25/05/2024
উম্মাহর কল্যাণকামী কর্মবীর আলেম মনীষী
ইলিয়াস মশহুদ : শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আর কোনো নবী ও রাসুল আসবেন না। কিন্তু নবীওয়ালা কাজ চালিয়ে নিতে হবে। এ কারণে দুনিয়ায় কিছু মানুষকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়তের উত্তরসূরি করে পাঠানো হয়। যারা নবীওয়ালা কাজ চালিয়ে যাবেন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বুজুর্গ আলেম শায়খুল হাদিস মাওলানা নযীর আহমদ তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।
আদর্শ মানব গড়ার ক্ষেত্রে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের যেসব মনীষীর অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে, তাদের অন্যতম হলেন- শায়খুল হাদিস মাওলানা নযীর আহমদ। ঝিঙ্গাবাড়ি হুজুর নামে প্রসিদ্ধ ছোটখাটো গড়নের মায়াবী চেহারার অধিকারী এই আলেমকে দেখলে যে কারও মনে আলাদা টান ও মহব্বত জেগে ওঠে। উপমহাদেশের প্রবাদতুল্য বুজুর্গ শায়খে বায়মপুরী, হজরত হাফেজ্জী হুজুর, শায়খুল হাদিস মাওলানা আজীজুল হক ও শায়খুল হাদিস মাওলানা জাওয়াদ হুসাইন (রহ.)-সহ বরেণ্য অনেক আলেমের শিষ্যত্ব ও স্নেহসৌরভ তাকে ইলমি ময়দানে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ফলে ব্যাপক ও বিস্তৃত এই কর্মজীবনে তিনি যেমন একজন সফল ইমাম, খতিব, শিক্ষাসচিব, মুহতামিম ও শায়খুল হাদিসের মতো গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি ওয়াজ-নসিহতের ময়দানেও তার রয়েছে সরব উপস্থিতি।
মাওলানা নযীর আহমদ সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লামাঝিঙ্গাবাড়ি গ্রামে ৪ মে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা আজিজুর রহমান (রহ.) উঁচুমাপের যুগসচেতন আলেম ছিলেন। লামাঝিঙ্গাবাড়ি মোহাম্মাদিয়া মাদ্রাসা তারই প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ।
মাওলানা নযীর আহমদের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। অতঃপর কোরআন মাজিদ পড়েন হাফেজ কারি আহছানুল্লাহ (রহ.)-এর কাছে। এরপর ভর্তি হন লামাঝিঙ্গাবাড়ি মাদ্রাসায়, সেখানে পিতার তত্ত্বাবধানে চলে পড়ালেখার পর্ব। পরে গাছবাড়ি মুজাহিরুল উলুম কওমি মাদ্রাসায় হেদায়া, কুদুরি, কাফিয়া ইত্যাদি কিতাব পাঠ শেষে ইলম অন্বেষণের পর চলে যান কানাইঘাট দারুল উলুম মাদ্রাসায়। সেখানে তৎকালের যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে সহিহ বোখারি, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসায়ি, মুওয়াত্তাইন ও তাহাবি শরিফসহ দরসে নেজামির উচ্চস্তরের কিতাবাদি, যেমন- মুখতাসারুল মাআনি, তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে বায়যাবি, মিশকাতুল মাসাবিহ, শরহে আকাইদ, তাফসিরে মাদারেক, মুসাল্লামুস সুবুত, সুল্লামুল উলুম ইত্যাদি কিতাবের দরস গ্রহণ করেন।
তবে কানাইঘাট মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবনের শেষ দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় চলে যেতে হয়। চিকিৎসা চলাকালে লালবাগ মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হয়ে যান এবং শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.)-এর কাছে সহিহ বোখারির পুনর্পাঠ গ্রহণ নেন। ঢাকায় চিকিৎসা চলাকালীন এই দীর্ঘ সময়েও তার শারীরিক অবস্থা তেমন উন্নতি হয়নি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়ি চলে যান। এবারও ঘরে বসে থাকতে তার মন চায়নি, পিতা মাওলানা আজিজুর রাহমান (রহ.)-এর পরামর্শে সিলেটের বরেণ্য শায়খুল হাদিস হাফেজ জাওয়াদ হুসাইন পারকুলি (রহ.)-এর কাছে হাদিসের পাঠ নিতে ১৩৮৩ হিজরিতে দেউলগ্রাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এ বছরই সিলেট অঞ্চলের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারার অধীনে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আপন মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
