Darul Uloom Mueenul Islam দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী

Darul Uloom Mueenul Islam দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী

Share

05/06/2026

প্রশ্নঃ আমাদের এলাকায় কয়েক বছর পূর্বে নতুন একটি দলের আবির্ভাব হয়েছে। এরা এমন কতগুলো আক্বীদা প্রচার করে বেড়াচ্ছে, যা কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর এসব আক্বীদাগুলোর মাধ্যমে এলাকার সরলমনা ও নিরীহ মুসলমান ভাই-বোনদেরকে তাদের দলভুক্ত করে ঈমান হারা করছে। তাদের আক্বীদাগুলোর বিশেষ বিশেষ কয়েকটি ক্রমানুসারে নিম্নে উল্লেখ করা হলো। এদের ব্যাপারে কুরআন-হাদীসের আলোকে মতামত দিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরকে গোমরাহী থেকে বাঁচার পথ বাতলে দিবেন। বিশেষ বিশেষ আক্বীদাগুলো নিম্নরূপ-

(১) এই দলের প্রধান হলো বায়েযিদ খান পন্নী। তার উক্তি- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে, যা সমাপ্ত করার জন্য আল্লাহ্ তায়ালা তাকে ইলহামের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান করেছেন।

(২) দলনেতা ও তার অনুসারীদের উক্তি- জুম্আ ও দুই ঈদের নামায পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা ছাড়া জুম্আ ও ঈদাইনের নামায পড়া ভণ্ডামী ছাড়া আর কিছুই নয়।

(৩) বর্তমান আলেম সমাজ, যারা তাদের দলের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন না বা তাদের দলভুক্ত হবেন না, তারা কাফির, মুশরিক। তাদের পিছনে নামায পড়া হারাম।

(৪) মাযহাব স্বীকার বা মান্য করা তাদের দলগত আক্বীদা বিরোধী।

(৫) যারা ‘হিযবুত তাওহীদ’-এর সাথে একমত নন, মৃত্যুর পর তাদের জানাযা পড়া যাবে না। এমনকি তাদের মা-বাবা হলেও। যেহেতু তারা কাফির ও মুশরিক।

(৬) দাঁড়ি, টুপি, লম্বা জামা ও সুন্নাত নামায পড়া প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। কারণ, এতে ইসলামের কিছু যায় আসে না।

(৭) বর্তমান কুরআন-হাদীস এবং কওমী ও মারকাযী মাদ্রাসার পাঠ্য সিলেবাস তৎকালীন খ্রীস্টান তথা ইংরেজ শাসকদের নির্বাচিত। তাই শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তা মানা যাবে না।

(৮) ‘সিহাহ্ সিত্তাহ্’র হাদীসগুলোর উপর নির্ভর করা যায় না। যেহেতু এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত শত বছর পর সংকলিত। আমরা এক সপ্তাহ আগের কথা স্মরণ রাখতে পারি না, তারা কিভাবে শত শত বছর আগের কথা স্মরণ রাখবে। তাই এগুলোতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত।

(৯) নবী-রাসূলগণ ভুলের ঊর্ধ্বে নন। যেহেতু তাঁরা আমাদের মত মানুষ। যদিও মর্যাদার দিক দিয়ে কিছুটা পার্থক্য আছে।

আবু তাহের (এলাকা বাসীর পক্ষে), গোবরা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী।
উত্তরঃ সৃষ্টির আদিকাল থেকে হক্ ও বাতিলের দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলে আসছে। আর এই বাতিলপন্থী ইহুদী-খ্রীস্টান তথা ইসলাম বিরোধীরা ইসলামকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে নানাবিধ চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে ইসলামকে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ করতে সর্বাÍক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে সদা-সর্বদা। তারা সরাসরি ইসলামের সাথে মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে বিভিন্ন কূটকৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে যুগে যুগে, আবিস্কার করেছে বিভিন্ন মতবাদ ও ফিরকার। যেমন শিয়া, কাদিয়ানী, বাহাই, রেযাখানী, আগাখানী প্রভৃতি।

এসব মতবাদগুলোকে যদিও ইসলামের রূপ দিয়ে প্রকাশ-প্রচার করা হয়েছে কিন্তু এগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য আল্লাহ্র মনোনীত ইসলামের প্রচার-প্রসার নয়, বরং মূলতঃ এসবের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইসলামকে ধ্বংস করা। মুনাফিকের চরিত্র ধারণ করে এসব মতবাদের জন্ম।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে প্রকাশ্য কাফিররা ইসলামের যতটুকু ক্ষতিসাধন করেছিল, মুনাফিকরা তার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতি সাধন করেছিল। কারণ, এদের বহিঃরূপ ছিল মুসলমানের, আর ভেতরের রূপ ছিল কাফির, মুশরিক ও ইহুদী-খ্রীস্টানের। একারণেই বর্তমান কালের ইহুদী-খ্রীস্টানরা যুগ-যুগান্তরের সেই মুনাফিক চরিত্রের একদল লোককে তৈরী করেছে ইসলামের ক্ষতি সাধন করার মানসে। যারা প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচারক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে কিন্তু অন্তঃকরণে এরা করে ইহুদী-খ্রীস্টানদের দালালী।

