31/12/2022
থার্টিফার্স্ট নাইট। যা একটি খৃষ্টীয় অপসাংস্কৃতি। কোনো মুসলিম বিধর্মীদের মতো অপসংস্কৃতির জোয়ারে নিজের গা ভাসিয়ে দিতে পারে না। কেননা আনন্দ ফুর্তিতে তাদের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ওটাই তাদের সংস্কৃতি, কোনো ক্ষেত্রে ওটাই তাদের ধর্ম।
কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য রয়েছে ধর্মীয় নির্দেশনা। যে নির্দেশনার আলোকে সে চলতে বাধ্য। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ঈমান, পরকাল বিশ্বাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা।
আনন্দ-ফুর্তি করা যাবে কিন্তু তা অবশ্যই ধর্মীয় সীমারেখার ভেতরে হতে হবে। গান- বাজনা, মদ-জুয়া, জিনা-ব্যভিচার সহ কোন ধরনের অশ্লীলতাকেই ইসলাম সমর্থন করে না। তাই আনন্দ-ফূর্তির ক্ষেত্রে একজন মুসলিমকে ধর্মীয় নিদর্শনা মেনে চলতে হবে।
৩১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতটি মূলত খৃস্টীয় বর্ষপঞ্জির শেষরাত। যাকে আমরা ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ নামে জানি। এ-রাতের ১২টা এক মিনিটে সূচনা হয় নতুন আরেকটি সনের। ইংরেজিতে যাকে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে স্বাগত জানানো হয়। তবে ইংরেজি নববর্ষ হিসেবে যা উদযাপন করা হয় তা আসলে ইংরেজি নববর্ষ নয়, বরং এটা হচ্ছে খৃস্টীয় বা গ্রেগরিয়ান নববর্ষ। যার সাথে মিশে আছে খৃস্টীয় কর্মযজ্ঞ। এর নামকরণও করা হয়েছে খ্রিস্টান ধর্মযাজক পোপ গ্রেগরিয়ানের নামানুসারে। তারই আদেশে ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই বর্ষপঞ্জীর প্রচলন ঘটে। সেই বছর কিছু মুষ্টিমেয় রোমান ক্যাথলিক দেশ গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী গ্রহন করে এবং পরবর্তীকালে ক্রমশ অন্যান্য দেশসমূহেও এটি গৃহীত হয়।
গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জী মূলত পূর্ববর্তী জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীকে সংস্কার করে তৈরি করা হয়েছে। আর তা সংস্কার করার অন্যতম কারণ ছিল, ইস্টার (অমুসলিমদের উৎসব) কে সঠিক সময়ে আনার জন্য।রোমানরা ১লা জানুয়ারি উৎসর্গ করে প্রাচীন রোমান ধর্ম অনুযায়ী প্রারম্ভের ও রুপান্তরের ঈশ্বর হিসেবে খ্যাত জানুসকে। জানুস থেকেই বছরের প্রথম মাসকে জানুয়ারি নামকরণ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকগণ বলেন: খৃস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার সর্বপ্রথম ১ জানুয়ারিতে নববর্ষ উৎসবের প্রচলন করে। পরে তা ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পিছিয়ে নেই আমাদের বাংলাদেশও। প্রবল উৎসাহ আর উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে এ দেশেরই একটি জনগোষ্ঠী এই থার্টিফার্স্ট নাইট ও হ্যাপি নিউ ইয়ার উদযাপন করে থাকে। শুধুই কী উদযাপন? একশ্রেণির মানুষ নিজেদেরকে উদ্দাম, উন্মত্ততা ও উচ্ছলতায় নিজেকে সঁপে দেয়।
থার্টিফার্স্ট নাইট নামে যে উৎসব পালিত হয় তার প্রধান টার্গেট মুসলিম সমাজের যুবক-যুবতীরা। এই উৎসবের মধ্যে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা, নগ্নতা ও ধোঁকাবাজিসহ চরিত্র নষ্ট করার সব আয়োজন থাকে ব্যাপকভাবে। বিভিন্ন হোটেল, পতিতালয়, পানশালা, নাচঘর, ক্লাবঘর, নাইটক্লাব সেজে উঠে নতুন সাজে। সবাই ডাকে — ‘চলে এস মোর ভুবনে, মেতে উঠ নব আনন্দে’।
এই থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন প্রথাটি ইসলাম পরিপন্থী। আর ইসলাম যে সকল কারণে এজাতীয় উৎসব উদযাপন করাকে অনুমতি দেয়না, সেগুলো হলো—
১. কাফিরদের অনুসরণ :
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
'যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখল সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।' -[আবুদাউদ : ( ৩৫১৪ )]
ইব্ন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন : 'আল্লাহ তায়ালার কিতাব , নবী (সা.) এর সুন্নত, খোলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শ ও সকল আলেমরা একমত যে , মুশরিকদের বিরোধিতা করতে হবে এবং তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা যাবে না। [ মাজমুউলফতোয়া : ( ২৫ /৩২৭ )]
২. অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা :
থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে রাতভর চলে অশালীন ও বেহায়পনার মহোৎসব। যুবতীরা আটঁসার্ট, অশালীন ও অর্ধনগ্ন পোশাক পরিধান করে অবাধে চলাফেরা করে। অথচ এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঐসব নারী যারা হবে পোশাক পরিহিতা কিন্তু নগ্ন। যারা পরপুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা বক্র উঁচু কাঁধবিশিষ্ট উটের ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।’ (সহীহ মুসলিম : ২১২৮)
৩. গান বাজনা :
এ-রাতে আয়োজিত হয় বিভিন্ন কনসার্ট। যেখানে নারী-পুরুষের একসঙ্গে গান-বাজনা, অশ্লীল নৃত্য আবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ও রাসূলুল্লাহ (সা.) এসব কাজকে সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। এ-প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা লুকমান : ৬)
৪. আতশবাজি ও পটকাবাজি :
এ-রাতে আনন্দ-উল্লাস উপভোগ করার জন্য মধ্যরাত থেকে শুরু হয় আতশবাজি ও পটকাবাজি। যা জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করে। এর দ্বারা অগ্নিসংযোগেরও আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া এসব কর্মকাণ্ডে জনসাধারণকে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সূরা আহযাব : ৫৮)
৫. অর্থ অপচয় :
এ-রাতে বিপুল অর্থ হারাম কাজে ব্যয়িত হয়। যা মারাত্মক গুনাহের কাজ এবং অনর্থক অপচয়। আর ইসলাম অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। এই ব্যপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা অপচয় করো না, কেননা তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা আনআম : ১৪১)
৬. যুবক-যুবতীর অবাধ মেলামেশা :
এ-রাত্রিতে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, সমুদ্র সৈকত, নাইট ক্লাবগুলোতে যুবক-যুবতীরা অবাধে মেলামেশা ও নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়। যা ইসলামে ব্যভিচার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেউ যদি বলে তারা খারাপ কিছু করবে না শুধুমাত্র উৎসব উদযাপন করবে; তাহলে হয়তো ওরা অন্যদের ধোঁকা দিচ্ছে; নয়তো তারা নিজেরাই ধোঁকায় পড়ে আছে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে একত্রিত হলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (মিশকাত শরীফ : ১৩১৮) আর শয়তানের উপস্থিতি মানেই বিপদের দিকে ধাবিত হওয়া।
এসব কারণ ছাড়াও আরো অসংখ্য কারণ বা অপকারিতা রয়েছে এই থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনে। সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এজাতীয় উৎসব মুসলিম যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
একবার হজরত আলী (রা.) কে নববর্ষ উপলক্ষে কিছু হাদিয়া দেওয়া হলে তিনি বলেন— ‘নওরোজুনা কুল্লা ইয়াওম’ অর্থাৎ মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ। মুমিন প্রতিদিনই নতুন উদ্যমে আমল করবে। আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে। কেননা প্রতিটি দিনই সে তার নির্ধারিত 'আযালের' পানে ছুটে চলছে। ক্রমেই তার সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই অনর্থক বিষয়ে সে মূল্যবান সময়কে অপচয় করতে পারে না।
বুধবার ভোরে কুয়াশার চাদর ভেদ করে পূর্বাকাশে লাল সূর্যটি উঁকি দেবে সুন্দর আগামী বিনির্মাণের অভিপ্রায়ে। প্রত্যাশা করি, বিদায়ী বছরের হতাশা, কষ্ট, গ্লানি, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে সমৃদ্ধির পথে শুরু হোক নতুন বছরের নতুন অভিযাত্রা।
সেই প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার জায়গা থেকে আমাদের উচিৎ পুরনো বছরসহ অতীতের পাপরাশির জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। সেই সঙ্গে নতুন বছরসহ ভবিষ্যতে পাপ না করার অঙ্গীকার করা। বেশি বেশি আল্লাহর আনুগত্যের তওফিক কামনা করা।