[একজন সংগ্রামী মানুষের যাপিত জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে আমার এই উপন্যাসের (স্বপ্ন, শিকল ও একমুঠো আকাশ) ঘটনা প্রবাহ ও গল্প সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। গল্পের ছলে জীবনবোধের গভীরতাও জানা যাবে ।
বি.দ্র: উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনী বিন্যাস পুরোপুরি বাস্তব ও সত্য কিন্তু চরিত্রগুলো ছদ্মনামে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ]
স্বপ্ন, শিকল ও একমুঠো আকাশ
পর্ব-১: কাদামাটির দিনগুলো
#পরিচ্ছেদ_তিন: #স্লেটের_উপর_স্বপ্ন_ধুলোর_উপর_ভবিষ্যৎ
সেদিন ভোরবেলা মতিউরের ঘুম ভাঙল অন্যরকমভাবে।
মায়ের ডাকে নয়। ভাইয়ের দুষ্টুমিতে নয়।
ঘুম ভাঙল ঝাঁঝালো একটা গন্ধে।
সরিষার তেল।
খোরশেদা রাতেই মতিউরের মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে রেখেছিলেন — ঘুমের মধ্যে এলোমেলো হয়ে গেছে, কিন্তু তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধটা আছে। সেই গন্ধে মতিউর বুঝল — আজকের দিনটা অনন্য।
আজ তার স্কুল জীবনের প্রথম দিন।
সে উঠে বসল। পাশে হাসমত — চোখ খোলা, তাকিয়ে আছে ঘরের ছাদের দিকে। মতিউর ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।
"ভাই, উঠবা না?"
হাসমত ঘুরল। মুখে একটু হাসি।
"আগেই উইঠ্যা আছি। তুই ঘুমাইতাছিলি।"
"আমি ঘুমাই নাই।"
"ঘুমাইছস। নাক ডাকছস।"
"মিথ্যা কথা!"
হাসমত হাসল — সেই হাসিতে বড় ভাইয়ের চিরকালের প্রশ্রয়। বারো বছর বয়সী ছেলের হাসি, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কোথাও একটা গাম্ভীর্য লুকিয়ে আছে যা বারো বছরকে ছাপিয়ে যায়।
সকালের নাস্তা বলতে যা হলো — আউশ ধানের খই আর আখের গুড়। সাথে তৃপ্তির ঢেকুর।
বন্যার পরে সংসারে আরো টান পড়েছে। মাঠের ফসল নষ্ট হয়েছে। গ্রামের সবার অবস্থা প্রায় একই রকম।
মকবুল হোসেন উঠোনে বসে বিড়ি টানছিলেন।
তাঁকে দেখলে বোঝা যাচ্ছিল না ভেতরে কী চলছে। মুখাবয়বে নীরবতার ছাপ। চোখ দুটো স্থির। কিন্তু বিড়িতে টান দিচ্ছিলেন একটু বেশি বেশি — যেটা তাঁর স্বভাবজাত টানের বাইরে।
হাসমত পাশে গিয়ে বসল।
"আব্বা, মতিরে আইজকা স্কুলে দিবা?"
"হ।"
"আমিও যামু লগে।"
মকবুল হোসেন ছেলের দিকে তাকালেন।
"তোর নিজেরও তো ক্লাস আছে।"
"একসাথেই যামু। আগে মতিরে ভর্তি করায়া দিয়া তারপর আমি ক্লাসে যামু।"
মকবুল হোসেন একটু ভাবলেন। তারপর মাথা নাড়লেন।
হাসমতের মুখে একটা আলোর ঝলকানি খেলে গেল। সে কিছু বলল না। কিন্তু সেই আলো দেখলেই বোঝা যায় — এই ছেলে স্কুলকে ভালোবাসে, ছোট ভাইয়ের এই দিনটাকে আরো বেশি।
স্কুলটা বাড়ি থেকে দুই কিংবা আড়াই মিনিটের পথ।
বর্ডারের রাস্তার ঠিক পশ্চিম পাশে। যে রাস্তায় বন্যার সময় মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল, সেই রাস্তার পশ্চিম পাশে ছোট্ট একটা মাঠ সমেত স্কুলটা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে।
মতিউর এই পথ চেনে। প্রতিদিন দেখেছে — কিন্তু কখনো ভেতরে যায়নি।
আজ যাচ্ছে।
মকবুল হোসেন এগিয়ে হাঁটছেন।
পেছনে মতিউর। তার হাতে একটা স্লেট — কাঠের তৈরি, পুরনো, এক কোণায় একটু চিড় ধরা। এই স্লেট হাসমতের ছিল। হাসমত তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে নতুন একটা পেয়েছে — পুরনোটা তুলে রেখেছিল শোবার ঘরের এক তাকে। আজ সকালে সে নিজেই মতিউরের হাতে তুলে দিয়েছে।
"নে। আইজ থেইক্যা এটা তোর"
মতিউর স্লেটটা দুই হাতে নিয়েছিল। হালকা — কিন্তু মনে হচ্ছিল ভারী।
এখন হাঁটতে হাঁটতে সে স্লেটটা বুকে চেপে ধরেছে।
হাসমত পাশে হাঁটছে। একটু এগিয়ে, একটু পেছিয়ে।
মতিউর বলল — "ভাই, স্কুলে মাইর দেয়?"
হাসমত হাসল।
"দেয়।"
"কেডা দেয়?"
"স্যার।"
"ক্যান দেয়?"