আর এই দালালীর বিনিময়ে এরা পাচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ-সম্পদ। এসব ভ্রান্ত দলগুলোরই একটি হচ্ছে নব আবির্ভ�ত ‘হিযবুত তাওহীদ’ নামক দল।

দলটির প্রতিষ্ঠাতা বায়েযিদ খান পন্নী’র লিখিত “এই ইসলাম ইসলামই নয়” ও “যুগ সন্ধিক্ষণে আমরা” বই দুইটির বিভিন্ন অংশ পড়ে আমরা যা বুঝতে পেরেছি, তা হচ্ছে- এই দলটি আসলেই একটি ভ্রান্ত ও বাতিল দল। যা ইসলামের ক্ষতি সাধন করার লক্ষ্যেই ইসলামের নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। দলটির প্রতিষ্ঠা বায়েযিদ খান পন্নী মূলত একজন নাস্তি�ক ও মুরতাদ এবং ইহুদী-খ্রীস্টানদের দালাল, একথা প্রমাণিত। যদিও লেখক তার বই দুটোর বিভিন্ন অংশে ইহুদী-খ্রীস্টানদের বিরোধিতা করেছে, এটাও তার এক প্রকার ছলনা ছাড়া কিছুই নয়।

এই আশঙ্কাও রয়েছে যে, ‘হিযবুত তাওহীদ’ প্রধান কাফির শিয়া সম্প্রদায়ের লেলিয়ে দেওয়া দালাল। ইহুদী-খ্রীস্টানদের মত শিয়ারাও ইসলামকে ধ্বংস করার সুদ�র প্রসারী চক্রান্তে প্রতিনিয়ত লিপ্ত। এজন্য তারা অকৃপণ হস্তে অঢেল অর্থসম্পদ ব্যয় করে যাচ্ছে। এই মুরতাদ হয়তো অঢেল অর্থসম্পদ প্রাপ্তির লোভে পড়ে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা ধ্বংস করার জন্য তাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এক নতুন ইসলাম আবিস্কার করে ‘হিযবুত তাওহীদ’ নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছে। নামে যদিও দলটি ইসলামী, কিন্তু তার কর্মকাণ্ড হচ্ছে ইসলাম পরিপন্থী।

ইসলামের নাম ও রূপে আত্মপ্রকাশ করা এধরণের বাতিল ও ভ্রান্ত দলগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে যদিও কিছু সংখ্যক সরলমনা সাধারণ মুসলমানকে ধোঁকা দিয়ে তাদের দলভুক্ত করে নিতে সক্ষম হয়, কিন্তু উলামায়ে হক্ তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কিরাম যখন তাদের আসল রূপ মুসলমানদের সামনে তুলে ধরেন, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে তাদের আসল উদ্দেশ্য কি? নিুোক্ত হাদীসের মাধ্যমে স্বকথিত ‘হিয্বুত্ তাওহীদ’র পরিচয় জানা যেতে পারে।

হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আখেরী যামানায় মিথ্যুক বিভ্রান্তকারী কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা তোমাদেরকে এমন সব কথাবার্তা শোনাবে এবং এমন কিছু মতাদর্শ প্রচার করবে যা তোমরাও কোন দিন শুননি এবং তোমাদের পূর্ববর্তী (সাহাবা, তাবিঈন)গণও শুনেন নি। সাবধান! তোমরা তাদের (ধোঁকা) থেকে বেঁচে থাকবে। যদি তাদের প্রতারণা ও ছলনা থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট ও ফিতনাগ্রস্ত করতে পারবে না।

উক্ত হাদীসের টিকায় মিরক্বাত শরীফের (১/৩৯০) বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে- হাদীসে দাজ্জালের কথা বলা হয়েছে। এখানে দাজ্জাল অর্থ বিভ্রান্তকারী, চক্রান্তকারী ও ধোঁকাবাজ। এরা মানুষের কাছে এসে বলবে, আমরা ইসলামের পণ্ডিত ও বুযুর্গ, তোমাদেরকে সঠিক ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। কিন্তু আসলে তারা মিথ্যাবাদী। তারা এমন সব আজগুবি ও ভ্রান্ত কথাবার্তা, হুকুম-আহ্কাম ও আক্বীদা-বিশ্বাস বর্ণনা করবে, যা তোমরা নিজেরা কোনদিন শুননি। এমনকি তোমাদের পূর্ববর্তী সাহাবা, তাবিঈনগণও কখনো শুনেননি। (মিশকাত শরীফ- ১/২৮)।

উল্লিখি হাদীসের আলোকে অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ হয় যে, তথাকথিত বায়েযিদ খান পন্নী সেই দাজ্জাল তথা বিভ্রান্তকারী, চক্রান্তকারী ও ধোঁকাবাজদের একজন। যাদের কথা চৌদ্দশত বছর পূর্বেই রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন। বায়েযিদ খান পন্নী ও তার দলের পরিচয় এবং পরিণতি কি; তা উক্ত হাদীসের আলোকে সহজেই অনুমেয়।

