13/09/2026
— ইলমুল ফিক্বহ —
— অধ্যায় ০২ — পোস্ট ০৪ —
০২) অজু ও অজু সম্পর্কিত বিধানসমূহ
অজু হলো নামাজ ও অন্যান্য iইবাদতের জন্য শরীরের নির্দিষ্ট অংশকে পানি দিয়ে ধোয়া বা মাজা করার মাধ্যমে অর্জিত পবিত্রতা।
অজু সম্পর্কিত বিধানসমূহের মধ্যে রয়েছে—কোন কোন অঙ্গ ধোয়া আবশ্যক, অজুর অবৈধ বা বাতিলের কারণসমূহ, অজু কতবার বা কখন পুনরায় করা প্রয়োজন, এবং অজুর জন্য ব্যবহৃত পানি ও পদ্ধতির নিয়মাবলী। এটি ইসলামিক ইবাদতের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই অধ্যায়ে আমরা শিখবো:
০১) প্রস্রাব-পায়খানা করার আদব ও সুন্নাতুল-ফিতরাহ।
০২) অজু ও অজু সম্পর্কিত বিধানসমূহ।
০৩) খুফ বা মোজার উপর মাসাহ করা।
০৪) গোসল।
০৫) তায়াম্মুম।
০১) পেশাব-পায়খানা (কাযায়ে হাজত) এর শিষ্টাচার ও সুন্নাতুল-ফিতরাহ
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি মানুষের আকীদাহ, ইবাদত, লেনদেন, সামাজিক আচরণ এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। পবিত্রতা (الطهارة) ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিষয়। তাই পেশাব-পায়খানার মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজের ক্ষেত্রেও ইসলাম অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিপূর্ণ আদব-আখলাক শিক্ষা দিয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২২২
পরিভাষাগত পরিচয় (التعريفات)
১. ইস্তিনজা (الاستنجاء)
ইস্তিনজা বলতে সামনের (القُبُل) অথবা পেছনের (الدُّبُر) নির্গমনপথে লেগে থাকা নাপাকির চিহ্ন পানি দ্বারা অপসারণ করাকে বোঝায়।
ফিকহি সংজ্ঞা
إزالة الخارج من السبيلين بالماء
অর্থাৎ, “দুই নির্গমনপথ থেকে নির্গত নাপাক বস্তু পানি দ্বারা অপসারণ করা।”
২. ইস্তিজমার (الاستجمار)
ইস্তিজমার বলতে পাথর, মাটির ঢেলা, টিস্যু, কাপড় বা অনুরূপ পরিষ্কার বস্তু দ্বারা নাপাকির চিহ্ন অপসারণ করাকে বোঝায়।
ফিকহি সংজ্ঞা
إزالة أثر الخارج من السبيلين بالحجارة أو ما يقوم مقامها
ইস্তিজমারে বিজোড় সংখ্যা ব্যবহার
হাদিস
مَنِ اسْتَجْمَرَ فَلْيُوتِرْ
অর্থ:
“যে ব্যক্তি ইস্তিজমার করবে, সে যেন বিজোড় সংখ্যা ব্যবহার করে।”
তাখরীজ
সহীহ আল-বুখারী, كتاب الوضوء
সহীহ মুসলিম, كتاب الطهارة
হাদিসের মান
متفق عليه (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
অর্থাৎ, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়েই বর্ণনা করেছেন; এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহীহ হাদিস।
ফিকহি মাসআলা
ইস্তিজমারে তিনবার বা বিজোড় সংখ্যায় মুছা সুন্নত।
প্রয়োজন হলে পাঁচ বা সাতবার পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে।
উদ্দেশ্য হলো নাপাকির চিহ্ন সম্পূর্ণরূপে দূর করা।
মাযহাবসমূহের মতামত
চার মাযহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে বিজোড় সংখ্যা ব্যবহার সুন্নত, ওয়াজিব নয়।
পানি না থাকলে করণীয়
যদি পানি না পাওয়া যায়, তাহলে টিস্যু, কাপড়, পাথর বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা নাপাকি দূর করা আবশ্যক।
সমসাময়িক প্রয়োগ
বর্তমান যুগে টয়লেট টিস্যু, ওয়েট টিস্যু এবং অন্যান্য পরিষ্কার শোষণক্ষম বস্তু ইস্তিজমারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ক) পেশাব-পায়খানা করার শিষ্টাচার (آداب قضاء الحاجة)
১. বাথরুমে প্রবেশের পূর্বে দোয়া পাঠ করা
বাথরুমে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বলবে:
بِسْمِ اللهِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
উচ্চারণ:
বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবাঈছ।
অর্থ:
“আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি পুরুষ ও নারী শয়তানদের অনিষ্ট থেকে।”
দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
سِتْرُ مَا بَيْنَ أَعْيُنِ الْجِنِّ وَعَوْرَاتِ بَنِي آدَمَ إِذَا دَخَلَ أَحَدُهُمُ الْخَلَاءَ أَنْ يَقُولَ: بِسْمِ اللهِ
“মানুষ যখন পায়খানায় প্রবেশ করে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে, তখন তা জিনদের দৃষ্টি ও আদম সন্তানের লজ্জাস্থানের মাঝে পর্দা হয়ে যায়।”
— সুনান আত-তিরমিযী; আল-আলবানী রহ. সহীহ বলেছেন।
