10/07/2021
তিন ইঞ্চি নদী কি???
সাড়ে তিন হাত নৌকা কি????
ভোলা মন ও ও ও ও
মন , মনরে মন আমার
ও দুটি মাংস পিন্ড লন্ড ভন্ড
করিল এই সোনার দেশ
তিন ইঞ্চি নদীতে পড়ে ,
সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ।
সেই নদীর মাঝখানে ভাই তিন কোনা এক চর,
কামিনী বাঘিনী নাচে চরের ও উপর ।
জীবের যাওয়া আসা নদীর ভিতর,
স্বর্গ নরক দুঃখ ক্লেশ ।
সেই নদীটির চৌদিকে ভাই ভয়ঙ্কর জঙ্গল,
তারই মাঝে পাতা আছে বাঘ মারা এক কল ।
যত লোভী কামি যায় রসাতল,
দেখে নদীর পরিবেশ ।
কেউ জানেনা সেই নদীটি গভীর যে কত,
ব্রহ্মা , বিষ্ণু , মহেশ্বর তার জানে না তত্ত্ব ।
ঢুবাইতে স্বর্গ মত্ত ,
লাগে নদীর এক নিমেষ ।
সেই নদীতে আসে রে ভাই মাসে মাসে ভাণ,
রসিক যারা চিনে তারা করিতেছে স্নান ।
গুরু অসীম না জানিয়া সন্ধান,
ধরল বাবার ভাবাবেশ ।
তিন ইঞ্চি নদীতে পড়ে ,
সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ।
" দুটো মাংসপিণ্ড লণ্ডভণ্ড
করিল এই সোনার দেশ"
তাৎপর্যঃ একং সৎ। অর্থাৎ ব্রহ্ম একমাত্র। তার অংশ বা কলা নেই।
মনুষ্যের যেমন ছায়া আছে, ব্রহ্মেরও যেন তদ্রূপ ছায়া আছে ; ব্রহ্মের ছায়ার নাম মায়া, প্রকৃতি। সৃষ্টির আগে ব্রহ্মের সহিত সম্মিলিত ভাবে তার ছায়া বর্তমান ছিল ; ঐ সময়ে ব্রহ্মের ছায়া রুপ প্রকৃতির পৃথক অস্ত্বিত্ব ছিল না। সৃষ্টিকালে ব্রহ্ম ও প্রকৃতি পৃথক হইলেন। তখন ব্রহ্মের নাম হইল পুরুষ এবং ব্রহ্মের ছায়ার নাম হইল প্রকৃতি। এই পুরুষ ও প্রকৃতির সমবায়ে বিশ্বজগৎ ও দেহজগৎ সৃষ্টি হইল।
উল্লেখিত গানের দুইটি মাংসপিণ্ড হইল যথাক্রমে পুরুষ এবং প্রকৃতি।
এই পুরুষ ও প্রকৃতির সমবায়ে জগৎ বা দেহ গঠিত হয়েছে বলে গানে বলা হয়েছে, দুইটি মাংসপিণ্ড ( পুরুষ ও প্রকৃতি) লণ্ডভণ্ড হইয়া ( বিভাজিত হইয়া) সোনার দেশ ( জগৎ বা দেহ ) গঠিত হইল।অহং ব্রহ্মাস্মি
-------------------
তিন ইঞ্চি নদীতে পড়ে
সাড়ে তিন হাতের নৌকা শেষ।।
তাৎপর্যঃ ঈড়া, পিঙ্গলা ও সুষম্না নাড়ীকে যথাক্রমে গঙ্গা নদী, যমুনা নদী ও সরস্বতী নদী বলা হয়। এই তিন নাড়ী বা তিন নদীর মিলিতস্থানকে ত্রিবেণী সঙ্গম বলা হয়। এই ত্রিবেণী তিন নাড়ী বা তিন নদীর সমবায়ে গঠিত বলে একে তিন ইঞ্চির নদী বলা হয়েছে। কবি এখানে রূপক ভাবে সংখ্যাকে ইঞ্চি বলেছেন। এই তিন ইঞ্চির নদীটি আমাদর আজ্ঞাচক্রে ( ভ্রুযুগলের মাঝখানে) অবস্থিত। সুতরাং তিন ইঞ্চির নদীর পরিচয় পাওয়া গেল। এবার দেখব যে, সাড়ে তিন হাতের নৌকা বলতে কাকে বোঝানো হইয়াছে এবং কিভাবে ঐ নদীতে পড়ে নৌকাটি শেষ হয় ।
মানব দেহের পরিমাণ সাড়ে তিন হাত হওয়ায় মানবদেহকে রূপক ভাবে সাড়ে তিন হাতের নৌকা বলা হয়েছে। মানবদেহ বলতে কি বোঝায়? হ্যাঁ, মানবদেহটি ২৪ তত্ত্বের সমবায়ে গঠিত।
ক্রিয়াযোগ সাধন ( প্রাণায়ামাদি ) করলে ২৪ তত্ত্ব আজ্ঞাচক্রে অর্থাৎ ত্রিবেণীতে লয় প্রাপ্ত হয় বলে বলা হয়েছে -- তিন ইঞ্চি নদীতে সাড়ে তিন হাতের নৌকা শেষ। আসুন, আমরা ক্রিয়াযোগ সাধন করে নিজ নিজ নৌকাকে তিন ইঞ্চি নদীতে ফেলে শেষ করে জন্ম মৃত্যুর পরপাড়ে উপনীত হই। আর কালঘুম ঘুমাবেন না ; শিঘ্র জাগুন, শিঘ্র।। সেই নদীর মাঝখানে ভাই তিন কোনা এক চর, কামিনী বাঘিনী নাচে চরের উপর। জীবের যাওয়া আসা চরের ভিতর, স্বর্গ নরক দুংখ ক্লেশ। সেই নদীর চৌদিকে ভাই ভয়ঙ্কর জঙ্গল,তারই মাঝখানে পাতা আছে বাঘ মারার কল।
