12/05/2020
চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠের ইতিকথা
ক্যামেরুন ইন্সটিটিউটের ঠিক পাশেই ছিল একটি স্কুল। পাকশীর অতি পরিচিত হাশেম আলী মিলনায়তনের প্রথম নাম ছিল ক্যামেরুন ইন্সটিটিউট। স্কুলটি ছিল একটি উচ্চ মাইনর স্কুল। মুন্সি নকীব উদ্দিন তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন, পরে তাঁর অবর্তমানে বাবু মোহিনী মোহন চৌধুরী প্রধান শিক্ষক হন। পাকশী ফুটবল মাঠের দক্ষিনে, খড়ের চাল ও চাটাইয়ের দেয়ালে নির্মিত স্কুলটিতে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন হতো। শিশু, ১ম ও ২য় শ্রেণীর ক্লাস হতো পশ্চিম দিকে বড় ঘরে। ৮/১০ জন ছাত্র বিশিষ্ট ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর ক্লাস মাঝের ঘরটিতে হলেও সেই ঘরের মাঝে কোন দেয়াল ছিল না। আর ১২ জন ছাত্র বিশিষ্ট ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস হতো পূর্ব দিকের ঘরটিতে।
দক্ষিনমুখি ও চারদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ থাকায় প্রচুর আলো-বাতাস পাওয়া যেত স্কুলটিতে। স্কুল প্রাঙ্গণে দুটি কাঁঠাল গাছও ছিল। বারান্দার ছোট ঘরটিতে একটি বড় সিন্দুকের মধ্যে স্কুলের কাগজপত্র ও মানচিত্র ইত্যাদি থাকতো। স্কুলের পূর্ব দিকে একটি ছোট চালাঘরে “নাথু” নামে একজন পরিচারক থাকতো। সব মিলে ৪৫ থেকে ৫০ জন ছাত্র লেখাপড়া করত স্কুলটিতে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহিনী মোহন চৌধুরী এর বাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার শিকারপুরে।
১৯২৪ সালে ২রা জানুয়ারী মাইনর স্কুলটি পাকশী হাই ইংলিশ স্কুলে পরিণত হয়। পুরানো স্কুলের ছাত্রসহ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সবার এ স্থানে ধারণ করা সম্ভব হতো না। তাই শিশু শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ক্যামেরুন ইনস্টিটিউটে ক্লাস হত। এ ভাবে চলে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত।
১৯২৫ সালে “যোগীন্দ্রচন্দ্র দাশগুপ্ত” বর্তমান স্কুলটির জন্য রেলওয়ের জমির পাশে জমি কিনে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ছাত্ররা নতুন স্কুল ঘরে স্থানান্তরিত হয়। সাথে শিক্ষক ও ছাত্রদের থাকার জন্যও ঘর তৈরি করেন। এই সময়ের পাকশী রেলের কর্মী সমাজ থেকে সংগৃহীত সাপ্তাহিক মুষ্টি ভিক্ষা স্কুলের প্রয়োজনে লাগত এবং ছাত্রাবাসে অনেক গরিব ছাত্রদের খাবারের একাংশ ব্যবস্থা হত। এই ভাবে যোগীন্দ্র বাবু ও সাঁড়ার বিশিষ্ট চিকিৎসক রাম বাবুর সাথে একত্র হয়ে এই মহৎ কাজটি করেন।
শ্রী যোগীন্দ্র বাবুর স্কুল নির্মাণের পেছনে যে কারন ও উদ্দেশ্যটি রয়েছে তা না বললেই নয়। যোগীন্দ্র বাবু তখন পাকশীতে আসেন রেলওয়ের ইন্সপেক্টর অফ ওয়ার্কস হয়ে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণই ছিল তার প্রধান কাজ। তিনি প্রমোশন পেয়ে এস.ডি.ও হয়ে পাকশীতেই থেকে গেলেন। আজ যেখানে চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ছিল ঘন জঙ্গল। যোগীন্দ্র বাবু একদিন সেই জঙ্গলে শিকারে এসে দুটি মানুষের লাশ দেখতে পান। দুটি পুরুষকে দু'একদিন আগে নির্মমভাবে হত্যা করে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়েছিল। এ দৃশ্য দেখে তিনি বিচলিত হলেন। শিকারের উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন এবং বাড়ি ফিরে তার মাকে ঘটনাটি বললেন। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারলেন যে নিহত ব্যাক্তিরা বাঘইল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তার মা শ্রীমতি চন্দ্রপ্রভা দেবী তাকে আদেশ দিলেন তিনি যেন সেখানে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন যার ফলে মানুষ মানুষের গলা না কেটে কাটা গলাকে জোড়া লাগাবে।