"পড়া না পারলে।"
মতিউর একটু চুপ করল। তারপর বলল — "আমি পড়া পারমু।"
হাসমতের মুখে সেই হাসি আবার।
"জানি।"
স্কুলটা দেখা গেল।
১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। বেশ পুরোনো একটি স্কুল।
উত্তর-দক্ষিণ বরাবর লম্বা একটা দোচালা ঘর — পুরোটাই টিনের। চাল, বেড়া সব। পূর্ব দিকে মুখ করা। বড় উঁচু রাস্তা থেকে একটু ভেতরে, মাঠের কোলে। টিনে মরিচা ধরেছে এখানে-ওখানে — বন্যার পানি ছুঁয়ে গেছে, সেই দাগ এখনো আছে নিচের দিকে।
পূর্ব দিকে দরজা। তিনটি কক্ষ।
দক্ষিণ কোণে একটা আমগাছ। পাতা ঝরে গেছে অনেকটা। শাখাগুলো শূন্য, তবু একটা ছায়া ছড়িয়ে আছে সেদিকটায়। আর পূর্ব দিকে, উঁচু রাস্তার ধারে, দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল পাকুড় গাছ — বিরাট কাণ্ড, ডালপালা ছড়িয়ে রাস্তার উপরেও গেছে। সেই গাছের বয়স কত কেউ জানে না — গ্রামের মানুষ বলে, দাদার বাপের আমলেও এই গাছ এতটুকুই ছিল। পাকুড় গাছ হলেও গ্রামের মানুষ একে বটগাছ বলেই জানে।
মতিউর থামল।
সে এতদিন দূর থেকে দেখেছে এই স্কুল। কখনো কাছে আসেনি। এখন কাছে এসে দেখছে।
মকবুল হোসেন ফিরে তাকালেন।
"দাঁড়াইলি ক্যান?"
মতিউর কথা বলল না। শুধু হাঁটতে লাগল।
হেড মাস্টার মোঃ খলিলুর রহমান।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি — বছরের পর বছর পরতে পরতে হলদেটে হয়ে গেছে। কিন্তু ইস্ত্রি করা। এলাকার মানুষ, মকবুল হোসেন ছোটবেলা থেকেই চেনেন।
মকবুল হোসেন সালাম দিলেন।
"চাচা, আছেন কেমন?"
খলিলুর রহমান চশমার উপর দিয়ে তাকালেন।
"আরে মকবুল। আসো। বসো।"
তারপর মতিউরের দিকে তাকালেন। "এ-ই তোমার ছোট ছেলে?"
"জি চাচা। ভর্তি করতে আনছি।"
"নাম?"
"মতিউর রহমান।"
"বয়স?"
"সাত।"
"আগে কিছু পড়ছ?"
মতিউর মাথা নাড়ল — না।
খলিলুর রহমান মকবুল হোসেনের দিকে তাকালেন।
"নিয়মিত পাঠাবে তো? অনেক বাবা আছে — দুই দিন পাঠায়, তারপর মাঠে নিয়ে যায়।"
মকবুল হোসেনের মুখ একটু শক্ত হলো।
"না চাচা। আমার ছেলে পড়ব।"
কথাটা এমনভাবে বললেন — যেন শুধু উত্তর না, নিশ্চয়তা।
খলিলুর রহমান একটু নরম হলেন।
"হাসমত তো ভালোই পড়ছে। ছোটটাও পড়ুক।"
হাসমত পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল। হেড স্যারের মুখে নিজের নাম শুনে একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল — অজান্তেই।
ভর্তির কাজ হচ্ছে।
মতিউর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। হাসমত পাশে।
আমগাছের নিচে দুটো ছেলে কী একটা নিয়ে ঝগড়া করছে — কাছে যেতে মন চাইল, গেল না।
হাসমত বলল — "ভয় লাগতাছে?"
"না।"
"হাছা কথা"
মতিউর চুপ।
হাসমত একটু সরে এসে ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে মতিউরের মুখের দিকে তাকাল।
"মতি, শোন।"
"কী?"
"এইহানে ভালো কইরা পড়বি। ঠিক আছে?"
"হ।"
"না পারলে জিজ্ঞেস করবি। লজ্জা পাবি না।"
"হ।"
হাসমত একটু থামল। তারপর বলল —
"আমি এহন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। তুইও এক এক কইরা উপরে উঠবি। তারপর আমার থেকেও বেশি উপরে যাবি।"
মতিউর ভাইয়ের চোখে দিকে তাকাল।
সেই চোখে একটা উজ্জ্বলতা আছে — কিন্তু তার পেছনে কোথাও একটা ছায়াও আছে। যেটা মতিউর এখন দেখতে পাচ্ছে না, শুধু টের পাচ্ছে। যেমন মেঘের আড়ালে রোদ থাকলে আলো অনুভব করা যায়, কিন্তু দেখা যায় না।
সে মাথা নাড়ল।
"ঠিক আছে, ভাই।"
হাসমত মতিউরের মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিল।
কোনো কথা নেই।
শুধু বড় ভাইয়ের স্নেহের পরশ।
ক্লাসে ঢুকল মতিউর।
টিনের ঘরের ভেতরটা একটু অন্ধকার — পূর্ব দিকের দরজা দিয়ে আলো আসছে, কিন্তু টিনের বেড়া আলো আটকায়। মাটির মেঝে। কাঠের বেঞ্চ — কোনোটা ভাঙা, কোনোটা টলমল। জানালা আছে টিনের বেড়ায়, সেখান দিয়ে বাইরের আলো আসছে, সেই আলোয় ধুলোর কণা উড়ছে।
ব্ল্যাকবোর্ড কালো — কিন্তু চকের গুঁড়োয় সাদাটে হয়ে গেছে।
মতিউর একটা বেঞ্চে বসল।
স্লেটটা কোলে নিল।
পাশে একটা মেয়ে বসে আছে — কালো চুল, দুই বেণি, চোখে একটু সন্দেহ। মতিউরের দিকে তাকাল, কিছু বলল না।
মতিউর স্লেটে আঙুল বোলাল।
কাঠের মসৃণ গায়ে। এর উপরে একদিন হাসমত লিখেছিল — প্রথম অক্ষর, প্রথম শব্দ। এখন সে লিখবে।
কী লিখবে জানে না এখনো। অক্ষর শেখেনি। শব্দ জানে না। কিন্তু এই স্লেটের উপর একটা ভার অনুভব করছে সে — যেন এই কাঠের টুকরোটা শুধু কাঠ না, যেন এটা কারো স্বপ্নের একটা অংশ।
ভাইয়ের স্বপ্ন।
বাবার স্বপ্ন।
রমজান আলী স্যার এলেন।
একজন প্রাণবন্ত মাঝবয়সী শিক্ষক — হাতে চক ও ডাস্টার।
ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন —অ
বড় করে। সাদা চকে কালো বোর্ডে।
মতিউর তাকিয়ে রইল।
এই বর্ণটা সে আগে দেখেছে — কোথাও না কোথাও। কিন্তু এখন এটাকে অন্যরকম লাগছে। বোর্ডে লেখা বলে? স্যার লিখেছেন বলে? নাকি আজ থেকে এটা তার নিজের বলে?
