে হলো না তিনি কোনো অপর...
06/12/2025

সেদিন পুরো আদালত নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাঠগড়ায় টলতে টলতে যখন ৯১ বছরের হেলেন প্রবেশ করলেন, তখন মনে হলো না তিনি কোনো অপরাধী। পাঁচ ফুটের সামান্য বেশি উচ্চতা, কাঁপা হাত, বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক দুখিনী মুখ। পরনে হাসপাতালের গাউন আর দুর্বল কব্জিতে হাতকড়া পথভোলা এক অতিশয় বৃদ্ধার চেয়ে তাঁকে অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছিল না।

বিচারক মার্কাস ফাইল উল্টে দেখলেন অভিযোগ: গুরুতর চুরি (Grand Theft)। কিন্তু কিছুতেই যেন হিসেবটা মিলছিল না।

যে প্রেম পঁয়ষট্টি বছরের অভ্যেস, হেলেন আর তাঁর ৮৮ বছরের স্বামী জর্জ, পঁয়ষট্টি বছর ধরে কাটিয়েছেন এক দীর্ঘ, সাধারণ জীবন। সেই জীবনের একমাত্র অগ্রাধিকার ছিল জর্জের হার্টের ওষুধ, দিনে বারোটি বড়ি যা তাঁকে শ্বাস নিতে সাহায্য করত। এই ওষুধ শুধু জর্জের জীবন ছিল না, ছিল হেলেনের অভ্যেস।

কিন্তু এক সপ্তাহ আগে, একটি তুচ্ছ ত্রুটির কারণে তাদের স্বাস্থ্য বীমা বাতিল হয়ে যায়। ফার্মেসিতে গিয়ে হেলেন জানতে পারেন, যে ওষুধ আগে ৫০ ডলারে পাওয়া যেত, এখন তার দাম ৯৪০ ডলার!

তিনি খালি হাতে বাড়ি ফেরেন। তিন দিন ধরে দেখেন, জর্জের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন মৃত্যুর হিমেল স্পর্শ। তিনি বুঝতে পারছিলেন কী ঘটছে। কোনো অবস্থাতেই তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারলেন না।

যখন মমতা হলো মরিয়া

মরিয়া হয়ে তিনি আবার ফার্মেসিতে ফিরলেন। অপেক্ষা করলেন, যতক্ষণ না ফার্মাসিস্ট পেছন ফেরেন... কাঁপা হাতে তিনি ব্যাগে ওষুধ ভর্তি করলেন। দরজায় পৌঁছানোর আগেই স্বয়ংক্রিয় সাইরেন বেজে উঠলো মুহূর্তেই হাতকড়া পড়ল তাঁর দুর্বল কব্জিতে।

আদালতে তাঁর ভাঙা গলায় ফিসফিস করে সেই স্বীকারোক্তি যেন এক মর্মস্পর্শী পদ্যের মতো শোনাল:

"আমি চুরি করতে চাইনি, মাননীয় বিচারক।
আমি শুধু তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।
অর্থ ছিল না, ছিল শুধু মরিয়া এক স্ত্রী।
আমার প্রেমই সেদিন চুরি করেছিল, মাননীয়।"

বিচারক মার্কাস তাঁর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর ভরাট কণ্ঠের প্রথম নির্দেশ: "ওনার শিকল খুলে দাও, এখনই!"

তিনি বাদি পক্ষের উকিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “গুরুতর চুরি? এই জন্য?” হেলেন কেঁদে ফেললেন।

বিচারক দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমন কথা বললেন যা ইতিহাস হয়ে রইলো। তিনি বলেন:

"এই নারী অপরাধী নন। তিনি আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থারই এক শিকার।"

তিনি হেলেনকে খালাস দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবা বিভাগকে ডেকে নির্দেশ দিলেন যেন জর্জ সেদিনই পূর্ণ চিকিৎসা পান।

পরে এক সাংবাদিক যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, বিচারক শান্তভাবে উত্তর দিলেন: “কখনও কখনও ন্যায়বিচার মানে হলো বুঝতে পারা, কখন সমাজব্যবস্থা নিজেই অন্যায়ে পরিণত হয়েছে। এই নারী চোর নন। তিনি এক স্ত্রী, যিনি ভালোবাসাকে বেছে নিয়েছেন।”

যেখানে আইন রুদ্ধ, সেখানে প্রেমই বিচারক। যে চুরি জীবন বাঁচায়, সে চুরি পাপ নয়...পবিত্র।

#ন্যায়বিচার #হেলেনজর্জেরগল্প #ভালোবাসা #মানবতা

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

#বৃহৎ_দাস

সৈয়দ মুজতবা আলী: (শব্দ, জ্ঞান ও জীবনের ফেরিওয়ালা)তিনি ছিলেন এক বিরল জ্যোতিষ্ক, যাঁর লেখনীতে জ্ঞান আর রসবোধ মিলেমিশে এক...
06/12/2025

সৈয়দ মুজতবা আলী: (শব্দ, জ্ঞান ও জীবনের ফেরিওয়ালা)

তিনি ছিলেন এক বিরল জ্যোতিষ্ক, যাঁর লেখনীতে জ্ঞান আর রসবোধ মিলেমিশে একাকার। সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর সাহিত্য পাঠ করলে অনুধাবন করা যায় জীবনের প্রতি তাঁর গভীরতম ভালোবাসা আর লেখনীর অতুলনীয় গভীরতা। বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো ক্ষণজন্মা মানুষ সত্যিই বিরল।

জ্ঞান-তৃষ্ণায় তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর জার্মানি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ডক্টরেট করতেন, সেই সময়ে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন সেখানকার অধ্যাপক। মুজতবা আলী ছিলেন এক আদ্যন্ত কসমোপলিটন মানুষ।

ভাবা যায়! সেই শহরে একবার স্থানীয় জার্মান ভাষায় কৌতুক প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। আর সেই কঠিন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন এক বাঙালি যুবক! ভাষার ওপর কতটা দখল থাকলে, ভিন্ন সংস্কৃতির রসবোধকেও এভাবে জয় করা যায়, মুজতবা আলী ছিলেন তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।