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আমার উম্মতের ঐক্য কখনো ভ্রান্তি ও গোমরাহীর উপর হবে না। কারণ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উপর আল্লাহ্ তায়ালার অশেষ রহ্মত রয়েছে। আর এই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত থেকে যে পৃথক হয়ে যাবে, সে জাহান্নামে পতিত হবে। (তিরমিযী শরীফ-২/৩৯)।

অন্যত্র ইরশাদ করেন- তোমরা বড় জামাআত অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসরণ কর। কেননা, যে ব্যক্তি এই জামাআত থেকে পৃথক হয়ে যাবে সে জাহান্নামে পতিত হবে। (মিশকাত শরীফ-১/২৮)।

উল্লিখিত হাদীসদ্বয় দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, গোটা উম্মত কখনো ভ্রান্তি ও গোমরাহীর উপর ঐক্যবদ্ধ হবে না। অথচ মুরতাদ বায়েযিদ খান পন্নী বলছে, “সকল মানুষ গোমরাহীর মধ্যে আছে। তারা যে ইসলামের কথা বলছে সে ইসলাম- ইসলামই নয়। বরং আমার হিয্বুত্ তাওহীদে যোগদান না করলে কাফির হয়ে যাবে”। প্রমাণিত হলো তার এ দাবী সম্পূর্ণ হাদীস তথা ইসলাম বিরোধী। আর এই ভ্রান্ত মতবাদ প্রচারকারী ও উম্মতের মধ্যে বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারীর পরিণাম এবং যারা তার দলভুক্ত হয়ে এসব ইসলাম বিরোধী আক্বীদা-বিশ্বাসে বিশ্বাসী হবে, তাদের পরিণাম কি হবে, আশাকরি তা সকলের কাছে দিবালোকের ন্যায় পরিস্কার হয়ে গেছে। এই লোকের অন্যান্য ভ্রান্ত আক্বীদা ও দাবীগুলোর খণ্ডন এ স্বল্প-পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় কেবল দলীল-প্রমাণের উদ্ধৃতিসমূহ উল্লেখ করে ক্ষান্ত হচ্ছি।

সূত্র- সূরা মায়েদা- ৩, সূরা জুম্আ- ৯, সূরা ইমরান- ১৭৫, সূরা বাক্বারাহ- ২৬৮, সূরা আ’রাফ- ১৬, সূরা আন্আম- ৪৩, তাফ্সীরে রূহুল মাআনী-১৪/১০০, ১০২, তাফ্সীরে কুরতুবী-১/৩০৮, মুসলিম শরীফ-১/১২৯, তিরমিযী শরীফ-১/২৯৪, ৩০৮, আল্ মাওছ�আতুল ফিক্বহিয়্যা-২৭/১৯৩, ১৯৫-১৯৭, ২৪০, ৩১/১১৪, হিদায়া-১/১৪৬, হালবী কাবীর-৫৬৬ পৃঃ, জাওয়াহির€ল ফিক্বাহ্-১/২৬, ৩০, ফাতওয়ায়ে শামী-৩/৪৫৮ প্রভৃতি।

উত্তর দিয়েছেন- হযরত আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন (দা.বা.)
মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসীর-
জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।

26/05/2026

ঈদুল আযহাঃ করনীয়, বর্জনীয় এবং আমাদের দায়িত্ব
- হযরত আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.)
-----------------------
মুসলিম উম্মাহর জীবনে অন্যতম একটি ইবাদত ‘ঈদুল আযহা’। আত্মত্যাগ ও মানবতার বার্তা নিয়ে প্রতিবছর মুসলমানের সামনে হাজির হয় এ ইবাদাত । যিলহজের দশ তারিখ (১ আগস্ট) মহাসমারোহে পালিত হবে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এই ইবাদত।

ঈদের দিন মুমিন মুসলমানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। নিজেকে পরিপাটি ও সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়ে এসব আমল পালন করতে হয়।

ঈদের দিনের বিশেষ আমল/ সুন্নাহ
১. অন্যদিনের তুলনায় সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। [বায়হাকী, হাদীস নং-৬১২৬]

২. মিসওয়াক করা। [তাবয়ীনুল হাকায়েক-১/৫৩৮]

৩. গোসল করা। [ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৩১৫]

৪. শরীয়তসম্মত সাজসজ্জা করা। [বুখারী, হাদীস নং-৯৪৮]

৫. সামর্থ অনুপাতে উত্তম পোশাক পরিধান করা। [বুখারী, হাদীস নং-৯৪৮, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং -৭৫৬০]

৬. সুগন্ধি ব্যবহার করা। [মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-৭৫৬০]

৭. ঈদুল আযহাতে কিছু না খেয়ে ঈদের নামাযের পর নিজের কুরবানীর গোশত আহার করা উত্তম। [বুখারী, হাদীস নং-৯৫৩, তিরমিজী, হাদীস নং-৫৪২, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-১৬০৩]

৮. সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া। [আবু দাউদ, হাদীস নং-১১৫৭]

৯. ঈদের নামায ঈদগাহে আদায় করা, বিনা অপরাগতায় মসজিদে আদায় না করা। [বুখারী, হাদীস নং-৯৫৬, আবু দাউদ, হাদীস নং-১১৫৮]

১০. যে রাস্তায় ঈদগাতে যাবে, সম্ভব হলে ফিরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরা। [বুখারী, হাদীস নং-৯৮৬]

১১. পায়ে হেটে যাওয়া। [আবু দাউদ, হাদীস নং-১১৪৩]১২. ঈদুল আযহায় যাবার সময় পথে এ তাকবীর আওয়াজ করে পড়তে থাকবে। [মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-১১০৫]

اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ

ঈদ হল মুসলমানদের শান-শওকত প্রদর্শন, তাদের আত্মার পরিশুদ্ধতা, তাদের ঐক্য সংহতি ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎসব। কিন্তু দুঃখজনক হল- বহু মুসলিম এ দিনটাকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে জানে না। তারা এ দিনে বিভিন্ন অনৈসলামীক কাজ-কর্মে মশগুল হয়ে পড়ে। এ ধরনের কাজ-কর্ম থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিৎ। নিম্নে এ ধরনের কিছু কাজের আলোচনা করা হল-

১. কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রাখে এমন ধরনের কাজ বা আচরণ করা। “[আবু দাউদ ৩৫১২]

২. পুরুষ কর্তৃক মহিলার বেশ ধারণ করা ও মহিলা কর্তৃক পুরুষের বেশ ধারণ করা ।” [সহীহ আল-জামে হাদীস নং ৪৫৮৪ ]

৩. বেগানা মহিলা পুরুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা। [মুসলিম:৩৯৭১]

৪. গান-বাদ্য বাজানো। [বুখারী পৃ: ২৯৪ অধ্যায়: ১৭]

ঈদুল আযহায় পরিচ্ছন্নতা ও আমাদের দায়িত্ব

ঈদুল আযহা বা কুরবানি ঈদে খাবার-দাবারের প্রাচুর্য যেমন থাকে, তেমনি কুরবানি পশুর বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনাও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। এই ময়লা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আবার পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় যা অনেক সময় নানা রোগ বালাইও নিয়ে আসে। আমরা অধিকাংশ মানুষই পশু কুরবানির জন্য তেমন কোনো সতর্কতা অবলম্বন করি না।

যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিজের কুরবানিকৃত পশুর বর্জ্যও কোনো রকমে ফেলে চলে আসি। অথচ এজন্য প্রত্যেকের সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান থাকার পাশাপাশি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব আছে।

আশেপাশের পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। পশুর হাটের বর্জ্য মাটি চাপা দিতে হবে। আর শহরে তো সিটি কর্পোরেশনের গাড়িই আছে। কুরবানি পশুর কোনো বর্জ্যই নর্দমা, নালা, ড্রেন এসব জায়গায় ফেলা যাবে না।

কুরবানির পর পশুর রক্ত, বর্জ্য এগুলো খোলা স্থানে ফেলে রাখা উচিত নয়। গর্ত করে সেখানে পুতে ফেলতে হবে। রক্ত ও নাড়িভুড়ি যেহেতু খুব অল্প সময়ে দুর্গন্ধ ছড়ায় তাই তা মাটি চাপা দিতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। আবার মাটি থেকে সরানো সম্ভব না হলে পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। অন্যথায় জীবাণু জন্মে তা থেকে নানা রোগ ছড়াবে।

এছাড়া কুরবানি পশুর চামড়ার ক্ষেত্রে তা খোলা জায়গায় পরিষ্কার করতে হবে। ময়লা দুর্গন্ধ ছড়াবে এমন জায়গায় এই কাজ না করাই ভালো। কুরবানি পশুর চামড়া নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

ফলো করুন দারুল উলূম হাটহাজারী অফিসিয়াল

25/05/2026

আইয়্যামে তাশরীক এর আহকাম
---------------------------------------------
* জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখে ফজরের নামায থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আছর পর্যন্ত সময়কে আইয়্যামে তাশরীকের দিন বলা হয় ৷ (হিদায়া : ১/২১৫) ৷
* আইয়্যামে তাশরীকের দিনগুলোতে প্রত্যেক ফরয নামাযের পর পুরুষদের উপর উচ্চস্বরে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব ৷ মহিলাগণ আস্তে বলবে যাতে নিজে শুনে ৷ (শামী : ২/১৭৪, তাহতাবী : ৫৪০)
* ফরয নামায জামাতের সহিত পড়া হোক বা একাকী, ওয়াক্তের মধ্যে পড়া হোক বা কাজা, চাহে নামাযী ব্যক্তি মুক্বীম হোক বা মুসাফীর, শহরের বাসিন্দা হোক বা গ্রামের বাসিন্দা, সকলের উপর ফরজ নামায শেষে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব ৷ (দুররে মুখতার, শামী : ২/১৮০) ৷
* সুন্নাত, নফল, জানাযার নামাযের পরে তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব নয় ৷ (ফতোয়ায়ে শামী : ৬/১৭০) ৷
* ফরয নামাযের পর ইমাম সাহেব যদি তাকবীরে তাশরীক ছেড়ে দেয়, তাহলে মুক্তাদীগণ তাকবীরে তাশরীক বলবে ৷ (ফতোয়ায়ে শামী : ৬/১৮০) ৷
* মাসবুক (যে ব্যক্তির এক রাকাত বা দু'রাকাত ছুটে গেছে) নিজ নামায শেষ করতঃ পরে তাকবীরে তাশরীক বলতে হবে ৷ (ফতোয়ায়ে শামী : ৬/১৮০) ৷
* আইয়্যামে তাশরীকের ভিতর যদি কারও নামায কাযা হয়ে যায়, আর সে যদি এ'কাযা নামায উক্ত দিনের মধ্যেই পড়ে নেয়, তাহলে তাকে সালামের পর তাকবীরে তাশরীক বলতে হবে ৷ (হিন্দিয়্যাহ : ১/১৬৮) ৷
* আইয়্যামে তাশরীকের পূর্বের কাযা নামায আইয়্যামে তাশরীকের মধ্যে আদায় করে ৷ তাহলে তাকবীরে তাশরীক বলতে হবে না ৷ (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ : ১/১৬৮) ৷
* ফরয নামাযের পর সাথে সাথে তাকবীর বলতে স্মরণ না থাকে ৷ তাহলে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তাকবীর বলতে হবে ৷ হ্যাঁ নামাযের বিপরীত কোন কাজ করে ফেললে, যথা- কথা বলা, অযু ভেঙ্গে ফেলা, মসজিদের বাহিরে চলে যাওয়া ইত্যাদি, তাহলে তাকবীরে তাশরীক বলতে হবে না ৷ ওয়াজিব ছেড়ে দেয়ার কারণে আল্লাহর কাছে তাওবা করবে ৷ (শামী : ৬/১৮০) ৷
* তাকবীরে তাশরীক হল—
اَللهُ أكْبَرُ اَللهُ أكْبَرُ لَا إلَهَ إلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ وَلِله الْحمْدُ.
উচ্চারণ : আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ ৷
* তাকবির বলার পূর্বে কারও অযু ভেঙ্গে যায়, তাহলে তাকবির বলার জন্য নতুন করে অযু বা তায়াম্মুমের প্রয়োজন নাই ৷ (হাশিয়াতুত তাহতাবী : ৫৪০) ৷

সত্যায়নে-
মুবাল্লিগে ইসলাম আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন (দা.বা.),
মুফতি ,মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

23/05/2026

পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা” কর্তৃপক্ষ দ্বীনদরদী মুসলমানদের জন্য অন্যান্য বছরের ন্যায় এবছরও এক মহতী কুরবানী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

যারা নিজ নামে অথবা নিজের পিতা-মাতা বা কারো নামে ওয়াজিব বা নফল কুরবানী আদায় করতে চান, তাদের জন্য মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিশ্বস্ত ও সুশৃঙ্খলভাবে কুরবানীর দায়িত্ব গ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ।

মাত্র ১৫,০০০/- টাকায় এক শরীক কুরবানী আদায় করা যাবে। যে কেউ চাইলে এক বা একাধিক শরীকে অথবা পূর্ণ গরু, মহিষ বা ছাগল দিয়ে কুরবানী মাদরাসার দায়িত্বে আদায় করতে পারবেন। কুরবানির গোশত মাদরাসার গরিব-মিসকীন, এতীম ছাত্রদের মাঝে বিতরণ করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

অর্থ প্রেরণ ও বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচের নম্বর সমূহে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।

বিকাশঃ 01815649114, অথবা 01815-647270

ব্যাংক হিসাবঃ
Islami Bank Bangladesh PLC
A/C: 2051700100005000
Hathazari Branch, Chattogram

19/05/2026

‘কুরবানী’ মুমিন জীবনে যে শিক্ষা দিয়ে থাকে
- শায়খুল হাদীস হযরত আল্লামা শেখ আহমদ (দা.বা.)
---------------------
আর মাত্র কয়দিন পরেই মাহে যিলহজ্বের ১০ তারিখ উদযাপিত হবে, পবিত্র ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ। এ ঈদকে বকরা ঈদও বলা হয়। এ দিনে বিত্তবান মুসলমানগণ গরু, মহিষ, উট, দুম্বা ও বকরি যবেহের মাধ্যমে মহিমান্বিত পবিত্র কুরবানী সম্পন্ন করে থাকেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে কোলাহল মুখর পরিবেশে তারা আনন্দ-উল্লাসের মাঝে যবেহ্কৃত পশুর গোশ্ত আহার করে ঈদ উদ্যাপন সম্পন্ন করে থাকেন।

প্রশ্ন থেকে যায়, কুরবানী কি? কি তার দাবী ও শিক্ষা? এ মহাখুশীর দিনে কিসের কুরবানী? কুরবানী মানে নিছক পশু যবেহ্, না ব্যাপকতর কোন কুরবানীর মহাদায়িত্ব মুসলমানদের স্কন্ধে রয়েছে? এ সবক’টি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব পেতে হলে আমাদের দৃষ্টি সে দিকে নিতে হবে, যেখান থেকে এ কুরবানীর উৎপত্তি।

বস্তুতঃ মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)এর কৃত পবিত্র কুরবানীর মাঝেই আমাদের উপরোক্ত প্রশ্নাবলীর যথার্থ জবাব সন্নিহিত রয়েছে।

