29/07/2026
চলন বিলের কান্নাঃ
তিন দিন ধরে ময়নার প্রচণ্ড জ্বর। গায় হাত দেওয়া যাচ্ছে না, যেন তপ্ত উনুন। শেষরাতে মেয়েটা জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে কী যেন বলল, তারপর থেকে একদম নিস্তেজ। চলনবিলের দ্বীপ গ্রামে কোনো ডাক্তার নেই। একটা কবিরাজ ছিল, সেও গত বন্যায় ভিটে হারিয়ে পাবনায় চলে গেছে। চিকিৎসার জন্য বড়াইগ্রাম বা সিংড়ার হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু এই অথৈ বিল পাড়ি দিয়ে সেখানে যাওয়ার উপায় কী?
ঘাটে গফুর মিয়ার নিজের একটা পুরনো কোষা নৌকা বাঁধা আছে বটে, কিন্তু গত কার্তিক মাসে লগি ঠেলতে গিয়ে তার বুড়ো কোমরটা যে ভেঙেছে, তারপর থেকে আর লগি ধরার জোর পাননি শরীরে। শ্যালো ইঞ্জিনঅলা নৌকা ভাড়া করতে হবে। কিন্তু এক লিটার ডিজেল কেনার পয়সাও আজ গফুর মিয়ার পকেটে নেই। বিলের মাঝিরা যে টাকা ভাড়া চায়, তা এই অভাবের দিনে আকাশকুসুম কল্পনা।
ঠিক এমন সময়, বিলের বুক চিরে একটা বিলাসবহুল ওয়াটারবাস তীব্র হর্ন বাজিয়ে ধেয়ে গেল। ঢাকা থেকে আসা একদল পর্যটক উন্মুখ হয়ে চলন বিলের রূপ দেখছে। কেউ কেউ দূরবীন চোখে দিয়ে বিলের পাখি খুঁজছে, কেউ দামি ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক শব্দে ফ্রেমবন্দি করছে এই জলঘেরা ‘রূপকথা’র গ্রামকে। প্রমোদতরীর তৈরি করা বড় বড় ঢেউগুলো যখন গফুর মিয়ার ভাঙা দাওয়ায় এসে আছড়ে পড়ছে, তখন সেই ঢেউয়ের ঝাপটায় কাঁপছে একটা নিভে যাওয়া উনুন আর একটা নিথর হতে চলা অবুঝ প্রাণ। গফুর মিয়া ঝাপসা চোখে শুধু পর্যটকদের চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে রইলেন।