12/06/2023
**বাংলাদেশে খ্রিস্টান বিবাহের এবং বিবাহ বিচ্ছেদের আইনী পদক্ষেপগুলি কী কী?
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিয়ে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও পবিত্র চুক্তি। তাদের বিয়ে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। বাধ্যতামূলকভাবে করতে হয় রেজিস্ট্রি। খ্রিস্টান বিয়েতে রেজিস্ট্রেশন ও আইনগত যে বিধান রয়েছে তাতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই স্বার্থ রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৮৭২ সালের খ্রিস্টান ম্যারেজ অ্যাক্ট (খ্রিস্টান বিবাহ আইন) অনুযায়ী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে সম্পাদিত হয়। তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি করার আগে কিছু নিয়ম পালন করতে হয়, যা অন্যান্য ধর্মের চেয়ে কিছুটা আলাদা।
**আসুন জেনে নেই, খ্রিস্টান বিয়েতে রেজিস্ট্রেশন করার আগে বাধ্যতামূলক বিষয়গুলো।
গির্জার কাছে নোটিশ
বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের আগে পাত্রপাত্রীর পুরো নাম, ডাক নাম, পেশা বা অবস্থা ও বাসস্থানের ঠিকানা গির্জার কাছে নোটিশ আকারে দিতে পাঠাতে হবে। নোটিশ প্রাপ্তির পর গির্জার যাজক নোটিশটি খোলা জায়গায় টানিয়ে দেবেন যাতে বিষয়টি সবার নজরে আসে।
আপত্তি বিবেচ্য
পাত্র ও পাত্রী পক্ষের পাঠানো নোটিশ কয়েক সপ্তাহ ঝোলানো থাকবে। নোটিশের কোনো বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা গির্জায় জানাতে হবে। আর আপত্তি না পেলে গির্জার প্রধান বিয়ের দুটি পক্ষের কাছ থেকে একটি ঘোষণা গ্রহণ করবেন। এছাড়া এই ঘোষণাটি বিয়ের পক্ষগুলো ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হয়ে দেবেন। সেই ঘোষণায় কিছু বিধিনিষেধ আছে যা দুই পক্ষকে পূরণ করতে হবে।
আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক
পাত্র-পাত্রীর মধ্যে বিবাহ বা আত্নীয় সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাত্রপাত্রীর মধ্যে জানা মতে এমন কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক নেই যাতে তাদের বিয়েতে আইনসম্মত বাধা আছে।
পাত্র-পাত্রী সাবালক
বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রীকে অবশ্যই সাবালক হতে হবে। পাত্র-পাত্রী যদি সাবালক না হয় তবে বিবাহ আইননত বৈধ হবে না।
এই ঘোষণা সম্পন্ন হওয়ার কমপক্ষে চারদিন পর গির্জার যাজক বিয়ের আবেদনকারীকে একটি সার্টিফিকেট দেবেন। সেই সার্টিফিকেট জারির দুই মাসের মধ্যে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
**এবার জেনে নেই খ্রিষ্টান বিবাহ বিচ্ছেদ এর নিয়ম:
ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস এ দেশে। অনেক সময় খ্রিস্টান ধর্মের দম্পতিরা আসেন তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে জানতে। অনেক দম্পতি প্রশ্ন করেন যে, কেবল নোটারি করলেই বিবাহ বিচ্ছেদ হবে কি না? অনেকে প্রশ্ন করেন যদি স্বামী-স্ত্রী সমঝোতার মাধ্যমে নোটারি করায় তবে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হবে কি না ইত্যাদি।
খ্রিস্টান ধর্মে ‘তালাক’ উচ্চারণ করলেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় না। নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ‘আমি বিবাহ বিচ্ছেদ করলাম’ অথবা ‘আজ থেকে আমরা আর স্বামী-স্ত্রী নই’ এ ধরনের কথা লিখে নোটারি করলেও বিবাহ বিচ্ছেদ হবে না। এমনকী যদি কোনো খ্রিস্টান দম্পতি নিজেরা সমঝোতার মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ নেবার জন্য কোনো চুক্তি করেন তবে সেটি কোর্ট থেকে ডিক্রি না নেওয়া পর্যন্ত কার্যকর হবে না।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের মোকদ্দমা করে শুনানি পূর্বক রায় নিয়ে তবেই খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত দম্পতিরা বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯-এ বলা আছে যে কোথায়, কিভাবে এবং কী কী কারণে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত দম্পতিরা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আদালতে মোকদ্দমা করতে পারবেন। ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯-এর ১০ ধারা মতে স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। এই ধারায় আরো উল্লেখ করা আছে যে কী কী কারণে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহ বিচ্ছেদের মোকদ্দমা করতে পারেন। ১০ ধারা মতে স্বামী বা স্ত্রী জেলা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। জেলা জজ বিবাহ বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দিলে ঐ রায়টি কার্যকর হবার জন্য হাইকোর্টের কনফারমেশন লাগবে। হাইকোর্ট বিভাগের তিনজন বিচারপতির বেঞ্চে এই শুনানি হবে, যদি ভিন্ন মতামত হয় তবে মেজোরিটির রায় প্রাধান্য পাবে। আবার যদি দুজন বিচারপতির বেঞ্চে শুনানি হয় এবং ভিন্ন রায় আসে তবে সিনিয়র বিচারপতির মতামত প্রাধান্য পাবে। ধারা ১১ মতে যদি কোনো স্বামী তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অ্যাডেল্ট্রি বা ব্যভিচারের অভিযোগ এনে বিবাহ বিচ্ছেদ চান তবে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ঐ লোকের নামও পিটিশনে লিখতে হবে।
সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশের খ্রিষ্টান বিবাহবিচ্ছেদ নিজস্ব ধর্মীয় আইনে পরিচালিত হয়। যেসব আইনে খ্রিষ্টান ডিভোর্স পরিচালিত সেগুলো হলো দ্য ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯, দ্য ম্যারেজ অ্যাক্ট, ১৯৭২, দ্য কোড অব ক্যানন ল’ (ক্যাথলিকদের জন্য)।
ক্যানন আইনের ১০৫৬ ধারামতে, খ্রিষ্টান বিয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঐক্য ও অবিচ্ছেদ্যতা। প্রটেস্ট্যান্টদের মতে, বিয়ে একটি ধর্মীয় সংস্কার। বিয়ে এবং বিয়ের বিচ্ছেদ নিয়ে ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দ্য ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
এ অ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিষ্টান দম্পতির সম্পর্ক তিনটি উপায়ে ছিন্ন করা যায়—
প্রথমত, দ্য ডিভোর্স অ্যাক্টের ধারা ১০ অনুযায়ী স্বামী তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ এনে আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু স্ত্রীর ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযোগ এনে আবেদন করার কোনো সুযোগ নেই। তবে স্বামী যদি ব্যভিচারসহ ধর্মত্যাগ, অন্য ধর্ম গ্রহণ, অপর কোনো নারীকে বিয়ে করেন, কোনো নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত থাকেন, বহুকামিতা, পাশবিকতা বা নৃশংসতা করেন, অথবা কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া দুই বছর স্ত্রীর খোঁজখবর না রাখেন, তাহলেই শুধু স্ত্রী আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই স্ত্রীর পক্ষে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার কোনো সুযোগও এ আইনে দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয়ত, নিচে উল্লেখ করা কারণে বিয়ে বাতিল করার জন্য যেকোনো পক্ষ আদালতে আবেদন করতে পারেন—
১. স্বামী বিয়ের সময় এবং মামলা দায়ের করার সময় পর্যন্ত পুরুষত্বহীন ছিল;
২. বিয়ের পক্ষদ্বয়ের মধ্যে এমন সম্পর্ক বিদ্যমান, যার কারণে বিয়ে করা আইনত নিষিদ্ধ;
৩. বর বা কনে কেউ বিয়ের সময় মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল;
৪. স্বামী বা স্ত্রী যে কারও পূর্ববর্তী স্ত্রী বা স্বামী বিয়ের সময় জীবিত ছিল।
সর্বশেষ জুডিশিয়াল স্যাপারেশনের মাধ্যমেও সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাবে। ব্যভিচার, নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা বা কোনো কারণ ছাড়া দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে পরিত্যাগ করলে স্বামী বা স্ত্রী আদালতে জুডিশিয়াল স্যাপারেশনের মামলা করতে পারে।
দ্য ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯-এর ধারা ১৭ ও ২০-এর অধীনে বিবাহবিচ্ছেদ ও বাতিল–সম্পর্কিত রায় হাইকোর্ট ডিভিশনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়, যা অনেক বিচারপ্রার্থীর জন্য ঝামেলাদায়ক। আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়া জটিল বলে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকে অ্যাফিডেভিট করে বিবাহবিচ্ছেদ ও আবার বিয়ে করে থাকেন। তবে তা আইনসিদ্ধ নয়। আগের বিয়ের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ না হলে আবার বিয়ে খ্রিষ্টান ধর্মমতে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়।