জামি'আ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.ঢাকা
আদর্শবান ছাত্র গড়ার লক্ষ্যে কাজ করি
05/06/2024
জিলহজ মাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল
-মুফতি আব্দুল্লাহ আল মামুন সিলেটী হাফি.
-------------------------------------------------------------------
১. সামর্থবান হলে হজ ও উমরা করা। সুরা আলে-ইমরান, আয়াত নং- ৯৭, সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ১৫২১, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ১৯৮৬।
২. কুরবানি দেওয়ার মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে, ১০ই জিলহজ থেকে ১২ ই জিলহজ সূর্যান্ত পর্যন্ত– এ সময়ের মধ্যে কুরবানি করা। সুরা কাউসার, আয়াত নং- ০২, সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৯৬৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৯৬০।
৩. অধিক পরিমাণ আল্লাহর জিকির করা। সুরা হজ, আয়াত নং- ২৮।
৪. অধিক পরিমাণ নেক আমল করা। সহিহ বুখারী, হাদিস নং- ৯৬৯।
৫. এই দশদিন নখ-চুলসহ শরীর থেকে কোনো কিছু না কাটা। কুরবানির পর কাটা। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৯৭৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ২৭৮৯, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং- ৫৮৯৭।
৬. বেশি-বেশি তাকবীর (তথা আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ), তাহমীদ (তথা আলহামদুলিল্লাহ) ও তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ) পাঠ করা। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং- ১৪১১০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং- ৫৪৪৬, তাবারানি কাবির, হাদিস নং- ১১১১৬।
৭. ঈদের দিন ও তার পরবর্তী দুইদিন ব্যতীত বাকি দিনগুলোতে রোজা রাখা। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং-৯২২১, জামে তিরমিজি, হাদিস নং- ৭৪৯, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ২৪৩৮।
৮. হাজীগণ ব্যতীত অন্যরা আরাফার দিনের (৯ই জিলহজের) রোজা রাখা। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১১৬২, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং- ২২৫১৭, আল মুজামুল আওসাত, হাদিস নং- ২০৬৫।
৯. আরাফার দিন তথা ৯ই জিলহজের ফজরের নামাজ থেকে ১৩ই জিলহজের আছর পর্যন্ত, একবার করে; তাকবীরে তাশরীক পড়া। আর তা হলো-
الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله، والله أكبر الله أكبر، ولله الحمد.
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ। ইলাউস সুনান- ৮/১৫২, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং- ৫৬৩১।
১০. ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজ পড়া। সুরা কাউসার, আয়াত নং- ০২, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ৮৮৪, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ১২৯২।
১১. ঈদের দিনের যাবতীয় সুন্নত আদায়ে সচেষ্ট হওয়া। জামে তিরমিযি, হাদিস নং- ২৬৭৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৪৬১২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ৪২।
06/01/2024
শরীয়তের দৃষ্টিতে ভোট সংক্রান্ত কিছু কথা
----------------------------------------------------------
১. ভোট শব্দের শাব্দিক অর্থ মত বা রায়। আর পরিভাষায় ভোট বলা হয়, কাউকে তার সততা, বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতার সাক্ষ্য দিয়ে প্রতিনিধিত্বের পদের জন্য সমর্থন করা।
২. যদি ইসলামের দাবি এবং জনগণের ন্যায্য দাবি পেশ করার একমাত্র যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোক পাওয়া যায় আর তিনি কোনো অনৈসলামিক দলভুক্ত না হন, তাহলে তাকে প্রতিনিধিত্বের পদে বরণ করা ওয়াজিব।
৩. যদি একাধিক যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোক পাওয়া যায়, তাহলে যিনি অধিক ইসলাম-দরদী এবং গরীব-দরদী হবেন, তাকে সমর্থন করা মুস্তাহাব।