অন্য হাদীসে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন:
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا دَخَلَ الْخَلَاءَ قَالَ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
“নবী ﷺ যখন পায়খানায় প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পুরুষ ও নারী শয়তানদের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।’”
— সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম
২. বাথরুম থেকে বের হওয়ার দোয়া
বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় বলা সুন্নত:
غُفْرَانَكَ
উচ্চারণ: গুফরানাকা।
অর্থ:
“হে আল্লাহ! আমি আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
দলিল
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا خَرَجَ مِنَ الْخَلَاءِ قَالَ: غُفْرَانَكَ
“রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন পায়খানা থেকে বের হতেন, তখন বলতেন: ‘গুফরানাকা’।”
— সুনান আত-তিরমিযী; আল-আলবানী রহ. সহীহ বলেছেন।
এছাড়া আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাথরুম থেকে বের হয়ে বলতেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنِّي الْأَذَى وَعَافَانِي
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমার থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করেছেন এবং আমাকে সুস্থতা দান করেছেন।”
— ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ
৩. বাথরুমে প্রবেশ ও বের হওয়ার আদব
বাথরুমে প্রবেশের সময় বাম পা আগে প্রবেশ করানো এবং বের হওয়ার সময় ডান পা আগে বের করা সুন্নত।
এর কারণ হলো ইসলামের সাধারণ নীতি:
সম্মানজনক ও পবিত্র কাজে ডান দিককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অপবিত্রতা বা তার বিপরীত বিষয়ের ক্ষেত্রে বাম দিককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪. পেশাব করা ও ইস্তিঞ্জার সময় বাম হাত ব্যবহার করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا بَالَ أَحَدُكُمْ فَلَا يَمَسَّ ذَكَرَهُ بِيَمِينِهِ، وَلَا يَتَمَسَّحْ مِنَ الْخَلَاءِ بِيَمِينِهِ
“তোমাদের কেউ যখন পেশাব করবে, তখন সে যেন তার ডান হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ না করে এবং পায়খানা থেকে পরিষ্কার হওয়ার সময় ডান হাত ব্যবহার না করে।”
— সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম
৫. সতর (লজ্জাস্থান) গোপন রাখা
যে ব্যক্তি পেশাব-পায়খানা করতে চায়, তার জন্য আবশ্যক হলো মানুষের দৃষ্টি থেকে নিজের সতর গোপন রাখা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
احْفَظْ عَوْرَتَكَ إِلَّا مِنْ زَوْجَتِكَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ
“তোমার সতর সংরক্ষণ কর, তোমার স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসী ছাড়া।”
— সুনান আত-তিরমিযী
এটি ইসলামের লজ্জাশীলতা, শালীনতা ও পবিত্রতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৬. বসে পেশাব করা
মুস্তাহাব (উত্তম) হলো বসে পেশাব করা।
কারণ:
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ অধিকাংশ সময় বসেই পেশাব করতেন।
২. এতে সতর অধিক গোপন থাকে।
৩. কাপড় বা শরীরে পেশাবের ছিটা লাগার সম্ভাবনা কম থাকে।
তবে যদি কেউ দাঁড়িয়ে পেশাব করে এবং—
পেশাবের ছিটা লাগার আশঙ্কা না থাকে;
অন্যের সামনে সতর প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা না থাকে;
তাহলে এতে কোনো গুনাহ নেই।
খ) পেশাব-পায়খানার সময় যেসব কাজ হারাম
নিম্নোক্ত স্থানে পেশাব-পায়খানা করা হারাম:
মানুষের চলাচলের রাস্তা
মানুষের বিশ্রামের ছায়াযুক্ত স্থান
পার্ক বা জনসাধারণের বিনোদনস্থল
ফলদ বৃক্ষের নিচে
পানির প্রবাহ বা জলাধারে
এমন যেকোনো স্থানে যেখানে মানুষের কষ্ট, অসুবিধা বা বিরক্তির কারণ হয়
দলিল
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
اتَّقُوا اللَّاعِنَيْنِ
“তোমরা অভিশাপ ডেকে আনে এমন দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাক।”
সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! অভিশাপ ডেকে আনে এমন দুটি কাজ কী?”
