Mofijul islam

Mofijul islam

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Mofijul islam, Education Website, Khulna.

12/05/2025
Photos from Mofijul islam 's post 31/12/2023

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: ভারতের প্রাপ্তি
_____________________

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবনুসারে একাত্তরের যুদ্ধে ১ হাজার ৯৮৪ জন ভারতীয় মারা যায়। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৭৬৯, নৌবাহিনীর ২০৪ এবং বিমানবাহিনীর ১১ জন। এই সংখ্যা ধরেই তাদেরকে ৫ লক্ষ রুপি করে সম্মাননা দেয় সরকার। এই জীবন দানের মাধ্যমে ভারত তার চিরশত্রু পাকিস্তানকে দুর্বল করে মানসিক ভাবে, আর্থিকভাবে এবং চেতনার দিক থেকে এবং অর্জন করে বিজয়। তাদের আসাম এবং সেভেন সিস্টার্সসহ আশেপাশের রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আশাংকা থেকে একটা স্থায়ীভাবে স্বস্তি লাভ করে।

যুদ্ধের কারনে ভারতে আশ্রয় নেয়া শরনার্থী, তাঁদের খরচ, ভারতের অন্যান্য সকল প্রকার ক্ষতিপূরনের বিপরীতে আর্থিকভাবে তাঁরা পাকিস্তান থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়। এছাড়াও যুদ্ধ গবেষক এ এস এম সামছুল আরেফিন তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ে উল্লেখ করেন ভারত সেই সময় বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে ১৬ কোটি ৮১ লক্ষ ৩ হাজার ৭শত ২৭ ডলার সাহায্য পায়।

পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যাবার পর আর্থিকভাবে ভারত সরকার পাকিস্তান থেকেও ক্ষতিপূরণ নেয়। ভারতীয় অফিসিয়াল হিসাব মোতাবেক পাকিস্তানের কাছ থেকে ভারত সর্বমোট ৫৪৩ কোটি ৫১ লাখ ১৪ হাজার ২৯৪ রুপি ক্ষতিপূরণ আদায় করে।

স্বাধীনতার পর ভারতীয় বাহিনী ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে মার্চ ১৯৭২ পর্যন্ত সময় বাংলাদেশে অবস্থান করে। এই সময়ে কি পরিমাণ লুটপাট তাঁরা করে তা বর্ণনাতীত। তাদের লুটপাট মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষদেরকে হতবাক করে দেয়। ২১শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ব্রিটেনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় সাংবাদিক মার্টিন ঊলাকট (Martin Woollacott) Indians ‘loot whole factory ‘শিরোনামে লেখায় লিখেন ;

❝ Systematic Indian army looting of mills, factories and offices in Khulna area has angered and enraged Bangladesh civil officials here. The looting took place in the first few days after the Indian troops arrived in the city on December 17 ❞
(Martin Woollacott, Indians ‘loot whole factory, The Guardian, Jan 22, 1972).

সে সময় খুলনার ডিসি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের ক্যাবিনেট সচিব ডক্টর কামাল সিদ্দিকী। তিনি সে সময় ভারতীয় বাহিনীর এই লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখে বলেন; কেবল খুলনা থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টাকার পরিমাণ লুটপাট করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কামাল সিদ্দিকী পরবর্তীতে লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে করা তার পিএইচডি থিসিসে বাংলাদেশের দরিদ্রতার কারণ হিসেবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

ভারতীয় সৈন্যরা পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া সকল অস্ত্র এবং ৮৭ টি ট্যাংক নিয়ে যায় যার মূল্য ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কামাল সিদ্দিকি আরো উল্লেখ করেন ভারতীয় সৈন্যদের লুটপাটের মধ্যে অস্ত্র ছাড়াও ছিল মজুদকৃত খাদ্য শস্য, কাঁচা পাট, সুতা, গাড়ি, জাহাজ,শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিন ও যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য। কামাল সিদ্দিকীর মতে সব মিলিয়ে কম করে ধরলেও এই লুটপাটের পরিমাণ কেবল খুলনা জেলাতে ছিল তৎকালীন হিসেবে ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সারা বাংলাদেশের ১৯টি জেলা থেকে লুটাপাটের পরিমাণ কেমন হতে পারে সেটা অনুমান অসম্ভব নয়।