জ্ঞানের এই মহাসাধকের ঝুলিতে ছিল সতেরোটি ভাষা, সতেরোটি ভাষাতেই তিনি লিখতে পারতেন, অনর্গল কথা বলতে পারতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য।

এক রাষ্ট্রদূত তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন: “আমি জীবনে এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর এত বিষয়ে আলাপ শুনি নাই, যেটা উনি আমাকে শুনিয়েছিলেন অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে।”

তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল সম্পূর্ণ ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ এবং বিশ্বকবির ‘গীতবিতান’ শুরু থেকে শেষ, আবার শেষ থেকে শুরু! একবার এক অনুষ্ঠানে এক পুরোহিত যখন সংস্কৃত ভাষায় গীতা নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন, মুজতবা আলী দাঁড়িয়ে নির্ভুল মূল সংস্কৃত ভাষায় সম্পূর্ণ বক্তব্য বলে দিয়ে উপস্থিত দর্শকদের হতবাক করে দেন। তিনি ভুল ধরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেন, শব্দের চেয়ে পবিত্র আর কিছু নেই, আর সত্যের চেয়ে আপন আর কিছু নয়।

বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর দখল এতই গভীর ছিল যে, প্রখ্যাত পণ্ডিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ রচনার পর বলেছিলেন, “আমার অভিধান যদি কোনো সময় সংশোধন করার প্রয়োজন হয়, তাহলে যেন সৈয়দ মুজতবা আলী সেটা করে।”

আদ্যন্ত ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর আদর্শ ছিল জাত-ধর্ম নয়, মনুষ্যত্বের শিক্ষা। সেই উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে কটাক্ষের শিকারও হতে হয়েছিল। অনেকেই তাঁকে ‘আইওয়াশ’ বা ‘পাকিস্তানি এজেন্ট’ বলে সন্দেহ করত। আক্ষেপ করে তিনি লেখক শংকরকে বলেছিলেন, "এক একটা লোক থাকে যে সব জায়গায় ছন্দপতন ঘটায়, আমি বোধহয় সেই রকম লোক।"

কিন্তু রসবোধ তাঁকে কখনো ছাড়েনি। মৃত্যুর আগে অবধিও তা বজায় ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি বলেছিলেন: "আমার মৃত্যুর পর সবাইকে বলবে, আলী সাহেব তার বেস্ট বইটা লেখার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু কী করবেন, উনার তো প্যারালাইসিস হয়ে ডান হাতটা অবশ হয়ে গেল। হাতটা ভালো থাকলে তিনি দেখিয়ে দিতেন সৈয়দ মুজতবা আলীর বেস্ট বই কাকে বলে।"

মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও যিনি এমন রসবোধের পরিচয় দেন, তিনি আসলে জীবনকে আমৃত্যু ভালোবেসে গেছেন।

কিংবদন্তি সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রতি রইল আমাদের অবিরাম শ্রদ্ধা। তিনি শব্দ, জ্ঞান ও জীবনের এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা।

ছবি :- ইন্টারনেট থেকে ।।

#সৈয়দমুজতবাআলী #বাংলাসাহিত্য #মুজতবাআলী #শব্দেরজাদুকর
#বৃহৎ_দাস

দোলনাটা নাবিলার জন্য কিনেছিলাম ৪ বছর আগে৷ দোকানি বলেছিলো যদি কখনও ফেরত দেন অর্ধেক দামে আমাদেরকে দিতে পারবেন।আজকে রাজশাহী...
05/12/2025

দোলনাটা নাবিলার জন্য কিনেছিলাম ৪ বছর আগে৷ দোকানি বলেছিলো যদি কখনও ফেরত দেন অর্ধেক দামে আমাদেরকে দিতে পারবেন।

আজকে রাজশাহী ছেড়ে দিলাম। নাবিলার মা এটা ফেরত দিতে বললো কারণ নাবিলা বড় হয়ে গেছে।

রিক্সা নিয়ে যাচ্ছিলাম। রিক্সাওয়ালা মামা বললেন বেতের এত সুন্দর জিনিস বিক্রি করবেন কেনো?

আমি বললাম বাচ্চা বড় হয়ে গেছে।

এটার আর দরকার নেই।

মামা বললেন কত টাকা পাইবেন বিক্রি করে। আমি বললাম যেখান থেকে কিনেছিলাম সেখানেই ব্যাক দিবো।

ওরা ১২৫০ টাকা দিবে। উনি বললেন মামা একটু দাড়ান বাড়িতে একটু কল করবো বউয়ের কাছে।

কল করে বলছে মনির জন্য একটা দোলনা কিনবো নাকি? ১২৫০ টাকা লাগবে, দোলনাটা খুবই সুন্দর।

ওপাস থেকে বলছে এত টাকাতো নেই। মামা ফোন কেটে এসে বলছেন আমার ১ মাসের একটা বাচ্চা আছে।

ওর জন্য নিতে চাইছিলাম কিন্তু এত টাকা নেই৷ আমি বললাম আমি আপনাকে দোলনাটা এমনিতেই দিবো, নিবেন?

এটা আপনার বাবুর জন্য উপহার দিলাম।

উনি বললেন আমি নিবো, আমার বাবু অনেক মজা করবে বলেই একটা সুন্দর হাসি দিলেন।

একজন বাবা তার সন্তানের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সন্তানকে ভালো রাখার চেষ্টা করেন।

একজন বাবা তার সন্তানের কাছে হিরো৷ সন্তানের প্রথম ভালোবাসা তার বাবা।

উনার মনের অনুভূতি আমি বুঝতাম না যদি নাবিলার জন্ম না হতো৷

©রিয়াদ হোসাইন।

কথাটা হয়তো অনেকের কাছেই অপ্রিয়, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি বিশেষত পুরুষের চোখ নারীর দিকে তাকালে প্রথম কী খোঁজে? রূপ, আকৃতি আর ...
05/12/2025

কথাটা হয়তো অনেকের কাছেই অপ্রিয়, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি বিশেষত পুরুষের চোখ নারীর দিকে তাকালে প্রথম কী খোঁজে? রূপ, আকৃতি আর এক আদিম কামনা। আমরা দেখি শুধু দেহাংশ; অর্থ, ইতিহাস কিংবা নিঃশব্দ ত্যাগ তখন গৌণ হয়ে যায়।