তিনি বললেন:
الَّذِي يَتَخَلَّى فِي طَرِيقِ النَّاسِ أَوْ فِي ظِلِّهِمْ
“যে ব্যক্তি মানুষের চলার পথে অথবা তাদের বিশ্রামের ছায়াস্থলে পেশাব-পায়খানা করে।”
— সহীহ মুসলিম
গ) পেশাব-পায়খানার সময় কিবলামুখী হওয়া বা কিবলার দিকে পিঠ দেওয়ার বিধান
মরুভূমি, খোলা মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানে—যেখানে কিবলা ও ব্যক্তির মধ্যে কোনো আড়াল বা প্রতিবন্ধক নেই—সেখানে পেশাব-পায়খানার সময় কিবলার দিকে মুখ করা কিংবা কিবলার দিকে পিঠ দেওয়া বৈধ নয়।
এর দলিল হলো আবূ আইয়্যূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا أَتَيْتُمُ الْغَائِطَ فَلَا تَسْتَقْبِلُوا الْقِبْلَةَ وَلَا تَسْتَدْبِرُوهَا بِغَائِطٍ أَوْ بَوْلٍ، وَلَكِنْ شَرِّقُوا أَوْ غَرِّبُوا
“তোমরা যখন পেশাব-পায়খানার জন্য যাও, তখন পায়খানা বা পেশাব করার সময় কিবলার দিকে মুখ করবে না এবং কিবলার দিকে পিঠও দেবে না; বরং পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ করো।”
— সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম
তবে যদি ব্যক্তি কোনো ভবনের ভিতরে থাকে অথবা তার ও কিবলার মাঝখানে কোনো দেয়াল, পর্দা বা আড়াল থাকে, তাহলে এ ব্যাপারে কোনো অসুবিধা নেই।
এর দলিল হলো আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর বর্ণনা। তিনি বলেন:
ارْتَقَيْتُ فَوْقَ بَيْتِ حَفْصَةَ، فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقْضِي حَاجَتَهُ مُسْتَدْبِرَ الْقِبْلَةِ مُسْتَقْبِلَ الشَّامِ
“আমি আমার বোন হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরের ছাদে উঠেছিলাম। তখন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে পেশাব-পায়খানা করতে দেখলাম; তিনি কিবলার দিকে পিঠ দিয়ে এবং শামের (সিরিয়া অভিমুখে) দিকে মুখ করে বসেছিলেন।”
— সহীহ মুসলিম
এছাড়াও মারওয়ান আল-আসগার রহ. বর্ণনা করেন:
“আমি ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে দেখলাম, তিনি তাঁর উটকে কিবলামুখী করে বসিয়েছেন এবং নিজেও কিবলার দিকে মুখ করে বসেছেন। আমি বললাম, ‘হে আবূ আবদুর রহমান! এটি কি নিষিদ্ধ নয়?’