স্যার বললেন — "সবাই বলো — স্বরে অ।"
সবাই মিলে বলল — "স্বরে অ।"
মতিউর একটু সময় নিল, কিন্তু বলল।
তারপর সে স্লেটের দিকে তাকাল।
আঙুল দিয়ে — চক নেই তখনো, শুধু আঙুল দিয়ে — সে এঁকে ফেলল স্লেটে। অ। যেমন দেখেছে তেমন না, একটু বাঁকা, একটু আঁকাবাঁকা — কিন্তু অ।
পাশের মেয়েটা দেখল।
মতিউর দেখল সে দেখছে। একটু লজ্জা পেল।
কিন্তু মুছল না।
ক্লাসে ছেলেকে রেখে মকবুল হোসেন বের হয়েছেন। এখনো যাননি। পাকুড় গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন — রাস্তার ধারে সেই বিশাল গাছ, যার গায়ে হাত রাখলে মনে হয় শতবছরের শক্তি আছে। সেই গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মকবুল হোসেন তাকিয়ে আছেন শ্রেণিকক্ষের দিকে।
হাসমত বাবার সাথেই।
"আব্বা, আমি ক্লাসে যাই?"
"যা।"
হাসমত পা চালাতে গিয়ে থামল।
বাবার মুখের দিকে একবার তাকাল।
মকবুল হোসেন তাকিয়ে আছেন টিনের ঘরটার দিকে। সেই তাকানোয় কী আছে — হাসমত সব বোঝে না। কিন্তু এটুকু বোঝে — আব্বা এখন একা থাকতে চান।
সে চলে গেল।
মকবুল হোসেন একা দাঁড়িয়ে রইলেন।
পাকুড় গাছের ডাল থেকে একটা পাখি উড়ে গেল। রাস্তায় দূরে একটা সাইকেল যাচ্ছে। মাঠে কোথাও কাক ডাকছে।
তিনি বিড়ি ধরালেন। বরাবরের মতো রসিদা বিড়ি।
একটা টান দিলেন।
ধোঁয়া উঠল — হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ঠিক যেভাবে কিছু কিছু কষ্ট মেলে যায় — কাউকে না বলে, কোনো শব্দ না করে, নিঃশব্দে।
দুপুরে ছুটি হলো।
মতিউর বের হতেই দেখল — হাসমত দাঁড়িয়ে আছে আমগাছের নিচে।
হাসমত দেখল ছোট ভাইকে।
"কেমন লাগল?"
মতিউর একটু ভাবল। তারপর বলল —
"অ শিখছি।"
হাসমত হাসল।
"শুধু অ?"
"আজকে শুধু অ। কাল আরো।"
হাসমত মাথা নাড়ল।
"চল, বাড়ি যাই।"
দুই ভাই হাঁটতে লাগল।
পশ্চিমে বাড়ির পথ। পাকুড় গাছটা পেছনে পড়ে রইল — বিশাল, নির্বিকার। সামনে ধুলোর রাস্তা। দুপুরের রোদ চড়া। মতিউরের হাতে স্লেট — এখন একটু কম ভারী মনে হচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে মতিউর বলল —
"ভাই।"
"হু।"
"তুমি কী কী পড়?
হাসমত একটু ভাবল।
"অনেক কিছু। বাংলা, অঙ্ক, পরিবেশ।"
"কঠিন?"
"একটু। কিন্তু পারা যায়।"
মতিউর ভাবল।
"তুমি কি ভালো ছাত্র?"
হাসমত একটু থামল। তারপর হাসল — কিন্তু এই হাসিটা আগেরগুলোর মতো না। এই হাসিতে একটু অন্য কিছু আছে।
"হ। মোটামুটি।"
"স্যার কি তোমারে পছন্দ করেন?"
"করেন।"
"তাইলে তুমি অনেক দূর পড়বা। তাই না?"
এই প্রশ্নটা সহজ। সাত বছরের ছেলের সহজ প্রশ্ন। কিন্তু হাসমত এবার উত্তর দিল না সাথে সাথে।
কিছুক্ষণ হাঁটল।
বাড়ির চাল দেখা যাচ্ছে দূরে। পরিচিত ছন-খড়ের চাল।
তারপর হাসমত বলল —
"তুই পড়লেই হইব।"
এই কথাটা এত সহজভাবে বলল — যেন কোনো ব্যাপার না, যেন কোনো কষ্ট নেই, যেন এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু মতিউর টের পেল — এই সহজ কথার ভেতরে সহজ কিছু নেই। এমন কিছু যেটা বুকে লাগে। এমন কিছু যেটা পাকুড় গাছের ছায়ার মতো — দেখা যায়, কিন্তু ধরা যায় না।
বিকেলে মতিউর উঠোনে বসল।
হাতে স্লেট ও চকের একটা ছোট টুকরো।
সে লিখল।
অ।
মুছল।
আবার লিখল।
এবার একটু ভালো।
মুছল।
আবার।
হাসমত পাশে বসে কী একটা করছিল — খেয়াল করল।
"হইছে?"
