16/05/2026
মানবমনের গভীরে প্রেমের যে চিরন্তন আকুতি লুকিয়ে থাকে, তা ভাষা, দেশ কিংবা কালের ব্যবধান মানে না। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কবিরা তাঁদের কাব্যে একই অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রকাশ করেছেন। ইংরেজ সাহিত্যের অমর কবি ও নাট্যকার Christopher Marlowe এবং বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী অথচ গভীর রোমান্টিক কবি Kazi Nazrul Islam—এই দুই ভিন্ন ভূখণ্ডের কবির সৃষ্টিকর্মে আমরা খুঁজে পাই এমনই এক আশ্চর্য মানসিক সাদৃশ্য।
ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মার্লো তাঁর বিখ্যাত কবিতা The Passionate Shepherd to His Love-এ প্রেমিক হৃদয়ের কোমল আকাঙ্ক্ষাকে প্রকৃতির রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন। অপরদিকে বিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অগ্নিকবি নজরুল ইসলাম তাঁর গীতিকবিতা “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী”-তে প্রেমিক সত্তার অপার সৌন্দর্যবোধ ও কল্পনাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। দুই কবির ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, সময়ের ব্যবধানও বিস্তর—তবুও প্রেমিক হৃদয়ের আর্তি যেন এক সুরেই বাঁধা।
মার্লো তাঁর প্রেমিকাকে আহ্বান জানিয়েছেন এই বলে—
“Come live with me and be my love”
এই একটি পঙ্ক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রেমের চিরন্তন ডাক। প্রিয়তমাকে কাছে পাওয়ার আকুলতা, একসাথে সৌন্দর্যময় জীবন গড়ার স্বপ্ন। একইভাবে নজরুলও তাঁর প্রেমিকাকে আহ্বান করেছেন—
“মোর প্রিয়া হবে এসো রানী”
দুই কবির আহ্বানের ভাষা আলাদা হলেও অনুভূতির গভীরতা এক ও অভিন্ন।
মার্লোর কবিতায় প্রকৃতি যেন প্রেমের অলংকার হয়ে ওঠে। তিনি প্রেমিকাকে উপহার দিতে চান উপত্যকা, বনভূমি, পাহাড় ও ঝর্ণার সৌন্দর্য। তাঁর কল্পনায় প্রেম মানেই প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য—
“And we will all the pleasures prove,
That valleys, groves, hills and fields…”
অন্যদিকে নজরুল তাঁর প্রিয়াকে সাজাতে চান আকাশের তারায়, চৈত্রের চাঁদে, রামধনুর রঙে। তিনি সাধারণ অলংকারে প্রেমিকাকে বরণ করতে রাজি নন; বরং তাঁর প্রেমের আয়োজন মহাজাগতিক সৌন্দর্যে দীপ্ত—
“দেবো খোঁপায় তারার ফুল,
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির
চৈতী চাঁদেরো দুল।”
এখানেই দুই কবির কল্পনার মিল বিস্ময়করভাবে ধরা পড়ে। একজন প্রকৃতির বুকে প্রেমের স্বর্গ নির্মাণ করতে চান, অন্যজন আকাশের নক্ষত্র ও চাঁদের আলো দিয়ে প্রেমিকাকে সাজিয়ে তুলতে চান।
মার্লো তাঁর প্রেমিকাকে গোলাপের শয্যা, সুগন্ধি ফুলের তোড়া ও মার্টল পাতায় বোনা পোশাক উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন—
“And I will make thee beds of roses
And a thousand fragrant posies…”
ঠিক তেমনি নজরুলও তাঁর প্রেমিকাকে অলৌকিক সৌন্দর্যে রাঙিয়ে তুলতে চান—
“কণ্ঠে তোমার পরাবো বালিকা,
হংস-সারির দুলানো মালিকা।”
এখানে প্রেম শুধু দেহজ নয়; এটি হয়ে ওঠে নান্দনিকতার এক মহিমান্বিত প্রকাশ।
মার্লোর কবিতায় প্রেমিক হৃদয় শীতের জন্য তৈরি করে “purest gold”-এর অলংকারখচিত পোশাক, আর নজরুল তাঁর প্রিয়ার পায়ে পরিয়ে দিতে চান রামধনুর লাল রঙের আলতা।
“জোছনার সাথে চন্দন দিয়া
মাখাবো তোমার গায়।”
এই চিত্রকল্পগুলো কেবল প্রেমের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং কবিদের অসীম কল্পনাশক্তিরও পরিচায়ক।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো—দুই কবিই তাঁদের প্রেমিকাকে সংগীত ও আনন্দের আবহে আবিষ্ট করতে চেয়েছেন। মার্লো লিখেছেন—
“The shepherd’s swains shall dance and sing…”
আর নজরুল তাঁর প্রেমের বাসর সাজাতে চান গানের সাত সুরে—
“আমার গানের সাত-সুর দিয়া,
তোমার বাসর রচিবো প্রিয়া।”
এ যেন প্রেম ও সংগীতের এক অনন্ত মিলন।
দুই কবির জীবনকাল ও সামাজিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। Canterbury-তে জন্ম নেওয়া মার্লো ছিলেন রেনেসাঁ যুগের কবি; তাঁর কবিতায় ছিল ইউরোপীয় মানবতাবাদ ও প্রকৃতিপ্রেমের ছাপ। অপরদিকে Churulia-র মাটি থেকে উঠে আসা নজরুল ছিলেন উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহের প্রতীক। তবুও প্রেমের ক্ষেত্রে দু’জনের হৃদয় যেন একই সুরে অনুরণিত হয়েছে।
এটাই সাহিত্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য—মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি সর্বজনীন। ভাষা বদলায়, সংস্কৃতি বদলায়, সময় বদলায়; কিন্তু প্রেমের আবেদন, সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রিয় মানুষকে আপন করে পাওয়ার স্বপ্ন কখনো বদলায় না। তাই শতাব্দীর ব্যবধান পেরিয়েও ক্রিস্টোফার মার্লো এবং কাজী নজরুল ইসলাম একই প্রেমের গান গেয়ে যান—দুই ভাষায়, দুই ভূখণ্ডে, অথচ একই হৃদয়ের স্পন্দনে।