21/06/2025
টাকা একটি কানেক্টিভ টিসুর মতো। এটি যেমন মানুষের শরীরে চলাচলকারী রক্তের মতো জীবন প্রবাহ বজায় রাখে, তেমনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় টাকার প্রবাহ যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, ততক্ষণ সবকিছু সজীব ও কার্যকর থাকে। আমাদের শরীরের প্রত্যেকটি কোষ যেমন রক্তের মাধ্যমে শক্তি পায়, ঠিক তেমনই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ সচল থাকে অর্থনৈতিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত হালনাগাদের মাধ্যমে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ বিভাগের যন্ত্রপাতিগুলোর অধিকাংশই বহু বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে, অনেক সময় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। অর্থাভাবে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ বা আধুনিকায়ন হয়নি। ফলে গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা গড়ে উঠছে না।
একবিংশ শতাব্দীতে ফার্মেসির জগতে প্রযুক্তির যে বিপ্লব ঘটেছে, সেখানে ইন-সিলিকো ড্রাগ ডিজাইন, মলিকুলার ডকিং, হাই থ্রুপুট স্ক্রিনিং প্রভৃতি অত্যাধুনিক পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের জন্য নির্ভরযোগ্য কম্পিউটার, সফটওয়্যার এবং গবেষণাগার থাকা আবশ্যক। অথচ আমাদের বিভাগের অবস্থা এমন যে, আজও অনেক গবেষণাকাজ হাতে কলমে বা থিসিস নির্ভরভাবে কেবল নোট আকারে সীমাবদ্ধ। শিক্ষকদের আন্তরিকতা আর ছাত্রদের মেধা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং টেকনিক্যাল সাপোর্টের অভাবে আমরা একপ্রকার বাধ্য হচ্ছি পিছিয়ে পড়তে। বিভাগের গবেষণার জন্য নেই আলাদা বাজেট, নেই যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা। এমনকি পরীক্ষাগারে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ কিংবা গ্লাসওয়্যার পর্যন্ত স্বল্প পরিসরে পাওয়া যায়।
একটি বিভাগের প্রাণশক্তি হলো তার গবেষণা ও উদ্ভাবনক্ষমতা। আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন আইডিয়া উপস্থাপন করে, কিন্তু প্ল্যাটফর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের অভাবে তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। যদি টেকসই অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়া যেত, তাহলে গবেষণার মাধ্যমে আমরা ওষুধ শিল্পে বড় পরিবর্তন আনতে পারতাম। টাকার সঠিক ব্যবহার ও বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি হালনাগাদ, ল্যাবরেটরি আধুনিকায়ন, সফটওয়্যার লাইসেন্স সংগ্রহ, এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মতো উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব হতো। শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিংকের অভাবেই আমাদের শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা পরবর্তীতে চাকরির বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বে ফার্মেসি কেবলমাত্র ওষুধ প্রস্তুতিই নয়, বরং রোগ নির্ণয়, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, ফার্মাকোভিজিল্যান্স, পেশেন্ট কেয়ার ইত্যাদির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এইসব আধুনিক শাখাগুলোর সাথে তাল মেলাতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগকে উন্নয়ন করতে হবে। অধ্যয়ন ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে চাই সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং প্রাইভেট সেক্টরের যৌথ অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত এই বিভাগকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে গবেষণায় ফান্ড বরাদ্দ দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে এটি একটি সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে পরিণত হয়।
উল্লেখ্য, দেশের যেসব আন্তর্জাতিকমানের ওষুধ কোম্পানি রয়েছে, যেমন স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইবনেসিনা, ইনসেপ্টা— তারা চাইলে একাডেমিক-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্টনারশিপের মাধ্যমে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ করে দিতে পারে। এই ধরনের যৌথ উদ্যোগে নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রবাহ শুরু হবে, এবং বিভাগটির মান বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে MoU স্বাক্ষরের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এক্সচেঞ্জ, গবেষণাপত্র প্রকাশ ও স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
একটি কথাই সত্য— টাকা যন্ত্র নয়, কিন্তু টাকার অনুপস্থিতি যন্ত্রকে অকেজো করে দেয়। একবিংশ শতাব্দীর ফার্মেসি বিভাগ মানে কেবল বই-পুস্তক নির্ভর শিক্ষা নয়; বরং এটি একটি গবেষণাগার, একটি হাসপাতালের বর্ধিত অংশ, একটি উৎপাদনশীল গবেষণা কেন্দ্র। অতএব এ বিভাগে বিনিয়োগ মানে জাতির স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন মানে জাতির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, এমনকি মানবসম্পদ রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা।
অতএব, বিভাগীয় পরিকল্পনায় টাকা যেন রক্তের মতোই অবিরাম প্রবাহিত হয়। যেমন রক্ত বন্ধ হলে হৃদযন্ত্র থেমে যায়, তেমনি অর্থ না থাকলে বিভাগটিও স্থবির হয়ে পড়ে। আমাদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন পর্যায় পর্যন্ত ফার্মেসি শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো। শুধুমাত্র কাগজে-কলমে নয়, বরং বাস্তবায়নে বরাদ্দ দিতে হবে প্রকৃত অর্থ ও নীতিগত সমর্থন।
পরিশেষে বলা যায়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ যদি সময়োপযোগীভাবে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পায়, তাহলে এটি ইনশাল্লাহ দেশের অন্যতম ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এই বিভাগের সাফল্য শুধু একটি ইউনিটের উন্নয়ন নয়, বরং গোটা জাতির স্বাস্থ্য-স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ন। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একমাত্র চাবিকাঠি হলো সঠিক সময়ে টাকার প্রবাহ নিশ্চিত করা।