জ্ঞান অর্জন করুন, জ্ঞান ছড়িয়ে দিন-Gain knowledge, spread knowledge

জ্ঞান অর্জন করুন, জ্ঞান ছড়িয়ে দিন-Gain knowledge, spread knowledge

Share

The page is to gain and spread knowledge espeically related to the Islam and Islamic Lifestyle. We are serving you since 1995.

It's not only a business to me but also it's a dream work for me.The journey of Shoe Market started more than two decades ago, from the inspiration of leather business & later curving its’ way into shoemaking. Global Footprint: As the largest shoemaker in the subcontinent, Shoe Market Limited company holds 15% share of leather footwear export in Bangladesh from $1.75 billion leather export. Shoema

02/06/2026

ইসলামে ধর্ষণ ও ব্যভিচার শাস্তি
▪️যিনা বা ব্যভিচার

ব্যভিচার বলতে শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ বিবাহবন্ধনের বাইরে কোনো নারী-পুরুষের ইচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্ককে বোঝায়। ইসলামী পরিভাষায় একে “যিনা” (الزنا) বলা হয়। এটি ইসলামে কবীরা গুনাহ ও জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।” সূরা ইসরা : ৩২

আর ব্যভিচারের শাস্তিও ইসলামে সুনির্ধারিত।অপরাধীরা অবিবাহিত হলে তাদেরকে একশ বেত্রাঘাত করা হবে, আর বিবাহিত হলে তাদের শাস্তি হলো রজম (পা থ র নিক্ষেপে মৃ* ত্যু দণ্ড)। এ বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে কারো জন্য আলাদা কোনো ছাড় নেই।

অবিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর জন্য একশ
বে ত্রা ঘা তের বিধান কুরআনে এসেছে—

الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَة جَلْدَةٍ

“ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ বে ত্রা ঘা ত করো।” সূরা নূর : ২

আর বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর জন্য রজম (পা থ র নি ক্ষে পে মৃ*ত্যুদণ্ড)-এর বিধান সহীহ হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। যেমন—

হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ قَالَ أَتَى رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ فَنَادَاهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ ‏.‏ فَأَعْرَضَ عَنْهُ فَتَنَحَّى تِلْقَاءَ وَجْهِهِ فَقَالَ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ ‏.‏ فَأَعْرَضَ عَنْهُ حَتَّى ثَنَى ذَلِكَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ فَلَمَّا شَهِدَ عَلَى نَفْسِهِ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ دَعَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏"‏ أَبِكَ جُنُونٌ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ لاَ ‏.‏ قَالَ ‏"‏ فَهَلْ أَحْصَنْتَ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ نَعَمْ ‏‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ اذْهَبُوا بِهِ فَارْجُمُوهُ ‏"‏ ‏.‏

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আসল, তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। সে উচ্চস্বরে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যিনা করেছি।” রাসূল ﷺ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে আবার তাঁর সামনে এসে একই কথা বলল। রাসূল ﷺ আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

এভাবে সে চারবার নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিল। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ডেকে বললেন, “তোমার মধ্যে কি পাগলামি আছে?” সে বলল, “না।” তিনি বললেন, “তুমি কি বিবাহিত?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাকে নিয়ে যাও এবং রজম করো। সহীহ বুখারী ৬৮১৫, সহীহ মুসলিম ১৬৯১

আর এ বিষয়ে আরও বহু সহীহ হাদীস বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। তবে আলোচনা দীর্ঘ না করার উদ্দেশ্যে এখানে একটি হাদীসের উপরই সীমাবদ্ধ থাকা হলো।

▪️ধর্ষণ বা জোরপূর্বক ব্যভিচার

ধর্ষণ বা জোরপূর্বক ব্যভিচার হলো—কোনো নারীর সাথে তার ইচ্ছা ও সম্মতি ব্যতীত ভয়-ভীতি,বলপ্রয়োগ, অস্ত্রের হুমকি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো জবরদস্তিমূলক উপায়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা বা স্থাপনে বাধ্য করা। ইসলামী পরিভাষায় একে “যিনা বিল-জবর” (الزنا بالجبر) বলা হয়। এটি কেবল ব্যভিচারই নয়; বরং চরম জুলুম, মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন এবং ভয়াবহ অপরাধ।