মতিউর স্লেটটা ভাইয়ের দিকে তুলে ধরল।
হাসমত দেখল।
তারপর মাথা নাড়ল।
"হইছে।"
মতিউর আবার স্লেটের দিকে তাকাল।
কাঠের উপরে চকে আঁকা একটা বর্ণ — অ।
ছোট্ট একটা বর্ণ। কিন্তু এই মুহূর্তে মতিউরের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ, সবচেয়ে মূল্যবান কিছু!!
কারণ এটা শুধু বর্ণ নয়, এটা স্বপ্নের শুরু।
আব্বার না-বলা কথার শুরু। মায়ের কষ্ট লাঘবের প্রতীক্ষার শুরু। হাসমতের সেই কথার শুরু — তুই পড়লেই হইব।
একটা পরিবারের শুরু — যারা মাটি কামড়ে ধরে বেঁচে থাকে, যারা বন্যায় ডুবেও ভাসে, যারা ধুলোয় হেঁটে স্বপ্ন দেখে।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে।
বর্ডারের রাস্তায় দূরে কেউ যাচ্ছে — সাইকেলের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। পাকুড় গাছের প্রাচীন কোটরে ঠাঁই নেওয়া চামচিকা আর বাদুড়দের নীড়ে ফেরার অস্থিরতা—যেন কোনো এক দলছুট পথিক বারবার অন্দরে প্রবেশ করছে, আবার কোন এক অজানা ব্যাকুলতায় ডানা ঝাপটে বেরিয়ে আসছে নীরবতার অন্ধকারে।
সেই অন্ধকারে মাটির প্রদীপের আলোয় মতিউর আরেকবার লিখল।
অ।
— চলবে
ভালো লাগলে জানাবেন! খারাপ লাগলেও নির্দ্বিধায় জানাবেন!! আমি ইতিহাসের মানুষ হলেও সাহিত্যে তেমন ডুব দেয়া হয়নি। কাঁচা হাতের লেখা। উৎসাহ কিংবা সমালোচনা পেলে হয়তো একদিন তা পেকে যাবে।
চাইলে শেয়ারও করতে পারেন।
উল্লেখ্য, প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে (শুক্র/ শনিবার) লেখা দেওয়ার চেষ্টা করব। আবার একই লেখার ইংরেজি সংস্করণ সোম/মঙ্গলবারে প্রকাশ করার চেষ্টা করব যাতে আমার শিক্ষার্থী এবং ইংরেজি শেখায় আগ্রহীদের কাজে লাগে। ধন্যবাদ
English, IHC and Others with Robiul Islam
It’s a hub for English language enthusiasts and seekers of knowledge in Islamic History & Culture.
29/04/2026
Show your improvement in the comment section.
27/04/2026
Similarly, make a sentence in the comment section to show your improvement.
25/04/2026
এখন থেকে ইংরেজি (grammar, vocabulary, free handwriting কিংবা translation) , ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (উচ্চ মাধ্যমিক/ডিগ্রি) কিংবা মৌলিক কোন লেখা নিয়মিতভাবে পেইজে আপলোড করার চেষ্টা করব।
[একজন সংগ্রামী মানুষের যাপিত জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে আমার এই উপন্যাসের (স্বপ্ন, শিকল ও একমুঠো আকাশ) ঘটনা প্রবাহ ও গল্প সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। গল্পের ছলে জীবনবোধের গভীরতাও জানা যাবে ।
বি.দ্র: উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনী বিন্যাস পুরোপুরি বাস্তব ও সত্য কিন্তু চরিত্রগুলো ছদ্মনামে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ]
স্বপ্ন, শিকল ও একমুঠো আকাশ
পর্ব-১: কাদামাটির দিনগুলো
#পরিচ্ছেদ_দুই: #থৈ_থৈ_পানি, #ভাসা_ভাসা_জীবন
১৯৮৮ সাল।
সেই বছর আষাঢ় মাসটা যেন শেষ হতেই চাচ্ছিল না।
বৃষ্টি পড়ছিল। থামছিল। আবার পড়ছিল। যেন আকাশের কোনো অতল গভীরে এক অদৃশ্য কলসি চিরতরে উপুড় হয়ে গেছে—সেই কলসির তলা নেই, শেষ নেই। রাতের পর রাত ছনের চালের ঝুম বৃষ্টির মোলায়েম শব্দ। দিনের পর দিন মেঘলা আকাশ, রোদের দেখা নেই।
তারপর এলো শ্রাবণ।
আর শ্রাবণ আসতেই আকাশ সত্যিকার অর্থে ভেঙে পড়ল।
