29/12/2025
আজ থেকে দুই দিন আগে এমন একজন মানুষের জন্মদিন ছিল, যিনি আমাদের বাঙালি মুসলমান জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ করে দিয়ে গিয়েছিলেন। যিনি একাই খ্রিষ্টান মিশনারি ও পাদ্রিদের মাধ্যমে বৃটিশদের আধিপত্যবাদকে রুখে দিয়েছিলেন আমাদের এই বাংলার মাটিতে।
সেই মহান মনিষীর নাম মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। যিনি ছিলেন সে যুগের ওসমান হাদি। যার বক্তৃতায় কেঁপে ওঠতো বৃটিশ বাংলা। এই মহান বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী ১৮৬১ সালের ২৬শে ডিসেম্বরে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন।
কিন্তু তিনি মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ১৯০৭ সালের ৭ই জুন ইন্তেকাল করেন। তবে, মাত্র ৪৫ বছরের এই জীবনে তিনি বাঙালি মুসলমানের জন্য কী না করেছেন! তিনি না থাকলে হয়তো আজ আমরা নিজেদেরকে বাঙালি মুসলমান বলে পরিচয় না-ও দিতে পারতাম।
অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম বলেন, "মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর আবির্ভাব ঘটে সেই সময় কালটায় যখন খৃষ্টান মিশনারীরা বাংলার হাটে-মাঠে, নগরে-বন্দরে ব্যাপকভাবে খৃষ্টান ধর্ম প্রচারে লিপ্ত হয়েছে, যখন এদেশে মুসলমানরা ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় দোসরদের যৌথ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। সেই সময়ে আমাদের জাতীয় জীবনে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের তাঁর মতো বিপ্লবী মননের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছিলো আমাদের জাতীয় সত্তাকে সমুন্নত রাখার তাকিদেই।"
তিনি এ দেশের মুসলিম জাগরণে কেমন বিপ্লবী ভূমিকা রেখেছিলেন এর প্রমাণ মেলে ১৯০৭ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করলে তখনকার সময়ের পত্র-পত্রিকার সম্পাদকীয় মন্তব্য ও প্রতিবেদনগুলো থেকে।
তার মৃত্যুর পর 'সোলতান' পত্রিকায় লেখা হয়, "সুষুপ্ত বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ বুঝি জাগিতে জাগিতে আর জাগিতে পারিল না। তাছাড়া বোধ হয় উন্নতি সোপানে উঠতে উঠতে আর উঠিতে পারিল না। আমাদের মহাপাপ নিবন্ধনই হয়তো খোদাতালার অভিপ্রায় অনুসারে বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ হইতে বাগ্মীকুল শিরোমনি স্বজাতি বৎসল, সমাজ হিতৈষী ধর্মগত প্রাণ, সমাজ দেহের আত্মা-সদৃশ যশোর ছাতিয়ানতলা নিবাসী ইসলাম প্রচারক মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ সাহেব নিরাশ্রয় বঙ্গীয় পতিত মুসলমান সমাজকে আকুল শোক সাগরে ভাসাইয়া বিগত ৭ জুন শুক্রবার বেলা ১টার সময় অনন্তধামে যাত্রা করিয়াছেন। বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ আজ চারিদিকে অন্ধকার দেখিতেছে।"
মিহির ও সুধাকর' পত্রিকা লিখে, "আজকাল বঙ্গীয় মোসলেম-রাজনৈতিকজগত ও ধর্মজগত ঘোর তমসাচ্ছন্ন। এই দুঃসময়ে যিনি উভয় বঙ্গের নানা অস্বাস্থ্যকর স্থানে গমনপূর্বক তত্রত্য অশিক্ষিত নিরীহ মুসলমানদিগকে সদুপদেশ প্রদান করিয়া শিক্ষা ও ব্যবসায় বাণিজ্যে মনোযোগী হইবার জন্য উৎসাহ দিতেছিলেন, যিনি আজ আঠার বছর কাল ধর্ম ও সমাজের জন্য স্বীয় জীবন উৎসর্গ করিয়া বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজে এক নব জীবনের সঞ্চার করিয়াছেন, বঙ্গের সেই অদ্বিতীয় বাগ্মী ইসলাম ধর্ম প্রচারক মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব আর ইহজগতে নাই। মুসলমান সমাজকে কাঁদাইয়া তিনি গত ২৪ শে জ্যৈষ্ঠ মোতাবেক ৭ই জুন (২৪শে রবিয়সসানী) শুক্রবার বেলা একটার সময় (ঠিক জুম্মার নামাজের সময়) পবিত্র কলবের পরিত্যাগ করিয়াছেন (ইন্না লিল্লাহ)।"
'ইসলাম প্রচারক' পত্রিকা লিখে, "বঙ্গের সর্বপ্রধান বাগ্মী ও সমাজ সেবক, মুসলমানদিগের উন্নতির পথপ্রদর্শক ও সমাজ-সংস্কারক, মুসলমান কবি, গ্রন্থকার ও ধর্মপ্রচারক, সর্বজনপ্রিয় মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের অকাল মৃত্যুতে বঙ্গীয় মুসলমানের যে চূড়ান্ত ক্ষতি হইয়াছে, সে ক্ষতি পূরণ হইবার আর আশা নাই। আমদের প্রাণের ভাই অকালে চলিয়া গিয়াছেন। আমাদের হৃদয় চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়াছে, বাহুভগ্ন হইয়াছে।"
শুধু তা-ই নয়, তার মৃত্যুতে ইসমাঈল হেসেন সিরাজী লিখেছিলেন,
হায়! হায়! হায়! হৃদি ফেটে যায় অকালে সে মহাজন, কাঁদায়ে সবারে গেল একেবারে আঁধারিয়া এ ভুবন।
কেহ না ভাবিল কেহ না বুঝিল কেমনে ডুবিল বেলা,
ভাবিনি এমন হইবে ঘটন সবাই করিনু হেলা।
শেষ হ'ল খেলা ডুবে গেল বেলা আঁধার আইল ছুটি' বুঝিবি এখন বঙ্গবাসিগণ কি রতন গেল উঠি'।
গেল যে রতন হায় কি কখন মিলিবে সমাজে আর?
মধ্যাহ্ন তপন হইল মগন, বিশ্বময় অন্ধকার!
তবে, দুঃখের বিষয় হলো, এই মহান বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী, সমাজ সংস্কারক, লেখক, সম্পাদক, বাগ্মী ব্যাক্তিকে আমরা ভালো করে চিনি না। অথচ, তার জীবন ও কর্ম জানা ও বুঝা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়।
যশোর সদরের চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে তার মাজার রয়েছে। সেখানে তার লেখা একটা কবিতার কয়েকটি পঙক্তি লেখা— ‘ভাব মন দমে দম, রাহা দূর বেলা কম’।