13/10/2024
সত্য ঘটনার প্রেক্ষিতে
`করোনার কালো অধ্যায়'
সুজন বেসরকারি একজন চাকরিজীবী। সংসার মোটামুটি ভালই চলছিল লালবাগের একটি বাসার দ্বিতীয় তলায় থাকতো। গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল, পানি বিলসহ হাজার বিশেক টাকার মধ্যেই বাড়ি ভাড়া টা কমপ্লিট হয়ে যেত। বেতনের বাকি টাকা দিয়ে সংসার বেশ ভালোই চলছিল। সুজনের সংসারে তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান। গ্রামের বাড়িতে সুজনের বাবা-মা থাকেন। বাবা-মা বেশ ধণ্যার্ঢ। শহরের একপাশে একটি বাড়িতে (৩ তলা) থাকেন আর দুইটি বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন।যেহেতু বাবা-মায়ের আয়ের উৎস ছিল, তাই সুজনকে তেমন বেগ পোহাতে হতো না। তবে যত বারই বাবা-মাকে দেখতে যেত, ততবারই বাবা-মাকে খুশি করার জন্য তাদের পছন্দসই খাবার/ পণ্য নিয়ে যেত। বাসা থেকে চলে আসার সময় বাবা-মায়ের হাতে যতটুকু সম্ভব টাকা জোর করে হলেও দিয়ে আসতো। বাবা-মা রাখতে চাইতো না। তারপরও সুজন বিছানায়/ বালিশের নীচে রেখে আসতো।
বাবা-মায়ের প্রতি সুজনের অগাধ ভালবাসা। কারণ সুজন জানতো হাদিসে আছে- বাবা-মায়ের এমন আচরণ করা যাবে না, যাতে তারা উহ শব্দটি করে।
২০২০ সাল,হঠাৎ করেই করোনার প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে শুরু হয়।প্রথম কয়েক মাস সবকিছুই ঠিকঠাক মতোই চলছিল কিন্তু হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠান থেকে যে পরিমাণ বেতন তাকে দেয়া হতো সেই পরিমাণ বেতন দিবে না বলে প্রতিষ্ঠান সাফ জানিয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের ঠিক অর্ধেক বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, অনান্য সকল এলাউন্স বন্ধ। করোনাকালীন সময়ে চাকরি ছাড়াও যাবে না, পাশাপাশি অন্য কোথাও অন্য কোন কাজ কেউ দিবেও না। কয়েকদিন পার হওয়ার পর সন্তানদের জন্য যেই প্রাইভেট টিউটর রাখা হয়েছিল সেই টিউটর বাদ দেয়া হয়। বাজার সদাইয়ের খরচ কমিয়ে দেয়া হয়েছে, চিকন চালের জায়গায় মোটা চালের ভাত খাওয়া শুরু করেছে।
যে পরিমাণ টাকা নিয়ে সংসার চালানোর কথা সেই পরিমাণ টাকা না পাওয়ার কারণে তাদের দূদর্শা শুরু হল সংসারের খরচ বাঁচানোর জন্য সকল অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সন্তানরা যেভাবে বেড়ে উঠেছিল সেই খরচ সংগ্রহ করা বা যোগান দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না ফলশ্রুতিতে ভাত ডাল এবং ভর্তা ছাড়া আনুষাঙ্গিক সমস্ত খাবার দাবারই বন্ধ হয়ে গেলো।
শিশু বাচ্চা বিস্কুট,চিপসের জন্য প্রায়ই আবদার করে কিংবা একটু দুধ চা খাওয়ার জন্য আবদার করে। সুজন মিথ্যার আশ্রয় নেয় কাল ঠিক এনে দেব। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। বাবা বিস্কুট/চিপস এনে দেয়না। একদিন ছোট বাচ্চাটি জেদ ধরেছে, আজ বিস্কিট এনে দিতেই হবে। এনার্জি প্যাকেট বিস্কিটের দাম ১০ টাকা। সেই ১০ টি টাকা সুজনের পকেটে ছিল না তারপরেও সে দোকানদারের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল যে ভাই এক প্যাকেট বিস্কিট দিবেন বাকিতে। দোকানদার বাকিতে অসম্মতি জানায়, বলেন আগেরই বেশ কিছু টাকা বাকি আছে জনাব ওই টাকা গুলা পরিশোধ করেন তারপরে নিয়ে যাবেন। সুজন মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
দোকানের পাশেই একটা ণির্মাণাধীন ভবন। কন্ট্রাক্টর সাইফুল ( টাইলসের কন্টাকটার) বিষয়টি বোঝতে পারলো এবং ডেকে বলল সুজন ভাই আপনি দশ টাকা নিয়ে আপনার ছেলের জন্য বিস্কুট নিয়ে যান। রাজি হল না কারণ সুজন নম্র ভদ্র কারো কাছ থেকে হাত পেতে খাওয়ার মত ছেলে সে নয়।
এক পর্যায়ে দেখতে পেল আজকে টাইলস মিস্ত্রির হেলপার আসেনি সুজন জিজ্ঞেস করল হেলপারের মজুরি কত সাইফুল উত্তর দিল হেলপারের মজুরি ৬০০ টাকা । সুজন বললো, আমাকে কাজ দেয়া যাাবে? রাজি হয়ে গেল সাইফুল। উপায়ান্তর না পেয়ে এসি রুমে কাজ করা সুজন, ৬০০ টাকা হাজিরায় কুলির কাজ করেছে।
কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্ত না হওয়ায়, দিন দিন ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল।কোন উপায় না পেয়ে,সুজন বাবা-মায়ের কাছে সাহায্যের জন্য ফোন করে। বাবা প্রথমে নিষেধও করেনি আবার রাজিও হয়নি। কিন্তু মা বলেই ফেলল ঠিক আছে বাসায় আসো সবাই মিলে বসে পরামর্শ করি।
আমি তোমাদের বড় সন্তান আমি আজকে বিপদে পড়ে তোমার কাছ থেকে একটু থাকার জন্য জায়গা চেয়েছি তোমাদের তিনটে বাড়ি, আমার থাকার জন্য একটা রুম হলেই হবে। সেই রুমের জন্য পরামর্শ করতে হবে? কেন সবাইকে নিয়ে বসতে হবে? আমি চেয়েছি বাবা মা আমাকে দিবে, এটা আমার অধিকার আমি কি আমার অধিকার পেতে পারি না? তাছাড়া, আমি যদি বাড়িতে থাকতাম, তাহলে আমাকে কি একটি ঘর দিতে না?