উজানের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল ব্রহ্মপুত্রকে ফুলিয়ে তুলল। দশানী নদী উপচে পড়ল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। মাঠ ডুবল। রাস্তা ডুবল।ঘরের উঠোন ডুবল। সাথে মানুষের স্বপ্নও ডুবল।
এক সকালে ঘুম থেকে উঠে মতিউর দেখল—বাড়ির উঠোনে পানি।
লালচে-ঘোলা পানি। সে প্রথমে ভাবল স্বপ্ন। চোখ কচলাল। আবার দেখল। না, স্বপ্ন না।
খালি পায়ে নামল। পানির স্পর্শে গায়ে শিরশিরে অনুভূতি—ঠান্ডা, কিন্তু অদ্ভুত ভালো লাগছে।
তখনো সে বুঝত না—এই পানি আনন্দের না।
এই পানি এদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এক কষ্ট ও বেদনার সাক্ষর।
দুপুর হওয়ার আগেই মকবুল হোসেন অস্থির হয়ে উঠলেন।
উত্তরের ফাঁকা মাঠ পানির নিচে মিলিয়ে গেছে। ঢেঁকিকলের ছাউনি আধাডোবা। বাঁশঝাড়ের গোড়ায় পানি জমেছে—টলটলে না, ঘোলা, স্রোতের একটা অদৃশ্য টান আছে তাতে।
শরাফত আলী পাশে এসে দাঁড়াল।
মতিউরের চাচা। মকবুল হোসেনের ছোট ভাই। বড় ভাইয়ের সংসারেই থাকেন, বড় ভাইয়ের সাথে ছায়ার মতো চলেন।
"ও ভাই।"
মকবুল হোসেন ঘুরলেন।
"গরু দুইডারে উঠানে রাখলে আর হব না। পানি বাড়তাছেই।"
"হ।" মকবুল হোসেন আকাশের দিকে তাকালেন। মেঘ সরছে না। "ঝোড়ার পাড়ের রাস্তায় নিয়া যামু। উঁচা জাগা।"
"আমিও যামু ভাই।"
"মতিরে লগে নিস। চোখে চোখে রাখিস।"
শরাফত আলী ছোট ভাতিজার দিকে ফিরল। মতিউর তখন উঠোনের পানিতে লাফালাফি করছে। বানের পানিতে ভেসে আসা ছোট ছোট দারকিনা ও খলসে মাছের পিছনে ছোটাছুটি করছে।
"মতি! আয় রে। ঝোড়ার পাড়ে যামু।"
মতিউর এক দৌড়ে এসে চাচার হাত চেপে ধরল।
মতিউরদের বাড়ির পশ্চিমেই ঝোড়া। ব্রহ্মপুত্র যখন বর্ষার যৌবনে মত্ত হয়ে দুকূল ছাপিয়ে দেয়, তখন সেই উদ্ধত জলরাশি দশানি নদী হয়ে আছড়ে পড়ে শান্ত এই ঝোড়ার বুকে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছরের পানির তীব্রতা ও ভয়াবহতা অনেক বেশি।
ঝোড়ার পাড়ের রাস্তাটা একটু উঁচু। কিন্তু সেটিও প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা। সেখানে পৌঁছে মতিউর থমকে গেল।
এত মানুষ সে একসাথে এর আগে কখনো দেখেনি।
রাস্তার দুই ধার জুড়ে মানুষ গাদাগাদি করে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি সব একসাথে। কেউ পলিথিন টানিয়েছে মাথার উপরে—সেই পলিথিনে বৃষ্টির পানি জমে থলের মতো ঝুলছে। কেউ খোলা আকাশের নিচে, ভিজছে, কাঁপছে। শিশু কাঁদছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা চুপ করে বসে আছেন—সেই চুপ থাকার নীরবতা কান্নার চেয়েও ভারী, শব্দ না হলেও দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার মতো।
কাছেই এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দম্পতি পথের ধারে তাদের ১২ কিংবা ১৩ বছরের নাতনীকে নিয়ে বসে আছেন। পায়ের কাছে একটা ছোট বাঁশের ঝুড়ি—ভেতরে ছয়টি বাচ্চা সহ একটা মুরগী। চোখে মুখে ক্লান্তি ও একরাশ দুশ্চিন্তার ছাপ।
মতিউর চাচার হাত আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল।
"কাকা, ওরা ক্যান এই জাগায় বয়ে আছে?"
শরাফত আলী বলল—
"বাড়িঘর ডুইবা গেছে রে, বাপ। আর কোনো জায়গা নাই।"
"ডুইবা গেছে মানে?"
"মানে পানিত তলায়ে গেছে। ঘরের মইদ্যে পানি ঢুইক্কা গেছে।"
মতিউর বুঝল না পুরোটা। কিন্তু কিছু একটা বুঝল। সে একবার পেছনে তাকাল—যেদিকে তাদের বাড়ি, তাদের ছন-খড়ের ঘর দুটো।
কিন্তু বাঁশ ঝাড় থাকায় ঘর দেখতে পেল না।
হঠাৎ রাস্তায় একটা শোরগোল উঠল।
"ওই দ্যাখ ভাই! গরু ভাইস্যা যাইতাছে!"