৪. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হারাম ও কবিরা গোনাহ'র অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং অযোগ্য, অসৎ ও অবিশ্বস্তকে; যোগ্য, সৎ ও বিশ্বস্ত বলে সাক্ষ্য দেওয়া মিথ্যা সাক্ষ্য। অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রতিনিধিত্ব দেওয়াও মারাত্মক পাপ– যা কেয়ামতের আলামত। আত্মীয়তার খাতিরে, দল-মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে অথবা নিজ এলাকার হওয়ায়; অযোগ্য, অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ ও ধর্মদ্রোহীকে প্রতিনিধিত্বের পদের জন্য বরণ করাও মহাপাপ– যা শরীয়তে হারাম।
৫. কার মাঝে প্রকৃত যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা আছে, সেটা জানা খুব মুশকিল। যদি কারও অবিশ্বস্ততা সাব্যস্ত না হয় এবং সে সর্বদা বিশ্বস্ত থাকার অঙ্গীকার করে আর এমতাবস্থায় তারচে' অধিক বিশ্বস্ত লোকও বিদ্যমান না থাকে, তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মুবাহ বা বৈধ।
৬. অন্যের কাছে নিজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের পদ চাওয়া নাজায়েয। বরং জনগণের কর্তব্য হলো, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের পদ দেওয়া। তবে জনগণ যদি বিশ্বস্ত ও সৎ ব্যক্তি চিহ্নিত করতে অপারগ হয়, এমতাবস্থায় কোনো অসৎ ব্যক্তি উক্ত সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ায় অথচ বাস্তবে ওই সমাজে প্রকৃত বিশ্বস্ত ও যোগ্য লোক বিদ্যমান আছে কিন্তু জনগণের তা অজানা, তাহলে এক্ষেত্রে উক্ত যোগ্য লোকের জন্য নিজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের পদ চাওয়া জায়েয।
৭. ভোট একটি আমানত। যাকে-তাকে ভোট দেওয়া যাবে না। বরং ভোট পাওয়ার উপযুক্ত এমন লোককে ভোট দিতে হবে।
৮. কেন্দ্র দখল করা, জোর করে সিল মারা অথবা অন্যের ভোট দেওয়া– এগুলো সবই কবিরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত।
৯. ডাবল ভোট ও জাল ভোট দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে ধোঁকা ও মারাত্মক গোনাহ।
১০. ভোট ক্রয়-বিক্রয় করা নাজায়েয ও হারাম। বর্তমানে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীরা ভোটারদের মাঝে যে টাকা-পয়সা, চা-নাস্তা, বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি বিতরণ করে থাকে, তা ভোটারদেরকে নিজের স্বপক্ষে ভোট প্রদানের উদ্দেশ্যেই দিয়ে থাকে। আর সাক্ষীকে নিজের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য কোনোকিছু দেওয়া ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। উপরিউক্ত সুরতগুলো ভোট ক্রয়-বিক্রয়েরই অন্তর্ভুক্ত। অতএব, এগুলো শরীয়তে হারাম।
১১. পর্দার প্রতি পূর্ণ খেয়াল রেখে মহিলারাও কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে।
১২. যদি কেউ কসম করে- “আমি অমুক প্রার্থীকে ভোট দিবো না”, কিন্তু বাস্তবে উক্ত প্রার্থীটি ভোট পাওয়ার উপযুক্ত হয়; তাহলে এক্ষেত্রে কসমকারী ভোটারের কর্তব্য হলো, সেই প্রার্থীকে ভোট দিয়ে কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায় করা।
১৩. কোনো যোগ্য প্রার্থী থাকলে, তাকে ভোট দেওয়া কর্তব্য। যোগ্য ব্যক্তি থাকলে বিনা ওজরে তাকে ভোট প্রদান না করা, সত্য গোপন করার নামান্তর। আর সত্য গোপন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম ও কবিরা গোনাহ।
১৪. যে প্রার্থী ইসলামবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, যার দ্বারা ইসলামের ক্ষতি হতে পারে অথবা ইসলাম যাকে প্রার্থী হতে অনুমতি দেয় না, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া নাজায়েয।
১৫. যাকে ভোট দেওয়া হবে, সে যদি নির্বাচিত হওয়ার পর; চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার ও দূর্নীতিতে লিপ্ত হয়, তাহলে তার গোনাহের একটি অংশ ভোটদাতার আমলনামায় যুক্ত হবে।
১৬. কোনো আসনে একজন লোককেও যদি সাক্ষ্য ও ভোট দেওয়ার উপযুক্ত মনে না হয় তবে তাদের মধ্যে যে জন নীতি-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা ও কাজে-কর্মে অন্য প্রার্থীর তুলনায় কম খারাপ তাকেই ভোট দিতে হবে।
-লিখেছেন মুফতি আব্দুল্লাহ আল মামুন সিলেটী হাফিজাহুল্লাহ,
প্রধান মুফতি ও পরিচালক: জামি‘আ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ঢাকা।
28/06/2023
কুরবানির ফাযায়েল ও মাসায়েল (সকল পর্ব একসাথে)
কুরবানির পরিচয়
---------------------------------