এই লুটপাটের বাহিরেও ছিল চোরাচালান ও কালোবাজারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্পদের পাচার। কামাল সিদ্দিকী তার থিসিসে দেখিয়েছেন কিভাবে বৈদেশিক সাহায্য, আমদানি-রপ্তানিতে, টাকার অবমূল্যায়ন করে ভারত বাংলাদেশকে লুট করে। লুটপাট ভারতীয় সেনাবাহিনী করলেও চোরাচালান ও কালোবাজারিতে যুক্ত ছিল ভারতীয় ব্যবসায়ী শ্রেণী এবং তাঁরা বাংলাদেশেরও কিছু দালাল জুটিয়ে নিয়েছিল।

বাংলাদেশে ভারতীয় আরদালীদের লুন্ঠনের ব্যাপারে আজিজুল করিম ‘হোয়াই সাচ এন্টি-ইন্ডিয়ান ফিলিংস এমং বাংলাদেশী?’ শিরোনামে এক নিবন্ধে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ভারতীয় মাসিক ‘অনিক’-এর রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ❝ ভারতীয় সৈন্যদের লুণ্ঠিত মালামালের মূল্য ছিল প্রায় ১শ’ কোটি মার্কিন ডলার। ❞

জয়নাল আবেদীনের ‘র এন্ড বাংলাদেশ’ শিরোনামে লেখা একটি বইয়েও বাংলাদেশে ভারতীয় আরদালীদের লুন্ঠনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বইটিতে তিনি লিখেছেন—

❝পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় সৈন্যদের ব্যাপক লুটতরাজ দেখতে পেয়ে ভারতের প্রকৃত চেহারা আমার কাছে নগ্নভাবে ফুটে উঠে। ভারতীয় সৈন্যরা যা কিছু দেখতে পেতো তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তো এবং সেগুলো ভারতে বহন করে নিয়ে যেতো। লুটতরাজ সহজতর করার জন্য তারা আমাদের শহর, শিল্প স্থাপনা, বন্দর, সেনানিবাস, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এমনকি আবাসিক এলাকায় কারফিউ জারি করে। তারা সিলিং ফ্যান থেকে শুরু করে সামরিক সাজসরঞ্জাম, তৈজষপত্র ও পানির ট্যাপ পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে যায়। লুণ্ঠিত মালামাল ভারতে পরিবহনের জন্য হাজার হাজার সামরিক যান ব্যবহার করা হয়।❞

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর পুর্ব পশ্চিম উপন্যাসে লিখলেন,

❝ ঢাকায় এতসব বিদেশী জিনিস পাওয়া যায়, এসব তো আগে দেখেনি ভারতীয়রা । রেফ্রিজারেটর, টিভি, টু-ইন-ওয়ান, কার্পেট, টিনের খাবার-এইসব ভর্তি হতে লাগলো ভারতীয় সৈন্যদের ট্রাকে। ❞

৯ম সেক্টর কমান্ডার প্রধান মেজর এম এ জলিল অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা বইতে উল্লেখ করেন ভারতীয় বাহিনী খুলনা শহর থেকে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। যশোহর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়ার্টার তন্ন তন্ন করে লুট করেছে। বাথরুমের মিরর এবং অন্যান্য ফিটিংসগুলো পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়৷ ভারতীয় বাহিনীর এই লুটপাটে বাধা দেওয়ায় মেজর জলিলকে আটক করে জেলে ভরে আওয়ামী লীগ সরকার।

ভারত ও ভারতীয়দের এসমস্ত কর্মকাণ্ডের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে দেখতে হয় একটি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ যেখানে ৫-১০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়। এরপরও বাংলাদেশীরা আজ ভারতীয় অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকারের দাবী জানাতেও শরমিন্দা অনুভব করে। অথচ ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’ স্বীকার করে বলেন;

❝……আমাদেরকে সত্যাশ্রয়ী হতে হবে। বাংলাদেশীদের প্রতি আমরা সঠিক আচরণ করিনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সব রকমের সাহায্য করা উচিৎ ছিল, কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা তা করেননি। তারা বেনিয়ার মতো আচরণ করেছেন। ❞

(ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’, স্টেটসম্যান, ২৯ এপ্রিল, ১৯৮৮।

30/12/2023

বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। হয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম বহিষ্কৃত শিক্ষক। তিনি হলেন ডিরোজিও (ঝড়ের পাখি) - - 🙏 🙏 | প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য 🙏🙏

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, উনিশ শতকের একজন শিক্ষক, যিনি পাশ্চাত্যের ছোঁয়ায় এ দেশের তরুণদের মেধা ও মননকে জাগানোর পথ বের করে দিয়ে গেছেন। ভারতে যখন পাশ্চাত্যের হাওয়া লাগি লাগি করছে, সেসময় একটা তরুণের দল ‘ডিরোজিওর শিষ্য’ বলে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। বহুদিনের আঁকড়ে থাকা সংস্কার, গোঁড়ামি, যাকে কিনা নিজেদের ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতি বলে জীবনযাপন করছিলেন ভারতবর্ষের বাসিন্দারা, সেই সময়ের ভারতবর্ষ যখন বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান বলে কোনো দেশ আসেনি।

নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমল শেষ হবার সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। এরপর কিছুদিন ইংরেজদের প্রায় অধীনেই নবাবি করলেন পর মীর কাশিম। তারপরেই ইংরেজদের প্রত্যক্ষ শাসনে চলে এলো বাঙালিরা, তখনকার ভারতবাসীরা। আর ইংরেজরা প্রবেশ করতে লাগলো ভারতের সর্বক্ষেত্রে। প্রায় সব ইংরেজই যখন কোনো না কোনোভাবে বাঙালিকে হাতিয়ে নিতে চাচ্ছে, এর মধ্যে পশ্চিমা কিছু মানুষ ব্যতিক্রম ছিলেন, যারা বাঙালির উন্নতিই চেয়েছিল। এরই মধ্যে অন্যতম হলেন এই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।

ডিরোজিওর জন্ম ও শৈশব -
হেনরির জন্ম ১৮০৯-এর ১৮ এপ্রিল কলকাতার মৌলালি অঞ্চলে এক ইউরেশীয় পরিবারে। তার বাবার নাম ফ্রান্সিস, মা সোফিয়া। মাত্র ছ’বছর বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন হেনরি। পরে তার বাবা আনা মারিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলাকে বিবাহ করেন। আনার নিজের সন্তানাদি না থাকায় সতীনের সন্তানদের নিজের ছেলে মেয়ের মতোই দেখতেন। বেশ আদরের সাথে ও স্বচ্ছলতার মাঝেই বড় হয়েছিলেন তিনি, সবসময় পরিপাটি সাজে থাকতেন। চুলের মাঝখানে কাটা সিঁথি, সচরাচর টুপি না পরা- এই তো ডিরোজিও। ছোটবেলা বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলতেন, ঘোড়ায় চড়ারও শখ ছিল।

বৈষম্যের মুখোমুখি ডিরোজিও, তবে কখনো না মেনে নেওয়া -
তখন ইউরেশীয়দের দেখা হতো নিপীড়িতের দৃষ্টিতে। সকল ধরনের পেশায়ও তাদের প্রবেশে বেশ নিষেধাজ্ঞা ছিল। এমনকি সরাসরি স্কুল-কলেজে পড়া নিয়েও তাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। কিন্তু ডিরোজিও কখনোই সেসব বৈষম্যকে তার ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি, তিনি তার সম্প্রদায়ের মুক্তি আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দেন। সংখ্যালঘু হয়েও সংখ্যালঘুতাকে মেনে নেননি ডিরোজিও। সবসময়ই প্রশ্ন তোলার, অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবার একটা আর্তি কাজ করতো তার মধ্যে। পরবর্তী জীবনে এই আর্তি হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মধ্যেও তিনি ছুঁড়ে দিতে পেরেছিলেন যাতে তারা রক্ষণশীলতার বাইরে আসতে পারে।

ডেভিড ড্রামন্ড ও ধর্মতলা অ্যাকাডেমি -
ডিরোজিওর মধ্যে যুক্তির যে বৃক্ষ ডালপালা ছড়ায় তার বীজ বপন করেছিলেন ডেভিড ড্রামন্ড, ডিরোজিওর শিক্ষক। ডিরোজিও যখন ছোট, তখন ইংরেজি শিক্ষার জন্য কলকাতায় তেমন ভাল কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যা আছে সব জগাখিচুড়ি অবস্থা! এমন সময় ত্রাণকর্তা হয়ে এলেন ড্রামন্ড। তিনি ছিলেন একাধারে ধর্মতলা আকাডেমির শিক্ষক ও আংশিক স্বত্ত্বাধিকারী। ১৮১৫ থেকে ১৮২৩ সাল, এই আট বছর ডিরোজিও দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ধর্মতলা অ্যাকাডেমিতে। এখানেই তার জীবনদর্শনের আদর্শ গড়ে উঠেছিল। ড্রামন্ড একটা দেবশিশুর মধ্যে এঁকে দিয়েছিলেন পূর্ণ মানুষের ছবি, বুকের ভেতর গেঁথে দিয়েছিলেন সত্যের জন্যে বাসনা।

