26/01/2026
পরিবারকে নিরাপদ রাখার ১১টি পরামর্শ।
বাদল সৈয়দ
‘তিনি কাল রাতে বাসার সবার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে হাসিমুখে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। আজ তাঁর ঘুম ভাঙেনি—কখনো ভাঙবেও না!’
অনেক সময় মৃত্যু কোনো ওয়ার্নিং ছাড়াই পেছন থেকে আঘাত করে। আমরা মৃতদের জন্য আফসোস করি, প্রার্থনা করি; কিন্তু একবারও ভাবি না—এরকম নিঃশব্দ মৃত্যু আমারও হতে পারে।
আমি আপনার শতায়ু কামনা করি—একই সঙ্গে চাই, আপনি মৃত্যু নিয়ে ভাবুন। আপনার অবর্তমানে পরিবার যেন সুরক্ষিত থাকে, তা নিয়ে চিন্তা করুন।
আমরা মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না—তবে আমি না থাকলেও পরিবার কীভাবে স্বস্তিতে থাকতে পারে, তা নিয়ে ভাবতে পারি।
বিষয়টি অপ্রিয়—কিন্তু বাস্তব খুব কঠিন। তাই এ ব্যাপারে কিছু ভাবনা লিখলাম।
১) শরীর: বন্ধু থেকে শত্রু
শরীরের দিকে খেয়াল রাখুন। প্রায়ই শুনি—অকস্মাৎ দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তারা শারীরিক সমস্যাগুলোকে পাত্তা দেননি, যা বড় হয়ে মরণধাক্কা দিয়েছে। বুকব্যথা গ্যাসের কারণে হচ্ছে ভেবে কতজন অকালে জীবন হারিয়েছেন! তাই যেকোনো শারীরিক সমস্যায় ডাক্তারের কাছে যান। শুধু সমস্যা হলে নয়, সম্ভব হলে মাঝে মাঝে হেলথ চেকআপ করান। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন, হালকা ব্যায়াম করুন।
শরীর আপনার বন্ধু—কিন্তু মুহূর্তেই শত্রু হয়ে উঠতে পারে। তাই সাবধান!
২) সঞ্চয়: বর্ষার ছাতা
অবশ্যই সঞ্চয় করুন। আপনি না থাকলে পরিবারের সবচেয়ে বড় বিপদ হবে আর্থিক সংকট। তাই ছোট ছোট করে হলেও সঞ্চয় করুন। পিপিলিকা যদি শীতের বিপদ বুঝতে পারে—আপনি পারবেন না কেন?
৩) ঋণ: শত্রু ভয়ংকর
ঋণ করবেন না। দুর্ভাগ্যবশত আপনি না থাকলে এই ঋণ আপনার পরিবারের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। বিশেষ করে হ্যান্ড লোন করবেন না। অনেক সময় দেখা যায়, কারও মৃত্যুর পর কেউ কেউ অস্বাভাবিক হ্যান্ড লোন পরিশোধের দাবি করেন—যা অবিশ্বাস্য। আর ঋণ করে ঘি কখনো খাবেন না—ওটা বিষ খাওয়ার সমতুল্য।
৪) বিমা: অবহেলিত সুরক্ষা
আমাদের দেশে জীবনবিমাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু আমি মনে করি, অল্প খরচে পরিবারকে নিরাপদ রাখার জন্য এটি একটি চমৎকার উপায়। তবে বিমা করতে হবে খুব বাছাই করে। স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত থাকলে চিকিৎসার সময়ও কাজে লাগে।
(নীতিগত কারণে আমি কোনো বিমা কোম্পানির নাম সাজেস্ট করব না—সেটি আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে।)
৫) সংযত জীবন: লিমিট দ্যা বর্ডার
জীবনযাপনে সংযত হোন। সেই লাইফস্টাইল মেনে চলুন—যা আপনি না থাকলেও আপনার পরিবার বহন করতে পারবে। আপনার অবর্তমানে অতিরিক্ত বিলাসী অভ্যাস তাদের চরম হতাশায় ঠেলে দিতে পারে।
৬) স্বাবলম্বী স্ত্রী: যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক
স্ত্রীকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করুন। চাকরি করা সম্ভব না হলে তিনি অন্য কিছু করতে পারেন। আজকাল অনেক ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছেন—অনলাইনে ব্যবসা করছেন। অল্প পুঁজিতেই এটা সম্ভব। তিনি স্বাবলম্বী হলে আপনার অবর্তমানে সংসার চালাতে পারবেন।
মনে রাখবেন—পরের ওপর নির্ভরশীল হলে তিনি শুধু আর্থিক নয়, আরও অনেক বিপদে পড়তে পারেন।
৭) ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার
আপনার কোথায় কী আছে, তা পরিবারকে জানিয়ে রাখুন।
ব্যাংক ডিটেইল, সঞ্চয়, বিনিয়োগের বিবরণ, দেনাদার-পাওনাদারদের তালিকা—
সংক্রান্ত কাগজপত্র একটি ফাইলে গুছিয়ে রাখুন। তা পরিবারকে দেখিয়ে রাখুন—যাতে প্রয়োজনের সময় তারা সহজেই খুঁজে পায়। কোনো সংযোজন বা পরিবর্তন হলে সঙ্গে সঙ্গে তথ্যগুলো আপডেট করুন।
এটি একটি অমূল্য দলিল হিসেবে কাজ করবে।
৮) নমিনি: নেভার ফরগেট ইট
ব্যাংক হিসাব, প্রভিডেন্ট ফান্ডের নমিনি ঠিক করে রাখুন। ফ্ল্যাট বুক করলে আপনার অবর্তমানে কাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে ডেভেলপার কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে রাখুন।
৯) মাসিক মুনাফা: স্মার্ট মুভ
যদি বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়, তবে মাসিক লাভ দেয়—এমন বিনিয়োগ করুন। এটি স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে করতে পারেন, যাতে একজনের অবর্তমানে অন্যজন সহজে লাভ তুলতে পারেন।
১০) ফ্যামিলি অ্যাডভাইজার: দুঃসময়ের অভিভাবক
আপনার দৃষ্টিতে খুবই বিশ্বস্ত কাউকে ফ্যামিলি অ্যাডভাইজার ঠিক করুন—যিনি আপনার অবর্তমানে পরিবারকে পরামর্শ দিতে পারবেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অযাচিত উপদেশের ভারে পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আপনার দৃষ্টিতে কারা ক্ষতিকর, তাও বলে রাখুন।
১১) চিঠি: আপনার কণ্ঠস্বর
একটি চিঠি লিখে রাখুন। তাতে আপনার অবর্তমানে পরিবারের সদস্যরা কীভাবে চলবে, তা লিখুন। এটি হবে আপনার কণ্ঠস্বর—তাদের পথ নির্দেশনা।
“We plan for tomorrow, while death arrives today.”
‘আমরা পরিকল্পনা করি আগামীকালের, অথচ মাঝে মাঝে মৃত্যু কড়া নাড়ে আজ।’
অতএব, নিজ পরিবারের সুরক্ষা-কৌশল নিয়ে ভাবুন।
আপনি শতায়ু হোন—নাতির ঘরের পুঁতি দেখা অবধি বেঁচে থাকুন, এই প্রার্থনা করি।
আমার জন্যও দোয়া করবেন।
#আসুনমায়াছড়াই