14/08/2025
ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয় — আমার প্রথম প্রেম
এটি আমার প্রথম কর্মস্থল—তাই হৃদয়ের গভীর থেকে ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়কে ভালোবাসি। একুশ বছরের বেশি সময় ধরে আমি এখানে কর্মরত ছিলাম। আজ আমি অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হলেও, আমার প্রথম কর্মস্থলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, এলাকার মানুষ—সকলকেই সমানভাবে স্মরণ করি। তাঁরাও আমাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতায় ভরিয়ে দিয়েছেন; কারো মধ্যে কখনো কার্পণ্য দেখিনি।
জীবনের প্রথম প্রেম যেমন ভোলার নয়, তেমনি প্রথম কর্মস্থলও। কেউ ডাকুক আর না ডাকুক—এটি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার পরিবারের মতোই ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ও আমার সুখ-দুঃখের সাথী।
স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে কত কত ছবি—ক্লাসরুমের ব্যস্ততা, অফিসরুমের কর্মচাঞ্চল্য, লাইব্রেরির নিঃশব্দ জগৎ, কম্পিউটার ল্যাবের প্রযুক্তি-গন্ধ, খেলার মাঠের উল্লাস, কাঁঠালতলার আড্ডা, সারি সারি নারিকেল গাছ, মেহগনি বাগান, বেলগাছের ছায়া, সামনে সবজি বাগান, দুই পাশে মাছের পুকুর, আর পাশে মসজিদ ও শিবমন্দির।
শিবমেলার সেই রঙিন দিনগুলো—ঝালমুড়ি, চটপটি, জিলাপি, নানান রকম মিষ্টি, পেঁয়াজু; খেলনার দোকান, নাগরদোলা, পুতুলনাচ, সার্কাস—সবই যেন আজও চোখে ভাসে। পাকড় গাছের নিচে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আড্ডা জমে উঠত প্রাণের টানে।
আমার মনে আছে এ্যাথলেটিক্স, ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট, সাঁতার—নানা আয়োজনের কথা। ছাত্রজীবন থেকেই স্কাউটিং করায় স্কাউট শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, আর ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে উপভোগ করেছি অসংখ্য সাফল্য—উপজেলা, জেলা, উপঅঞ্চল, অঞ্চল, এমনকি জাতীয় পর্যায় থেকে রানারআপ ও চ্যাম্পিয়ন ট্রফি অর্জন।
যেমন আনন্দ পেয়েছি, তেমনি কষ্টের মুখোমুখিও হয়েছি। জীবনে বিরল যে অভিজ্ঞতা—ছাত্র পেটানোর অভিযোগে মামলা, হাইকোর্টের রুল—আমার কপালেও জুটেছিল। একজন ক্রীড়া শিক্ষকের পক্ষে তার জবাব দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সকলের ভালোবাসা, সহকর্মীদের সহযোগিতা সেই কষ্ট মুছে দিয়েছে, আমাকে ঋণী করেছে।
যাঁর হাত ধরে আমি চাকরি পেয়েছিলাম—তৎকালীন প্রধান শিক্ষক, চিরকুমার মরহুম আবুল ফজল তাজ উদ্দিন স্যার—তাঁর প্রতি রয়েছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁর সাথে গল্প করা, সন্ধ্যায় সাইদুর ভাইয়ের হ্যারিকেন জ্বালানো—এসবই হৃদয়ে অমলিন।
আমার দেখা সবচেয়ে স্মার্ট শিক্ষক—জনাব কার্তিক চন্দ্র সাহা (সহকারী প্রধান শিক্ষক)। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আমি সবসময় প্রশ্নবানে ব্যস্ত রেখেছি।
এখন এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের বয়স ১০৫ বছর—উপজেলার শতবর্ষ বিদ্যালয়ের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। মনে পড়ে মরহুম মজিবর রহমান, বারীন্দ্র কিশোর চক্রবর্তী, আবুল কাশেম স্যার, মতিয়ার রহমান স্যার, মরহুম নুরুল ইসলাম স্যার—যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও মানবিকতায় আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।
বর্তমানে শক্ত হাতে হাল ধরেছেন প্রধান শিক্ষক জনাব মোহাম্মদ শাহজাহান স্যার—আমার জীবনের উন্নতিতে তিনি একজন অভিভাবকতুল্য। লোকমান হেকিম স্যার, মাওলানা জহিরুল ইসলাম স্যার, বড় বোনের মতো মাকসুদা আক্তার ম্যাডাম, শাহনাজ আক্তার—সবাই দিয়েছেন ভালোবাসা ও সম্মান।
আমার স্নেহধন্য ছোটভাইয়ের মতো সহকর্মীরা—আব্দুল আহাদ, রফিকুল ইসলাম, শারমিন আক্তার পলি, মিজানুর রহমান, মনিরুজ্জামান, আব্দুল হক, সেলিম হোসেন, মোতালেব হোসেন, মোকবুল—সবাই আমাকে মর্যাদা দিয়েছেন। অফিস সহকারী নুর মোহাম্মদ ভাই, গফুর ভাই—এঁদের আন্তরিকতা ভোলার নয়। আমার প্রিয় ছাত্র আজহারউদ্দীন, ফিরোজ, রফিক, আব্দুল আলিম—তাঁদের অবদানও গভীরভাবে মনে আছে।
কিন্তু হৃদয়ে সবচেয়ে দাগ কেটেছে আমার বিদায়ের দিন—যেদিন ফরিদা পারভীন অঝোরে কেঁদেছিল।
আমি জানি, আমার কর্মস্থল ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকি। তাই ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়, তুমি ভালো থেকো—তুমি আর তোমরা সবাই ভালো থেকো।
লেখক- মোহাম্মদ ছালাহ্ উদ্দিন
সহকারী প্রধান শিক্ষক
ফয়জুন নেছা উচ্চ বিদ্যালয়,বরাইদ।
তারিখঃ ১৪-০৮-২০২৫ খ্রি.