সত্যি বলতে, আমিও একসময় তেমনই ছিলাম। পথের ধারে কোনো নারীকে দেখলে দৃষ্টি নিজের অজান্তেই তার বক্ষদেশের দিকে চলে যেত। মনে হতো, ‘এই তো সৌন্দর্য!’ তখন বুঝতাম না, এই সৌন্দর্যের আড়ালে কতটা কষ্ট, কতটা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া লুকিয়ে আছে।

তারপর একদিন, জীবনের এক দৃশ্য চোখের সামনে এল যা আমার ভেতরের 'পুরুষ'টাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে মানুষ হয়ে দেখতে শেখাল।

শূন্য বুকের সজল দান, তালপাতা ছাওয়া এক ছোট্ট দাওয়ায় বসে আছেন এক মা। চোখে ঘুম নেই, দেহ কঙ্কালসার। কোলের শিশুটি কাঁদছে না, বরং নীরবে লেগে আছে মায়ের বুকে। সে জানে না, এই উৎসে এখন দুধ নেই।

তার ছোট্ট ঠোঁট শুধু টেনে টেনে চুষে যাচ্ছে মায়ের শূন্য স্তন। শব্দ হচ্ছে, চোঁক চোঁক... চোঁক চোঁক...
সে এক নীরব, অসহায় সুর।

যেন সে এখনো বিশ্বাস করতে চাইছে: ‘মা আমাকে দেবেই, কিছু না কিছু দেবেই।’

কিন্তু বুক তো খালি!
দুধ নেই, খাবার নেই, শক্তি নেই।
আছে শুধু এক মায়ের মরিয়া ভালোবাসা।

মা কথা বলেন না, শুধু তাকিয়ে থাকেন সন্তানের মুখের দিকে। তাঁর চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো অভিযোগও নেই, শুধু একরাশ হাহাকার জমে আছে।

আর সে দুধের বদলে,
মায়ের চোখ থেকে টপ টপ করে ঝরছে অশ্রু।
সেই উষ্ণ নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে বুক বেয়ে, পৌঁছে যাচ্ছে শিশুর ঠোঁটে।

শিশুটি কি সত্যিই দুধ খাচ্ছে?
নাকি সে মায়ের চোখের জলকেই দুধ ভেবে গিলে নিচ্ছে?
বুঝতে পারছে না, যা সে খাচ্ছে, তা আসলে ক্ষুধা নয়, মায়ের কষ্ট। ভালোবাসা যখন চরম নিঃস্বতার মুখোমুখি হয়, অশ্রু তখন হয়ে ওঠে দানের ভাষা।

প্রথম শান্তি, প্রথম প্রার্থনা, সেই দৃশ্যটা আমার ভেতরে ঝড় তুলেছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, নারীর স্তন কোনো কামনার বিষয় নয়। ওটা এক অদৃশ্য ইতিহাসের পৃষ্ঠা যেখানে লেখা আছে জন্মের গল্প, ক্ষুধার কান্না, মায়ের ত্যাগ।

একজন নারী যখন সন্তানের মুখে দুধ দেন, তখন সেটা শুধু পুষ্টি নয় ওটা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র দান। আর যখন তাঁর বুক শুকিয়ে যায়, তখনও তাঁর ভালোবাসা শুকোয় না।

আজ আমি যখন রাস্তায় কোনো নারীকে দেখি, চোখে আগে যেটা কামনা দেখত, এখন সেটা দেখে না। এখন মনে হয়:

তার বুক যেন পূর্ণ থাকে,
যেন কোনো শিশুর প্রথম স্বাদ
অশ্রুর নোনতা না হয়,
হোক সেটা দুধের মিষ্টি।

একজন বাবা হওয়ার পর, আমি ওই দৃশ্যটার মানে আরও গভীরভাবে বুঝেছি। নারীর বুক কোনো দেহাংশ নয়,

ওটা এক শিশুর প্রথম পৃথিবী,
প্রথম শান্তি, প্রথম প্রার্থনা।

তাই আজ আমি প্রতিটি পুরুষকে বলি তুমি নারীকে দেখো, দেখতেই পারো, কিন্তু দেখার ভঙ্গিটা বদলে দাও। তার ভেতরে এক মহাসাগর আছে যেখানে ভালোবাসা ঢেউ হয়ে ওঠে, ত্যাগ নীরবে বয়ে যায়, আর অশ্রু গলে দুধ হয়ে যায়।

নারীর শরীরকে শুধু কামনার নয়, জীবনের উৎস হিসেবে দেখো। কারণ, যে বুক শূন্য হয়েও সন্তানের মুখে চোখের জল দেয়, সেই বুকই পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান।

#মা #মাতৃত্ব #ত্যাগ #সম্মান #দৃষ্টিভঙ্গি

#সংগ্রহীত।

#বৃহৎ_দাস

হুমায়ুন ফরীদি: যে ঋণের নাম ভালোবাসা,,তিনি শুধু অভিনেতা ছিলেন না; ছিলেন জীবনের কবি, শব্দের জাদুকর। মঞ্চের আলো নিভে গেলেও ...
05/12/2025

হুমায়ুন ফরীদি: যে ঋণের নাম ভালোবাসা,,

তিনি শুধু অভিনেতা ছিলেন না; ছিলেন জীবনের কবি, শব্দের জাদুকর। মঞ্চের আলো নিভে গেলেও তাঁর উপস্থিতি ছিল এক জীবন্ত শিল্প। হুমায়ুন আহমেদ তাঁর লেখায় বলেছিলেন, ক্যাম্পাসে তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষের ভিড় দেখে মনে হতো, এ যেন 'শব্দের জাদুকর'! তাঁর ঝাঁকড়া চুল আর কথা বলার সহজাত ‘আর্ট’ দশজন মানুষ থেকে তাঁকে সহজেই আলাদা করে দিত।

ফরীদি, এক অপার বিস্ময়ের নাম।

যে ঋণ শোধ করা বারণ,,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসের কথা। আলবেরুনীর ক্যান্টিন কিংবা হলের দোকানগুলো আজও তাঁকে মনে রেখে গর্ব করে। কারণ, সেখানে তিনি টাকা নয়, রেখেছিলেন ভালোবাসার এক অনন্ত বন্ধন।

কথিত আছে, একবার এক অনুষ্ঠানে সুমন নামে একজন ঠাট্টাচ্ছলে তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন "ফরীদি ভাই, আলবেরুনীর ক্যান্টিনে ৩১৯ টাকা বাকি রেখেছেন, শোধ করে যাবেন!"