সবাই একসাথে ঝোড়ার দিকে তাকাল।
ঝোড়ার ভাসা পানির বুক চিরে ভেসে আসছে দুটো গরু। দড়ি ছিঁড়ে গেছে—অথবা বাঁধার সময়ই পাওয়া যায়নি। গরু দুটো তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। দক্ষিণে, আরো দক্ষিণে, যেদিকে ঝোড়া গিয়ে মিশেছে দশানীতে।
একটু পরে আর দেখা গেল না।
রাস্তার অন্য এক প্রান্তে একজন মধ্যবয়সী মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। কাঁদছেন না। মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু দুই হাতে মাথা ঢেকে বসে আছেন। পাশে তাঁর স্ত্রী দাঁড়িয়ে—নিজেও কাঁদতে চান, কিন্তু বন্যায় সব হারিয়ে কাঁদার শক্তিটুকুও যেন শেষ হয়ে গেছে।
মতিউর সেই মানুষের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।
মকবুল হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিছু বললেন না।
শরাফত আলীও চুপ। কিছু কিছু কষ্টের সামনে ভাষা এসে থেমে যায়। বেরোয় না।
বিকেল নামতেই পানি আরো বাড়ল।
পূর্ব দিকে ইটের সলিং করা উঁচু বর্ডারের সড়কও আজ হাজারো ঘরহারা মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমে চরাঞ্চল গিলে খাওয়া বন্যার করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে মানুষ এখানে এসেও ঠাঁই নিয়েছে। চারদিকে শুধু অথৈ জলরাশি, গবাদি পশুর আর্তনাদ আর নিঃস্ব মানুষের হাহাকার—এক ভয়াবহ আবহ সৃষ্টি করেছে।
ইটের রাস্তার ঠিক পশ্চিম পাশে দোচালা টিনশেডের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও মানুষ গিজগিজ করছে।
দিনের বেলায় বন্যার্ত মানুষের বিভীষিকাময় কষ্ট দেখে শিশু মতিউরের মনে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হলো। রাতে এসব দৃশ্য তার চোখে ভাসতে লাগলো। ওই রাতে তার খুব বেশি ঘুম হলো না।
পরদিন সকাল।
স্কুলের উত্তর ধারের সেই চিরচেনা কাঁচা রাস্তাটি আজ যেন এক পচনোন্মুখ ক্ষতের মতো ধুঁকছে। স্রোতের ধারালো নখ মাটির বুক চিরে প্রথমে ছোট একটা গর্ত তৈরি করেছিল, যা এখন রাক্ষুসী ভাঙনে রূপ নিয়েছে। মাটির ড্যালাগুলো খসে খসে ঘোলা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন একেকটা নিথর স্বপ্ন বিসর্জন দিচ্ছে কেউ। দুই পাশের জলরাশি এখন সেই সংকীর্ণ ভাঙন দিয়ে এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। কলকল শব্দে ধেয়ে আসা সেই ঘোলা পানির ক্ষিপ্রতা এতটাই তীব্র যে, মনে হয় চারপাশের সবকিছুকে গ্রাস না করা পর্যন্ত তার তৃষ্ণা মিটবে না।
হাসমত মতিউরকে সাথে নিয়ে ভাঙ্গনরত কাঁচা রাস্তাটির ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। গ্রামের বাড়ন্ত বয়সী অনেক ছেলে-মেয়ে সেখানে জমায়েত হয়েছে।
"মতি, এতো কাছে যাইস না। পইড়া যাবি।"
কিন্তু মতিউরের চোখ সরছে না।
সেই ভাঙা জায়গায়, দুই স্রোতের সংগমে, কী যেন লাফাচ্ছে। রুপালি - চকচকে। একটা না—অনেকগুলো। পানির উপর উঠছে, আবার নামছে। মাঝে মাঝে রোদের আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে। অনেকগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ভাঙা রাস্তার দুই ধারে উঠে পড়ছে। মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যেও ছেলে বুড়ো সবাই আনন্দের সাথে সেগুলো ধরছে।
"ভাই! ওইগুলা কী মাছ? এতো লাফায় ক্যান?"
মাছ ধরার ফাঁকে হাসমত উত্তর দিল- "কাইখলে মাছ।"
"কাইখলে মাছ?" মতিউরের চোখ বড় হয়ে গেল।
"হ। দুই দিকের পানি যে জাগায় আইসা মিলে, কাইখলে মাছ সে জাগায় লাফায়। স্রোতের উল্টা দিকে যাবার চেষ্টা করে।"
মতিউর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
এই ভয়াবহ বন্যায়, এত মানুষের কান্নার মাঝে—ছোট ছোট রুপালি মাছ শুধু লাফাচ্ছে। যেন তারা জানে না দুর্যোগ কী। তারা শুধু জানে —স্রোতের বিপরীতে লড়তে হয়, থামলে চলে না।
সন্ধ্যা নামার আগে পশ্চিম দিক থেকে আরো মানুষ এলো।
জামালপুর থেকে কামালপুরের বর্ডারের উঁচু রাস্তা ধরে অসংখ্য মানুষ হেঁটে আসছে। পশ্চিমের চরাঞ্চলের মানুষ—দশানীর ওপারের চর থেকে। সেদিকের ফসলি মাঠ পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। বাড়িঘর নেই, পথ নেই, শুধু থৈ থৈ পানি।
তারা আসছে দলে দলে।
ক্লান্ত পায়ে। ভেজা কাপড়ে। শূন্য চোখে। কেউ কেউ রিক্ত হাতে।
যে মানুষ সব হারিয়েছে, তার চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা থাকে। সেটা কষ্টের চেয়ে আলাদা, হতাশার চেয়ে গভীর।
মতিউর সেই চোখের ভাষা জানত না তখন। কিন্তু সে শুধু মানুষগুলোকে দেখছিল।
রাস্তার ধারে ধারে পলিথিনের অস্থায়ী তাঁবু। তার নিচে গুটিসুটি হয়ে মানুষ। কেউ আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছে—ভেজা কাঠ ধরছে না, শুধু ধোঁয়া উঠছে। শিশুরা কাঁদছে। মায়েরা বুকে চেপে ধরে বসে আছেন—নিজেরাও কাঁদছেন কিন্তু তা ভিতরে ভিতরে।
একটা পরিবার এসে রাস্তার ধারে বসল।
বাবা-মা আর তিনটা ছেলেমেয়ে। বাবার কাঁধে একটা পুরনো কাপড়ের বস্তা—ভেতরে কী আছে কে জানে, হয়তো সামান্য কিছু, হয়তো এটুকুই যা বাঁচাতে পেরেছেন। ছেলেমেয়েগুলো মতিউরের বয়সী। গায়ে ভেজা কাপড়, চোখে ঘুম, মুখে খিদের ছাপ।
মতিউর তাদের দিকে এগিয়ে গেল।
হাসমত পেছন থেকে ডাকল—"মতি, কই যাস?"
মতিউর থামল না।
সে সেই পরিবারের সামনে দাঁড়াল। একটু চুপ করে রইল। তারপর যে ছেলেটা তার বয়সী, তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল—
"তোমার বাড়ি কই?"
ছেলেটা উত্তর দিল না। শুধু তাকাল—ফ্যাকাশে, ক্লান্ত চেহারায়; দীর্ঘ সময়ের কোনো ক্লান্তি যেন তার ছোট্ট চোখে মুখে।
মতিউর আবার বলল—"তোমার বাড়িও কি পানিত ডুইবা গেছে?"