শিল্প-সাহিত্য,ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছুর জন্য একটা আবেদন সৃষ্টি হয়েছিল ডিরোজিওর মধ্যে, এখানেই এই ধর্মতলা আকাডেমিতে, ড্রামন্ডের কাছ থেকে। কীভাবে সত্যকে অর্জন করতে হয়, কীভাবে তর্কের মাধ্যমে সত্যকে স্থাপন করতে হয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কী করে মানুষকে মানুষ হয়ে ভালবাসতে হয়- ডিরোজিও এ শিক্ষা ড্রামন্ডের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। কোনোকিছুই গ্রহণ করা যাবে না যুক্তির কষ্টিপাথরে না ঘষে, বললেন স্বপ্ন দেখতে, স্বপ্নের জন্যে বাঁচতে-মরতে। চিন্তাশীলতা, যৌক্তিকতা, মননশীলতার স্বরূপ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিলেন। পড়ালেন হিউম, স্মিথ, রবার্টসন, রীড, স্টুয়ার্ট, বেকন, পেইনসহ অনেকের দর্শন; বার্নসের ক্যাম্পবেলের কবিতার দ্রোহের কথা বুকে ভরে দিয়ে দেখতে বললেন বিশ্বকে ড্রামন্ড একজন কবি ছিলেন, এ প্রভাবও ডিরোজিওর মধ্যে পড়ে।

হিন্দু কলেজে আসার আগে ও পরে -
ড্রামন্ডের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, আর উচ্চশিক্ষার পথে না গিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। হয়তো উচ্চশিক্ষার চেয়েও উঁচু কোনো এক শিক্ষাকে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করেছিলেন, তাই এবার কর্মের মধ্য দিয়ে শিক্ষা নিতে পা বাড়ালেন। তবে শিক্ষকতা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়নি। প্রথমে তার বাবা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন সেখানে যোগ দেন। কিন্তু এ কাজ তাঁর বেশি দিন ভাল লাগেনি। এর পর তিনি ভাগলপুরের নীল দফতরে যোগদান করেন। এখানেই শুরু হয় তাঁর কাব্য চর্চা। তার কবিতা রচনায় প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেটে’-এর সম্পাদক ডক্টর জন গ্রান্ট। ডিরোজিও ‘জুভেনিস’ ছদ্মনামে লিখতেন। ১৮২৮-য় প্রকাশিত হয় ‘দ্য ফকির অফ জঙ্ঘীরা, এ মেট্রিকাল টেল; অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। এর পাশাপাশি চলতে লাগল তার নিজের পড়াশুনা। ক্রমেই তিনি নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

এর পরে ডিরোজিও ভাগলপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন মূলত ডক্টর গ্রান্টের সহায়তায়। ১৮২৬ নাগাদ, তিনি কলকাতায় দু’টি চাকরি পেয়েছিলেন। প্রথমটি ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেট’-এর সহ সম্পাদক হিসেবে, দ্বিতীয়টি হিন্দু কলেজে শিক্ষকতার। কারও কারও মতে তিনি দু’টি চাকরি এক সঙ্গে কিছুদিন করেছিলেন। ডিরোজিও যে সময় হিন্দু কলেজে যোগদান করেন, সেই সময়টা ছিল কলেজের সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার সময়। তার পাণ্ডিত্য ও মেধার জন্যই কলেজের খ্যাতি ও গৌরব বেড়েছিল। কোনো কোনো গবেষকের মতে ডিরোজিওর এই জনপ্রিয়তাই তার পতনের কারণ। সাংবাদিক রূপেও ডিরোজিয়োর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

হিন্দু কলেজের ছাত্রদের সাথে ডিরোজিও -
মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজে আসেন শিক্ষক হয়ে। তার পড়ানোর বিষয় ছিল ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস। এত কমবয়সেই তিনি যুক্তিকে বুদ্ধিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারতেন এবং শুধু তাই নয় ছাত্রদের কীভাবে তার চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত করতে হয় তাও ডিরোজিওর অজানা ছিল না। আর তাই তো গড়ে উঠেছিলো পাশ্চাত্যচিন্তায় আধুনিক একটি তরূণ সমাজ। গতানুগতিকতাকে কী করে যুক্তির হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে হয়, কী করে তথাকথিত প্রথা-রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলতে হয়, কীভাবে জীবনের প্রতিটি অংশে অন্ধ বিশ্বাসকে অতিক্রম করতে হয়- ডিরোজিও হিন্দু কলেজের সেই কিছু ছাত্রের মর্মে তা প্রবেশ করাতে পেরেছিলেন।