জবাবে তাঁর উত্তরটি ছিল এক অসাধারণ,
“আমি এইটা শোধ করব না। কেন? আমি এই ক্যান্টিন, হল, ক্যাম্পাস, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষগুলোর কাছে আজীবন ঋণী থাকতে চাই।”

কী আশ্চর্য! তিনি অর্থ দিয়ে নয়, ভালোবাসার এক চিরন্তন ঋণ দিয়ে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলেন নিজেকে। সেই ঋণের ভার আজও জাহাঙ্গীরনগরের ধূলিকণায় অক্ষত।

বৃষ্টির রাতে প্রতিশ্রুতির ফেরিওয়ালা,,
হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন কথার খেলাপ না করার মানুষ। তাঁর কাছে সামান্য প্রতিশ্রুতিও ছিল জীবন বাজি রাখার মতো পবিত্র।

এক ঘোর বর্ষার রাত। নাটকের কাজ শেষে হুতাপাড়া থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। নিজেই চালাচ্ছিলেন গাড়ি। সারাপথ ঝুম বৃষ্টি। বহুদূর চলে আসার পর হঠাৎ মনে পড়ল, প্রোডাকশন বয় ইসমাইলকে সামান্য কিছু টিপস দেওয়ার কথা ছিল। ছেলেটা টাকার আশায় বসে থাকবে!

সেদিনের সেই ঝুম বৃষ্টির রাতে, কোনো দ্বিধা না করে, ফরীদি গাড়ি ব্যাক করিয়ে আবার ফিরে এলেন হুতাপাড়া। ইসমাইলকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও টিপসটুকু দিয়ে তারপর আবার গাড়ি চালিয়ে ফিরলেন ঢাকা। সামান্য একজন মানুষের প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতা এটাই তো ফরীদি।

তিনি ছিলেন একাধারে শিল্পী, কবি, অভিনেতা, নাট্যশিল্পী, আবৃত্তিকার এবং আমাদের মুক্তিসংগ্রামের একজন সাহসী যোদ্ধা। তাঁর অভিনয় আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু তাঁর মানবতা, তাঁর প্রতিশ্রুতি ও তাঁর বিনয় এসবই তাঁকে করেছে আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয়।

কিছু ঋণ শোধ করা যায় না। যেমন শোধ হয়নি জাহাঙ্গীরনগরের সেই ৩১৯ টাকা। সেই ভালোবাসার ঋণের ভারেই তিনি আজও আমাদের মাঝে অমর।

#হুমায়ুনফরীদি #কিংবদন্তি

#বৃহৎ_দাস

একদিন জালালউদ্দিন রুমি একটি বনের পথ ধরে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি বিশাল, কৃষ্ণবর্ণ তিতির পাখি ধরে ফেললেন। রুমি মনে মনে ভ...
30/11/2025

একদিন জালালউদ্দিন রুমি একটি বনের পথ ধরে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি বিশাল, কৃষ্ণবর্ণ তিতির পাখি ধরে ফেললেন। রুমি মনে মনে ভাবছিলেন, আজকের আহার হিসেবে পাখিটিকে ঝলসানো হবে, নাকি সুস্বাদু তরকারি রান্না করা হবে!

ঠিক সেই মুহূর্তে পাখিটি মানবীয় কণ্ঠে বলে উঠল - ‘হে রুমি! আপনি এই জীবনে এত গোশত আহার করেছেন, তবুও আপনার আমিষের আকুতি কেন শেষ হয় না? আপনি যদি আমাকে মুক্ত করে দেন, তবে আমি আপনাকে তিনটি অমূল্য উপদেশ দেব, যা আপনার জীবনকে শান্তি ও সন্তোষে ভরে দেবে।’

রুমি কিছুটা বিচলিত হলেন, কিন্তু প্রজ্ঞার লোভে রাজি হলেন। তিনি বললেন, ‘বেশ, তবে আমার হাতের মুঠোর মধ্যেই প্রথম উপদেশটি দাও। যদি পছন্দ না হয়, তবে এই মুহূর্তেই তোমাকে হত্যা করব।’

পাখিটি সম্মতি জানিয়ে বলল:

প্রথম উপদেশ: "আপনি সবসময় আপনার বন্ধুদের উদ্ভট বা অর্থহীন আলোচনায় খুব বিচলিত হয়ে পড়েন। এর চেয়ে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিন। তাতে আপনার জীবন আরও শ্রেয়তর হবে, এবং আপনি শান্তিতে থাকবেন।"

রুমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে দেখলেন, পাখিটির কথায় গভীর প্রজ্ঞা আছে। তিনি দ্বিতীয় উপদেশের জন্য অনুরোধ করলেন।

পাখি এবার বলল, ‘আমাকে মুক্ত করে দিলে আমি ওই কাছের গাছের ডালে বসে দ্বিতীয় উপদেশটি দেব।’

রুমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পাখিটিকে মুক্ত করে দিলেন। পাখিটি উড়ে গিয়ে কাছেই একটি গাছের ডালে বসল।

দ্বিতীয় উপদেশ দেওয়ার আগে পাখিটি বলল, ‘রুমি! তুমি এক বিরাট বোকামি করেছ! আমার পেটের ভেতরে তিন কেজি ওজনের মহামূল্যবান হীরা ছিল। তুমি এটা পেলে তোমার সাত পুরুষ বসে খেতে পারতো!’

এই কথা শুনে রুমি সাংঘাতিকভাবে ঘাবড়ে গেলেন। তিনি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পাখিটিকে আবার ধরার জন্য তার দিকে ছুটতে শুরু করলেন।

তখন পাখিটি জোরে জোরে হেসে উঠল এবং চিৎকার করে বলল:

‘রুমি, তুমি তো দেখছি আমার প্রথম উপদেশটি একেবারেই শোননি! আমার নিজের ওজন যেখানে মাত্র দুই কেজির বেশি নয়, সেখানে আমার পেটে তিন কেজি হীরা থাকবে কী করে? তুমি এখনো উদ্ভট আর বোধহীন কথায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছো!

