04/11/2024
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচনের জন্য ডেলিগেট মনোনয়ন হলো প্রাথমিক প্রক্রিয়া। এটি প্রাথমিকভাবে প্রাইমারি, ককাস, এবং দলীয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হয়। মনোনয়নের এই প্রক্রিয়াটি দল এবং রাজ্যের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হতে পারে।
বেশিরভাগ ডেলিগেট মনোনীত হন রাজ্য-স্তরের প্রাইমারি এবং ককাস নির্বাচনের মাধ্যমে। এই নির্বাচনগুলোতে সাধারণ জনগণ ভোট দেন এবং প্রতিটি প্রার্থীর সমর্থনে নির্দিষ্ট সংখ্যক ডেলিগেট মনোনীত হয়। ডেলিগেট সদস্য দুই রকম-
বাধ্যতামূলক ও অনাবদ্ধ ডেলিগেট। বাধ্যতামূলক ডেলিগেট প্রাইমারি ও ককাসের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচিত হন এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন দিতে বাধ্য থাকেন। অনাবদ্ধ ডেলিগেট বা সুপারডেলিগেট সাধারণত পার্টিতে কিছু উচ্চপদস্থ সদস্য যেমন গভর্নর, সিনেটর, এবং কংগ্রেস দ্বারা নির্বাচিত হন, যারা প্রার্থীর প্রতি বাধ্য নন। তারা স্বাধীনভাবে নির্দিষ্ট দলের যে কোনও প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারেন।
এছাড়াও প্রতিটি দল তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় ডেলিগেটদের মনোনীত করে। কিছু রাজ্যে দলীয় কমিটি বা কাউন্সিলরা ডেলিগেট মনোনয়ন দেয়, যা পার্টির নীতিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায়, বিভিন্ন রাজ্যে ডেলিগেটের সংখ্যা দলের নিয়ম, জনসংখ্যা, এবং দলের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলের জন্য সর্বাধিক ডেলিগেট সংখ্যা প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা সাধারণত ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বড় রাজ্যের জন্য বরাদ্দ থাকে।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় সর্বাধিক ডেলিগেট থাকে। উদাহরণস্বরূপ ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য ৪৯৫ জন বাধ্যতামূলক ডেলিগেট সদস্য আছে, যা অন্যান্য ছোট রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমগ্র কনভেনশনে প্রায় ৪,৫৬৩ ডেলিগেট আছে।
রিপাবলিকান পার্টিতে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বড় রাজ্যে প্রায় ১৬৯ ডেলিগেট থাকে। রিপাবলিকান পার্টির সমগ্র কনভেনশনে প্রায় ২,৪২৯ ডেলিগেট থাকে।
তবে ডেলিগেটের সংখ্যা নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয়, কারণ জনসংখ্যা পরিবর্তন এবং নির্বাচনী বিধিতে কিছুটা হেরফের হতে পারে। তবে প্রতি রাজ্যে ন্যূনতম ডেলিগেট সংখ্যা ৩।
সাধারণত পার্টি কনভেনশনের ডেলিগেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাসের প্রথম মঙ্গলবার পর্যন্ত। মার্চ মাসের প্রথম মঙ্গলবারকে 'সুপার টুইসডে' বলা হয়।
জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এই ডেলিগেটরা পার্টি কনভেশনে বসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনীত করেন। তারাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ইলেকটর মনোনীত করেন, যাদের সরাসরি ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এইসব ইলেকটরের ভোটকে বলে ইলেকটোরাল ভোট। দুই দলের( ডেমোক্রট ও রিপাবলিকান) সর্বমোট ৫৩৮ টি ইলেকটোরাল ভোট নিয়ে গঠিত হয় ইলেকটোরাল কলেজ। এই ইলেকটোরাল কলেজে যে প্রার্থী ২৭০ বা তার বেশি ইলেকটোরাল ভোট পাবেন তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
বলে রাখা ভালো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরের মঙ্গলবারে। যদিও ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে যায়, ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে থেকেই। ভোট গ্রহণের এই আগাম প্রক্রিয়া দুই ভাবে হয়ে থাকে। একটি হলো আর্লি ভোটিং প্রক্রিয়া, অন্যটি হলো মেইল ইন ভোটিং প্রক্রিয়া। তবে মঙ্গলবারের পরে আর কোনো ভোটারের ভোট গ্রহণ হয় না।
৫০ টি রাজ্যের প্রত্যেকটিতে ইলেকটরের সংখ্যা সমান নয়। যেমন সবচেয়ে বড় রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৫ হলেও ফ্লোরিডায় হলো ৩০ টি এবং সবচেয়ে ছোট রাজ্য ওয়াইওমিং এ আছে মাত্র ৩ টি ইলেকটোরাল ভোট। এভাবে ৫০ টি রাজ্যে মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৫ টি। বাকি তিনটি ইলেকটোরাল নির্ধারণ করা আছে ওয়াশিংটন ডিসির জন্য। তবে ডিসি থেকে কোনো প্রতিনিধি ( সিনেট বা হাউস ) কংগ্রেসে যায় না। তারা শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