মুসলমান মাত্রই কমবেশী অবগত আছেন যে, আল্লাহ তাআলা সায়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম (আ.)এর কাছ থেকে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তুটির কুরবানী চেয়েছিলেন। মানবিক সরলতায় তিনি পশু যবেহকেই কুরবানী মনে করেছিলেন। তাই তিনি প্রথমতঃ একশ’ উট যবেহ করেন। কিন্তু ওহী এলো, পশু যবেহ হয়েছে বটে, কুরবানী হয়নি। দ্বিতীয়বার আবার একশ’ উট যবেহ করলেন। কিন্তু এবারও একই অবস্থা, কুরবানী হয়নি। এবার তিনি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন, ভাবতে লাগলেন, আমার মাওলা আমার কাছে কী চান? কী তাঁর মনশা? এসব ভাবতে ভাবেত ঘুমিয়ে পড়লেন। এক সময় তিনি স্বপ্নযোগে প্রকৃত কুরবানীর রূপরেখা পেয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন, তিনি তার ঔরসজাত সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ.)কে কুরবানী করছেন। এতে তিনি বুঝে গেলেন যে, “আল্লাহ্ তাআলা আমার কাছ থেকে আমার সর্বাধিক প্রিয় পুত্র বালক ইসমাঈল (আ.)এর কুরবানী চান”।

হযরত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন মাওলার প্রেমে বিভোর। আপন মাওলার সন্তুষ্টি অর্জনই হল তাঁর জীবনের পরম চাওয়া ও পাওয়া। এজন্য তিনি যে কোন কুরবানী ও ত্যাগ করতে কুণ্ঠিত নন। মা’বূদের প্রতি এই নিরঙ্কুশ মুহাব্বত ও নিবেদিত প্রাণ হওয়ার কারণেই তিনি ‘খলীলুল্লাহ্’ উপাধী পেয়েছেন।

ইব্রাহীম (আ.) কালক্ষেপণ না করে কুরবানী করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। বাকী রইল পুত্রের কুরবানী হওয়ার প্রস্তুতি। পিতা ইব্রাহীম (আ.) পুত্র ইসমাঈল (আ.)এর কাছে গেলেন। জানালেন তাকে আল্লাহর নির্দেশ ও নিজের সিদ্ধান্তের কথা। পুত্র নিজ কানেই আপন পিতার কথাগুলো শুনলেন। কিন্তু এতে তিনি মোটেও বিচলিত হলেন না। চেহারায় ভাবান্তরও পরিলক্ষিত হল না তাঁর। আল্লাহর নির্দেশ ও পিতার সিদ্ধান্তের সামনে নিজের মস্তক ঝুঁকিয়ে দিলেন নিঃসঙ্কোচে। ভক্তি ভরা কণ্ঠে বললেন, হে আমার আব্বাজান! আপনার প্রতি আল্লাহর আদেশ যথাযথভাবে পালন করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।

অবশেষে পিতা-পুত্র উভয়ে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। পিতা নিজ হাতে পুত্রকে যবেহ করে দুনিয়ার মুহাব্বতের কুরবানী করবেন, আর পুত্র আল্লাহর নির্দেশকে সমুন্নত রাখতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিবেন। বিনিময়ে উভয়ে লাভ করবেন আল্লাহর মহান সন্তুষ্টি। বস্তুতঃ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মহান হলে, তার জন্যে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা নবীগণের অমর শিক্ষা এবং এটাই মানুষকে সফলতার স্বর্ণ চূড়ায় অধিষ্ঠিত করে।

হযরত ইবরাহীম (আ.)এর অভিষ্ঠ লক্ষ্য ছিল মহান। এর চেয়ে মহান আর কোন লক্ষ্যই হতে পারে না। সেটি হল, ‘রেযায়ে মাওলা’ বা স্রষ্টার সন্তুষ্টি। মানব জীবনের সব চেয়ে বড় চাওয়া ও পরম পাওয়াও এটি। সৃষ্টির জীবনে এর চেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু নেই। এজন্য ইবরাহীম (আ.) একমাত্র বালক পুত্রকে কুরবানী করতে কুণ্ঠিত হননি। বয়োবৃদ্ধ কালে আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামত দিয়েছিলেন তাঁকে। ঔরসজাত সন্তানের প্রতি কার না মুহাব্বত-ভালবাসা থাকে? বিশেষ করে শেষ বয়সের সন্তানের প্রতি! এ ক্ষণস্থায়ী প্রেমকে কুরবানী করে আল্লাহর চিরস্থায়ী সন্তুষ্টি ও মুহাব্বত অর্জন করতেই তিনি ইসমাঈল (আ.)কে কুরবানী করতে উদ্যত হলেন।