ব্যভিচার ও ধর্ষণের শাস্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—ধর্ষকের উপর ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তিই কার্যকর হবে। সে বিবাহিত হলে তার শাস্তি রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃ*ত্যুদণ্ড), আর অবিবাহিত হলে একশ বে ত্রা ঘাত। পক্ষান্তরে ধর্ষিতা নারীর উপর কোনো শাস্তি বর্তাবে না; কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি নির্যাতিতা, বাধ্যকৃত ও নিরপরাধ।

ইমাম ইবনে কুদামা রহ. বলেন

ولا حَدَّ على مُكْرَهَةٍ في قولِ عامَّةِ أهلِ العلمِ. رُوِىَ ذلك عن عمرَ، والزُّهْرِىِّ، وقَتَادَةَ، والثَّورِىِّ، والشَّافِعِىِّ، وأصْحابِ الرَّأْىِ. ولا نعلمُ فيه مُخالفًا؛ وذلك لقولِ رسول اللَّه -صلى اللَّه عليه وسلم-: "عُفِىَ لأمَّتِى عن الْخَطإِ، والنِّسْيَانِ، وما اسْتُكْرِهُوا عَلَيْه" (٣٣). وعن عبد الجَبَّارِ بن وائلٍ (٣٤)، عن أبيه، أنَّ (٣٥) امرأةً اسْتُكْرِهَتْ على عهدِ رسولِ اللَّه -صلى اللَّه عليه وسلم- فدَرَأَ عنها الحَدَّ. روَاه الأثْرَمُ

“জোরপূর্বক বাধ্যকৃত নারীর উপর কোনো হদ (শাস্তি) নেই—এ ব্যাপারে প্রায় সকল আহলে ইলম একমত। এ মতটি উমর রাযি. ইমাম যুহরী, কাতাদাহ, সাওরী, শাফেয়ী এবং আহলুর রায় (হানাফি ফকীহগণ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা কোনো ভিন্নমত জানি না।’’ এর দলিল হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী—
“আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যেসব কাজে তাদেরকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়—সেগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।”

আর আবদুল জব্বার ইবনে ওয়াইল তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন—“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন নবী ﷺ তার উপর থেকে হদ (শাস্তি) রহিত করেন।” ইমাম ইবনে কুদামা, আল মুগনী ১২/৩৪৭,

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রাহ. বলেন—

وَلَا عُقُوبَةَ عَلَيْهَا إِذَا صَحَّ أَنَّهُ اسْتَكْرَهَهَا وَغَلَبَهَا عَلَى نَفْسِهَا وَذَلِكَ يُعْلَمُ بِصُرَاخِهَا وَاسْتِغَاثَتِهَا وَصِيَاحِهَا

“যদি এটি প্রমাণিত হয় যে তাকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তবে তার উপর কোনো শাস্তি আরোপ করা হবে না। আর বিষয়টি সাধারণত তার চিৎকার, সাহায্য প্রার্থনা ও আর্তনাদ থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।” ইমাম ইবনে আব্দুল বার, আল ইসতিযকার ৭/১৪৬,

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. আরও বলেন—

وَاخْتَلَفَ الْفُقَهَاءُ فِي وُجُوبِ الصَّدَاقِ عَلَى الْمُغْتَصِبِ فَقَالَ مَالِكٌ وَاللَّيْثُ وَالشَّافِعِيُّ عَلَيْهِ الصَّدَاقُ وَالْحَدُّ جَمِيعًا. وَقَالَ أَبُو حَنِيفَةَ وَأَبُو يُوسُفَ وَمُحَمَّدٌ وَسُفْيَانُ الثَّوْرِيُّ عَلَيْه الْحَدُّ وَلَا مهر عليه

ধর্ষণকারীর উপর “মোহর” (মোহরে মিছল/ক্ষতিপূরণ) ওয়াজিব হবে কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক, আল-লাইস এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধীর উপর দুটি বিষয়ই প্রযোজ্য—হদ (শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি) এবং মোহরে মিছল (ক্ষতিপূরণ)। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ এবং সাওরী (রহ.)-এর মতে, তার উপর হদ প্রযোজ্য হবে; তবে মোহর (ক্ষতিপূরণ) আলাদাভাবে ওয়াজিব হবে না।ইমাম ইবনে আব্দুল বার, আল ইসতিযকার ৭/১৪৬,

▪️ধর্ষণ কি হিরাবার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?

আর ধর্ষণ বা বলপূর্বক ব্যভিচার, যা বর্তমান সময়ে আলোচিত একটি ভয়াবহ অপরাধ, এর শাস্তি সব ক্ষেত্রে একই ধরনের হয় না; বরং ঘটনার প্রকৃতি, পদ্ধতি এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

যদি এই অপরাধ অস্ত্রের ভয়, অপহরণ, দলবদ্ধ সন্ত্রাস বা জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী কার্যক্রমের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তবে তা কুরআনে বর্ণিত “হিরাবা” ও “ফাসাদ ফিল আরদ”-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। ফাসাদ ফিল আরদ-এর অর্থ হলো—পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, জননিরাপত্তা বিনষ্ট করা এবং মানুষকে ভয়-ভীতি ও আতঙ্কে ফেলে সন্ত্রাসী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো।

কুরআন মাজীদে সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে এ ধরনের অপরাধীদের বিষয়ে কঠোর শাস্তির বিধান বর্ণিত হয়েছে। এটি বিবাহিত বা অবিবাহিত—কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যে কেউ এই অপরাধে জড়িত হলে তার ক্ষেত্রে শরঈ বিধান প্রযোজ্য হবে। এ ধরনের ফৌজদারি সন্ত্রাসী অপরাধীরা দুটি শাস্তি একত্রে পাওয়ার যোগ্য :

১. অপরাধের শাস্তি।
২. ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ তথা সন্ত্রাসের শাস্তি।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে
এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হ*ত্যা করা হবে, অথবা শূ*লীতে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কে* টে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে…।” সূরা মায়িদা: ৩৩

▪️ধর্ষণের পর হত্যা: কিসাসের বিধান কী?

সাম্প্রতিক ধর্ষণের পর মেয়েদেরকে হ*ত্যাও করা হচ্ছে।
ফলে এসব ঘটনা তো নিছক ধর্ষণের নয়, এর সাথে আছে হ*ত্যার অপরাধ। আর এই ধরণের হ*ত্যার বিধান একমাত্র কিসাস তথা মৃত্যুদণ্ড।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَلَکُمۡ فِی الۡقِصَاصِ حَیٰوۃٌ یّٰۤاُولِی الۡاَلۡبَابِ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ

হে বুদ্ধিমানেরা! কিসাসের ভেতর তোমাদের জন্য রয়েছে জীবন (রক্ষার ব্যবস্থা)। আশা করা যায় তোমরা (এর বিরুদ্ধাচরণ) পরিহার করবে। সুরা বাকারা, আয়াত ১৭৯

▪️ধর্ষণ প্রমাণের শরঈ পদ্ধতি কী?

ক্লাসিক ফিকহে ধর্ষণ প্রমাণের প্রধান ভিত্তিগুলো
হলো—

এক. ধর্ষকের ইকরার বা স্বীকারোক্তি

যদি ধর্ষণের অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে সুস্পষ্টভাবে চারবার স্বীকার করে যে সে জোরপূর্বক যৌন অপরাধ করেছে, তাহলে তার এই স্বীকারোক্তি শরীয়ত ও বিচারিক দৃষ্টিতে শক্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ভিত্তিতে বিচারক তার উপর হদ প্রয়োগের রায় দিবেন।

হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আসল, তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। সে উচ্চস্বরে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যিনা করেছি।” রাসূল ﷺ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে আবার তাঁর সামনে এসে একই কথা বলল। রাসূল ﷺ আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

এভাবে সে চারবার নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিল। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ডেকে বললেন, “তোমার মধ্যে কি পাগলামি আছে?” সে বলল, “না।” তিনি বললেন, “তুমি কি বিবাহিত?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাকে নিয়ে যাও এবং রজম করো। সহীহ বুখারী ৬৮১৫, সহীহ মুসলিম ১৬৯১

এ হাদীসের ভিত্তিতে হানাফী ও হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, ব্যভিচারী বা ধর্ষককে চারবার ব্যভিচার বা ধর্ষণের স্বীকারোক্তি দিতে হবে; এরপর তার উপর হদ কার্যকর করা হবে। পক্ষান্তরে শাফেয়ী ও মালেকী ফকীহগণের মতে, একবার স্পষ্ট স্বীকারোক্তিই হদ প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট। তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ২/৩৮৭, আল ফিকহুল হানাফী ফি সাউবিহিল জাদীদ ৩ /২৫৬, ফাতাওয়া উসমানী ৩/৫৩৭,

দুই. অথবা চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য

ধর্ষণের ক্ষেত্রেও হদ (নির্ধারিত শরয়ি শাস্তি) কার্যকর করার জন্য চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, ন্যায়পরায়ণ মুসলিম পুরুষের সাক্ষ্য প্রয়োজন। আল ফিকহুল হানাফী ফি সাউবিহিল জাদীদ ৩ /২৫৫, ফাতাওয়া শামী ৪/৭, সাঈদ সংস্করণ।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

“যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর তাদের দাবির সমর্থনে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে আশি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। তারাই তো প্রকৃত ফাসেক।” সূরা নূর, আয়াত ৪

হাদিসে নববীতে ইরশাদ হয়েছে—

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ، قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنْ وَجَدْتُ مَعَ امْرَأَتِي رَجُلًا، أَؤُمْهِلُهُ حَتَّى آتِيَ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ؟ قَالَ: «نَعَمْ»."

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, সা‘দ ইবনু উবাদা রাযি. বলেন—“হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে কোনো পুরুষকে পাই, তবে কি আমি তাকে (অর্থাৎ বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য) চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করা পর্যন্ত সময় দেব?” নবী ﷺ বললেন: “হ্যাঁ।” সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৯৮,

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন, করাচীর ফতোয়ায় বলা হয়েছে—‘‘ধর্ষণের অপরাধে শরয়ি হদ কার্যকর করার জন্য চারজন সাক্ষী অথবা অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি আবশ্যক। এ দুটির কোনোটি ছাড়া হদ কার্যকর করা যাবে না।

তবে ধর্ষিত নারী যেহেতু জবরদস্তির শিকার ও শরয়ি পরিভাষায় ‘মুকরাহ’, তাই তার উপর কোনো হদ প্রযোজ্য হবে না।’’ জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন, ফাতাওয়া নম্বর 143812200011

▪️মেডিকেল পরীক্ষা ও পারিপার্শ্বিক আলামতের মাধ্যমে ধর্ষণ প্রমাণের শরয়ি অবস্থান

হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনায় কুরআনুল কারীম পারিপার্শ্বিক আলামতের ভিত্তিতে সত্য উদ্ঘাটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত পেশ করেছে। যখন মিসরের আজীজের স্ত্রী হযরত ইউসুফ আ. এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন, তখন মহিলার পরিবারের একজন ব্যক্তি জামা ছেঁড়ার দিককে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

قَالَ هِيَ ‌رَاوَدَتْنِي ‌عَنْ ‌نَفْسِي، وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ . وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ. فَلَمَّا رَأَى قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنَّ إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ ﴾ [يوسف: 26-28]

“ইউসুফ বলল, সেই-ই আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিল। তখন মহিলার পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, ‘যদি তার জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে নারী সত্য বলেছে এবং সে মিথ্যাবাদী। আর যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে নারী মিথ্যা বলেছে এবং সে সত্যবাদী।’ অতঃপর স্বামী যখন দেখল যে, ইউসুফের জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া, তখন সে বলল, ‘এ তো তোমাদের নারীদের কৌশল। নিশ্চয়ই তোমাদের কৌশল বড়ই ভয়ংকর।’”—সূরা ইউসুফ, ১২ : ২৬-২৮

উপরোক্ত আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন—

“এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, মামলা- মোকদ্দমা ও বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে ইঙ্গিত ও আলামতের সাহায্য গ্রহণ করা যেতে পারে। এখানে সাক্ষ্যদাতা ইউসুফ আ. এর জামার পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে যাওয়াকে এ বিষয়ের আলামত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং যুলায়খা তাকে আটকানোর চেষ্টা করছিল।

এ ব্যাপারে সকল ফকীহ একমত যে, ঘটনার প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটনের জন্য আলামত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে কাজে লাগানো উচিত, যেমন এ ঘটনায় করা হয়েছে। তবে শুধু আলামত ও ইঙ্গিতকেই চূড়ান্ত ও স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।” মাআরিফুল কুরআন, সূরা ইউসুফ (১২), আয়াত ২৬-২৮-এর তাফসীর।

কাতারভিত্তিক ইসলামি ফতোয়া প্ল্যাটফর্ম IslamWeb.net-এ প্রকাশিত এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

ফকীহগণ এ বিষয়ে একমত যে, ব্যভিচার চারজন সাক্ষীর কমে প্রমাণিত হয় না; এটি অন্যান্য অপরাধের প্রমাণপদ্ধতি থেকে ভিন্ন। সূরা নূর, আয়াত ৪

সাক্ষ্যদানের শর্ত হলো সাক্ষীরা ন্যায়পরায়ণ (আদিল) হতে হবে এবং তাদের সাক্ষ্য এমন হতে হবে যে তারা সরাসরি ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছে। অর্থাৎ স্পষ্টভাবে অবলোকন করতে হবে—ব্যভিচারের ক্ষেত্রে পুরুষের অ*ঙ্গ নারীর অ*ঙ্গে প্রবেশ করেছে—এবং সাক্ষ্য হবে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায়, কেবল ইঙ্গিত বা ইশারার মাধ্যমে নয়।

ধর্ষণ ও ব্যভিচারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো—ধর্ষণের ক্ষেত্রে নারী শরয়ি দৃষ্টিতে দায়মুক্ত (মুকরাহ) হিসেবে গণ্য হয়; তার উপর কোনো হদ প্রযোজ্য হয় না। বরং সে জবরদস্তির শিকার ও নির্যাতিত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তার জন্য শরয়ি অধিকার ও ক্ষতিপূরণের বিধান প্রযোজ্য হয়।

আধুনিক চিকিৎসা-প্রযুক্তির মাধ্যমে ধর্ষণ প্রমাণকে শরয়ি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য না বলার একটি যুক্তি হলো—আল্লাহ তাআলা ব্যভিচার প্রমাণের জন্য নির্দিষ্টভাবে চারজন সাক্ষীর শর্ত নির্ধারণ করেছেন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের ইজ্জত ও গোপনীয়তা সংরক্ষণ করা। তাই এমন বিকল্প পদ্ধতির উপর নির্ভর করা বৈধ নয়, যা শরীয়তের নির্ধারিত প্রমাণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

তবে এটি বলা সঠিক নয় যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে এর আলামত ব্যভিচারের তুলনায় অধিক স্পষ্ট হতে পারে। কারণ ধর্ষণের শিকার নারী সাধারণত সাহায্যের জন্য চিৎকার করে এবং আশপাশের লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, পক্ষান্তরে ব্যভিচার সাধারণত গোপনীয়তার সাথে সংঘটিত হয়।

আর যদি কোনো নারী সাহায্যের জন্য চিৎকার করে এবং ঘটনাস্থলে কেউ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করতে দেখে, তাহলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকারোক্তি প্রদান করলে, তার স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে—কারণ “স্বীকারোক্তিই সর্বোত্তম প্রমাণ।— ফতোয়া নং 70220

ফাতাওয়া দারুল উলুম যাকারিয়া-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

যে অপরাধ ফরেনসিক সায়েন্সের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এবং এর সাথে যদি শরয়ি সাক্ষ্য বা অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি বিদ্যমান থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে শরয়ি হদ ও কিসাসের বিধান কার্যকর করা হবে।

আর যদি কোনো শরয়ি সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকে, বরং কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমেই অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে হদ বা কিসাস কার্যকর করা যাবে না।

তবে এ প্রমাণকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা যাবে না; বরং বিচারক (কাজী) তা বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত তাযীর (বিচারভিত্তিক শাস্তি) প্রদান করতে পারবেন।
এর কারণ হলো—হদ ও কিসাসের ক্ষেত্রে শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য হলো যথাসম্ভব শাস্তি প্রয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সন্দেহের কারণে হদ বাতিল করার নীতি গ্রহণ করা।—ফাতাওয়া দারুল উলূম যাকারিয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬০

জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নসব (বংশ পরিচয়), ব্যভিচার বা ধর্ষণ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টকে চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত নয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বোচ্চ যা প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে, তা হলো একটি সহায়ক বা সমর্থনমূলক আলামত; কিন্তু এটিকে মূল ও চূড়ান্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

ফতোয়ায় আরও উল্লেখ করা হয় যে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার দৃষ্টিতেও ডিএনএ টেস্ট সম্পূর্ণ নির্ভুল বা ভুলের সম্ভাবনামুক্ত নয়। বিভিন্ন কারণে এতে ত্রুটি, বিভ্রান্তি বা ভিন্ন ফলাফল আসার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও একে নসব নির্ধারণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ও অকাট্য মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা নিশ্চিত নয়।—ফতোয়া নং 143908200093

অন্য এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

ব্যভিচার বা ধর্ষণ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টের কোনো স্বতন্ত্র শরয়ি গ্রহণযোগ্যতা নেই। শরয়ি দৃষ্টিতে এ ধরনের অপরাধ কেবল তখনই প্রমাণিত হবে, যখন চারজন প্রত্যক্ষদর্শী ন্যায়পরায়ণ মুসলিমের সাক্ষ্য অথবা অভিযুক্তের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে; এর বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে তা শরয়ি হদ হিসেবে সাব্যস্ত হবে না।

তবে যদি ডিএনএ পরীক্ষার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে স্বীকারোক্তি প্রদান করে, তাহলে সেই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই অপরাধ প্রমাণিত হবে। জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, ফাতাওয়া 144312100749

সারকথা—
ধর্ষণজনিত অপরাধে ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে মূল বিচারনীতি হলো নির্দিষ্ট ও কঠোর প্রমাণের ভিত্তিতে হদ কার্যকর করা। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি স্পষ্ট ও স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি প্রদান করে, অথবা চারজন ন্যায়পরায়ণ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে শরয়ি বিধান অনুযায়ী হদ প্রয়োগ করা হবে।

কিন্তু যদি এই দুইটির কোনোটিই বিদ্যমান না থাকে—অর্থাৎ অভিযুক্ত স্বীকার না করে এবং চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও না থাকে—তাহলে শরীয়াহ নির্ধারিত হদ কার্যকর হবে না। এই অবস্থায় বিচারক পারিপার্শ্বিক আলামত (قرائن), ফরেনসিক প্রমাণ, ডিএনএ টেস্টসহ আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপায়কে সহায়ক প্রমাণ (supporting evidence) হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারেন।

এসব আলামতের ভিত্তিতে বিচারক অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের প্রক্রিয়া শুরু করবেন। অনেক ক্ষেত্রে এমন তদন্তমূলক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকারোক্তি প্রদান করতে পারে, যা শরয়ি দৃষ্টিতে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়ে হদ প্রয়োগের ভিত্তি হতে পারে।

▪️হদ প্রমাণিত না হলেও তাযীর আরোপ করা হবে

আর স্বীকারোক্তি বা শরয়ি সাক্ষ্য ব্যতীত শুধু পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে হদ প্রয়োগ করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে ইসলামী বিচারব্যবস্থা অপরাধকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে না; বরং তা তাযীর (বিচারভিত্তিক শাস্তি) এর আওতায় নিয়ে আসে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ অপরাধের গুরুত্ব ও প্রমাণের শক্তি অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারেন।

IslamWeb. net-এ প্রকাশিত এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

যদি চারজন সাক্ষী অথবা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হদ প্রমাণিত না হয়, তবে ধর্ষক তাযীর (বিচারভিত্তিক শাস্তি)-এর উপযুক্ত হবে। তাযীর এমন একটি শাস্তি, যার নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ শরীয়তে নির্ধারিত নেই; বরং তা বিচারকের ইজতিহাদ ও বিবেচনার উপর নির্ভরশীল।

অতঃপর যদি ধর্ষণের সাথে অপহরণের মতো কোনো অপরাধ যুক্ত থাকে, তাহলে তা হিরাবা (সামাজিক সন্ত্রাস ও দস্যুতা)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এ অবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তি হিরাবার শাস্তির উপযুক্ত হবে—যদি তা শরয়ি প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হয়। এ ক্ষেত্রে দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট বলে গণ্য করা হয়; যেমন মালিকী ফকীহ ইবনু ফারহূন রহিমাহুল্লাহ তাঁর তাবসিরাতুল হুক্কাম-এ উল্লেখ করেছেন।—ফতোয়া নং 397813

জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

‘আর যদি শরয়ি পদ্ধতিতে অপরাধ প্রমাণিত না হয়, কিন্তু সহায়ক সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক আলামত ও বিভিন্ন নিদর্শনের ভিত্তিতে বিচারকের নিকট অপরাধ সংঘটনের ব্যাপারে প্রবল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তিনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তাযীরমূলক শাস্তি আরোপ করতে পারবেন।’ জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, ফাতাওয়া নম্বর 144107200593

অন্য এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

‘ধর্ষণে যেহেতু জোর-জবরদস্তি ও সামাজিক ফাসাদ বিদ্যমান, তাই “ফাসাদ ফিল আরদ”-এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তাযীরস্বরূপ কঠোর শাস্তি আরোপ করতে পারে, যার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।’ জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, ফাতাওয়া নম্বর 143410200046

হদ ও তাযীরের মধ্যে পার্থক্য হলো—হদের শাস্তি শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট; পক্ষান্তরে তাযীরের পরিমাণ ও ধরন শাসক বা বিচারকের ইজতিহাদ ও বিবেচনার ওপর ন্যস্ত।

হদের ক্ষেত্রে সন্দেহের কারণে শাস্তি রহিত হয়ে যায়; কিন্তু তাযীরের ক্ষেত্রে সেই সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও তাযীরমূলক শাস্তি আরোপ করা আবশ্যক হয়। ফাতাওয়া শামী ৬/৬০, সাঈদ সংস্করণ।

তাযীরের শাস্তির কোনো নির্ধারিত পরিমাণ নেই। এর পরিধি বেত্রাঘাত থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। যেহেতু তাযীরের শাস্তি ইসলামী শরীয়তে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি, তাই রাষ্ট্রপ্রধান বা আদালত অপরাধের প্রকৃতি, তার ভয়াবহতা এবং সমাজের ওপর তার ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে তাযীরস্বরূপ মৃ*ত্যুদণ্ডও নির্ধারণ করতে পারেন, যদি তা জনস্বার্থ রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় মনে হয়। ফাতাওয়া শামী ৬/১০৭, আল ফিকহুল হানাফী ফি সাউবিহিল জাদীদ ৩/৩১০

▪️হুদুদ, কিসাস ও তাযীর কার্যকরের দায়িত্ব কার?

ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত নীতিমতে, হুদুদ,
কিসাস ও তাযীরের মূল শাস্তি কার্যকর করার অধিকার সাধারণ জনগণের নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বা বৈধ শাসকের একচ্ছত্র দায়িত্ব।

ফিকহগ্রন্থসমূহে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন বাদায়েউস সানায়ে, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, রওযাতুত তালিবীন এবং আল-মওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে দণ্ডবিধি প্রয়োগের দায়িত্ব শাসক বা রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত।

তদ্রূপ হিদায়া গ্রন্থে-এও উল্লেখ রয়েছে যে হদ কার্যকর করা রাষ্ট্রপ্রধান বা তার প্রতিনিধির দায়িত্ব। এমনকি কোনো ব্যক্তি সালিশ বা মীমাংসাকারীর ভূমিকায় থাকলেও তার জন্য হুদুদ বা কিসাস কার্যকর করার অধিকার নেই।

