21/08/2025
বাঙালি জাতির উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত ইতিহাস ও মৌখিক কাহিনিতে নানা মত পাওয়া যায়। একধরনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ মতে, বাঙালিরা মূলত ভেদা উপজাতির বংশধর। এই ভেদা জনগোষ্ঠী প্রাচীনকালে শ্রীলঙ্কার সমতল দ্বীপ অঞ্চল থেকে ভালো খাদ্য ও বাসস্থানের সন্ধানে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে। প্রায় ১৭০০ বছর আগে তারা বঙ্গ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। ভাষাগতভাবে তখন তাদের কথাবার্তাকে পাখির কিচিরমিচিরের মতো শোনাত বলে বর্ণনা আছে।
বঙ্গে আসার পর এই ভেদা জাতি এখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়। বঙ্গের আসল এবং প্রাচীন ভূমিপুত্র ছিলেন সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল ইত্যাদি অস্ট্রো-এশীয় জনগোষ্ঠী। দীর্ঘকাল ধরে ভেদা ও এই স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে আন্তঃবিবাহ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ফলে এক নতুন মিশ্র জাতির উদ্ভব হয়, যাদের পরবর্তীতে ‘চাণ্ডাল’ নামে অভিহিত করা হয়।
ঋগ্বেদের বিবরণে দেখা যায়, গঙ্গা ও ভগীরথীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে ‘বঙ্গ’ বলা হত। এই বঙ্গ জনপদে তখন চাণ্ডাল নামে এক জাতির বসবাস ছিল, যাদেরকে উচ্চবর্ণের আর্য সমাজ অপবিত্র বলে মনে করত। লোকমুখে প্রচলিত ছিল যে, কোনো মুনিঋষি এই অঞ্চলে প্রবেশ করলে তিনি অপবিত্র হয়ে যেতেন। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বোঝা যায়, প্রাচীন বঙ্গ ছিল আর্য-সংস্কৃতির বাইরে এক স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠীর বাসভূমি।
পরবর্তী সময়ে এই চাণ্ডাল জাতি ধীরে ধীরে বহিরাগত প্রভাব, মুসলিম শাসন, আর্য-সংস্কৃতি ও আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে মিলেমিশে ‘বাঙালি’ নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ, বর্তমান বাঙালি জাতি মূলত একটি দীর্ঘকালীন মিশ্রণ প্রক্রিয়ার ফল—ভেদা, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি জাতির সংমিশ্রণে গঠিত এক আধুনিক জনগোষ্ঠী।
ভাষার দিক থেকেও বাঙালির ইতিহাস জটিল। বাংলা ভাষার উৎপত্তি অনেকের মতে মধ্যযুগে, বিশেষ করে মুসলিম শাসনামলে। তবে তারও আগে পাল যুগে বাংলা ভাষার পূর্বসূরি রূপে চাটগাঁইয়া, সিলেটী, অসমিয়া, ওড়িয়া, ভোজপুরী ও মৈথিলি ভাষাগুলোর ব্যবহার ছিল। এই ভাষাগুলোতেই চর্যাপদ রচিত হয়েছিল, যা বাংলার প্রাচীন সাহিত্যিক নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালিরা নিজেদেরকে প্রায়ই একক জাতিগত পরিচয়ে উপস্থাপন করলেও, প্রকৃতপক্ষে তাদের শিকড় বহু জাতি ও সংস্কৃতির মিলিত ইতিহাসে নিহিত। বাঙালি পরিচয়ের ভেতরে রয়েছে প্রাচীন ভেদা অভিবাসনের স্মৃতি, আদিবাসী সাঁওতাল-মুন্ডা সংস্কৃতির প্রভাব, আর্যদের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ছাপ, মুসলিম শাসনামলের ভাষা ও সংস্কৃতির অবদান এবং ব্রিটিশ আমলে আধুনিক জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা।
অতএব, বর্তমান বাঙালি পরিচয়কে বোঝার জন্য এর বহুমাত্রিক ইতিহাস ও জাতিগত মিশ্রণকে স্বীকার করা জরুরি। এটি কোনো একক জাতির শুদ্ধ রূপ নয়, বরং সহস্র বছরের আন্তঃসম্পর্ক, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনের ফল। এই সত্য স্বীকার করা ইতিহাসচর্চার জন্য যেমন জরুরি, তেমনি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের জন্যও প্রয়োজনীয়।
Nafisa Khanom
প্রগতিশীল তরুণ কলাম লেখক ✍️