08/07/2022
দীননাথ-ইনস্টিটিউশন- এর জন্মকথা
বাহুবল উপজেলার একটি প্রসিদ্ধ গ্রামের নাম ‘সাতকাপন’। গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এ গ্রামের একটি অসচ্ছল সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাজেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য নামে এক শিক্ষানুরাগী। তিনি হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১ম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। প্রবেশিকা পাশ করার পরপরই তিনি স্বগ্রামের ভূমিপুত্র দেবেন্দ্র নাথ দত্তের তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমা সদরের বাসায় চলে যান। সেখানে তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘দি ইন্ডিয়ান টি এণ্ড কমার্স কোং লিঃ’-এ চাকুরীতে যোগদান করেন। কিছুদিন পর দেবেন্দ্র নাথ দত্ত তাকে সাতকাপন স্টেটের ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়ে এলাকায় পাঠান।
ছাত্র জীবনে রাজেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণে নানামুখী বিড়ম্বনার স্বীকার হন। তখন থেকেই তার অন্তরে সুপ্ত বাসনা ছিল বাহুবল সদরে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করার মধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করা। তিনি সাতকাপন স্টেটের ম্যানেজার পদে আসার পর স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গন্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে থাকেন।
১৯৩৬ সনের শেষ দিকে তিনি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেই আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়ে একটি সাধারণ সভা আহ্বান করেন। কসবাকরিমপুর প্রকাশিত ভাদেশ্বর গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আব্দুল মঈন চৌধুরী (কুটি মিয়া)-এর পিতা আব্দুস সামাদ চৌধুরী (নবাব মিয়া)-এর সভাপতিত্বে উক্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ‘দীননাথ ইনস্টিটিউশন’ নামে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং রাজেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্যকে সম্পাদক করে বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়।
১৯৩৭ সনে কয়েকজন ছাত্র নিয়ে জমিদার দেবেন্দ্র নাথ দত্তের সাতকাপনের গ্রামের বাড়িতে ‘দীননাথ ইনস্টিটিউশন’ হাই স্কুল-এর পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। পিতার নামে স্কুলের নামকরণ করে কার্যক্রম শুরু করায় দেবেন্দ্র নাথ দত্ত খুশি হন। তিনি তার পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে বাহুবল বাজারের উত্তর পার্শ্বে করাঙ্গী নদীর তীরে স্কুল ক্যাম্পাস (বর্তমান ক্যাম্পাস) ও মধুপুর চা বাগানের রাস্তার পার্শ্বে সাতকাপন গ্রাম সংলগ্ন স্থানে খেলার মাঠসহ সর্বমোট এক একর একত্রিশ শতক ভূমি এবং বাহুবল বাজারের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পুরাতন হাসপাতালের ডাক্তার ও কম্পাউন্ডারের বাসগৃহের দক্ষিণে দশ শতক ভূমি ‘প্রধান শিক্ষকের বাস ভবন’-এর জন্য স্কুলের নামে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রাজেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্যরে প্রচেষ্টায় হাই স্কুলের ভবন নির্মাণের জন্য ‘দত্ত পরিবার’ প্রতিষ্ঠিত ‘শিলচর দি কাছাড় নেটিভ জয়েন্ট স্টক কোং লিঃ ও শ্রীহট্ট দি ভারত সমিতি লিঃ’ নাম প্রতিষ্ঠানদ্বয় থেকে দশ হাজার টাকা অনুদান আদায় করেন। এ টাকা থেকে দুই হাজার পাঁচশত টাকা বিদ্যালয়ের নামে ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা রাখেন। অবশিষ্ট অর্থে বিদ্যালয়ের একটি আধাপাকা গৃহ নির্মাণ করে ১৯৪০ সনে দেবেন্দ্র নাথ দত্তের বাড়ি থেকে মূল ক্যাম্পাসে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করেন। সেই ঐতিহাসিক গৃহটি আজও বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যখানে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এ গৃহটি এখনও বিদ্যালয়ের অন্যতম শ্রেণি কক্ষ হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।
১৯৪১ সনে চিন্তহরণ দাশ নামে একজন মাত্র ছাত্র নিয়ে ‘দীননাথ ইনস্টিটিউশন সাতকাপন’ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেট্টিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এ বছর একমাত্র পরীক্ষার্থী চিন্তহরণ দাশ ১ম বিভাগে মেট্টিকুলেশন পাশ করে বিদ্যালয়ের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ বছরই বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।
[তথ্যসূত্র: (১) মোহাম্মদ নূরু ইসলাম মনি সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী “করাঙ্গী”, প্রকাশ কাল- মে ২০০৪ খ্রি:; (২) দীননাথ ইনস্টিটিউশন সাতকাপন, বাহুবল-এর হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারক ‘স্মৃতিলিপি’, প্রকাশ কাল- ৩১ মে, ২০১৪ খ্রি:]