দ্বিতীয় উপদেশ: "অতীতকে কখনো পাল্টানো যায় না, আর আমি এখন তোমার অতীত। তুমি যা হারিয়েছো, তার জন্য আফসোস না করে বর্তমান মুহূর্তটিকে উপভোগ করো এবং ভবিষ্যতের জন্য বাঁচো।"

পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে রুমি তখন লজ্জিত কণ্ঠে তৃতীয় উপদেশের জন্য অনুরোধ করলেন।

তিতির পাখিটি শেষ উপদেশটি দিল:

তৃতীয় উপদেশ: "সবাইকে উপদেশ দিতে যেও না। শুধু তাদের উপদেশ দাও, যারা তা শুনবে এবং মনে রাখবে। মনে রেখো, কিছু কাপড় এত জীর্ণ হয়ে যায় যে, তা আর কখনো সেলাই করা যায় না - অর্থাৎ কিছু মানুষ উপদেশ পাওয়ার যোগ্যই নয়।"

#বৃহৎ_দাস

গ্রামের নাম নয়াগঞ্জ। সেখানে ছিল একটি জীর্ণ স্কুলঘর আর তার একমাত্র শিক্ষক, সুশান্তবাবু। সুশান্তবাবুর নিজের সংসার ছিল না,...
30/11/2025

গ্রামের নাম নয়াগঞ্জ। সেখানে ছিল একটি জীর্ণ স্কুলঘর আর তার একমাত্র শিক্ষক, সুশান্তবাবু। সুশান্তবাবুর নিজের সংসার ছিল না, কিন্তু স্কুলের প্রতিটি ছাত্রই ছিল তাঁর সন্তানের মতো। তাঁর মাইনে কম, দিন চলে কষ্টেসৃষ্টে। তাঁর একমাত্র শখের বস্তু ছিল হাতে লেখা কিছু কবিতার খাতা এবং একটি পুরনো শাল, যা তাঁর মায়ের স্মৃতি।

অরুণ, নয়াগঞ্জের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। সে সদ্যই দশম শ্রেণিতে উঠেছে। তার স্বপ্ন - ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু স্কুলের ফি এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভর্তি পরীক্ষার জন্য জরুরি একটি দামি পাঠ্যবই কেনার সামর্থ্য তার বাবার ছিল না। একদিন অরুণ কেঁদে সুশান্তবাবুর কাছে এসে বলল, "স্যার, আর পড়া হবে না। বইটি না কিনলে স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।"

অরুণকে কাঁদতে দেখে সুশান্তবাবুর বুক ফেটে গেল। তিনি জানতেন, ছেলেটির প্রতিভা অসাধারণ। পরের দিন ভোরে সুশান্তবাবু তাঁর মায়ের স্মৃতি-জড়ানো শালটি আর কবিতার খাতাগুলো নিয়ে পাশের শহরে গেলেন। সেগুলির বিনিময়ে তিনি সেই দুর্লভ বইটি কিনলেন।

বইটি হাতে তুলে দিয়ে সুশান্তবাবু বললেন, "অরুণ, এই বইটি একজন সহৃদয় ব্যক্তি তোমাকে উপহার দিয়েছেন। তোমার দায়িত্ব হলো এই উপহারের সম্মান রাখা।" শিক্ষক তখন তাঁর নিজের ত্যাগের কথাটি গোপন রাখলেন। অরুণ প্রণাম করে বইটি হাতে নিয়ে নতুন করে পথ চলা শুরু করল।

সময় গড়িয়ে গেল। অরুণ সেই বইয়ের জোরেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভালো ফল করল এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দিল। সুশান্তবাবু রয়ে গেলেন সেই নয়াগঞ্জের পুরনো স্কুলঘরে। তাঁর ছাত্রের সাফল্যের খবর তাঁকে উষ্ণতা দিত, যদিও তাঁর নিজের জীবন ছিল নিঃসঙ্গ ও দৈন্যে ভরা।

তিরিশ বছর পর। এখন অরুণ সেনগুপ্ত দেশের একজন বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার। তিনি নয়াগঞ্জের কাছেই একটি বিশাল সেতুর নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান হয়ে ফিরে এসেছেন। কাজের ফাঁকে একদিন তিনি তাঁর পুরনো স্কুলটি দেখতে গেলেন। স্কুলঘরের অবস্থা আরও করুণ হয়েছে, আর সুশান্তবাবুকে দেখলে চেনাই যায় না - ক্লান্ত, জীর্ণ এক বৃদ্ধ।

অরুণবাবু স্কুলের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে সুশান্তবাবু বললেন, "আমার একটা স্বপ্ন ছিল, স্যার। অরুণ বলে একটি ছেলে ছিল, সে আজ দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। ও যদি একবার আসত..."

হঠাৎ অরুণবাবু থমকে গেলেন। তিনি পুরোনো বইটির কথা, তার মলাটের নকশা আর লেখকের নাম মনে করার চেষ্টা করছিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "স্যার, আপনি কি সেই বইটা কিনে দিতে আপনার কিছু বিক্রি করেছিলেন?"

সুশান্তবাবু প্রথমে ইতস্তত করলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, "ওহ! আপনি কি সেই শুভাকাঙ্ক্ষী? অরুণকে বলেছিলাম, আপনার কথা গোপন রাখতে।"

অরুণ সেনগুপ্তের চোখে জল এসে গেল। তিনি মাথা নিচু করে সুশান্তবাবুর পা ছুঁয়ে বললেন, "আমিই সেই অরুণ, স্যার। যে বইটা আপনি আমার জন্য আপনার সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আমার আজকের সাফল্যের ভিত্তি আপনার সেই একটি দিনের আত্মত্যাগ।"

কথাগুলো শুনে সুশান্তবাবু স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

এর পর আর কোনো দ্বিধা নয়। অরুণ সেনগুপ্ত প্রথমেই সরকারি তহবিল থেকে নয়, নিজের অর্থে, সুশান্তবাবুর নামে একটি নতুন, আধুনিক স্কুল তৈরি করলেন। সেই নতুন স্কুলের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অরুণবাবু শুধু বললেন, "আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং হলো সেই সেতু, যা সুশান্তবাবু তাঁর মানবিকতা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন।"

আসলে, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যায় না। আপনার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা অন্য কারও জীবনের আলোকবর্তিকা হতে পারে।

#বৃহৎ_দাস

রমেশ কাকা..!সেদিন সন্ধ্যায় আর্কিটেক্টদের কনফারেন্স থেকে ফিরছিলাম। স্যুট-টাই পরা, হাতে লেটেস্ট মডেলের ফোন, কাঁধে ডিজাইন-...
30/11/2025

রমেশ কাকা..!