তিনি বললেন:
إِنَّمَا نُهِيَ عَنْ هَذَا فِي الْفَضَاءِ، فَإِذَا كَانَ بَيْنَكَ وَبَيْنَ الْقِبْلَةِ شَيْءٌ يَسْتُرُكَ فَلَا بَأْسَ
‘এ নিষেধাজ্ঞা মূলত খোলা স্থানের জন্য। কিন্তু তোমার ও কিবলার মাঝে যদি কোনো আড়াল থাকে, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই।’”
— সুনান আবূ দাউদ; ইমাম নববী ও আল-আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
ফিকহী নির্দেশনা
যদিও ভবনের ভিতরে বা আড়ালের আড়ালে এ কাজের অনুমতি রয়েছে, তথাপি কিবলার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে তা পরিহার করাই উত্তম।
অতএব মুসলমানদের উচিত বাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা বা অন্যান্য ভবনের টয়লেট নির্মাণের সময় কিবলার দিক বিবেচনায় রাখা।
ঘ) পেশাব-পায়খানার সময় যেসব কাজ মাকরূহ
১. বাতাসের মুখোমুখি হয়ে পেশাব করা
কোনো আড়াল ছাড়া প্রবল বাতাসের দিকে মুখ করে পেশাব করা মাকরূহ।
কারণ বাতাস পেশাবের ছিটা শরীর বা কাপড়ে ফিরিয়ে আনতে পারে, ফলে নাপাকির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
২. পেশাব-পায়খানার সময় কথা বলা
পেশাব-পায়খানা করার সময় কথা বলা মাকরূহ, তা আল্লাহর যিকির হোক বা সাধারণ কথাবার্তাই হোক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْرُجَنَّ رَجُلَانِ يَضْرِبَانِ الْغَائِطَ كَاشِفَيْنِ عَوْرَتَيْهِمَا يَتَحَدَّثَانِ، فَإِنَّ اللَّهَ يَمْقُتُ عَلَى ذَلِكَ
“দুই ব্যক্তি যেন একসাথে পায়খানার জন্য বের না হয়, এমন অবস্থায় যে তারা নিজেদের সতর উন্মুক্ত রেখেছে এবং পরস্পরের সাথে কথা বলছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা এ কাজকে অপছন্দ করেন।”
— সুনান আবূ দাউদ; আল-আলবানী রহ. সহীহ বলেছেন
হাদীসের ভাষা থেকে বোঝা যায় যে সতর উন্মুক্ত রেখে কথা বলা বিশেষভাবে নিন্দনীয়। পাশাপাশি পেশাব-পায়খানার সময় অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তাও শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়।
৩. গর্ত বা গুহাসদৃশ স্থানে পেশাব করা
মাটির গর্ত, প্রাণীর গর্ত বা অনুরূপ স্থানে পেশাব করা মাকরূহ।
আবদুল্লাহ ইবন সারজিস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ يُبَالَ فِي الْجُحْرِ
“নবী ﷺ গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন।”
— সুনান আবূ দাউদ; ইমাম নববী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন
নিষেধাজ্ঞার প্রজ্ঞা
এর কারণ হতে পারে—
গর্তে কোনো প্রাণী অবস্থান করতে পারে, যা ক্ষতিগ্রস্ত হবে;
অথবা সেটি জিনদের আবাসস্থল হতে পারে, ফলে তারা কষ্ট পেতে পারে।
এ কারণে ইসলাম সম্ভাব্য ক্ষতি ও অনিষ্ট থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছে।
৪. আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াতযুক্ত বস্তু নিয়ে টয়লেটে প্রবেশ করা
যেসব বস্তুতে আল্লাহর নাম, যিকির বা শরয়ী মর্যাদাসম্পন্ন লেখা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে টয়লেটে প্রবেশ করা মাকরূহ; তবে প্রয়োজন বা জরুরি অবস্থায় এতে কোনো গুনাহ নেই।
উদাহরণ:
আংটিতে খোদাইকৃত আল্লাহর নাম
যিকির লেখা তাবিজ (শরয়ী বৈধ হলে)
ইসলামি দোয়া বা যিকিরসম্বলিত কাগজপত্র
মুসহাফের বিধান
পবিত্র কুরআনের মুসহাফ টয়লেটে নিয়ে যাওয়া হারাম; তা খোলা অবস্থায় হোক বা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় হোক।
কারণ:
এটি আল্লাহ তা‘আলার কালাম;
সমস্ত কথার মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন;
টয়লেটে নিয়ে যাওয়া এর মর্যাদার পরিপন্থী এবং অসম্মানের শামিল।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ • فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ
“বরং এটি এক মহান মর্যাদাসম্পন্ন কুরআন, যা সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ।”
— সূরা আল-বুরুজ: ২১–২২
আরও বলেন:
ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান রক্ষা করে, নিশ্চয়ই তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।”
— সূরা আল-হাজ্জ: ৩২
অডিও রেকর্ডিং, সিডি ও ডিজিটাল ডিভাইসের বিধান
যেসব সিডি, মেমোরি কার্ড, মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসে কুরআনের অডিও রেকর্ডিং সংরক্ষিত থাকে, সেগুলোর হুকুম মুসহাফের হুকুমের মতো নয়।
অতএব প্রয়োজনে সেগুলো টয়লেটে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, শর্ত হলো—
স্ক্রিনে কুরআনের আয়াত দৃশ্যমান না থাকা;
কুরআনের লেখা প্রকাশিত অবস্থায় না থাকা;
এবং কুরআনের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখা।