12/08/2026
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত: নিচতলা শক্ত না করে ওপরের তলা মজবুত করা যায় না
প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সাবলীল পাঠক ও দক্ষ করে গড়ে তোলার তাগিদ আজ সর্বমহলে অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে পড়তে পারছে কি না, তা নিয়ে নানা মূল্যায়ন ও উদ্বেগ দেখা যায়। কিন্তু এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াটি ঠিক কোথা থেকে শুরু হওয়া উচিত—তা নিয়ে গভীর আত্মমূল্যায়নের সময় এসেছে।
তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণিতে ভালো পাঠক তৈরি করার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে একেবারে শুরুতেই—প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিতে।
মূল সমস্যার জায়গা: শেকড়ে টান না দিয়ে ডালাপালা সাজানোর চেষ্টা
একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গেলে যেমন সবার আগে প্রয়োজন অত্যন্ত মজবুত ও গভীর ভিত্তি, তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণি হলো সেই ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, আমরা নিচের শ্রেণিতে (অর্থাৎ ভিতের কাজটিতে) যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে শেষের দিকের শ্রেণিগুলোতে ভালো ফলাফল বা সাবলীল পাঠের জন্য মরিয়া হয়ে উঠি।
* ভিতের অবহেলা: প্রথম শ্রেণিতে বর্ণমালা চেনা, শব্দের সঙ্গে চিত্রের মিল করা, ধ্বনিগত সচেতনতা এবং আনন্দের সঙ্গে শেখার পরিবেশ তৈরি করার যে সময়টি, অনেক সময় তা তাড়াহুড়ো করে পার করে দেওয়া হয়।
* ওপরের শ্রেণিতে চাপের বোঝা: প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিতে শিশুদের মনে ভীতিহীন শিখন নিশ্চিত না করে যখন ওপরের শ্রেণিতে গিয়ে সাবলীল পাঠক বানানোর বাড়তি চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন তা হিতে বিপরীত হয়। শিক্ষার্থীরা শেখার আনন্দ হারিয়ে মুখস্থ বিদ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
শৈশব ও শিখন: প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির গুরুত্ব
শিক্ষা বিজ্ঞান বলে, শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশের সময় হলো তার জীবনের শুরুর বছরগুলো। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিতে যদি একজন শিশুর শিখনফল পুরোপুরি অর্জিত হয়, তবে তার সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পরবর্তী সব শ্রেণিতে পড়তে বাধ্য।
১. ভীতি দূরীকরণ: প্রথম শ্রেণিতে যদি শিখন আনন্দদায়ক হয়, তবে বিদ্যালয় ও পঠন-পাঠনের প্রতি শিশুর আজীবন এক ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।
২. স্বাভাবিক সাবলীলতা: জোর করে রিডিং পড়ানোর অভ্যাস করানোর চেয়ে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিতে বর্ণ ও শব্দের জগতকে সাবলীলভাবে শিশুর কাছে উন্মুক্ত করলে তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে গিয়ে তাকে আলাদা করে সাবলীল পাঠক বানানোর বাড়তি সংগ্রাম করতে হয় না। স্বাভাবিকভাবেই সে সাবলীল হয়ে ওঠে।
৩. টেকসই শিখন: একটি বিদ্যালয়ে যদি প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রথম শ্রেণির সকল শিক্ষার্থী শতভাগ শিখনফল অর্জন করতে পারে, তবে আগামী দিনে ২য়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীতে তাদের ফলাফল এবং দক্ষতা নিয়ে শিক্ষক বা অভিভাবকদের কোনো সংশয় থাকার কথা নয়।
আমাদের করণীয় ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
ওপরের তলা সাজানোর তাড়াহুড়ো বাদ দিয়ে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে শেকড়ের দিকে। এ জন্য প্রয়োজন:
* সম্পদের সঠিক বিন্যাস: প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিতে সবচেয়ে দক্ষ, উদ্যমী ও শিশুসুলভ শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া এবং তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
* মূল্যায়ন পদ্ধতি: শেষের শ্রেণির ফলভিত্তিক মূল্যায়নের চেয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বুনিয়াদি দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে কি না, তার ওপর কড়া নজরদারি রাখা।
* সহজলভ্য শিখন পরিবেশ: মুখস্থ বা শাস্তিমূলক পরিবেশের বদলে খেলাধুলা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
উপসংহার
একটি সুন্দর, টেকসই ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে প্রথম ইটটিতে। আমরা যদি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিকে অবহেলা করে কেবল পঞ্চম শ্রেণির ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকি, তবে তা হবে বালির ওপর ঘর বাঁধার শামিল। তাই নিচতলা বা ভিতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি শিশুকে শুরু থেকেই দক্ষ করে গড়ে তুলি; তবেই উচ্চতর শ্রেণিতে সাবলীল পাঠক ও মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করা সহজ ও স্বাভাবিক হবে। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, প্রথম ধাপ মজবুত হলে আগামী দিনের পথচলা আপনা আপনিই সুন্দর ও সফল হবে।
সাইদুর রহমান টুটুল
ঝিনাইদহ।