বেশিরভাগ রাজ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে “উইনার-টেক-অল” পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতিতে সংখ্যা গরিষ্ঠ ভোটারের ভোট যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পায়, তিনি ঐ রাজ্যের সকল ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান। যেমন- একটি রাজ্যে ইলেকটোরাল ভোট আছে ৫৫ টি এবং ভোটার আছে ২ কোটি ২০ লক্ষ, একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পেল ১ কোটি ১০ লক্ষ ২০০ ভোট এবং অনজন অর্ধেকের সামান্য কম ভোট পেল। মজার বিষয় হলো যে প্রার্থী মাত্র ২০০ ভোট বেশি পেলো সে ঐ রাজ্যের সমস্ত ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান। অর্থাৎ কোনো দলের পার্টি কনভেনশনে ডেলিগেটরা যাদেরকে ইলেক্টর হিসেবে মনোনীত করেছিলেন তারা সবাই নির্বাচিত হয়ে গেলো। অন্য দিকে যে দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মাত্র ২০০ ভোট কম পেলো তিনি একটি ইলেকটোরালও পেলেন না। অনেক ক্ষেত্রে যিনি নির্বাচিত হন তিনি পরাজিত প্রার্থীর তুলনায় লক্ষ ভোট কম পেয়েও প্রেসিডেন্ট হয়ে যান।
শুধুমাত্র মেইন এবং নেব্রাস্কাতে ভিন্ন পদ্ধতি আছে, মেইনের মোট ৪টি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে। এখানে ২টি ইলেকটোরাল ভোট রাজ্যের সাধারণ বিজয়ী প্রার্থীকে দেওয়া হয় এবং বাকি ২টি ইলেকটোরাল ভোট ২টি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের বিজয়ীদের মধ্যে ভাগ করা হয়।
উদাহরণ: যদি একটি ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট এবং অন্যটিতে রিপাবলিকান প্রার্থী জয়লাভ করে, তবে দুজনেই একটি করে ইলেকটোরাল ভোট পেতে পারেন।
নেব্রাস্কা: নেব্রাস্কার মোট ৫টি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে। এর মধ্যে ২টি ভোট পুরো রাজ্যে জনপ্রিয় ভোটে বিজয়ী প্রার্থীকে দেওয়া হয় এবং বাকি ৩টি ইলেকটোরাল ভোট রাজ্যের ৩টি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের বিজয়ীদের মধ্যে ভাগ করা হয়।
উদাহরণ: ৩টি ডিস্ট্রিক্টের মধ্যে যদি ২টি ডিস্ট্রিক্টে একজন প্রার্থী এবং অপরটিতে অন্য প্রার্থী জয়লাভ করেন, তবে উভয় প্রার্থীই কিছু ইলেকটোরাল ভোট পেতে পারেন।
সুইং স্টেট বা ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেটগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এমন কিছু রাজ্য যেখানে নির্বাচনী ফলাফল সাধারণত অনিশ্চিত থাকে এবং উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা জয়লাভের ভালো সম্ভাবনা রাখে। এই রাজ্যগুলোর জনপ্রিয় ভোটে খুব সামান্য ব্যবধানেই ফলাফল পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এই রাজ্যগুলোর ইলেকটোরাল ভোট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে।
নির্বাচনের প্রতি চক্রে সুইং স্টেটের তালিকা কিছুটা পরিবর্তিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণত নিম্নলিখিত রাজ্যগুলো সুইং স্টেট হিসেবে বিবেচিত হয়:
ফ্লোরিডা (Florida) - ২৯টি ইলেকটোরাল, পেনসিলভেনিয়া (Pennsylvania) - ২০টি, মিশিগান (Michigan) - ১৬টি, ওহাইও (Ohio) - ১৮টি, উইসকনসিন (Wisconsin) - ১০টি,
নর্থ ক্যারোলাইনা (North Carolina) - ১৫টি, আরিজোনা (Arizona) - ১১টি, জর্জিয়া (Georgia) - ১৬টি, নেভাডা (Nevada) - ৬টি ইলেকটোরাল ভোট আছে।
সুইং স্টেটগুলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সুইং স্টেটগুলোর ইলেকটোরাল ভোট বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এদের সম্মিলিত ইলেকটোরাল ভোট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। বলা হয়ে থাকে এই রাজ্যগুলোর ভোটাররা নাকি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে সবসময় সমর্থন করেন না। উদাহরণস্বরূপ, ফ্লোরিডার মতো বড় রাজ্যে জয়লাভ করা যেকোনো প্রার্থীর জন্য জয়ের পথে এক ধাপ এগিয়ে থাকা বোঝায়। নির্বাচনী প্রচারণা এবং প্রচুর অর্থও এই রাজ্যগুলোর ভোটারদের জন্য ব্যয় হয়, কারণ এদের ভোটগুলো প্রায়ই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করে।
নির্বাচনের পর নির্দিষ্ট দল থেকে মনোনীত ইলেকটরগণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ডিসেম্বরের দ্বিতীয় বুধবারের পরের সোমবারে ইলেকটোরাল কলেজে ভোট প্রদান করেন। এই ভোট গণনা হয় জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখে এবং বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। জানুয়ারির ২০ তারিখে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী শপথ গ্রহণ করেন।
মার্কিনিদের জন্য শুভ কামনা।