শিক্ষাজীবন শেষে নিজ এলাকা তালবাড়ি নেছারিয়া ফয়যে আম মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে শুরু করেন। এরপর কিছুদিন লামাঝিঙ্গাবাড়ি মুহাম্মদিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। মাঝে কিছুদিন শিক্ষকতা ছেড়ে ইলম অন্বেষণের নেশায় আবারও চলে যান ছাত্রজীবনে। চারখাই আদিনাবাদ মাদ্রাসায় মাওলানা শফিকুল হক আকুনী, মাওলানা আব্দুর রব পিল্লাকান্দি ও শায়খুল হাদিস শফিকুল হক বুলবুল (রহ.)-এর কাছে ইলমে তাফসিরের বিশেষ পাঠ গ্রহণ করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপনের পর দেউলগ্রাম মাদ্রাসায় দীর্ঘ ৮ বছর হাদিস ও তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবাদি পাঠদান করেন। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের দুই বছর পর মুরব্বিদের নির্দেশে চলে আসেন সিলেট শহরে। জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদ্রাসায় একাধারে ৮ বছর দরসে নেজামির প্রায় সব কিতাবের পাঠদান করেন। ১৯৭৮ সালে চলে যান জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জে, সেখানে সহিহ বোখারিসহ সিহাহ সিত্তার অন্যান্য কিতাব সুনামের সঙ্গে পাঠদান করেন। রাজাগঞ্জ মাদ্রাসায় ৮ বছর থাকাকালে প্রথমে শিক্ষাসচিব, পরে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গায় দুই বছর সহিহ মুসলিম ও তিরমিজি পড়ান। পরে চলে যান চারখাই আদিনাবাদ মাদ্রাসায়, সেখানে ১ বছর থাকার পর আসআদুল উলুম রামধা মাদ্রাসায় ২ বছর, এরপর জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজারে কয়েক মাস সহিহ বোখারিসহ অন্যান্য কিতাবের পাঠদান করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে ১৪০৮ হিজরি থেকে অদ্যাবধি সিলেটের শীর্ষ দ্বীনি বিদ্যাপীঠ জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়ায় আমৃত্যু শায়খুল হাদিস হিসেবে সহিহ বোখারিসহ অন্যান্য কিতাবাদি পাঠদান করেছেন। জামেয়া রেঙ্গার ছাড়াও গাছবাড়ি মাযাহিরুল উলুম কওমি মাদ্রাসা, জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ মাদ্রাসা, সিলেট শহরের ভার্থখলা মাদ্রাসায়ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে রেঙ্গার পাশাপাশি জামেআ আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) জাহানপুর, মেজরটিলা মাদ্রাসায় শায়খুল হাদিস এবং ২০০৩ সাল থেকে লামাঝিঙ্গাবাড়ি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাওলানা নযীর আহমদের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত শ্রুতিমুধর। তার কোরআন তেলাওয়াতে যে কারও মন জুড়িয়ে যায়। দরগাহ মাদ্রাসায় শিক্ষকতার সময় কয়েক বছর সুবিদবাজার ফাজিলচিশত মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে শাহজালাল দরগাহ মসজিদেরও ইমাম ও খতিব নিযুক্ত হন। তবে কিছুদিন মসজিদের দায়িত্ব পালনের পর ইলমে হাদিসের খেদমতের বিচ্ছিন্নতা তাকে পীড়া দিতে শুরু করে। তাই তিনি মাদ্রাসার খেদমতকে অগ্রাধিকার দেন। এ ছাড়া রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের উলামায়ে কেরামের প্রাচীন সংগঠন আনজুমানে দাওয়াতুল হকের সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে সভাপতি হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। তিনি ঝিঙ্গাবাড়ি নাদিয়া বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ ছাড়া লামাঝিঙ্গাবাড়ি শাহী ঈদগাহে দীর্ঘদিন খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সিলেট জেলার অন্যতম একজন শায়খুল হাদিস হিসেবে তার মর্যাদা ও পরিচিতি ব্যাপক। আলেম-উলামার আধিক্যস্থান হিসাবে পরিচিত রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের উলামায়ে কেরামের শ্রদ্ধাভাজন, সবার মান্যবর, মুরব্বি ও অভিভাবক হিসাবে মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সামাজিক ও দ্বীনি কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি ব্যাপক, অবদানও প্রচুর। সরাসরি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও ইসলামি রাজনীতি চর্চার বিরোধী নন। এই বৃদ্ধ বয়সেও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে দর্শক সারিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রচারবিমুখ হিসেবে থাকতে পছন্দ করেন, তাই জোর করেও কেউ তাকে মঞ্চে নিতে পারে না।
সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও মার্জিত কথনের অধিকারী এই আলোকিত ব্যক্তিত্ব জামেয়া রেঙ্গায় ইলমে হাদিসের নিরবচ্ছিন্ন খেদমতের দ্বারা জামেয়ার শিক্ষা অবদানের ক্ষেত্রে এক সোনালি স্তম্ভের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সিলেটের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে দ্বীনি খেদমতের অব্যাহত ধারাবাহিকতা তার কর্মজীবনের একটি অনুপম অধ্যায়।
আধ্যাত্মিকতায় তিনি শায়খে মাদানি (রহ.)-এর খলিফা মাওলানা আব্দুল জলিল বদরপুরী (রহ.)-এর কাছে বায়াত হন এবং খেলাফত ও ইজাজত লাভ করেন। লেখালেখির ময়দানেও তিনি সরব। এখনকার মতো প্রকাশনাশিল্পের মান যদি ৮০-৯০ দশকে থাকত, তবে মাওলানা নযীর আহমদের মাধ্যমে আমরা অনেক উপকারী রচনা পেতাম। তবু যা করেছেন এবং এখনো লেখালেখি বিষয়ে যে প্রেরণা তিনি লালন করেন, তা আর দশজন শায়খুল হাদিসের মধ্যে পাওয়া বিরল। তার লিখিত কয়েকটি বই হচ্ছে- কুরবানির মাসাঈল ও ঐতিহাসিক পটভূমি, শবেবরাতের তাৎপর্য, সহজ পদ্বতিতে হজ ও ওমরা। এ ছাড়া আরবি ও বাংলা বিভিন্ন ম্যাগাজিন-সাময়িকীতে তার অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে তিনি সিলেটের সর্বজনমান্য ও প্রবীণ আলেমে দ্বীন হিসেবে স্বীকৃত। উম্মাহর কল্যাণচিন্তায় সিলেটের আলেমরা তার পরামর্শ নেন। বয়সের ভারে জবানে যদিও অস্পষ্টতা এসেছে, তবু হাদিসের মসনদে বসে যখন ওয়াবিহি কালা হাদ্দাসানার সুর তুলেন, তখন যেন নবীপ্রেম উথলে ওঠে তার মননে, হয়ে যান একজন তরুণের মতো।
সুন্নতের অনুসরণ ও আখলাকে নববির আলোয় আলোকিত পূর্ববর্তী আলেমদের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, নিয়মিত তাহাজ্জুদগোজার এই শায়খ উম্মতের জন্য অনেক বড় নেয়ামত। তার অসংখ্য ছাত্র দেশ-বিদেশে ইলমের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। তিনি হজপালনের নিমিত্তে সৌদি আরব ছাড়াও ভারত সফর করেছেন। ১৩৮৭ হিজরিতে তিনি আলহাজ মৌলভি শফিকুল হক (রহ.)-এর তৃতীয় কন্যাকে বিয়ে করেন। তিনি ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক। ছেলেমেয়ে সবাইকে দ্বীনি শিক্ষা দিয়েছেন।
মহান এই মনীষী বেশ কদিন ধরে অসুস্থ হয়ে সিলেট ইবনে সিনা ও নর্থইস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আজ শনিবার (২৫ মে) ভোর সাড়ে ৫টার সময় নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।
আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।