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পশু, যথা: উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ছাগল ও ভেড়া নির্ধারিত দিনগুলোতে (যিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে) জবাই করা। (রদ্দুল মুহতার- ৫/১২৯, আলমাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ- ৫/৭৪)।
ফায়েদা: ইবাদতের মূলকথা হলো, আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। প্রথমত: ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ‘ইবাদত’ পালন করা। দ্বিতীয়ত: শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী ‘ইবাদত’ সম্পাদন করা। এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে কুরবানি সংক্রান্ত জরুরি কিছু ফাযায়েল ও মাসায়েল উপস্থাপিত হবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় সঠিক মাসায়েল অনুযায়ী এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত (কুরবানি) আদায় করার তাওফিক দিন। আমিন।
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
--------------------------------------------
হযরত আদম (আ.) থেকে আরম্ভ করে, সকল নবির শরিয়তে বিশেষকরে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সময় থেকে, কুরবানি বিশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। কুরবানি আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পনের নজিরবিহীন নমুনা। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিকে অম্লান রাখার নিমিত্তে “দ্বীনে মুহাম্মাদী”-তেও কুরবানির আমল, অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত এবং ইসলামের প্রতীক হিসেবে প্রবর্তিত হয়। স্বয়ং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগ থেকে এ পর্যন্ত, মুসলিম জাহানের সর্বত্র বিশেষ মর্যাদার সাথে কুরবানি পালিত হয়ে আসছে। কুরবানি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- “তোমাদের কুরবানির পশুর গোশত, রক্ত– কোনোটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে শুধু তোমাদের আন্তরিকতা ও আল্লাহ-ভীরুতা। (সুরা হজ, আয়াত- ৩৭)।
এক হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত ফাতেমা (রা.)-কে তার কুরবানির পশুর নিকট উপস্থিত থাকতে বলেন এবং ইরশাদ করেন, এই কুরবানির পশুর প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সাথে-সাথে আল্লাহ তায়ালা তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা শুধু মুহাম্মাদী পরিবারবর্গের বৈশিষ্ট্য, নাকি সকল মুসলিমের জন্য? তিনি উত্তরে বললেন, এই ফজিলত আমাদের এবং সকল মুসলিমের জন্য। (আততারগীব ওয়াত তারহীব- ২/৯৯)।
অপর এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সওয়াবের উদ্দেশ্যে আনন্দের সাথে, কুরবানি করবে; এ কুরবানি তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার মাধ্যম হবে। (আততারগীব ওয়াত তারহীব- ২/১০০)।
কুরবানি না করার কারণে হুঁশিয়ারি: অপরদিকে যারা সামর্থবান হওয়া সত্ত্বেও, কুরবানি করে না; তাদের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যারা সাধ্য ছিলো কুরবানি দেওয়ার কিন্তু কুরবানি দিলো না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে উপস্থিত না হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ৩১২৩)।
মাসআলা
--------------------
কুরবানি কার উপর ওয়াজিব: ১০ই যিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ই যিলহজ সুর্যাস্ত পর্যন্ত, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক-সম্পন্ন মুসলমান মুকীম ব্যক্তি (মুসাফির নয়), যার কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্য, মৌলিক প্রয়োজন অতিরিক্ত, অন্যকোনো আসবাবপত্র থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। স্বর্ণ বা রুপা কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না হয়, তবে স্বর্ণ বা রুপা উভয়টি মিলে কিংবা এর সাথে প্রয়োজন অতিরিক্ত অন্য বস্তুর মূল্য মিলে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্য হয়, তাহলেও কুরবানি ওয়াজিব হবে।
বি. দ্র. টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র– এসব কিছুর মূল্য কুরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। (সহিহ মুসলিম- ১/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৬, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯২।