সেদিন সন্ধ্যায় আর্কিটেক্টদের কনফারেন্স থেকে ফিরছিলাম। স্যুট-টাই পরা, হাতে লেটেস্ট মডেলের ফোন, কাঁধে ডিজাইন-রোল। শহরের সফল মানুষদের ভিড়ে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টের নিচে এসে থমকে গেলাম। গ্যারেজের এক কোণে একটি পুরোনো সাইকেল হেলান দেওয়া, তার পাশে একজন শীর্ণকায় মানুষ হাঁটু মুড়ে বসে আছেন।

আমার ড্রাইভার বলল, "স্যার, ইনি আপনার জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। গ্রামের লোক মনে হচ্ছে।"

লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। গায়ের রং রোদে পোড়া তামাটে, পরনে বহু পুরোনো একটি ধুতি আর অপরিষ্কার পাঞ্জাবি। চোখ দুটো কেমন অচেনা, বিষণ্ণ। তবে তাঁর হাঁটার ভঙ্গিটা কেমন পরিচিত ঠেকলো।

"কে আপনি?" আমি জিজ্ঞেস করি, কিন্তু কণ্ঠস্বরটা ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলো।

লোকটি ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন, তারপর ক্ষীণ গলায় বললেন, "ও রঞ্জন! তুই আমাকে চিনতে পারিসনি? আমি রমেশ, তোর কাকা।"

রমেশ কাকা! নামটা শুনে আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের ব্যবধান! শৈশবের এক শক্তিশালী নির্ভরতা, যা সময়ের স্রোতে পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।

আমার শৈশবের একটা বিরাট অংশ জুড়ে ছিল আমাদের পুরোনো পুকুর পাড়ের বাগানবাড়ি। আমার বাবা ছিলেন অসম্ভব কঠোর আর নিয়মানুবর্তী। বাবার চোখ এড়িয়ে আমার একমাত্র বন্ধু ছিল এই রমেশ কাকা।

বাবা চাইতেন আমি অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়ি, আর রমেশ কাকা আমাকে শেখাতেন মাটির গন্ধ, শিউলি ফুলের জন্মরহস্য, আর গাছের ডালে বসে থাকা পাখির নাম। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরলে মা যখন বাবার ভয়ে আমাকে পড়তে বসাতে চাইতেন, আমি চুপিচুপি রমেশ কাকার কাছে ছুটে যেতাম।

কাকার একটা নিজস্ব গন্ধ ছিল-মাটি, তামাক আর ভেজা পাতার গন্ধ। তিনি কখনও বকা দিতেন না। তাঁর হাতের তালু ছিল শক্ত, খসখসে, কিন্তু যখন তিনি আমাকে কোলে তুলে নিতেন, তখন মনে হতো পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়।

একদিন মনে আছে, আমি স্কুলের একটা অঙ্ক খাতার মধ্যে লুকিয়ে একটা চারাগাছ এঁকেছিলাম। বাবা সেটা দেখে প্রচণ্ড রেগে খাতাটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। আমি কেঁদে কাকার কাছে গেলে, কাকা আমাকে নিয়ে বাগানের এক কোণে গেলেন। সেখানে হাতে ধরে আমার জন্য ছোট্ট একটি শিউলি ফুলের চারা পুঁতলেন। কাকা বলেছিলেন, "রঞ্জন, অঙ্ক মাথা দিয়ে করিস, আর গাছ মন দিয়ে লাগাস। সব অঙ্ক একদিন মুছে যাবে, কিন্তু এই শিকড় কখনও মরবে না।" সেই দিন শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে কান্না থামিয়েছিলাম।

আমার ক্লাস এইটে ওঠার পর বাবা বাগানবাড়ি বিক্রি করে শহরে চলে আসেন। নতুন জীবনের ব্যস্ততায়, নতুন বন্ধুদের ভিড়ে রমেশ কাকা ক্রমশই বিস্মৃত হয়ে যান।

আজ সেই রমেশ কাকা আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁকে দেখে আমার মন খুশিতে নয়, বরং গভীর বেদনায় ভরে উঠলো। তাঁর চেহারায় যেন এক সর্বনাশের ছাপ।

"কী হয়েছে কাকা? আপনি হঠাৎ এখানে?" আমি তাঁকে উপরে নিয়ে এসে বসাই।

অনেক দ্বিধার পর কাকা ভাঙা গলায় বললেন, "নদী... নদী সব কেড়ে নিয়েছে রে রঞ্জন। গত বর্ষায় সব ভেসে গেল। আমার ভিটে, আমার ছোট বাগান... কিচ্ছু নেই। তোর ঠিকানা জোগাড় করে আসলাম। শহরে আর কে আছে আমার?"

