27/01/2026
এই অবরোধ ও হত্যাকাণ্ড কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া আবেগী ঘটনা ছিল না, এটা ছিল ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফল, যার শিকড় অনেক দূরে প্রোথিত ছিল। মদিনায় যে প্রায় ৪০ দিন অবরোধ চলেছিল, সেই অবরোধকারীরা মূলত তিনটি অঞ্চল থেকে এসেছিল—মিশর, কুফা ও বসরা। এরা সবাই সাহাবি ছিলেন না, বরং অধিকাংশই ছিল নবাগত মুসলমান, রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষিত, সহজে উসকানি গ্রহণকারী মানুষ এবং কিছু ছিল সরাসরি ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর সদস্য।
এই আন্দোলনের নেপথ্যে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হলো আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা। সে ছিল একজন ইয়েমেনি ইহুদি, যে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে। তার কাজ ছিল বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে মানুষের মধ্যে সন্দেহ, বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়ানো। সে বলত, “খিলাফত আলী (রাঃ)-এর প্রকৃত অধিকার”, “উসমান (রাঃ) অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় আছেন”, “শাসনব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত”, “গভর্নররা জুলুম করছে”—এই ধরনের কথা ছড়িয়ে সে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করত। সে চিঠির মাধ্যমে ভুয়া অভিযোগ তৈরি করত, এক শহরের মানুষের কাছে আরেক শহরের নামে মিথ্যা বার্তা পাঠাত, যাতে মনে হয় গোটা উম্মাহ ক্ষুব্ধ।
এই প্রোপাগান্ডার ফলে মিশরের একদল লোক, কুফার একদল লোক এবং বসরার একদল লোক “সংস্কারের দাবি” নিয়ে মদিনার দিকে রওনা দেয়। বাহ্যিকভাবে তাদের বক্তব্য ছিল—
তারা বলত গভর্নররা অন্যায় করছে, প্রশাসনে অবিচার হচ্ছে, উসমান (রাঃ) আত্মীয়দের বেশি সুযোগ দিচ্ছেন, বিচারব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে, সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনা হচ্ছে না।
এগুলো ছিল তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য। কিন্তু ভেতরের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে দেওয়া, কেন্দ্রকে দুর্বল করা এবং গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করা।
প্রথমে তারা মদিনায় এসে আলোচনা করে। হযরত উসমান (রাঃ) অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের কথা শোনেন, অনেক অভিযোগ যাচাই করেন, কিছু গভর্নরের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন, কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তনের আশ্বাস দেন। তারা বাহ্যিকভাবে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ফেরার পথে একটি জাল চিঠি “পাওয়া যায়” — যেখানে লেখা ছিল, মিশরের গভর্নরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিদ্রোহীদের গ্রেফতার ও শাস্তি দিতে। এই চিঠিটি হযরত উসমান (রাঃ)-এর নামে বানানো ছিল, কিন্তু তিনি তা লেখেননি। এটি ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের তৈরি একটি ফাঁদ।
এই চিঠিকে অজুহাত বানিয়ে তারা আবার মদিনায় ফিরে আসে, এবার আর আলোচনার জন্য নয়—চাপ সৃষ্টি করার জন্য। তখনই শুরু হয় অবরোধ। তারা খলিফার বাড়ি ঘিরে ফেলে, বাইরে পাহারা বসায়, লোকজনের যাতায়াত সীমিত করে দেয়। ধীরে ধীরে পানি, খাদ্য প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়। এই অবরোধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কয়েকজনের নাম ইতিহাসে এসেছে, যেমন—
মিশর দিক থেকে আসা বিদ্রোহীদের মধ্যে ছিল কিনানা ইবনে বিশর, সুদান ইবনে হামরান, মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর (আবু বকর রাঃ-এর ছেলে, যিনি পরে ভুল বুঝতে পেরে সরে যান), আরও কিছু উগ্রপন্থী যুবক।
এরা সাহাবি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ কেউ ছিল না, বরং ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও উসকানিতে উত্তেজিত মানুষ।
এই সময় সাহাবিরা চেয়েছিলেন শক্ত প্রতিরোধ করতে। আলী (রাঃ) নিজে তাঁর ছেলে হাসান ও হুসাইন (রাঃ)-কে পাহারায় বসিয়েছিলেন। তালহা (রাঃ), যুবায়ের (রাঃ), বহু সাহাবি তরবারি হাতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু হযরত উসমান (রাঃ) বারবার নিষেধ করেন। তিনি বলেন,
“আমার কারণে কোনো মুসলমানের রক্ত ঝরবে না। আমি নবীজি ﷺ-কে বলতে শুনেছি, একদিন আমাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, আমি চাই সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হোক, কিন্তু মুসলমানদের হাতে মুসলমানের রক্ত না ঝরুক।”
তিনি নিজের নিরাপত্তার চেয়ে উম্মাহর ঐক্যকে বেশি গুরুত্ব দেন।
অবরোধ দীর্ঘ হতে থাকে। একসময় বিদ্রোহীরা আরো উগ্র হয়ে ওঠে। একদিন তারা দেয়াল টপকে ও পেছনের দিক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) রোজা অবস্থায় ছিলেন, নিজের ঘরে বসে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর স্ত্রী নায়লা (রাঃ) বাধা দিতে গেলে তাঁর আঙুল কেটে যায়। তিনি কোনো প্রতিরোধ করেননি, কোনো তলোয়ার তুলেননি, কোনো চিৎকার করেননি।
এরপর সেই বিদ্রোহীরা নির্মমভাবে তাঁকে আঘাত করে হত্যা করে। ইতিহাসে এসেছে—তিনি তখন কুরআনের যে আয়াত পড়ছিলেন, সেখানে তাঁর রক্ত পড়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরিণতি।
এই হত্যার মাধ্যমে শুধু একজন খলিফাই শহীদ হননি—এর মাধ্যমে মুসলিম ইতিহাসের দরজা খুলে যায় এক দীর্ঘ রক্তাক্ত অধ্যায়ের দিকে। জামাল যুদ্ধ, সিফফিন যুদ্ধ, খারিজি ফিতনা—সবকিছুর সূচনা হয় এই ঘটনার পর থেকেই। হযরত উসমান (রাঃ)-এর শাহাদাত ছিল ফিতনার প্রথম বড় বিস্ফোরণ।
তিনি এমন একজন খলিফা ছিলেন, যিনি ক্ষমতা বাঁচাতে যুদ্ধ করেননি, নিজের প্রাণ দিয়ে উম্মাহকে রক্তপাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করে একজন নিরব শহীদ, একজন ধৈর্যের প্রতীক, একজন ষড়যন্ত্রের শিকার ন্যায়পরায়ণ খলিফা হিসেবে।
©
#ইসলামের_নূর #ইসলামেরবার্তা #ইসলামেরআলো #ইসলামেরপথ #ইসলামেরকথা