মায়ের আদেশ অনুসারে তিনি এখানে একটা স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ নিলেন। সব দিক থেকেই তিনি বাধাপ্রাপ্ত হলেও বিভিন্ন ভাবে জমির ব্যবস্থা করা হলো। ঠিকাদার কর্মচারী ও অন্যান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় স্কুল স্থাপনের কাজ পুরোদমে চলল। নানা কৌশলে রেল ভান্ডার থেকে নেয়া হল ঢেউটিন, পুরনো রেল, ইট, সুরকী ইত্যাদি । এভাবেই এ স্কুলের কাজ সমাপ্ত হয়। ১৯২৪ সালে চালু হওয়া স্কুলটি ১৯২৫ সালে বর্তমান স্কুলের জায়গায় স্থানান্তরিত হয়।
১৯৩৭ সালটি ছিল স্কুলের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় বছর। হঠাৎ এক রাত্রিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ভস্মীভূত হল স্কুলের সমস্ত রেকর্ড, গ্রন্থাগারের সব মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ সেইসঙ্গে স্কুল ভবনটিও। প্রতিষ্ঠাতা, শ্রীযুক্ত বাবু যোগীন্দ্র চন্দ্র দাসগুপ্ত এই দুঃসংবাদ পেয়ে কোলকাতা থেকে ফোনে জানালেন তিনি আসাম মেলে আসবেন। পাকশীতে আসাম মেল থামে না তাই প্রধান শিক্ষক, বাবু বিধু রঞ্জন মজুমদার ও বাবু আশুতোষ চক্রবর্তী তাকে ঈশ্বরদী থেকে আনতে গেলেন মটর ট্রলি নিয়ে। বিকেল সাড়ে চারটায় দিকে আসাম মেল স্টেশনে থামতেই দেখলেন তৃতীয় শ্রেণীর একটা কামরার দুই হ্যান্ডেল ধরে উস্কো খুস্কো চুলের মলিন মুখে, ধুতি পাঞ্জাবি চাদর পরে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। সবাই নির্বাক থাকলেও তিনি অশ্রু আটকাতে পারলেন না। তার আসার খবর পেয়ে অনেকেই এসেছিলেন তার সাথে পুড়ে যাওয়া স্কুলটি ঘুরে দেখতে।
অতঃপর তিনি প্রস্তাব দিলেন তার মা চন্দ্রপ্রভা দেবীর স্মৃতি রক্ষার্থে “পাকশী হাই ইংলিশ স্কুল” এর নাম পরিবর্তন করে “চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ” নামকরণ করা। এই নতুন নামকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি থাকলে, বিদ্যালয়ের পুনর্নির্মাণ কাজের সমস্ত ব্যয়ভার তিনি বহন করবেন। সমৃদ্ধশালী করে দেবেন বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, জরুরী হলে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তাও দেবেন তিনি। রাজী হলেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যোগীন্দ্র বাবু অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন তিনি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি। আর “পাকশী হাই ইংলিশ স্কুল” তখন থেকে বদলে হয়ে গেল “চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ”।
১৯২৪ সালের সেই পাকশী হাই ইংলিশ স্কুলটি কালের পরিক্রমায় এবং সময়ের দাবীতে ১৯৩৭ সালে চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ নাম ধারন করে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে পথচলা শুরু করে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘটে এর উৎকর্ষতা। অল্প দিনেই ছড়িয়ে পড়ে এর দ্রুতি। হয়ে ওঠে পাকশীর বাতিঘর। এভাবে চলতে গিয়ে স্কুলটি বিভিন্ন সময় নানা ভাবে, নানা দিক দিয়ে পরিবর্তিত হয়। এ দীর্ঘ পথ চলায় ১৯৮৫ ইং সালে স্কুলটি রেলওয়ে করন করা হয় এবং এর নতুন নামকরন করা হয বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ পাকশী। তখন থেকে অদ্যাবধি স্কুলটি এই নামে তার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ১৯২৪ সালে অত্র অঞ্চলের শিক্ষার প্রসারে যে ছোট্ট চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল আজ শতবর্ষের দারপ্রান্তে তা যেন এক মহিরুহু, পত্র পল্লবে সুশোভিত। যার সুবাশ আজ ছড়িয়ে পড়েছে এ ছোট জনপদ ছাড়িয়ে অনেক দুরে আলোকিত মানুষ গড়ার কারখানা হিসাবে। চন্দপ্রভা বিদ্যাপীঠ তার স্ব- মহিমায় উজ্জ্বল এক দিপ্তীময় নক্ষত্র। আমাদের শিক্ষার আতুরঘর, অনেক ভালোবাসায় মোড়া অঙ্গন।
(এই লেখাটি আমাদের ৯২ ব্যাচের প্রয়াত বন্ধু আজম ও সজিব কে উৎসর্গ করে লেখা)
সংগ্রিহিতঃ মনিরুল ইসলাম উজ্জল। ব্যাচ ৯২
ঈশ্বরদী ১২. ৫. ২০২০