তাঁর ভিটেমাটি হারানোর কথা শুনে আমার মনে পড়ল সেই শিউলি ফুলের চারাটি। যে শিকড়ের কথা তিনি বলেছিলেন, আজ তাঁর নিজের জীবনেই সেই শিকড় উপড়ে গেছে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি তাঁকে শুধু টাকা দিয়ে বিদায় করতে পারবো না, যেমনটা জহুরা বুবু-র গল্পে রঞ্জন পারেনি। আমি তাঁকে বললাম, "কাকা, আপনি কোথাও যাবেন না। এই শহরের মাটিতে আপনারও জায়গা হবে। আপনি আমার কাছেই থাকবেন। আমার একটা নতুন প্রজেক্ট চলছে, সেখানে একজন বিশ্বস্ত মানুষের খুব দরকার।"

আমি তাঁকে শুধু থাকার জায়গা দিলাম না, তাঁর জন্য এমন একটি কাজের ব্যবস্থা করলাম যেখানে তাঁকে নতুন করে মাটির কাছাকাছি থাকার সুযোগ করে দিলাম। তিনি আমার প্রজেক্টের ছাদের উপর ছোট্ট একটি গ্রিনহাউসের দেখাশোনা করতে শুরু করলেন।

একদিন সন্ধ্যায় কাজ শেষে আমি গ্রিনহাউসে গেলাম। দেখি রমেশ কাকা পুরোনো দিনের মতো আলতো করে মাটিকে ছুঁয়ে দেখছেন। তাঁর মুখে সেই পুরোনো, শান্ত হাসিটা ফিরে এসেছে।

তিনি হাসিমুখে একটা টবের দিকে ইশারা করে বললেন, "দেখ তো রঞ্জন, কী এনেছি! শহরে এত খুঁজে এই চারাটা পেলাম।"

টবের দিকে তাকিয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সেখানে ছোট্ট একটি শিউলি ফুলের চারা। কাকা বললেন, "সব অঙ্ক ভুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু এই শিকড়ের কথা ভুলিনি। তুই বলেছিলি, সব অঙ্ক একদিন মুছে যায়, কিন্তু শিকড় কখনও মরে না।"

সেদিন রাতে, বাড়ি ফেরার পথে, আমি বুঝতে পারলাম সম্পর্কগুলো ঠিক শিউলি ফুলের মতোই। দিনে তাদের দেখা না গেলেও, রাতের অন্ধকারে তারা নিজেদের গন্ধ আর অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায়। রমেশ কাকা আজ আমার জীবনের সেই সৌরভ, যা পঁচিশ বছরের ধুলায় ঢাকা পড়েও হারায়নি।

#বৃহৎ_দাস

জহুরা বুবু :একদিন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, অতিথি রুমে আলো জ্বলছে। আমি আমার স্ত্রীকে বলি,- 'কে এসেছে, আলো জ্বলছে য...
29/11/2025

জহুরা বুবু :

একদিন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, অতিথি রুমে আলো জ্বলছে। আমি আমার স্ত্রীকে বলি,

- 'কে এসেছে, আলো জ্বলছে যে ঐ ঘরে।'

আমার স্ত্রী বলে,
-
'তোমার দেশের বাড়ি থেকে দুজন মানুষ এসেছে। সম্ভবত ওনারা স্বামী স্ত্রী।'

- 'তাই। তুমি কী ওনাদের আগে দেখনি?'

- 'না। মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমি তোমার কী হই?’ আমি যখন বলি, ‘আমি তোমার স্ত্রী হই।’ তখন সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি আমাদের রঞ্জনের বউ! ও মা, কত সুন্দর তুমি!’ তারপর আমাকে যত সব আদর করা শুরু করেছিল।'

আমি আমার স্ত্রীকে নিয়েই অতিথি রুমে যাই। দেখি, পঞ্চাশোর্ধ একজন মহিলা ও একজন পুরুষ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। আমি চিনতে পারছিলাম না।কিছুটা বিস্মিত হলাম । ওনারাও আমাকে চিনতে পারছিল না।

আমার স্ত্রী মহিলাকে বলে,

- 'ইনি হচ্ছেন আপনাদের রঞ্জন, আপনাদের ছেলে।'

মহিলা আমার পরিচয় পেয়ে বিছানা থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে এবং বলে,

- 'তুমি এত বড় হয়ে গেছ!'

মহিলা বলেন,

- 'তুমি আমাকে চিনতে পারবে না। সেই ছোট বেলায় আমাকে দেখেছ। আমি তোমার ‘জহুরা বুবু’ , মনে পড়ছে আমার কথা? মনে পড়ে কী আমাকে? সেই কত বছর আগের কথা।'

পঁচিশ বছর আগে,

ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। স্কুল থেকে বাড়িতে

ফিরলে আমাকে খেতে দিতো হয় মা, না হয় জহুরা বুবু। জহুরা বুবু আমার জন্মের আগে আমাদের বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল। সেই নাকি কোলে পিঠে আমাকে লালন পালন করেছে। আমাকে দেখে শুনে রেখেছে।

একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি, জোহরা বুবু চোখে মোটা করে কাজল পরে আছে। আমি তার চোখের দিকে বিস্ময়ে পিট পিট করে তাকিয়ে থাকি।

জহুরা বুবু আমাকে বলে,

- 'কী দেখছ তুমি?'

আমি আঙুল দিয়ে জহুরা বুবুর চোখ দুটো দেখাই।

জহুরা বুবু বলে ওঠে,

- 'ওরে আমার ভাইটা।'

বলেই তার চোখ থেকে আঙ্গুল দিয়ে কাজল মুছে মুছে আমার চোখে পরিয়ে দেয়। জহুরা বুবুর দেওয়া তার চোখের কাজল আমার চোখে এখন আর নেই। তা মুছে গেছে কবে।

একদিনের কথা মনে আছে। আমার খুব জ্ব*র এসেছিল। দু-তিন দিনেও জ্বর নামছিল না। এই জহুরা বুবু মাকে কিছুতেই রাত জাগতে দেয়নি। সেই একটানা চার রাত আমার সিয়রে বসে জেগে থেকেছে। মাথায় জলপট্টি দিয়েছে। দুচোখের পাতা একটু সময়ের জন্য সে বন্ধ করেনি।

আমার শিশুকালে জহুরা বুবু কতো যে সেবা যত্ন করেছে, কত যে বিরক্তি ও যন্ত্রণা সহ্য করেছে। সে সব কথা আমার মনে নেই। আমি শুধু আমার মার কাছে থেকে সে সব কথা পরে শুনেছি।

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, এক বর্ষার দিনে জহুরা বুবুর বিয়ে হয়ে যায়। মা বাবাই সমস্ত বন্দোবস্ত করে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয় দূরের এক গ্রামে। আমার শুধু মনে আছে, শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার সময় জহুরা বুবু আমাকে বুকে টেনে নিয়ে ফূঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। নৌকায় উঠে সারা পথ নাকি সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিল।