তার পড়ানোর বিষয় ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস হলেও আলোচনার গন্ডি এগুলোতেই আটকে থাকতো না। আলোচনা অতিক্রম করতো বিজ্ঞান ও দর্শনের বিস্ময়কর পথও। ক্লাসভরা ছাত্র মুগ্ধ হয়ে দেখতো প্রায় তাদেরই বয়সী একটি ছেলের জ্ঞানের অফুরন্ত ভান্ডার, তাদের মধ্যেও জানার ইচ্ছা বোঝার ইচ্ছা, তথাকথিত গন্ডি পেরিয়ে আসার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠতো। ডিরোজিও তাদেরকে যতটা শিখিয়েছেন তার চেয়ে বেশি প্রবল করে দিয়েছিলেন তাদের জ্ঞানতৃষ্ণাকে। এই জ্ঞানতৃষ্ণার তাগিদেই তিনি ও তার ছাত্ররা শ্রেণীকক্ষের বাইরেও, এমনকি ডিরোজিওর বাসায়ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন।

রক্ষণশীলতায় কঠোর আঘাত হানলেন ডিরোজিও -
তার প্রতিষ্ঠিত ‘অ্যাকাডেমিক এসোসিয়েশন’, ‘সোসাইটি ফর দ্য অ্যাকুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ’, তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা যেমন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘দ্য এনকোয়ারার’ ও দক্ষিণারঞ্জনের সম্পাদনায় ‘জ্ঞানান্বেষণ’ রক্ষণশীল সমাজকে একের পর এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল -
ডিরোজিওর দ্বারা প্রচন্ডরূপে প্রভাবিত ছাত্ররাই একত্রে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নাম ধারণ করে। এরা হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সংস্কার ও রীতিনীতিকে এক কথায় মেনে না নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ধর্মে নিষিদ্ধ খাবার-দাবার গ্রহণ শুরু করেন, গর্বভরে প্রচারও করেন। এসব করার জন্য অনেকের পরিবারের সাথে বিচ্ছেদও ঘটে যায়। শুধু রক্তের সম্পর্কের বাইরেও এই নব্যবঙ্গের সদস্যরা গড়ে তোলেন গভীর বন্ধুত্ব। এদের মধ্যে কেশব সেন, রামতনু লাহিড়ী, রাধানাথ শিকদার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গৌরদাস বসাক, ভূদেব মুখোপাধায়, বঙ্কুবিহারী দত্ত, শ্যামাচরণ লাহা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এদের সবাই ডিরোজিওর সরাসরি শিষ্য নন, কয়েকজন তার ভাবধারায় তার মৃত্যুর পরও দীক্ষিত হয়েছেন এবং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁদেরই একজন।

বহিষ্কার, অতঃপর মৃত্যু -
সমাজ সংস্কার বিষয়ে প্রথাগত চিন্তাধারার বিরুদ্ধে যাওয়ায় হিন্দু কলেজের শিক্ষক পদ থেকে ডিরোজিওকে অপসারণ করার প্রস্তাব রাখা হয়। এই প্রস্তাব ৬-১ ভোটে অনুমোদিত হয়। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বহিষ্কৃত শিক্ষক। বহিস্কৃত হবার পরে ডিরোজিও অর্থকষ্টে পড়েন। তখন তিনি ধর্মতলা অ্যাকাডেমিতে পড়াতে যান এবং কলেরায় আক্রান্ত হন। ১৮৩১ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর তিনি মারা যান। গির্জা ও খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর অভিমতের কারণে পার্ক স্ট্রিটের গোরস্থানে তাকে সমাহিত করতে বাধা দেওয়া হয়। গোরস্থানের ঠিক বাইরে তাকে সমাহিত করা হয়।

তথ্যসূত্র -
১) বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পথিকৎ ডিরোজিও
২) wiki/ইয়ং_বেঙ্গল
৩) হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

29/12/2023

মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ, ডাক নাম গালিব এবং আসাদ। ইসলামী সভ্যতার মহান এই কবি ২৭ ডিসেম্বর, ১৭৯৭ সালে আগ্রাতে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতবর্ষে মোঘল সালতানাতের শেষ ও ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকের একজন ফার্সি এবং উর্দু ভাষার কবি । সাহিত্যে তার অনন্য অবদানের জন্য তাকে দাবির-উল-মালিক ও নাজিম-উদ-দৌলা উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

তার সময়কালে ভারতবর্ষে মোঘল সালতানাত তার ঔজ্জ্বল্য হারায় এবং শেষে ১৮৫৭ সালের সিপাহীবিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা পুরোপুরিভাবে মোঘলদের ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসন দখল করে। তিনি তার লেখায় মোঘলদের পতন, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম জীবনের কালো অধ্যায় নিয়ে লিখেছেন। মহান মোঘল সালতানাত তার আভিজাত্য হারিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, তার লেখায় মোঘল সালতানাতের এসব দিক দারুন ভাবে ফুটে উঠেছে। মহাবিদ্রোহের সময়কার তার লেখা সেই দিনলিপির নাম দাস্তাম্বু। এছাড়াও তিনি জীবনবোধ নিয়ে গজল রচনা করেছিলেন যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জন বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করেছেন ও গেয়েছেন। মোঘল সালতানাতের সর্বশেষ কবি মির্জা গালিব কেবল দক্ষিণ এশিয়ার কবিই নয়, আজ তার কবিতা মুগ্ধ করেছে সারা বিশ্বকে। তাকে উর্দু ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি বলে মনে করা হয়।