ছেলেটির মা হঠাৎ মুখে আঁচল চাপা দিলেন। একটা ফুঁপানো চাপা কান্না বের হয়ে এলো— ছোট একটা শিশুর সরল প্রশ্নে আর আটকে রাখা গেল না।
মতিউর চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে বুঝতে পারছে না।
মকবুল হোসেনও এই রাস্তার ধারেই ছিলেন। গ্রামের অন্যান্য উৎসুক মানুষের মতো তিনিও বন্যা দুর্গত মানুষদের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করছিলেন। পেছন থেকে এসে মতিউরের কাঁধে হাত রাখলেন।
ইতোমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এল। বাবার হাত ধরে ঘরে ফিরল মতিউর।
খোরশেদা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছেলেকে দেখে বুকে টেনে নিলেন। গা ভেজা, পায়ে কাদা।
"কোন জাগায় আছিলি এতক্ষণ?"
"ভাইয়ের সাথে স্কুল ও বডারের রাস্তায়।"
খোরশেদা কিছু বললেন না। শুধু ধরে রাখলেন।
একটু পরে মতিউর বলল—
"মা, কাগোর গরু য্যান ভাইস্যা গেছে।"
খোরশেদা চুপ।
"আর একটা পোলার বাড়ি ডুইবা গেছে। তার মা কাঁদতাছিল।"
এবারও চুপ।
"মা, আমাগো বাড়িও কি ডুইবা যাইব?"
খোরশেদা একটু সরে এসে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। পাঁচ বছরের শিশুর চোখে প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না সত্যি। জানেন না পানি আর কতটা বাড়বে। জানেন না কাল কী অপেক্ষা করছে।
কিন্তু মা অসত্য বলেন না, আবার সব সত্যিও বলেন না।
"ডুইবা যাইব না। তোর আব্বা আছে না?"
মতিউর একটু ভাবল।
তারপর মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ। আব্বা আছে।
আব্বা থাকলে সব ঠিক হয়—এই বিশ্বাসটা তখন তার কাছে ধ্রুবতারার মতো শক্ত।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
ঝোড়ার পানি বাড়ছে।
দূরে কোথাও কে জানি কাঁদছে—মানুষ, না জীবজন্তু, বোঝা যাচ্ছে না। রাতের বন্যায় সব শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
কিন্তু ঘরের ভেতরে একটা মাটির প্রদীপ জ্বলছে।
তেল কম। শিখা কাঁপছে। বাইরের ভেজা বাতাসে বারবার নিভে যেতে চাইছে।
কিন্তু নিভছে না।
যেভাবে এই পরিবার নিভছে না।
যেভাবে নিভছে না মতিউরের ছোট্ট বুকের সেই আলো—যেটার নাম সে এখনো জানে না, কিন্তু যেটা থাকলে মানুষ বেঁচে থাকে, লড়াই করে, ভেসে যায় না।
ঠিক সেই কাকিলা মাছের মতো।
স্রোতের বিপরীতে।
বারবার।
— চলবে
ভালো লাগলে জানাবেন! খারাপ লাগলেও নির্দ্বিধায় জানাবেন!! আমি ইতিহাসের মানুষ হলেও সাহিত্যে তেমন ডুব দেয়া হয়নি। কাঁচা হাতের লেখা। উৎসাহ কিংবা সমালোচনা পেলে হয়তো একদিন তা পেকে যাবে।
চাইলে শেয়ারও করতে পারেন।
উল্লেখ্য, প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে (শুক্র/ শনিবার) লেখা দেওয়ার চেষ্টা করব। আবার একই লেখার ইংরেজি সংস্করণ সোম/মঙ্গলবারে প্রকাশ করার চেষ্টা করব যাতে আমার শিক্ষার্থী এবং ইংরেজি শেখায় আগ্রহীদের কাজে লাগে। ধন্যবাদ
স্বপ্ন, শিকল ও একমুঠো আকাশ
পর্ব-১: কাদামাটির দিনগুলো
পরিচ্ছেদ এক: নহুলের সকাল
[This novel is based on the true story of a struggling soul. The characters appear under pseudonyms, but every event is real.]
The morning light had not yet fully broken.
In the eastern corner of the sky, a reddish glow was slowly gathering — as though an invisible hand were brushing colour along the horizon. A cold wind swept over the dew-soaked grass, carrying with it the smell of earth, paddy, and the drifting smoke of bamboo leaves — all blending together into a strange, wordless melody of morning.
Suddenly, a black drongo called out from the bamboo grove on the western side of the house. Then another. And then, as if by silent agreement, the birds all burst into chorus together — announcing, in their own language, that the day had begun.
Khorseda was in the small kitchen — a little bamboo-roofed shed tucked into the southern corner of the yard.
The clay stove had been burning since who knows when. Thin threads of smoke rose from burning jackfruit leaves and bamboo — bending in the breeze, dissolving into the sky above.
Her hands never rested. One hand fed dry leaves into the stove; the other carefully tipped the starchy water boiling over from the rice pot into a clay hollow on the ground — to be mixed later with cut straw for the two cows. No sound. No words. Only work — silent, ceaseless work.
From inside the small room, a voice called out.
"Moti! Oi Moti! Get up — morning's come!"
Hasmot's voice. That particular tone only older brothers know — not quite a command, not quite a plea, something in between.
Matiur lay curled up on a mat on the earthen floor of the small room. Five years old, maybe six — no one kept count at that age. He stirred at the call, mumbled something, then buried his face back into the mat.
"Moti!"
This time Hasmot came and nudged him at the foot. Matiur opened his eyes. The darkness in the room hadn't fully lifted yet. A sliver of light came through a gap in the thatching and lay across the mud floor like a long, pale scratch.
"What is it? Why are you calling?" Matiur asked, his voice thick with sleep.