কুরবানি আদায় হওয়ার শর্ত
------------------------------------------------
কুরবানি আদায় হওয়ার শর্ত সর্বমোট ৬টি:
১. কুরবানিদাতার নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া, অর্থাৎ অন্তরে কেবল আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকা। সুতরাং লৌকিকতা, প্রতিযোগিতা কিংবা গোশত খাওয়া বা কুরবানি না করলে, সমাজ কী বলবে ইত্যাদি– এ জাতীয় নিয়তে কুরবানি করলে, কুরবানি আদায় হবে না।
২. শরিকী কুরবানি হলে, আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত ব্যতীত অন্যরূপ নিয়ত পোষণকারীকে কুরবানির পশুতে শরিক না করা।
৩. কুরবানিদাতা অবশ্যই কুরবানির পশুর মালিক হতে হবে।
৪. কুরবানিদাতা ব্যতীত অন্য কেউ পশু জবাই করলে, এতে কুরবানিদাতার সুস্পষ্ট কিংবা ইঙ্গিতবহ অনুমতি থাকতে হবে।
৫. কুরবানির পশু শরিয়তে গ্রহণযোগ্য ও দোষমুক্ত হতে হবে।
৬. কুরবানিকারীর কুরবানিকালে অবশ্যই নিয়ত থাকতে হবে। কেননা নিয়ত ইবাদতের মূল স্তম্ভ। অবশ্য ফিকহ-বিশারদগণ গরীবের ক্ষেত্রে কুরবানির জন্য পশু খরিদ করে নেওয়াকে, নিয়তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৯, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯২)।
বর্তমান সময়ের অধিকাংশ মহিলার উপর কুরবানি ওয়াজিব: মহিলাদের কাছে যদি নেসাব পরিমাণ নিজস্ব মাল বা গয়না-পত্র, নগদ মহরের টাকা ইত্যাদি থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৬, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯২, আদ্দুররুল মুখতার- (৫/২৯২)।
কিছু স্বর্ণের সাথে নগদ এক/দুই টাকা: কোনো ব্যক্তির নিকট ১ ভরি স্বর্ণ এবং নগদ এক/দুই টাকাও আছে, তাহলে স্বর্ণের মূল্য বের করে রুপার নেসাব সাড়ে বায়ান্ন ভরির সমমূল্যের হয়ে গেলে, কুরবানি ওয়াজিব হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী-৫/২৯২,আদ্দুররুল মুখতার- ৬/৩১৬, ফাতাওয়া উসমানী-২/৩৯)।
যৌথ পরিবারের সকলের কুরবানি: যৌথ পরিবারে অনেক সময়, স্বামী, স্ত্রী, বালেগ সন্তান প্রত্যেকে আলাদা-আলাদা নেসাবের মালিক হয়, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকের নামে আলাদা কুরবানি করা ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৬, কেফায়াতুল মুফতী- ৮/১৮০)।
প্রতিবছর নাম পরিবর্তন করে কুরবানি: কোনো কোনো স্থানে মানুষ একবছর নিজের নামে, এক বছর ছেলের নামে আরেক বছর স্ত্রীর নামে কুরবানি করে। অর্থাৎ প্রতিবছর নাম পরিবর্তন করতে থাকে এটা জায়েয নয়। বরং যার উপর কুরবানি ওয়াজিব হয়, প্রতিবছর শুধু তার নামেই কুরবানি করা আবশ্যক। অন্যের নামে করলে নিজের ওয়াজিব কুরবানি আদায় হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৬, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৬/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার- ৬/৩১৬)।
নাবালেগের কুরবানি:
নাবালেগ ছেলে-মেয়েদের পক্ষ থেকে কুরবানি করা অভিভাকের উপর ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব। নাবালেগ ছেলেমেয়ে মালদার হলেও, তাদের মাল থেকে কুরবানি করা যাবে না। (কানযুল উম্মাল- ৫/২২৯, আদ্দুররুল মুখতার- ৬/৩১৫-১৬, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৬)।
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে কুরবানি: প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে কুরবানি করা পিতার জিম্মায় জরুরি নয়। যদি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজে মালদার হয়, তখন সে স্বয়ং কুরবানি করবে অথবা পিতাকে অনুমতি দিয়ে দিবে। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অনুমতিতে পিতা তার পক্ষ থেকে কুরবানি করতে পারবেন। (বাদায়েউস সানায়ে:৫/৬৪, আলবাহরুর রায়েক- ৮/১৭৮, রদ্দুল মুহতার- ৬/৩১৫)।
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানি
----------------------------------------
১. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে, তবে সেটি নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানির ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে, তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। বরং গরীব-মিসকিনদের মধ্যে সদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমাদ- ১/১০৭, ইলাউস সুনান- ১৭/২৬৮)।
২. যদি কয়েক ব্যক্তি একসাথে মিলে একটি ছাগল খরিদ করে অথবা গরুর এক-সপ্তমাংশ একাকী হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে অথবা অন্যকোনো এক ব্যক্তির নামে নফল কুরবানি করে, তবে তা সহিহ হবে। (মাজমাউল আনহুর- ৪/১৭৩, ফাতাওয়া কাসিমিয়্যাহ- ২২/৩১৮, ইমদাদুল ফাতাওয়া- ৩/২৮৮, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া- ২৬/১৩৮)।
যে সকল অবস্থায় কুরবানি ওয়াজিব:
১. কুরবানির দিনসমূহে যদি কারও কাছে কুরবানির নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।
২. যদি কেউ কুরবানির নযর ও মান্নত করে, তাহলে তার উপরও কুরবানি ওয়াজিব হবে।
৩. কুরবানি ওয়াজিব না হওয়া সত্ত্বেও, যদি কেউ কুরবানির নিয়তে পশু ক্রয় করে, তাহলে তার উপরও কুরবানি ওয়াজিব হবে।
৪. যদি কেউ কুরবানির ওসিয়ত করে মারা যায় এবং তার পরিত্যাজ্য সম্পদ থেকে এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ দ্বারা তা পালন করা সম্ভব হয়, তাহলে ওয়ারিশদের উপর তার ওসিয়ত পালন করা ওয়াজিব। (সহিহ বুখারি- ২৫৯২, বাদায়েউস সানায়ে- ৫/৬১-৬৫, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯১-২৯৩)।
যে ধরণের জমি বা বাড়ির ক্ষেত্রে কুরবানি ওয়াজিব:
প্রয়োজন অতিরিক্ত জমি অর্থাৎ, যে জমি বাৎসরিক খোরাকির জন্য প্রয়োজন হয় না, তা কুরবানির নেসাবে হিসাব করা হবে। ঠিক তদ্রুপ অনাবাদি জমির মূল্য নেসাবে হিসাব করা হবে।
অনুরূপভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, যেমন ভাড়া দেওয়া বাড়িও (যার আয় মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত) কুরবানির নেসাবে হিসাব করা হবে। (আদ্দুররুল মুখতার- ৫/১৯৮, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া- ৬/২৮৬, আলবিনায়া- ৯/১২৫)।
দুইজনে মিলে কুরবানির পশু জবাই করা:
যদি একজন অর্ধেক জবাই করে ছেড়ে দেয়, অতঃপর আরেকজন এসে জবাই সম্পূর্ণ করে; এমতাবস্থায় উভয়ে বিসমিল্লাহ পড়লে কুরবানি সহিহ হবে। অন্যথায় কুরবানি সহিহ হবে না। এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। (সুরা আনআম, আয়াত- ১২১, রদ্দুল মুহতার- ৯/৫০৪)।
দশজন মিলে দুই গরু কুরবানি করা:
দশজন মিলে যদি দুটি গরু ক্রয় করে, নির্দিষ্ট করা ব্যতীত কুরবানি করে, তাহলে কারও কুরবানিই সহিহ হবে না। কেননা সেখানে দুটি গরুর মধ্যে ১০ জনই শরিক থাকবে। তবে তারা যদি কুরবানি করার আগে পাঁচজন করে দুইভাগ হয়ে যায় এবং কে কোনটায় শরিক তা নির্ধারণ করে নেয়, তাহলে সকলের কুরবানি সহিহ হবে। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২০৮, রদ্দুল মুহতার- ৬/৩১৬)।
শরিকদের কারও উপার্জন হারাম হলে:
শরিকদের কারও পুরো উপার্জন বা অধিকাংশ উপার্জন হারাম হলে, কারও কুরবানি সহিহ হবে না। (মিশকাত-২৪৩, রদ্দুল মুহতার-৫/২৭৩)।
কুরবানির দিনসমূহে নগদ টাকা না থাকলে:
নেসাবের মালিক ব্যক্তির কাছে, কুরবানির দিনসমূহে নগদ টাকা না থাকলেও, তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। যদি প্রয়োজন অতিরিক্ত কোনো জিনিসপত্র তার কাছে থাকে, তা বিক্রি করে হোক বা ঋণ করে হোক, সে তার ওয়াজিব কুরবানি আদায় করবে। (রদ্দুল মুহতার- ৬/৩১৬, কিতাবুল ফাতাওয়া- ৪/১৩৩)।
কুরবানি না করতে পারলে:
কেউ যদি কুরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানি দিতে না পারে, তাহলে কুরবানির পশু ক্রয় না করে থাকলে, তার উপর পরবর্তীতে কুরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করেছিলো কিন্তু কোনো কারণে কুরবানি দেওয়া হয়নি, তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দিবে কিংবা তার ন্যায্য মূল্য সদকা করবে। তবে যদি কুরবানির দিনের পর ওই পশু জবাই করে ফেলে, তাহলে পশুর পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায়, তাহলে যে পরমাণ মূল্য হ্রাস পেলো, তাও সদকা করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২০৩, রদ্দুল মুহতার- ৬/৩২১, ফাতাওয়া কাযীখান- ৩/৩৪৫)।
কুরবানির পশু মারা গেলে বা হারিয়ে গেলে অথবা চুরি হয়ে গেলে, করণীয় কী?