তাৎপর্যঃ সেই নদীর অর্থাৎ ত্রিবেণীর অর্থাৎ আজ্ঞা চক্রের কুটস্থ চৈতন্যে আছে এক তিন কোনা চর ( ত্রিকোণ যন্ত্র) ।
কামিনী বাঘিনী নাচে চরের উপর অর্থাৎ কামিনী মানে যিনি মনের অভিশাস পুরণ করে দেন, বাঘিনী মানে যিনি বৈরাগ্য প্রদান করেন। উক্ত কামিনীর ( মহাদেবীর) ইচ্ছাতেই জীব জন্মায় আর বাঘিনী ( সরস্বতী) এর ইচ্ছাতেই জীব মৃত্যু বরন হয় ( মুক্ত হয়, ইহা কামনার মৃত্যু) । এ কারন, বলা হচ্ছে জীবের যাওয়া আসা চরের ভিতর। কামিনীর কামের কারনে জীব জন্মায় এবং ঐ কাম যতদিন জীব সরস্বতীর শ্রীপাদপদ্মে অর্পণ করতে পাচ্ছে না, ততদিন সে জন্মমৃত্যুর অধীন হয়ে সুখ( স্বর্গ) ও দুঃখ( নরক) ভোগ কচ্চে।
সেই নদীর চৌদিকে ভাই ভয়ংকর জঙ্গল অর্থাৎ ঐ নদীর চারদিকে সহস্র সহস্র অতি সুক্ষ্মাতিসুক্ষ নাড়ী রয়েছে এবং তারই উপর আছে বাঘ মারার কল অর্থাৎ যোগবিভুতি সমুহ বিসর্জ্জন করবার ক্রিয়া। কেউ জানে না সেই নদী গভীর কতো
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর জানে না তার তত্ত্ব
স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ডুবাইতে লাগে
ঐ নদীর এক মুহূর্ত।।
তাৎপর্যঃ
কেউ জানে না ঐ নদী গভীর কতো ---- ত্রিবেনী নদীতে কি আছে না আছে তা সাধারণে জানে না বলে বলা হয়েছে, " কেউ জানে না ঐ নদী গভীর কতো। "
কিন্তু যোগীগন ত্রিবেণীতে প্রবেশ করেছেন, তথায় বিদ্যমান আছে জ্ঞাতব্য সব কিছু -- ৪ বেদ, ১৮ পুরাণ, ১৪ শাস্ত্র, ভক্তি, শক্তি, মুক্তি ,বন্ধন.... প্রভৃতি। পুর্বে ঋষি গন ঐ নদী থেকেই স্বরজ্ঞান পেয়েছিলেন। স্বরজ্ঞান ২ ভাগে বিভক্ত সংগীত ও প্রাণায়ামাদি।
২। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর জানে না তার তত্ত্ব ---- ত্রয়ো দেবা ত্রয়ো গুণা অর্থাৎ তিনগুন হলো তিন দেবতা। সত্ত্ব গুনের ধারক বিষ্ণু, রজো গুনের ধারক ব্রহ্মা, তমো গুনের ধারক মহেশ্বর। পৃথক ভাবে শুধু সত্ত্বগুনের দ্বারা ঐ নদীতে প্রবেশ করতে পারা যায় না ; শুধু রজোগুণের দ্বারাতেও না ; শুধু তমো গুনের দ্বারাতেও না। এ কারন বলা হয়েছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব জানে না তার তত্ত্ব। কিন্তু গুনত্রয়কে মিলিত করে গুনাতীত হওয়া মাত্রই তার তত্ত্ব জানা যায়। সুতরাং তার তত্ত্ব জানতে হলে যোগসাধন করে গুনাতীত হতে হবে।
৩।। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ডুবাইতে লাগে তার এক মুহূর্ত ---- স্বর্গ মানে যথায় দৈবীভাব থাকে ; সত্ত্বগুনে দৈবীভাব থাকায় সত্ত্বগুনের অন্তরটা হলো স্বর্গ ; রজো গুনের অন্তরটা মর্ত্য আর তমো গুনের অন্তর( ভেতর টা) হলো পাতাল।
কথিত স্বর্গ, মর্ত্য ,পাতালকে ডুবাতে গুনাশ্রয়ার লাগে এক মুহূর্ত কাল। অর্থাৎ গুণাশ্রয়া ব্রহ্মার অন্তরে ব্রাহ্মী রুপে, শিবের অন্তরে রৌদ্রী রূপে এবং হরির অন্তরে লক্ষ্মী রুপে থেকে নিত্য তাদেরকে তার জলে সিক্ত করে রেখেছে। আজ ব্রহ্মার সৃষ্টি কর্ম যেটি হচ্ছে সেটি ব্রহ্মার অন্তরস্থ ব্রাহ্মী বা সরস্বতীর শক্তিতে ; এই রুপে হরির জগৎ পালন হচ্ছে হরির অন্তরে অবস্থিত লক্ষ্মীর শক্তিতে এবং শিবের সংহার কর্ম মাহেশ্বরীর শক্তিতে। সৃষ্টি জগৎ ঐ ত্রিবেণী তার এই তিনশক্তি দ্বারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবকে দিয়ে করাচ্চেন। সুতরাং ত্রিদেব, ত্রিবেণী নামীয় চণ্ডীর ভৃত্য মাত্র।
১০/৭/২১