বিয়ে হয়ে যাবার পর জহুরা বুবু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তারপর তার সংসার ব্যস্ততায় খুব বেশি আসত না। তারপর একদম না। তারপর চলে গেছে অনেক বছর। জহুরা বুবু আস্তে আস্তে সবার কাছে বিস্মৃত হয়ে যায়।

এই বিস্মৃত জহুরা বুবু কে দেখে যতটুকু খুশি হলাম, তার চেয়ে বেশি বিষাদে মনটি ভরে উঠল। জহুরা বুবু কেমন শীর্ণকায় হয়ে গেছে। চোখের নীচে কালো দাগ পড়ে গেছে। মনে হল, সে বড় ধরণের কোনো রোগে দুঃখে ভুগছে।

জহুরা বুবুই বলছিল,

- 'আমি তোমাদের বাড়ি থেকে ঠিকানা নিয়ে তোমার এখানে এসেছি। আমার অনেক বড় অসুখ হয়েছে মনে হয়। ওখানে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তাই অসহায় হয়ে তোমার এখানে চলে এলাম। এই ঢাকা শহরে আমাদের আপন কেউ নেই। তোমার কথা মনে হল। তাই তোমার কাছে চলে আসলাম।'

আমি জহুরা বুবু কে বলি,

- 'তুমি কোনো চিন্তা করবে না। তোমাকে ভাল ডাক্তার দেখাবো। তুমি ভাল হয়ে যাবে। তুমি সত্যিই ভালো হয়ে যাবে।'

জহুরা বুবু কিছু টাকা বের করে আমার হাতে দেয়। বলে,

- 'জানি না, কত খরচ হবে। তুমি এখান থেকে খরচ করবে।'

আমি ঐ মুহুর্তে জহুরা বুবু কে কোনো করুণা করতে চাইনি। আমি তার হাত থেকে টাকা নিয়ে নেই।

রুমে এসে আমি আমার স্ত্রীকে বলি,

- 'জানি, তোমাকে না বললেও তুমি ওনাদের জন্য অনেক করবে। তবুও বলছি, তুমি বিরক্ত হবে না।'

তোমাকে একটা কথা বলি,

- 'এই জহুরা বুবু আমার বড় বোনের মতন, আমার মায়ের মতন। আমার সর্ব শরীরে ওনার মায়া, মমতা, আদর স্নেহ লেগে আছে।'

আমার ছলো ছলো চোখ দেখে, ও শুধু বললো,

- 'ওনাদের কোনও অসম্মান ও অবহেলা হবে না। তুমি দেখ।'

শহরের সবচেয়ে ভাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে জহুরা বুবু কে দেখাই। ওনার সমস্ত কিছু চেক আপ করানো হয়। সব গুলো রিপোর্ট পেতে দুই তিন লেগে যায়। ইতোমধ্যে ঔষধ ও খেতে থাকে। সুন্দর চিকিৎসা পেয়ে জহুরা বুবুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

একদিন রাতে টেবিলে বসে খাচ্ছিলাম, আমার খাওয়া দেখে জহুরা বুবু আমার স্ত্রীকে বলছিলো,

- 'বউ মা, তুমি রঞ্জনকে এত ঝাল ভাত খাওয়াও কেন? ও তো ছোটবেলায় ঝালভাত খেত না। দু*ধ আর সর্বিকলা দিয়ে ভাত খেত। ও কোনো সময় নিজ হাত দিয়ে ভাত খেত না। চাচি আম্মা, না হয়‌ আমি তুলে খাওয়াতাম।'

আর একদিন আমার মাথার চুলে তেল নাই দেখে, আমার স্ত্রীকে বলছিলো,

- 'বউ মা, তুমি ওর মাথায় তেল দিয়ে দাও না কেন? সরিষার তেল নিয়ে আসো, আমি ওর মাথায় তেল দিয়ে দেই।'

এ রকম আরও অনেক কিছু ঐ অল্প কয়দিনে আমাকে পেতে হয়েছে।

ইতোমধ্যে সমস্ত রিপোর্ট গুলো পেয়ে যাই। জহুরা বুবু কে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট সব দেখলেন। রিপোর্ট দেখে তাঁর মুখটি বি*মর্ষ হয়ে উঠে। তিনি নতুন করে আরও ঔষুধ দিলেন। এবং ইংরেজিতে আমাকে বললেন, ‘'আপনি ওনাদের বাইরে রেখে এসে আমার সাথে দেখা করুন।’ আমি জহুরা বুবুকে বাইরে রেখে ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করি।

ডাক্তার বললেন, ‘ওনার লিউকেমিয়া ধরা পড়েছে। রক্তের ক্যান্সার। খুব বেশি হলে উনি তিন মাস বাঁচতে পারে। এই চিকিৎসা এখানে এখনও ভাল রকম নেই। খুব ব্যায়বহুল। আর করেও লাভ হবে না।’

জহুরা বুবু তার স্বামীসহ আমার বাসায় আরো তিন দিন ছিল। আমি জহুরা বুবুকে বলি,

- 'ডাক্তার সাহেব তোমাকে তিন মাসের ঔষধ দিয়ে দিয়েছে।এখন ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও ৷ তুমি যদি ভালো না হও, তিন মাস পর আবার এসো।'

যেদিন জহুরা বুবু চলে যাবে, সেদিন বুবুকে বলি,

- 'বুবু তুমি আমার চোখে একটু কাজল পরিয়ে দাও না!'

আমার স্ত্রীর কাছে কাজল ছিলো। সে কাজল নিয়ে আসে। জহুরা বুবু আমার চোখে কাজল পরিয়ে দেয়। আমি তার চোখের দিকে তাকাই। দেখি, জহুরা বুবু অঝোরে কাঁদছে।

তারপর আরও কত বছর চলে গেছে। শুনেছি অনেক আগেই জহুরা বুবু চলে গিয়েছেন জীবন নদীর ওপারে। তার দেওয়া সেই কাজল এখন আর আমার চোখে নেই। তা কবে মুছে গিয়েছে!

সংগৃহীত।

Address

Khulna
9320

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Knowledge Hub BD - জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share