গালিব কখনো তার জীবিকার জন্য কাজ করেনি। সারা জীবনই তিনি হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা ধার কর্য করে নতুবা কোনো বন্ধুর উদারতায় জীবন যাপন করেন। তার খ্যাতি আসে তার মৃত্যুর পর। তিনি তার নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি বেঁচে থাকতে তার গুণকে কেউ স্বীকৃতি না দিলেও, পরবর্তী প্রজন্ম তাকে স্বীকৃতি দিবে। ইতিহাস এর সত্যতা প্রমাণ করেছে।

চরম অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও কষ্টের মধ্যেই কেটেছে গালিবের জীবন। তবে তিনি ছিলেন পরম বন্ধু প্রিয় এক ব্যক্তিত্ব। একবার তার খুব কাছের বন্ধু তার বাড়ির পাশে একটা কাজে এসে তার সাথে দেখা না করেই চলে যায়। এতে গালিব খুবই কষ্ট পান। পরবর্তী একটি চিঠিতে তিনি এ কষ্টের কথা তার বন্ধুকে বলেন। কবি তার এক ছন্দে বলেন,
“সব সম্পর্ক ছিন্ন করো না, বন্ধু;
আর যদি কিছু না থাকে
তো শত্রুতাই থাক”
কবি তার প্রিয় মানুষদের প্রতি এভাবেই তার ভালবাসা প্রকাশ করেছেন।

প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কবি মির্জা গালিব চরম দুঃখ-দুর্দশার মাঝেও নিজের ব্যক্তিত্ত্বের যায়গায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেন নাই। যেখানে কবির সম্মানে বিন্দুমাত্র আঘাত হতে পারে এমন স্থান তিনি মুহূর্তেই ত্যাগ করেছেন।

কবি তার দুঃখ ভুলতে গিয়ে শরাবের দারস্ত হন। একবার কবি মসজিদে নামাজ পরেই মদ খাওয়া শুরু করলে মুসল্লিরা বলেন, গালিব এটা আল্লাহর ঘর এখানে মদ না খেয়ে অন্য কোথাও খাও। কবি তাদের প্রত্যুত্তরে বলেন,
“আমাকে এখানেই মদ খেতে দাও
নইলে এমন জায়গা দেখাও যেখানে খোদা নেই”
কবির এমন জবাবে তো সবাই চুপ হয়ে গেলেন। এমন তো কোন যায়গা নেই যেখানে খোদা নেই। তার জবাব কেউ না দিতে পারলেও তার অনেক পরে মহান দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল এর জবাব দেন। কবি বলেন,
“গালিব মসজিদ আল্লাহর ঘর
মদ খাওয়ার যায়গা না
কাফের অন্তরে যা
সেখানে খোদা নেই”

কবির জীবনে এরকম আরো একটি ঘটনা ঘটে যখন ব্রিটিশরা পুরো ভারত দখল করে নেয়ার পরে দিল্লির কেউ যাতে বিদ্রহ করতে না পারে তাই প্রভাবশালী সকল ব্যক্তিদের ডাকেন। একে একে তাদের সাথে কথা বলেন ব্রিটিশ জেনারেলরা। তখন মির্জা গালিবকেও ডাকা হয়। জেনারেল তাকে কবি হিসেবে অনেক সম্মানও দেন। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি হিন্দু নাকি মুসলমান? গালিব এর প্রত্যুত্তরে বলেন, আধা মুসলমান। জেনারেল তো অবাক। সে হিন্দু ও মুসলমান ধর্ম শুনেছে, আধা মুসলমান তো শুনেনি। তিনি কবিকে জিজ্ঞেস করলেন, আধা মুসলমান আবার কি? কবি জবাবে বলেন, মদ খাই কিন্তু শূকর খাই না। এভাবেই কবির শেষ জীবন ব্রিটিশ ভারতের শোষণের কালো অধ্যায় দেখে শেষ হয়েছে।

মহান এই কবি ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬৯ সালে ৭২ বছর বয়সে দিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেন।