--------------------------------------------------------------------------------------
কুরবানির পশু ক্রয় করার পর কুরবানি দেওয়ার পূর্বেই তা মারা গেলে বা হারিয়ে গেলে অথবা চুরি হলে, ধনী ব্যক্তির জন্য (যার উপর কুরবানি ওয়াজিব) নতুন করে পশু ক্রয় করে কুরবানি দিতে হবে। কিন্তু গরীব (যার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়)-এর জন্য নতুন করে কুরবানির পশু ক্রয় করে, কুরবানি করা আবশ্যক নয়। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ৪/৩১৪৯, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২১৬)।
নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে:
কুরবানির পশু হারিয়ে যাওয়ার পর, আরেকটি কিনে ফেললে, অতঃপর হারানোটিও পাওয়া গেলে, কুরবানিদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়), দুটি পশুই কুরবানি করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে, কোনো একটি কুরবানি করলেই চলবে। তবে উভয়টি কুরবানি করাই ভালো। (ইলাউস সুনান- ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৯)।
গর্ভবতী পশুর কুরবানি: গর্ভবতী পশু কুরবানি করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি জীবিত বাচ্চা পাওয়া যায়, তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে, সে পশু কুরবানি করা মাকরুহ। (মুয়াত্তা মালেক- ১৮৬, ফাতাওয়া কাযীখান- ৩/৩৫০, রদ্দুল মুহতার- ৬/৩২২)।
যে সকল রোগাক্রান্ত জন্তু দিয়ে কোরবানি জায়েয নয়
--------------------------------------------------------------------------------
১. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না, এমন পশুর কুরবানি জায়েয নয়। (জামে তিরমিযী- ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ- ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২১৪)।
২. এমন শুকনো-দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, তা দ্বারা কুরবানি করা জায়েয নয়। (জামে তিরমিযী- ১/২৭৫, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯৮, বাদায়েউসসানায়ে- ৪/২১৪)।
৩. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এতো বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না, এমন পশু দ্বারাও কুরবানি করা জায়েয নয়। (বাদয়েউস সানায়ে-৪/২৯৮, আদ্দুররুল মুখতার- ৬/৩২৪)।
৪. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যার কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে পশুর কুরবানি জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানি করা জায়েয। (জামে তিরমিযী- ১/২৭৬, রদ্দুল মুহতার- ৬/৩২৩, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯৭)।
৫. যে পশুর লেজ বা কোনো কানের এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানি জায়েয নয়। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। (মুসনাদে আহমদ- ১/৬১৫, ইলাউস সুনান- ১৭/২৩৮, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯৭-২৯৮)।
৬. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট বা এক চোখের দৃষ্টিশক্তি এক-তৃতীয়াংশ বা তারও অধিক নষ্ট হয়ে গেছে সে পশু কুরবানি করা জায়েয নয়। (জামে তিরমিযী- ১/২৭৫, ফাতাওয়া কাযীখান- ৩/৩৫২, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২১৪)।
জবাইকারীকে হাদিয়া/পারিশ্রমিক দেওয়া:
