26/02/2021
"প্রতিটি গ্রামে যেমন একটি আলোর মশাল আছে-শিক্ষক,
তেমনি সেই আলো নিভিয়ে দেবার মত একজন আছে- পুরোহিত।"
- ভিক্টর হুগো
চিঠিতে শুধু একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিলো। ১৮৬২ সালে ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো এই চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন তার প্রকাশককে।
চিঠিতে তিনি জানতে চেয়েছিলেন তার বই ‘লা মিজারেবলস’ কেমন বিক্রি হচ্ছে। সেটা জানার জন্য তিনি চিঠিতে শুধু লিখেছিলেন, ‘?’
তার প্রকাশকও কম যান না। তিনি উত্তর পাঠিয়েছিলেন শুধু ‘!’। এর অর্থ ছিলো বইটা অনেক বিক্রি হচ্ছে। চমৎকার।
সবচেয়ে মজার কথা হলো, যে বইয়ের ব্যাপারে জানতে ভিক্টর হুগো পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট চিঠিটি লিখেছিলেন, সেই বইটা কিন্তু মোটেই ছোট ছিলো না। সেটা ছিলো ১২০০-এরও বেশি পৃষ্ঠার দীর্ঘ একটা বই।
উনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী রোমান্টিক লেখক ভিক্টর হুগো। ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মী। বিশ্ববিখ্যাত ‘লা মিজারেবল’ ও ‘হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’ তারই সৃষ্টি।
পুরো নাম ভিক্টর মারি হুগো। ১৮০২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ফ্রান্স জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা। কবিতা, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের অনেক দিকেই ছিল তার বিচরণ। এগুলোর পাশাপাশি তিনি ৪ হাজারেরও বেশি চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন।
হুগোর শৈশব কেটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। জন্মের দুই বছর পর নেপোলিয়ন ফরাসিদের সম্রাট হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। যেহেতু তার বাবা নেপোলিয়নের শাসনকালে একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, তাই পরিবার নিয়ে প্রায়ই তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতে পারতেন। হুগো এই ভ্রমণগুলো থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। এই শেখাগুলো পরবর্তীতে তার সাহিত্যে ফুটে ওঠেছিল।
শৈশবেই হুগোর বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। মা সোফি প্যারিসে তিন সন্তান নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তবে হুগোর শিক্ষা ও আগ্রহকে সবসময় তিনি উৎসাহিত করেছিলেন। ফলস্বরূপ, শৈশবে রচিত তার বেশিরভাগ কবিতায় ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়।
তরুণ ভিক্টর প্রেমে পড়েছিলেন শৈশবের বন্ধু অ্যাডেলে ফাউচারের। মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গোপনে ১৮২২ সালে তাকে বিয়ে করেন। ১৮২৩ সালে তাদের প্রথম সন্তান লেওপোল্ড মারা যায়। ঐ ছেলেটির বয়স বেশ কম ছিল। ১৮২৪ সালে এই দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান লিওপোল্ডাইন জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৮৪৫ সালে ১৯ বছর বয়সে এই সন্তানটিও মারা যায়। সে সময় হুগো ও তার স্ত্রী দক্ষিণ ফ্রান্সে ভ্রমণরত ছিলেন। সেখানে একটি ক্যাফেতে সংবাদপত্র মারফত মেয়ে লিওপোল্ডাইনের মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারেন।
মেয়ের আকস্মিক মৃত্যু কবিকে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। কন্যার জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে অনেক কবিতা লেখেন। এক গবেষক বলছেন, হুগো সেই বিষাদ সারা জীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা সম্ভবত 'ডিমেন, ডেস ল'আউব' (আগামীকাল, প্রথম প্রভাতে); এতে বর্ণিত হয়েছে তার মেয়ের কবর পরিদর্শন করার কথা।
হুগোর সাহিত্য জীবনের সূচনা কবিতা দিয়ে। প্রথম কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮২২ সালে। প্রকাশের পরপরই এটি ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এরপর একে একে রচিত হয় ট্রাজেডি, অপেরা, অনুবাদ সহ নানান সৃষ্টি। সাহিত্যে ফ্রান্সের প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন ধারার সূচনা করেন হুগো। তাঁকে ফ্রান্সের রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের পথিকৃৎ বলা হয়ে থাকে। গীতি কবিতায় ছন্দের সুষম প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি ফরাসি কাব্য জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল মানুষের মুক্তি। ফ্রান্সের জনগণকে অন্ধকার আর গ্লানি থেকে মুক্তির আলোয় আলোকিত করে সমাজ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। এজন্যে হুগোকে সমাজ সংস্কারকও বলা হয়ে থাকে। সম্রাটের স্বেচ্ছাচারিতা তাঁকে ভীষণভাবে পীড়া দিত। হুগো রাজা লুইস নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ জানান তাঁর লেখনির মাধ্যমে। এরপর স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যান। গারনসি দ্বীপে দীর্ঘ উনিশ বছর নির্বাসিত জীবনযাপনকালে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লা মিজারেবল’, ‘দ্য ম্যান হু লাভস’, এবং ‘টয়লার্স অব দ্য সি’। স্বদেশে ফেরার পর জনগণ তাঁকে বিপুল সম্মানে অভিষিক্ত করে।
সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও জড়িত ছিলেন। ১৮৪৫ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'লা মিজারেবল' লেখার সময় ফ্রান্সের রাজা তাকে উচ্চকক্ষের সদস্যপদ দেন। আইনসভার সর্বোচ্চ দলের সঙ্গে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়। তিনি সেখানে সবার জন্য বিনা খরচে লেখাপড়া, সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং মৃত্যুদণ্ডের বিলুপ্তির ব্যাপারে কাজ করেন।
ভিক্টর হুগো রচিত বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ লা মিজারেবল উপন্যাস যেখানে তিনি নির্যাতিত শোষিত বারবণিতা ফাতিনে ও তার কন্যা সন্তান কসেত্তের মাধ্যমে তৎকালীন ফ্রান্সের নিঃস্ব অভাবগ্রস্ত মানুষের চিত্র তুলে ধরেছেন। জা ভলজা এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র যিনি তার বোনের সাতটি ক্ষুধার্ত সন্তানের জন্য এক টুকরো রুটি চুরি করতে গিয়ে ১৯ বছর জেল খাটেন। তার বহুলআলোচিত বাক্য ‘১০০ ফ্রাঁ দিন’ এই কথায় মানুষের প্রতি উদার হবার আহ্বান ছিল। ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে দরিদ্রের জন্য যা রীতিমতো প্রবাদবাক্য আর স্লোগান হয়ে উঠেছিল।
১৮৪৮ সালে যখন রাজ্যে উন্নতির জোয়ার শুরু হয়েছিল, তিনি লা মিজারেবল লেখা বন্ধ করে রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। পরে ১৮৫১ সালে ঘটনাক্রমে পরিস্থিতি বদলে যায়। হুগোর রাজনৈতিক চেতনার বিরোধিরা তাকে ব্রিটিশ চ্যানেলের একটি দ্বীপে নির্বাসিত করে। সেখান থেকে ১৮৬০ সালে তিনি আবার লা মিজারেবল লেখার কাজে হাত দেন। পরের বছরই উপন্যাসটি শেষ করেন। ফরাসি ভাষায় 'লা মিজারেবল' এর শব্দগত অর্থ দীন দুঃখীরা। এই উপন্যাসে লেখক উনিশ শতকের ফ্রান্সের সাম্রাজ্যতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের অধীনে সমাজের নিচু শ্রেণীর মানুষের এক সকরুণ জীবন চিত্র এঁকেছেন, যারা দুঃখ-দৈন্যের অভিশাপে বিকৃত। এ যেন কোনো উপন্যাস নয়; জীবনের জয়, পরাজয়, উত্থান-পতন, আশা-আকাঙ্খা সম্বলিত এক মহাকাব্য।
১৮৭০ সালে সম্রাটের পতন হলে হুগো ফ্রান্সে ফেরত আসেন, যেখানে তাকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে বিপুলভাবে সম্মানিত করা হয়।
ভিক্টর হুগো ও তাঁর ছেলে বারো বছরের জন্যে যখন সমুদ্রতীরে নির্বাসিত হন, তখন হুগো তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই বারো বছর তুমি কিভাবে কাটাবে’?
উত্তরে ছেলে বলেছিলেন, ‘শেক্সপিয়ার পড়ে’।
ছেলের পাল্টা প্রশ্নের উত্তরে হুগো বলেছিলেন, ‘সমুদ্র দেখে’।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সময়ে সময়ে পরিবর্তন আসে হুগোর। শৈশবে তিনি ছিলেন ক্যাথলিক। বিভিন্ন লেখায় তিনি চার্চের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাও জ্ঞাপন করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ক্যাথলিক বিরোধী এবং একপর্যায়ে ধর্মীয় মতবাদ বিরোধী হয়ে উঠেন। জানা যায়, নির্বাসনকালে তিনি প্রেতচর্চা তথা আত্মার আরাধনাও করেছিলেন। সারা জীবন ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি ছিলেন দ্বিধাবিভক্ত। ১৮৭২ সালে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল তিনি ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী কি না, উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “না। আমি মুক্তচিন্তার অধিকারী।"
১৮৭০ সালে যখন হুগো প্যারিসে ফিরে আসেন, তখন দেশ তাকে জাতীয়ভাবে অভিবাদন জানায়। তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তাকে একনায়কতন্ত্র দেওয়া হবে। যেমনটি তিনি সেই সময় তার কিছু নোটে লিখে গিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালের ৩ আগস্ট তিনি জনসাধারণের সামনে তার শেষ বক্তব্যে একটি আশাবাদী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন,
In the twentieth century war will be dead, the scaffold will be dead, hatred will be dead, frontier boundaries will be dead, dogmas will be dead; man will live.
“বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে, ভাস্কর্য বিনষ্ট হবে, ঘৃণা অস্তিত্ব হারাবে, সীমান্তের সীমানা হারিয়ে যাবে, দেবতারা মারা যাবে; মানুষ বাঁচবে।”
আধুনিক ফরাসি সাহিত্যের জনক ভিক্টোর হুগো।
"সকল সভ্যতা শুরু হয় ঈশ্বর তন্ত্র দিয়ে আর শেষ হয় গণতন্ত্রে এসে।"
~ভিক্টর হুগো
ভিক্টোর হুগোর জয়গান যখনই ইউরোপে ছড়িয়ে পরে ঠিক সেই সময় বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। বাংলাভাষায় ফরাসি সাহিত্যে চর্চার ইতিবৃত্তে আরো বৃহত্তর পরিধিতে বাঙালির ফরাসি সংস্কৃতির পরিগ্রহণে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাকে বাদ দেওয়া যায় না। ফরাসি কবি রঁমা রল্যাঁ'র সাথে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব তা গড়ে ওঠার পেছনেও ভিক্টর হুগোর প্রভাব কাজ করেছে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘হিং টিং ছট’ (১৮৯২) কবিতায় ইয়োরোপীয় পণ্ডিতের পাশাপাশি মধ্যে কৌতুকপ্রিয়, ভদ্র, শ্লেষ ও যমক সৃস্টিতে চতুর ফরাসি পণ্ডিতের যে বর্ণনা দিয়েছেন তার মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির কল্পনায় ইয়োরোপীয় চরিত্রের উগ্রমূর্তি সাধারণকল্পরূপের পাশে তুলনামূলকভাবে ফরাসি চরিত্রের কল্পরূপ বা ভাবমূর্তি উপস্থাপিত হয়েছে। হুগো ছাড়াও ফরাসি সাহিত্যিক মোলিয়ে, প্যাস্কাল, এমিল জোলা ও গোতিয়ের লেখার পাঠকও ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
শান্তিনিকেতনের এক নথি থেকে জানা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর দাদা সত্যেন্দ্রনাথের কাছ থেকে, ভিক্টোর হুগোর লেখা পড়ার জন্যাই ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন।
মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি একটি নোট লিখেছিলেন, যেটির শেষ কয়টি শব্দ ছিল- "To love is to act"। এই ভালোবাসা দিয়েই তিনি তার সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে গিয়েছেন আর জয় করেছেন হাজারো মানুষের মন।
১৮৮৫ সালের ২২ মে শ্রমিকের মলিন পোশাকে প্যারিসের ফুটপাথ ধরে হেঁটে চলেছেন হুগো। একটি মেয়ে তাকে দেখে দৌড়ে কাছে এসে বলল— কী আশ্চর্য! তোমাকে তো দেখতে একদম ভিক্টর হুগোর মতো লাগছে। আমি তো ভেবেছিলাম কোন কালে মরে গেছেন তিনি। মেয়েটির কথা শুনে ভয়ে কেঁপে উঠলেন হুগো। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলেন। সেদিন রাতেই মৃত্যু হলো ভিক্টর হুগোর।
২২ মে ১৮৮৫ সালে ভিক্টর হুগোর মৃত্যুর পর ফ্রান্সের রাস্তায় তার কফিন বয়ে নেবার সময় লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। সেদিন ফ্রান্সের জনগণ যতভাবে সম্মান জানানো সম্ভব, জানিয়ে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। তার মৃত্যুতে জাতীয় শোক পালন করা হয়।
ভিক্টর হুগো শুধুমাত্র সাহিত্যের বিশাল ব্যক্তিত্ব হিসেবেই সম্মানিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি ফ্রান্সের প্রজাতন্ত্র এবং গণতন্ত্র দ্বারা জনগণকে আকৃষ্ট করেছিলেন। সারা জীবন তিনি স্বাধীনতা, সমতা ও ফরাসি সংস্কৃতির প্রতি পরম আন্তরিকতা করে গেছেন।
শুভ জন্মদিন ভিক্টর হুগো