"We're taking food to Abba in the field. Get up."
Abba.
The word cut through his drowsiness. Whenever he thought of his father, something stirred deep inside his chest — he had no name for it, but he felt it. Maqbul Hossain always left for the fields before dawn. While Matiur still slept, he would sometimes half-hear it — the familiar footfall on the earthen yard, the sound of the door latch lifting.
Every single day.
The fields called them. The crops called them. The earth never let them go — as though an unspoken tenderness bound them to the soil.
Matiur sat up.
He rubbed his eyes with both hands, then stood. He wore bright red half-trousers and a thin vest — the first faint whispers of winter were beginning to make themselves known. He stepped outside.
Hasmot walked over to the kitchen.
"Ma, is the food ready?"
Khorseda looked up. Her eyes stung from the smoke, yet the light within them never dimmed.
"It's ready. Wash up — and wash Moti's face too."
This was the early 1980s. Tube wells were still rare in the village. An old, weathered well just outside served as their only source of water. Hasmot had already drawn water in a medium-sized tin bucket tied with jute rope.
He splashed water on his own face, then gently washed his younger brother's eyes and face as well.
Khorseda ladled rice into a lead container. Into three separate tin bowls she placed mashed potato, drumstick leaf curry, and a small-fish stir-fry.
She wrapped everything in an old cloth bundle — adding a tin jug, a glass, and three tin plates.
"Hasmot, go carefully. Hold Moti's hand."
Hasmot nodded. He was not young — nine or ten years older than Matiur, at least. He understood what it meant to be an older brother. He knew how to look after someone, how to keep them close.
He picked up the bundle.
"I'll carry it too," said Matiur.
"You can't. It's heavy."
"I can."
So, the two brothers held it together. Hasmot gripped the bundle in one hand and Matiur's hand in the other. Matiur held a corner of the cloth — as though he too were carrying it, as though he too were part of this small journey.
Khorseda stood in the doorway and watched. Her two sons had set off down the path. The smaller one's feet moved quickly, trying to keep pace with the bigger one. Behind them — the potato field to the north, the thatched shed of the dheki-mill beside it — all of it, one familiar picture.
Something stirred inside her. Not pain. Not joy. Something that sits between the two — a feeling only mothers know.
The two brothers walked along the path through the potato field.
The dew-wet leaves of the potato plants glistened. The sun had risen now — golden, gentle, that particular winter-morning sun that feels like more than just warmth when it touches your skin. It makes you feel that the world, after all, is a beautiful gift.
Beneath Matiur's feet — mud. Wet, soft mud. It gripped his feet with each step and then released them. And with every small step, a sound: chop-chop. He liked that sound. So he pressed down a little harder, just to hear it again.
Hasmot glanced back.
"What are you doing?"
"Nothing." Matiur grinned.
In the distance, they spotted Maqbul Hossain.
He was sitting beneath a small sheora tree at one corner of the field. A towel (gamcha) was wrapped around his head. A spade rested beside him. He had been working moments ago — now he rested, looking down at the earth, as though the soil were an old friend he was quietly conversing with.
Matiur saw his father. His feet quickened on their own.
"Abba!"
Maqbul Hossain raised his head. Sunlight fell across his face — sun-darkened, worn with labour — but at the sight of his son, a smile spread across it.
"You've come? Brought the food?"
"Yes, Abba," said Hasmot, holding out the bundle.
Maqbul Hossain untied the cloth. He spread his towel (gamcha) on the ground at the edge of the field and made room for all three.
"Sit down."
The three of them sat.
The sun rose in the east; in the west, a little shade still lingered. Rows of potato plants stood all around them — as though bearing quiet witness to this small moment. Somewhere in the distance, a cowbell rang. From the direction of the dheki-mill, someone's voice drifted over.
Maqbul Hossain served the boys first, then served himself.
Matiur began to eat. Hasmot ate in silence, glancing now and then at his father — at those hands, so rough and hardened by labour, yet somehow able to scoop out rice with such gentleness. He wondered about it as he ate.
When the meal was done, Maqbul Hossain said quietly, "Good crop this year. The soil is good."
It wasn't said to anyone in particular. Perhaps to himself. Perhaps to the fertile earth beneath him.
Matiur looked up. "Abba, how big have the potatoes got?"
Maqbul Hossain smiled. He dug into the soil and pulled out a potato — small, round, caked in mud.
"About this big. They'll grow bigger."
Matiur took the potato in his hands. Cold. Wet. The smell of earth clung to his palms. He turned it over and over, examining it — as though he were seeing a potato for the very first time.
And so the three of them sat on.
Few words. Mostly silence. But there was no emptiness in that silence. It was a full silence — one that held a father, two sons, warm sunlight, the smell of earth, and the quiet comfort of a shared morning meal.
Matiur did not know, then, where these moments would go.
He did not know that one day he would leave this muddy path far behind. He did not know that growing up sometimes means rising from this very ridge and walking away. He did not know that his father's hands would one day grow weak, that distance would grow between him and his brother, that life would carry each of them down different roads.
He only knew — right now, the sun was warm on his back. His father was beside him. His brother was beside him. And all around them stretched the green of the vegetable field.
He knew —
The sky was blue.
The earth was wet.
To him, the world was exactly this much.
And this much was everything.
— To be continued
ভেবেচিন্তে দেখলাম- যে চরিত্রকে আমি রূপায়ন করার চেষ্টা করছি, সেটি গল্প নয় বরং উপন্যাস হলেই ভালো হবে। নাম দিলাম- 'স্বপ্ন, শিকল ও একমুঠো আকাশ'
আমার আত্মার আত্মীয় এক বন্ধুর জীবনবোধের এক করুণ গল্প আমি আমার জবানে প্রকাশ করতে চাই।
আপনারা কী শুনবেন?
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Contact the school
Telephone
Website
Address
Jamalpur Sadar Upazila
2140