27/08/2026
সামান্য একটা কারণে চিৎকার করে ফেললেন। তরকারিতে নুন একটু কম হয়েছিল বলে।
এটা নতুন কিছু না। গত কয়েক মাস ধরেই এমন হচ্ছিল। ৩৪ বছর বয়সী নাজমা আক্তার, স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে একসময় বেশ সুখী সংসার ছিল তার। কিন্তু আজকাল সামান্য কারণেই রেগে যান, চিৎকার করেন, তুচ্ছ ব্যাপারেও ঝগড়া বেঁধে যায়।
শাশুড়ি বলেন, "বউয়ের মেজাজ দিন দিন উগ্র হয়ে যাচ্ছে।" স্বামী ভাবেন সংসারের চাপে এমন হচ্ছে। প্রতিবেশীরা আড়ালে বলাবলি করেন, "মহিলার মাথায় বোধহয় একটু সমস্যা হয়েছে।"
কিন্তু কেউই একটা জিনিস খেয়াল করেননি, নাজমা আক্তার দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছেন, অথচ খাওয়াদাওয়া আগের চেয়ে বেশিই করছেন। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। হাত দুটো মাঝেমাঝে একটু কাঁপে। গরম একদম সহ্য হয় না, ফ্যানের নিচে বসেও ঘামতে থাকেন। মাঝেমধ্যে হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
"যাক, এই বয়সে রো মহিলাদের ওজন বেড়ে যায়, আমাদের বউমা একটু স্লিম হচ্ছে, ভালোই তো।" "ওর মেজাজ তো আগে থেকেই একটু কড়া, বয়সের সাথে বেড়েছে হয়তো।"
কিন্তু এসবের পেছনে ছিল অন্য একটা কারণ, যেটা ঘরের কারো মাথায় ই আসে নি।
থাইরয়েড গ্রন্থি। গলার সামনে প্রজাপতির আকৃতির ছোট্ট একটা গ্রন্থি, যেটা শরীরের মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণ করে। নাজমা আক্তারের থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি হরমোন তৈরি করা শুরু করেছিল, মেডিক্যাল ভাষায় যাকে বলে হাইপারথাইরয়েডিজম।
এই বাড়তি থাইরয়েড হরমোন শরীরের প্রতিটা কোষকে বাড়তি গতিতে কাজ করতে বাধ্য করে। হৃদপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হয়, শরীরের তাপ উৎপাদন বেড়ে যায়, ক্যালোরি পোড়ে দ্রুত গতিতে। তাই খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যায়। মস্তিষ্কেও এই হরমোনের প্রভাব পড়ে। স্নায়ুতন্ত্র সবসময় বাড়তি উত্তেজিত অবস্থায় থাকে, এড্রেনালিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। ফলে খিটখিটে মেজাজ, সহজে রেগে যাওয়া, অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা এগুলো দেখা দেয়। আর এগুলো হাইপারথাইরয়েডিজমের খুবই সাধারণ লক্ষণ। এটা কোনো "মন্দ স্বভাব" নয়।
এটা একটা হরমোনজনিত সমস্যা।
কিন্তু পরিবারের কেউ এটাকে অসুখ ভাবেননি। ভেবেছেন স্বভাবের দোষ, সংসারের চাপ, নয়তো বয়সের প্রভাব। ডাক্তার দেখানোর কথা কারো মাথাতেই আসেনি।
মাস ছয়েক পর, বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান ঘিরে প্রচণ্ড দৌড়াদৌড়ি আর মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে গেলেন নাজমা আক্তার। রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর উঠলো, বুক অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ধড়ফড় করতে লাগলো। প্রলাপ বকতে শুরু করলেন, ঘামে ভিজে গেল পুরো শরীর।
পরিবার প্রথমে ভাবলো টাইফয়েড বা অন্য কোনো ইনফেকশন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই খিঁচুনি শুরু হলো।
ইমার্জেন্সি তে ডাক্তাররা যা শনাক্ত করলেন, তার নাম "থাইরয়েড স্টর্ম"।
হাইপারথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে ভয়াবহ জটিলতা। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত হাইপারথাইরয়েডিজমের ওপর হঠাৎ শারীরিক বা মানসিক চাপ পড়লে (ইনফেকশন, সার্জারি, প্রচণ্ড টেনশন, প্রসব) এটা ঘটতে পারে।
প্রচণ্ড জ্বর, মিনিটে ১৪০ এর বেশি হার্টরেট, একসময় হার্টের রিদম নষ্ট হওয়া, এবং প্রলাপ থেকে শুরু করে কোমা পর্যন্ত গড়ায়।
আইসিইউতে নেওয়া হলো তাকে। বিটা-ব্লকার দিয়ে হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ, এন্টিথাইরয়েড ওষুধ দিয়ে নতুন হরমোন তৈরি বন্ধ করা, স্টেরয়েড, শরীর ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা। সবকিছুই করা হলো বাচানোর জন্য।
কিন্তু ততক্ষণে হৃদযন্ত্রের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। হার্ট ফেইলিওর দেখা দিলো। (চিকিৎসা সত্ত্বেও থাইরয়েড স্টর্মে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১০-৩০%)
চারদিন আইসিইউতে লড়াই করার পর, নাজমা আক্তার আর ফিরে এলেন না।
চিকিৎসক পরে পরিবারকে বললেন, "ছয় মাস আগে যখন মেজাজ পরিবর্তন আর ওজন কমা শুরু হয়েছিল, তখনই যদি একটা থাইরয়েড টেস্ট করানো হতো, এই পরিণতি সহজেই এড়ানো যেত।"
বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে "মেজাজ গরম" কে স্রেফ স্বভাবের দোষ ভেবে বছরের পর বছর উপেক্ষা করা হয়.. বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে, যাদের হঠাৎ মানসিক পরিবর্তনকে অনেক সময় সংসারের পলিটিক্স বা "মহিলা মানুষ, মুড সুইং তো হবেই" বলে হালকাভাবে নেওয়া হয়।
তাই মনে রাখবেন যদি কারো খিটখিটে মেজাজের সাথে যদি এই লক্ষণগুলোও দেখেন
- খাওয়া বাড়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া
- গরম সহ্য না হওয়া, অতিরিক্ত ঘাম
- বুক ধড়ফড় করা
- হাত কাঁপা
- ঘুম কম হওয়া, ভেতরে ভেতরে অস্থির লাগা
- গলার সামনের দিকটা একটু ফুলে যাওয়া
তাহলে এটাকে শুধু "মেজাজ" বলে উড়িয়ে দেবেন না। একজন ডাক্তার দেখান, একটা সাধারণ থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TSH, FT3, FT4) করান। সময়মতো ধরা পড়লে হাইপারথাইরয়েডিজম সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটা রোগ।
আল্লাহ আমাদের এবং আমাদের প্রিয়জনদের হেফাজত করুন। সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
- শাহরিয়ার আবদুল্লাহ, MBBS Final Year