29/12/2023

পাকিস্তানি "উপনিবেশ" আমলে দেশের শিক্ষার অবস্থা কেমন ছিলো? - Mir Salman Samil
___________________
ব্রিটিশ আমলে বাংলার শিক্ষা ব্যাবস্থা উন্নয়নে ইংরেজরা যা করেছে তার বেশিরভাগই বা বলতে গেলে সবই করেছে পশ্চিম বাংলা তথা কলকাতায়। পূর্ব বাংলা শিক্ষা ক্ষেত্রে একেবারেই পিছিয়ে ছিলো, আরো নির্দিষ্ট করে বললে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানেরা ছিল একেবারেই অনগ্রসর।

দেশে হাতে গোনা কিছু স্কুল, কলেজ ছিল; বেশিরভাগই ছিল হিন্দু জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত। এসব প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার ছিল বন্ধুর। কোরবানি ঈদের পরে স্কুলে ঢুকতে না দেওয়া, বাধ্যতামূলক সরস্বতী পূজায় অংশ নেওয়াসহ নানাভাবে মুসলমানদের স্কুলে প্রবেশ কঠিন করে রাখা হয়েছিল।

ব্রিটিশ আমলে পশ্চিম বাংলায় ৭ টা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, আর গোটা পূর্ব বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ১ টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাও সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯২১ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় হিন্দুরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যেন ঢাকাতে বিশ্ববিদ্যালয় না হয়। যখন প্রতিষ্ঠায় বাধা দিতে ব্যর্থ হয় তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে। ১৯৩৮ সালে আরবি, ফারসি, ইসলামিয়াত এই বিভাগ বাদ দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান শিক্ষক ছিল মাত্র ৩ জন; ইংরেজি বিভাগে ড. মাহমুদ হাসান, বাংলার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ইতিহাসের ড. মাহমুদ হোসেন। পূর্ব বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এখানে বেশিরভাগ ছাত্র এবং শিক্ষক ছিল হিন্দু।

উচ্চ শিক্ষা পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য জন্য ছিল এক অধরা স্বপ্ন।

১৯৪৭ সালের দিকে পূর্ব বাংলার মাত্র ১২% লোক নিজের নাম লেখতে বা পড়তে সক্ষম ছিল। এবং এই ১২ ভাগের ৯৫ ভাগই ছিল বাঙালি হিন্দু। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানের সাক্ষরতার হার ছিল ৫ ভাগেরও নিচে। [১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১২ টি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় সব ছাত্র এবং শিক্ষক ছিল মুসলমান]।

১৯৪৭ এর ভারত ভাগের সময় পূর্ব বাংলার ৯৯% ডাক্তার, ৯৯% জমিদার, ৯৯% বিচারপতি, ৯৫% শিক্ষক, ৯৮% সরকারি অফিসার, ৯৫% পুলিশ অফিসার, ৯৫% উকিল, ৯৫% মহাজন, ৯৫% বড় ব্যবসায়ী ছিল হিন্দু।

৪৭ এর দেশভাগের পরে হিন্দুদের বড় অংশ পূর্ব বাংলা ছেড়ে পশ্চিম বাংলায় চলে যায়। পূর্ব বাংলায় একটা ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং ছাত্র শূন্য হয়ে যায়। অবস্থা সামাল দিতে জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজ থেকে শিক্ষক, ছাত্র এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকানো হয়। জগন্নাথ কলেজের এক বছর ছাত্র ভর্তি বন্ধ থাকে, ওই ব্যাচ পুরোটাই ঢাবিতে নিয়ে আসা হয়।

এই অবস্থায় পাকিস্তান সরকার এই অঞ্চলের শিক্ষা খ্যাতের উন্নয়নের জন্য অধিক পরিমাণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মানের উদ্যোগ গ্রহন করে।

◾৪ টি বিশ্ববিদ্যালয়:

ইংরেজরা তাদের ২০০শ বছর শাসনামলে ১টা মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছিলো। আর ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে তৈরি হয় ৪ টা বিশ্ববিদ্যালয়। সেগুলো হলো:

১। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩)
২। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬)
৩। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০)
৪। পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১)

◾ ৮৭ টি কলেজ:

বর্তমানে ঢাকা শহরে মোট ৩৯ টি কলেজ আছে, যার ভেতর ৮ টি তৈরি হয়েছে ইংরেজ আমলে, ২১ তৈরি হয়েছে পাকিস্তান আমলে, আর মাত্র ১০ টি তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার পর। সব মিলিয়ে পাকিস্তান আমলে সারা দেশে মোট ৮৭ টি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলোর কয়েকটা উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলের, আর বাকিগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন অনার্স-মাস্টার্স লেভেলের। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চ শিক্ষা প্রসারে এই কলেজ গুলো প্রধান ভুমিকা পালন করেছে। বর্তমান ঢাকার প্রায় সব বড় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পাকিস্তান আমলে তৈরি। যেমন:

১। তিতুমীর কলেজ।
২। বাংলা কলেজ।
৩। সিদ্ধেশ্বরী কলেজ।
৪। সোহরাওয়ার্দী কলেজ।
৫। তেজগাঁও কলেজ।

এবং ঢাকার ভাল ইন্টারইমিডিয়েট কলেজগুলোও প্রায় সবই পাকিস্তান আমলে তৈরি:

১। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ।
২। নটরডেম কলেজ।
৩। ঢাকা সিটি কলেজ।
৪। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ।
৫। রাইফেলস কলেজ।
৬। ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ।
৭। সরকারি বিজ্ঞান কলেজ।
৮। বিএফ শাহীন কলেজ।
৯। সেন্ট জোসেফ কলেজ।

বাংলাদেশের ৫২ বছরে ঢাকাতে এই কলেজগুলোর মানের কলেজ হয়েছে মাত্র একটা— রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ।

◾৮ টা সরকারি মেডিকেল কলেজ:

২০০ বছরের ইংরেজ শাসনামলে দেশে মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়েছে মাত্র ১ টা। পরবর্তী ২৩ বছরে পাকিস্তান আমলে মোট ৮ টি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়:

১। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭)
২। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮)
৩। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২)
৪ সিলেট মেডিকেল কলেজ (১৯৬২)
৫। স্যার সলিমুলস্নাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩)
৬। পিজি হাসপাতাল (১৯৬৬)
৭। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮)
৮। রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০)

◾ ৪ টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়:

১। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ১৯৬২
২। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ১৯৬৪
৩। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ১৯৬৮
৪। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ১৯৬৯

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫ টা, যার মধ্যে ৪ টাই পাকিস্তান আমলের। অর্থাৎ ২৩ বছরের পাক আমলে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ৪ টা, আর পরবর্তী ৫০ বছরে হয়েছে ১ টা!

◾ ১৭ টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটঃ

বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৯টি সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট রয়েছে, যার ভেতর ১৭ টি পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত [২৩ বছরে ১৭ টা আর ৫২ বছরে ৩১ টা]। ব্রিটিশ আমলে দেশে কোনো পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছিলোনা।

◾৪ টি ক্যাডেট কলেজ:

১। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ(১৯৫৮)
২। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ(১৯৬৩)
৩। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ( ১৯৬৩)
৪। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ (১৯৬৫)

◾অনান্য

১। চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমী ১৯৬২ [ বর্তমান নাম বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি ]
২। ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট’ ১৯৫০ [বর্তমান নাম বুটেক্স]
৩। চট্টগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ১৯৬২

◾এরকম আরো অনেক বিশেষায়িত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তান আমলে। এছাড়া দেশ ব্যাপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েক হাজার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাই স্কুল।

পাকিস্তান আমলে স্বাক্ষরতার হারঃ

১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের স্বাক্ষরতার হার ছিল ৫ ভাগেরও কম। ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে স্বাক্ষরতার হার দাড়ায় ২১.৫%। অর্থাৎ ৫ গুন বাড়ে।

অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছরে এই অঞ্চলের স্বাক্ষরতার হার ৪ গুন বাড়ে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের আদমশুমারী না হওয়ায় পাকিস্তান আমলের প্রকৃত স্বাক্ষরতার হার জানা যায়নি।

পাকিস্তান আমলের শিক্ষা নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা দুইটা মিথ্যার আশ্রয় নেয়:

১। তারা পূর্ব বাংলার হিন্দুদের পশ্চিম বাংলায় মাইগ্রেন করার আগের সময়ের জরিপ অনুসারে দাবি করে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার হার ছিল ১২ ভাগ। আগেই উল্লেখ্য হিন্দুরা মাইগ্রেশনের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র এবং শিক্ষক শূন্য হয়ে যায়।

২। ১৯৭১ সালে আদমশুমারী হয়নি তাই সাক্ষরতার হার কত সেটা জানা যায়নি। তাই অনেকেই ২১.৫% কেই পাকিস্তান আমলের স্বাক্ষরতা বলে চালায় দেয়। প্রকৃত পক্ষে ৭১ সালে কত ছিল এ নিয়ে কোন তথ্য নেই। তবে সেটা যে বেড়েছিল এটা নিশ্চিত।

10/01/2023

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়,গাজীপুর

Want your school to be the top-listed School/college in Khulna?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


Khulna
123456