কুরবানির পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানির পশুর কোনো কিছু জবাইকারী, কসাই, কর্মচারী, বাড়ির কাজের লোক ও গৃহ পরিচারিকাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া বা খাওয়ানোও বৈধ হবে না। কাজের বিনিময় বা পারিশ্রমিক আদায়ের পর উক্ত কুরবানির গোশত ইত্যাদি দেওয়া বৈধ। (রদ্দুল মুহতার- ৫/২০৯, কেফায়াতুল মুফতী- ৮/২১৯, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া- ২৬/৩৮৬)।
পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা:
যদি বিক্রেতা কুরবানির পশুর বয়স পূর্ণ
হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানি করা যাবে।
(জাওয়াহিরুল ফিকহ- ১/৪৪৯, আহকামে ইদুল আজহা- ৪১, মুফতী শফী রহ.)।
কুরবানির পশু জবাই করার সুন্নত পদ্ধতি:
কুরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করা উত্তম। তবে কেউ যদি ভালোভাবে জবাই করতে না পারে, তখন যে জবাই করার নিয়ম পদ্ধতি জানে, তাকে দিয়ে জবাই করাবে। জবাইয়ের সময় কুরবানিদাতার উপস্থিত থাকা উত্তম। (আলমাবসুত, সারাখসী- ১২/১৮, ফাতহুল কাদির- ৯/৫৩৩)।
কুরবানি করার সময় মুখে নিয়ত করা ভালো, তবে তা জরুরি নয়। কুরবানি সহিহহওয়ার জন্য এতটুকু নিয়তই যথেষ্ট যে, মনে-মনে খেয়াল রাখবে, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে কুরবানি করছি।
জবাই করার পদ্ধতি হলো, পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে দিবে, বাকি শরীর উত্তর দিকে থাকবে। পাগুলো পশ্চিমমুখী করে দিবে। জবাইকারী পশ্চিম দিকে মুখ করে জবাই করবে। জবাইকারী ও ছুরিতে জবাইকারীর সাহায্যকারীর জন্য বিসমিল্লাহ বলে জবাই করা ওয়াজিব। তবে যদি ভুলে বিসমিল্লাহ না পড়া হয় তাহলেও কুরবানি সহিহ হয়ে যাবে। ছুরিতে সাহায্যকারী ছাড়া পশু জবাই করার কাজে নিয়োজিত অন্য সবাই উচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ বলা ভালো। (রদ্দুল মুহতার- ৯/৪৫২, আহসানুল ফাতাওয়া- ৭/৪০৬)।
ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করা মুস্তাহাব। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া- ১৭/৩৯৬, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯০)।
কুরবানির পশু জবাই করার পর প্রাণ থাকা অবস্থায়, জবাইকৃত স্থানে ছুরি দিয়ে খোঁচা দেওয়া, ঘাড় মটকানো এবং পায়ের রগ কাটা ও চামড়া ছাড়ানো যাবে না। এগুলো
করা পশুর উপর জুলুম এবং এতে কুরবানি শুদ্ধ হলেও এমন কাজ করা মাকরুহে তাহরীমী। (রদ্দুল মুহতার- ৯/৪২৭, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া- ২৬/১৭৩-১৭৪)।
কুরবানি কত দিন করা যায়:
যিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজের পর থেকে
১২ তারিখ সূযার্স্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কুরবানি করা যাবে। তবে প্রথম দিনকুরবানি করা সবচেয়ে উত্তম। তারপর পযার্য়ক্রমে ১১ ও ১২ তারিখ। (ফাতাওয়া আলমগীরী-৫/২৯৫, রদ্দুল মুহতার- ৫/২১৯)।
যেসব পশু কুরবানি করা যায়:
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা– এসব
গৃহপালিত পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েয আছে। (ফাতাওয়া কাযীখান- ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৩৫, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২৯৭)।
কুরবানির পশুর বয়সসীমা:
কুরবানি সহিহ হওয়ার জন্য ছাগল, ভেড়া, দুম্বা– এক
বছর বয়সের আর গরু-মহিষ– দুই বছর বয়সের এবং উট– পাঁচ বছর বয়সের হতে হবে।
তবে ছয় মাসের ভেড়া বা দুম্বা যদি এমন মোটাতাজা হয়, যা দেখলে এক বছরের ভেড়া বা দুম্বার মতো মনে হয়, তাহলে তা দিয়েও কুরবানি আদায় করা যাবে।
বকরিসহ অন্যান্য পশু নিধার্রিত বয়সের একদিন কম হলেও কুরবানি করা সহিহ হবে না। (ফাতাওয়া কাযীখান- ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২০৫-২০৬, ফাতাওয়া আলমগীরী- ৫/২১৯)।