ঘটনাটি ইতিমধ্যেই সুজনের ছোট ভাই এবং ছোট বোনের কানে পৌঁছালো। সুজন তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানসহ যদি বাসায় আসে তাহলে তাকে একটি ফ্লাট অন্তত দিতে হবে। ফ্ল্যাটের বর্তমান ভাড়া দশ হাজার টাকা। ১০ হাজার টাকা ভাড়া আসা ফ্লাট সুজনকে দেয়া যাবে না। দেশের পরিস্থিতি খারাপ বরং ভাড়ার ওই টাকা আপনারা জমিয়ে রাখুন। বাবা-মা চিন্তা করল যে ঠিকই তো ওকে ফ্লাট দিলে ১০ হাজার টাকা আমাদের লস। একপর্যায়ে সুজন ভাড়ার বিষয়টি জানতে পারলো, সুজন মাসে দশ হাজার টাকা দেবে বলেও আশ্বস্ত করলো।
বাবা প্লিজ তুমি আমাকে একটু থাকার জায়গা দাও। অল্প কিছুদিনের জন্য। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই ঢাকায় ফেরত যাবো। বাজার করার টাকা নেই, ভাত ভর্তা আর ডাল ছাড়া আর কিছুই কপালে জোটে না। ছেলেদের নিয়ে খুব খারাপ সময় পার করছি। টাকা-পয়সা লাগবে না। থাকার জায়গা হলেই বাসাটা ছেড়ে দিব, প্রায় বিশ হাজার টাকা থেকে যাবে। আমাকে পারমিশন দাও।
ঠিক আছে তুমি চলে আসো আমি ব্যবস্থা করে দিব কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন দিয়ে বলল তুমি এই বাসায় আসবা না, ভাড়ার বাসায় উঠতে হবে। সুজনের অভিমানী মনে বড় ধরণের ধাক্কা লাগলো। সুজনের চাওয়া ছিল, বাবা-মা, ভাইয়ের সাথেই থাকবে, বোন মাঝে মাঝে বেড়াতে আসবে। ভাড়ার বাসায় কেন?
ভাগ্যের কি পরিহাস, যে ভাই-বোনকে কলিজার ভেতরে যত্নে রেখেছে সুজন, সেই ভাই-বোন, বাবা-মাকে উল্টা-পাল্টা বুঝিয়ে কান ভাড়ি করে ফেলছে। অসহায় হয়ে ছোট্ট বাচ্চাদের মত আর্তনাদ করেছে সুজন, বাবার কাছে, মায়ের কাছে, মন গলেনি বাবার। মন গলেনি মায়ের। ছোট ভাই আর ছোট বোনের কুবুদ্ধির কাছে ম্লাণ হয়ে গেছে সুজনের কষ্ট, ধূসর হয়ে গেছে সুজনের আর্তনাদ।
রাগে ক্ষোভে সুজনের বাড়ি যাওয়া হলো না। দুই সন্তান এবং স্ত্রীকে নিয়ে সুজন আরো বেশি অসহায় হয়ে যায়। কি বিভৎস! কি করুণ সে দিনগুলো।
আমাদের সংসারে এমন অনেক সুজন আছে, যারা ন্যায়ের সাথে মাথা উচু করে বাচতে চায়। অথচ সমাজের কিছু স্বার্থান্বেষী লোকের কারণে সৎ মানুষগুলো দারিদ্রতার চাপে মাথা উচু করে দাড়াতে পারেনা। হাত পাতলে বা অন্যের সম্পদে পোদ্দারী করতে চাইলে সুজন অনেক চাকচিক্য নিয়ে সমাজের সামনে আসতে পারে। সুজন কখনো তা করেনি।
তবে আমি বিশ্বাস করি, সুজনরা মরে যায় না,বুকের ভিতর পাহাড় সমান ব্যথা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলে। চলবে।
12/11/2023
12/02/2022
02/02/2022
05/01/2022
19/12/2021
17/12/2021
10/12/2021
03/12/2021
25/11/2021