পিতা-পুত্র কুরবানীর স্থলে হাজির। পিতার হাতে তীক্ষ্মধার ছুরি আর পুত্র যমীনে শায়িত। এক সময় পিতা পুত্রের গ-দেশে ছুরি চালাতে লাগলেন। কী রোমহর্ষক দৃশ্য! আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত ও প্রকৃতির সমস্ত পরিবেশে নেমে এলো নিস্তব্ধতার করুণ ছায়া। ইব্রাহীম (আ.) আপন মনেই ছুরি চালাতে লাগলেন। কিন্তু একি? ছুরি যে ইসমাঈল (আ.)এর গলা কাটছে না! তারপরও তিনি ছুরি চালিয়ে যাচ্ছেন। এ দৃশ্য যেমন পুরো প্রকৃতি অবলোকন করেছে, তেমনি দেখেছেন সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলা। যাঁর জন্যে ইবরাহীম (আ.)এর এ কুরবানী।

তিনি ওহী পাঠালেন, ইবরাহীম (আ.)! তোমার কুরবানী কবুল হয়েছে যদিও তোমার বালক পুত্র যবেহ হয়নি! সেস্থলে যবেহ হয়েছে জিব্রাঈল (আ.)এর আনিত বেহেশ্তী দুম্বা। পিতা-পুত্রের এ অপূর্ব ত্যাগ আল্লাহর এত বেশী পছন্দ হয়েছে যে, তিনি অমর গ্রন্থ কুরআনুল কারীমে এ ঘটনা বিবৃত করেছেন এবং সমগ্র মানব জাতিকে পরম প্রভুর তরে ত্যাগের দৃষ্টান্ত শিক্ষা দিয়েছেন। সাথে সাথে এ ঘটনার স্মারক হিসেবে উম্মতে মুহাম্মদীর উপর যিলহজ্বের দশ তারিখ পশু কুরবানীর বিধান জারি করেছেন। আর সেটিই আমাদের ঈদুল আযহা, সেটিই আমাদের কুরবানীর ঈদ বা বকরা ঈদ। সুন্নাতে ইব্রাহীমীর অমর নমুনা, যা আজো আমাদের মাঝে বিদ্যমান।

পিতার হাতে পুত্র যবেহের কুরবানী আল্লাহর ইচ্ছা নয়, তেমনি নিছক পশু যবেহও তাঁর কাম্য নয়। অন্যথায় সেদিন ইবরাহীম (আ.)এর পুত্র ইসমাঈল (আ.) যবেহ হয়ে যেতেন এবং দুশ’ উট যবেহের মাধ্যমে কুরবানী সম্পন্ন হতে পারতো। বরং কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি বান্দার একনিষ্ঠ আনুগত্য, আল্লাহ ভীতি ও মাওলাপ্রীতি কতটুকু, তা তিনি যাচাই করেন। মানুষ আল্লাহর নির্দেশের সামনে কতটুকু মস্তকাবনত করে, তা-ই তিনি দেখে থাকেন। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে- “এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাক্বওয়া। (সূরা হজ্ব- ৩৭ আয়াত)।

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, ঈদুল আযহার পশু যবেহ কেবল কুরবানী নয়, বরং এটি একটি মহিমান্বিত কুরবানীর স্মারক মাত্র। এদিনের পশু কুরবানী বৃহৎ কুরবানীর শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে জাগতিক সকল মায়া-মুহাব্বত ত্যাগ করে আপনজন, আপনধন ও আপনপ্রাণ উৎসর্গের।

আমাদের আরো স্মরণ রাখতে হবে, যবেহ মানেই কুরবানী নয়, আর কুরবানী মানেই যবেহ নয়। বরং কুরবানী হল, আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। এটি এতই ব্যাপক যে, যার পরিধি পূর্ণ মানব হায়াত বিস্তৃত। প্রতিটি মুহূর্তে মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরবানীর দাবী রয়েছে। নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, দাওয়াত ও তাবলীগ, তা’লীম, তাসনীফ, ওয়ায-নসীহত, মাতা-পিতার সেবা, সন্তান-সন্ততির প্রতিপালন, সবই কুরবানীর আওতাধীন। এসব কিছুর জন্য অবশ্যই নিজের জান-মাল-সময় ত্যাগ করতে হয় এবং এগুলো একনিষ্ঠ আল্লাহর জন্য হয়ে থাকলে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়।

বস্তুতঃ ত্যাগ ছাড়া ভোগ হয় না, বর্জন ছাড়া অর্জন হয় না। চাই তা পার্থিব বিষয়ে হোক কিংবা ধর্মীয় ক্ষেত্রে হোক। এজন্য বলা হয়, কুরবানীর কোন সুনির্দিষ্ট কাল নেই এবং তার কোন পরিসংখ্যান নেই। মুসলিম যিন্দেগীর প্রতিটি মুহূর্তই ত্যাগ ও কুরবানীর মহিমায় ভাস্বর। পূর্ণ যিন্দেগীতে অসংখ্য কুরবানীর দাবী ও দায়িত্ব তাদের উপর রয়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে এসব কুরবানীতে ভিন্নতা আসতে পারে। যেমন, রমযানে দিনের বেলা নিজের নফস ও উদরের চাহিদার কুরবানী করতে হবে, হজ্বের সময় নিজের অর্থ, আত্মীয়-স্বজন ও মাতৃভূমির মুহাব্বতকে কুরবানী করতে হবে, যিলহজ্বের দশ তারিখে বিত্তবান মুসলমানদেরকে পশু কুরবানী করে তার গোশত গরীব, মিসকীন ও আত্মীয়দের মাঝে বিলাতে হবে প্রভৃতি।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শ ও সাহাবায়ে কিরামের পবিত্র যিন্দেগী এ বাস্তবতাই আমাদের সামনে পেশ করে। হিজরতের নির্দেশ এসেছে, জন্মভূমি ও বাস্তুভিটার মায়া ত্যাগ করে তাঁরা হিজরত করেছেন। দ্বীনের জন্যে যুদ্ধে যাওয়ার ও অর্থ দান করার ডাক এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম সোৎসাহে সাড়া দিয়ে শহীদ হয়েছেন কিংবা গাজী হয়েছেন। বস্তুতঃ শরীয়তের যখন যে নির্দেশ আসে এবং যখন যে কুরবানীর দাবী উত্থাপিত হয়, তখন তার জন্যে স্বীয় সত্তাকে পেশ করা মহান ব্যক্তি ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মহান আদর্শ।

