29/08/2020
১৯৮১ সালের টর্ণেডো ও সিলোনিয়া হাই স্কুলের হেড স্যারের দূরদর্শিতা
======================================
১৯৮১ সাল। সিলোনীয়া হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব বিএসসি বিএড। শিক্ষক হিসেবে আছেন- ছেরাজ স্যার, হুদা স্যার, শ্রীরুপ স্যার, মাওলানা তাহের করিমি স্যার, ছেরাজ উদ্দিন স্যার, এনামুল হক স্যার, ইউসুফ স্যার, মনোরঞ্জন স্যার। দফতরী আলী আহমদ ও নাইট গার্ড নূর আহাম্মদ মিয়া।
ঢাকা মাইজদী সড়কের পশ্চিম পাশে উত্তর দক্ষিণে লম্বা দুটি টিন শেড ঘরকে যুক্ত করে স্কুল ভবন। স্কুল ভবনের উত্তর পাশে একটু ফাঁকা জায়গার পর বিএডিসির একটি পরিত্যক্ত গুদামঘরকে পরিষ্কার করে স্কুলের অফিস। সেখানে দুটি বড় টেবিলকে যুক্ত করে মাঝ বরাবর হেড স্যার বসেন। উনাকে ঘিরে তিন পাশে শিক্ষকেরা বসেন। দক্ষিন পশ্চিম কোনায় মনোরঞ্জন স্যার যাকে আমরা কেরাণি স্যার বলতাম, তিনি বসতেন। অফিস রুমের বাইরে দফতরী আলী আহমদ একটি টুলে বসতেন।
এ অফিস রুমে প্রবেশ ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত ভয়ের ব্যাপার। কোন শিক্ষক কতৃক কোন কাজের জন্য আদিষ্ট হয়ে আমরা এ রুমে প্রবেশ করার জন্য যেতাম। কাজের মধ্যে ছিল - বেত আনা, চক ডাস্টার আনা, বই আনা, মানচিত্র আনা ইত্যাদি। প্রতিবার প্রবেশের জন্য -May I come in sir বলে অনুমতি নিতে হতো। উপস্থিত স্যারদের কেউ Yes, come in বললেই প্রবেশ করতে পারতাম।
সকাল ১১টায় স্কুল শুরু হয় বিকেল ৪ টায় ছুটি হয়। ৩০ মিনিটের ৮টি ক্লাস প্রতিদিন। দুপুর ১ টা থেকে ২ টা যোহরের নামাজ ও টিফিন বিরতি।
দফতরী আলী আহমদের স্কুলের ঘন্টা বাজানোর আর্ট ছিল। ঘন্টা সমূহের বিশেষ অর্থও ছিল। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে এর অর্থ বুঝতে পারতাম। সকাল ১০.৩০ ও ১০.৪৫ মিনিটে টায় তিনি দু'বার সতর্ক ঘন্টা বাজাতেন। এটার আওয়াজ ছিল ঢং ঢং ঢং। সকাল ১১টায় তিনি ১১ টা ঘন্টা দিতেন। এর আর্ট ছিল ৫ জোড়া ঘন্টা ছন্দ করে দিয়ে শেষে ১ টি ঘন্টা। এর মানে ক্লাস শুরু হয়ে গেল। ১ম ঘন্টা শেষে ১ টি ঘন্টা , ২য় ঘন্টা শেষে ২ টি, ৩য় ঘন্টা শেষে ৩টি এবং ৪র্থ ঘন্টা শেষে যেহেতু টিফিন বিরতি হবে তাই শুধু ঢং ঢং ঢং। টিফিন বিরতি শেষে ২ জোড়া ঘন্টা মানে ক্লাস আবার শুরু হল। আবার ৫ম ঘন্টা শেষে ৫ টি, তারপর ৬ টি, ৭ টি সর্বশেষে ৪ জোড়া ঘন্টা শেষে ঢং ঢং ঢং মানে ছুটি। এ ঘন্টা শোনার জন্য কান খাড়া থাকতো, এটি ছিল চরম আনন্দের ঘন্টা। কোন দিন নোটিশ ছাড়া যদি নির্দিষ্ট ঘন্টা শেষে ঢং ঢং ঢং বেজে উঠতো আমরা বুঝে যেতাম কোণ কারণে আজ ছুটি হয়ে গেছে।
সেদিন ছিল এপ্রিল মাসের ১২ তারিখ। টিফিন বিরতির পর দুপুর ২ টায় ৫ম ঘন্টার ক্লাস শুরু হয়েছে। হঠাৎ আকাশ কালোমেঘে ঢেকে গেল। হেড স্যার বারন্দায় একবার হেটে গেলেন। সাথে সাথে ঢং ঢং ঢং ঘন্টা। স্যারেরা ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। দ্রুত বাড়ী চলে যেতে বললেন। স্কুল থেকে বের হয়ে বাজার পর্যন্ত দু মিনিট না যেতেই প্রচন্ড বৃষ্টি ও বাতাশ শুরু হয়ে গেল। বাজারে আমাদের ক্লাসমেট করিম উল হকের দোকান ছিল। আমরা নবম শ্রেণির ক্লাসমেটদের কয়েকজন ওর দোকানে বসলাম। প্রায় ঘন্টা খানেক পর বৃষ্টি থামলো। ইতিমধ্যে খবর পাওয়া গেল স্কুলের দু'টি ঘরের মধ্য একটি পড়ে গেছে। স্কুলের দিকে গেলাম। দেখলাম উত্তর পাশে ঘরটি যেটিতে এক ঘন্টা আগে নবম ও দশম শ্রেণির ক্লাস হচ্ছিল সেটি মাঠের মধ্য পড়ে আছে। আল্লাহর অশেষ শোকরিয়া। দু' শতাধিক ছাত্রছাত্রীসহ ঘরটি উপড়ে পড়লে অনেক বড় ক্ষয় ক্ষতি হতে পারতো। হেড স্যার আবহাওয়া দেখে দূরদর্শী পূর্বানুমান করতে পেরেছিলেন এবং তড়িৎ ছুটির সিদ্ধান্ত দিতে পারাতে অনেক বড় দুর্ঘটনা থেকে আল্লাহ রক্ষা করেছেন। স্কুল ছাড়া পুরো এলাকায় আর কোন ক্ষয় ক্ষতি হয়নি।
পরদিন জানতে পেরেছি, এটি ছিল একটি শক্তিশালী টর্নেডোর আঘাত। এটি মূল আঘাত হানে ছাগলনাইয়া ও পরশুরাম এলাকায় । এতে প্রায় দু'শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। এর তীব্রতা এত বেশি ছিলযে অনেক টিউবওয়েল উপড়ে যায়, অনেক টিনের ছাউনি গাছের উপর উড়ে গিয়ে আটকে পড়ে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে উপদ্রুত এলাকা সফর করেন।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন
চেয়ারম্যান
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়