পশুর যে-যে অঙ্গ খাওয়া জায়েয নয়:
পশুর সাতটি অঙ্গ খাওয়া জায়েয নয়। সেগুলো হলো–
১. প্রবাহিত রক্ত। ২. পুরুষাঙ্গ। ৩. অন্ডকোষ। ৪. স্ত্রীলিঙ্গ। ৫. চামড়ার নিচে টিউমারের মতো উঁচু গোশত। ৬. মূত্রথলি। ৭. পিত্তথলি। (সুরা আরাফ, আয়াত নং- ১৫৭, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৩)।
নফল কুরবানির পরিবর্তে কিতাব কেনা:
‘তালিবুল ইলম’-এর জন্য নফল কুরবানির পরিবর্তে কিতাব কেনা উত্তম। (মিশকাত- ৩২, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া- ১৭/৫০৬)।
কুরবানির পশুর গোশত
-------------------------------------
১. নেসাবের মালিক ব্যক্তি ওয়াজিব কুরবানি, নফল কুরবানি, আকিকা ও ওলিমার গোশত নিজে খেতে পারবে এবং ধনী-গরীব সবাইকে খাওয়াতে পারবে।
২. শরীকে কুরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।
৩. মান্নত ও ওসিয়তের গোশত ফকির মিসকিনদেরকে সদকা করে দিতে হবে। মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ খেতে পারবে না এবং ধনী লোকদেরও দিতে পারবে না।
৪. মুস্তাহাব হচ্ছে, কুরবানির গোশত তিনভাগে বিভক্ত করবে, একভাগ– মিসকিনদেরকে দেওয়া, একভাগ– নিজের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে দেওয়া এবং একভাগ– স্বীয় পরিবার-পরিজনদের জন্য রাখা। (ফাতাওয়া কাযীখান- ৩/৩৫১, আদ্দুররুল মুখতার- ৬/৩১৭, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া- ৬/৩৩৫)।
৫. যেসব কর্মচারীদের খাওয়া বেতনের অন্তর্ভুক্ত, তাদেরকে যদি শুধু কুরবানির গোশত খাওয়ানো হয়, তাহলে তাদেরকে কিছু টাকা দিয়ে দিবে। আর যদি কুরবানির গোশতের সাথে কোনো তরকারী থাকে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। তখন বাকি তরকারি তার বেতনের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর গোশত হাদিয়া হিসেবে হবে। (রদ্দুল মুহতার- ৬/৩২৯, ইমদাদুল মুফতীন- ৯৬৫)।
কুরবানির পশুর চামড়া
--------------------------------------
১. পশুর দেহ থেকে চামড়া পৃথক করার পূর্বে তা বিক্রি করা নাজায়েয।
২. কুরবানিদাতা ইচ্ছা করলে তা প্রক্রিয়াজাত করে নিজে ব্যবহার করতে পারবে কিংবা ধনী-গরীব– যে কাউকে হাদিয়া দিতে পারবে। তবে চামড়া যদি বিক্রি করা হয়, তখন প্রাপ্ত অর্থ গরীবকে সদকা করা ওয়াজিব।
৩. মান্নত ও ওসিয়তের জন্য কুরবানিকৃত পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারবে না এবং ধনী ব্যক্তিকেও হাদিয়া হিসেবে দিতে পারবে না বরং গরীবদেরকে সদকা করে
দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৫, রদ্দুল মুহতার- ৬/৩২৯, মুসনাদে আহমদ- ৪/১৫)।
আকিকা ও ওলিমা:
কুরবানির পশুতে আকিকা ও ওলিমার অংশ নেওয়া জায়েয।
শরীকী কুরবানি হলে অন্য শরীকদের অংশে কোনো সমস্যা হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৫, রদ্দুল মুহতার- ৯/৪৭২)।
সমাপ্ত, আলহামদুলিল্লাহ।
-লিখেছেন মুফতি আব্দুল্লাহ আল মামুন সিলেটী হাফিজাহুল্লাহ,
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও প্রধান মুফতি (ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ),
জামি‘আ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., উত্তর যাত্রাবাড়ি, ঢাকা-১২০৪,
সাবেক শিক্ষাসচিব ও মুশরিফে ইফতা- জামিয়া আবু বকর সিদ্দীক রা., যাত্রাবাড়ি, ঢাকা।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the school
Telephone
Website
Address
জামি‘আ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ঢাকা, ৪৯/২ উত্তর যাত্রাবাড়ী, কলার আড়ৎ , মদিনা মসজিদের গলি সংলগ্ন।
Jatrabari
1204