মুসলিম উম্মাহ্র বিরাজমান অবস্থার পর্যালোচনা করলে দিবালোকের ন্যায় প্রতিভাত হবে যে, মুসলমানদের বর্তমান দুরাবস্থার অন্যতম কারণ, কুরবানীতে কার্পণ্যতা। ত্যাগ ও কুরবানীর মহান সুন্নাত না থাকার কারণে আজ হাজারো সমস্যায় জর্জরিত মুসলিম উম্মাহ। দাওয়াতের ময়দানে পর্যাপ্ত ত্যাগ-কুরবানী না থাকার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানগণ কোণঠাসা। ইউরোপ, আমেরিকাসহ অন্যান্য অমুসলিম রাষ্ট্রের জনগণের ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিরূপ মনোভাবের একমাত্র কারণ দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের কুরবানীর অভাব। মধ্যম ও বিত্তহীন শ্রেণীর মাঝে ইসলামের চর্চা মোটামুটি থাকলেও সমাজের এলিট শ্রেণীর মাঝে দ্বীনের চর্চা খুবই হতাশাজনক পর্যায়ে। এর কারণ দ্বীনের দাঈ ও শিক্ষিত সমাজের দাওয়াতের ক্ষেত্রে পশ্চাদপদতা।

ইলমের ময়দানে পর্যাপ্ত কুরবানী না হওয়ার কারণে সমগ্র বিশ্ব ইল্মে ওহীর নূর হতে বঞ্চিত। অমুসলিম শক্তি তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বায়নের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে মনস্তাত্ত্বিক গোলামে পরিণত করে চলেছে। এর জন্যে তারা হাজার প্রকারের পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করছে। বিলিয়ন ট্রিলিয়ন অর্থ এ খাতে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু আমাদের একটি সার্বজনিন ইসলামী শিক্ষানীতি থাকা সত্ত্বেও এর বিশ্বায়ন করতে সক্ষম হইনি। এর কারণ, এক্ষেত্রে চিন্তাশীল ব্যক্তি ও তা বাস্তবায়নে মুসলিম নেতৃবৃন্দের সীমাহীন অনীহা ও অসহযোগিতা। ফলে ইসলামী শিক্ষার অভাবে বহু বিজাতির শিক্ষায় শিক্ষিতজন ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে যাচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ইসলামের মূলে কুঠারাঘাত করে চলছেন।

জুলুম, অত্যাচার ও বাতিলের প্রতিরোধে জিহাদের ময়দানে পর্যাপ্ত কুরবানী না হওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন জনপদে মুসলমানদের কি যে দুর্গতি ও যিল্লতী। বসনিয়ায় দশ লাখ মুসলমানকে শহীদ করা হয়েছে, কসোভোয় দুই লাখ মুসলমান শহীদ হয়েছেন। ৭০ হাজার মুসলমান শহীদ হয়েও কাশ্মীর এখনো স্বাধীন হতে পারেনি। চেচনিয়ায় রুশ ভল্লুকেরা ক্বিয়ামতের বিভীষিকা কায়েম করে চলছে। আরাকানের সামরিক জান্তা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক অভিযানে স্মরণকালের বৃহত্তম হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কত শিশু নিহত হয়েছে, এতীম হয়েছে কত সন্তান, কত নারী পাশবিকতার শিকার হয়েছে, কত সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে তার হিসাব কেউ দিতে পারবে না।

প্রশ্ন জাগে এসব কিছুর কারণ কি? এ প্রশ্নের জবাব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে এভাবে এসেছে, “যখন তোমরা ন্যায়, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিহাদ পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তোমাদের উপর যিল্লতীকে চাপিয়ে দিবেন।” বস্তুতঃ তাই হচ্ছে! জিহাদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কুরবানী না থাকার কারণে আমাদের এ দুর্দশা।

[পরবর্তী কিস্তিতে সমাপ্য]
-----------------------
অনুলিখনে- মাওলানা মুনির আহমদ

18/05/2026

দারুল উলুম দেওবন্দের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের - পর্ব এক.
দ্বিতীয় পর্ব পেতে👇
দারুল উলূম হাটহাজারী অফিসিয়াল

Want your school to be the top-listed School/college in Hathazari?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Telephone

Address


Hathazari