অতএব ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে বিচার ও শাস্তি ব্যক্তিগতভাবে বা জনতার হাতে অর্পণ করা বৈধ নয়। হুদুদ ও কিসাস কার্যকর করা সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কেউ নিজ উদ্যোগে এসব শাস্তি প্রয়োগ করলে তা শরীয়াহসম্মত পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হয় না; বরং তা বিশৃঙ্খলা, অবিচার ও ফিতনার কারণ হতে পারে।

ইসলাম অপরাধ দমনের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে রয়েছে—প্রমাণ যাচাই, সাক্ষ্য গ্রহণ, তদন্ত, সন্দেহ দূরীকরণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের সুসংগঠিত কাঠামো। এই দায়িত্ব ব্যক্তিগত বা জনসমষ্টির নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীন।

▪️ইসলামী দণ্ডনীতিতে শাস্তির সামাজিক দৃশ্যমানতা

ইসলামী দণ্ডবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিকে জনসম্মুখে কার্যকর করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সামাজিকভাবে দৃশ্যমান হয়, যাতে মানুষ অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে এবং নৈতিক সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকে। এর ফলে সমাজে পাপকে স্বাভাবিকীকরণের প্রবণতা রোধ হয়।

ব্যভিচারের শাস্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ

ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশত বে*ত্রা ঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী হও। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। সূরা আন-নূর: ২

এখানে “وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ”—
অর্থাৎ “মুমিনদের একটি দল যেন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে”—এই নির্দেশনা নিছক আনুষঙ্গিক বিষয় নয়; বরং এটি ইসলামী দণ্ডনীতির একটি মৌলিক নীতিকে প্রকাশ করে। ইসলামী শরীয়াহ মনে করে, নৈতিকতা কেবল ব্যক্তিগত জ্ঞান বা পাঠের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং সমাজে মূল্যবোধের দৃশ্যমানতা, অপরাধের প্রতি সামাজিক অবস্থান এবং প্রকাশ্য প্রতিরোধমূলক পরিবেশ মানুষের চিন্তা ও আচরণ গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে।

Khairul Islam 01/6/2026
হানাফী ফিকহ-Hanafi Fiqh

11/05/2026

#কুরবানীর_মাসায়েল
#মাওলানা_মুহাম্মাদ_ইয়াহইয়া

কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উল্লেখ হল।

কার উপর কুরবানী ওয়াজিব

মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫

নেসাবের মেয়াদ

মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

কুরবানীর সময়

মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫

নাবালেগের কুরবানী

মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

মুসাফিরের জন্য কুরবানী

মাসআলা : ৫. যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫

নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী

মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম

মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২

কুরবানী করতে না পারলে

মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে

মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

রাতে কুরবানী করা

মাসআলা : ১০. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই করলে

মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১

কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে

মাসআলা : ১২. উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

নর ও মাদা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

কুরবানীর পশুর বয়সসীমা

মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।

উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬

এক পশুতে শরীকের সংখ্যা

মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮

সাত শরীকের কুরবানী

মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে

মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পাল

কুরবানির নেসাব প্রসঙ্গ—

প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম
নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫

নেসাবের মেয়াদ—কুরবানীর নেসাব পুরো বছর
থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

কুরবানী কি সুন্নতে মুয়াক্কাদা?

সালাফি-আহলে হাদিসের কথিত শায়খদের অপকৌশলের বিষয়টা খেয়াল করবেন, রমযান আসলে তারাবিহর ব্যাপারে উমর রা. সহ সাহাবায়ে কেরামের আমল তাদের কাছে দলিল যোগ্য না বলে বেড়ায়। অনেকে আরো অগ্রসর হয়ে উমর রাযি. কে বিশ রাকাত তারাবির জন্য বিদআতী পর্যন্ত বলে ফতোয়া দেয়। নবীজির তাহাজ্জুতের হাদিস দিয়ে আট ‘রাকাত তারাবি’ প্রমাণ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠে। উমর রাযি. সহ সাহাবায়ে কেরামের আমলকে পাশ কেটে চলে যায়। সেখানে তারা উমর রাযি. এর আমলকে দলিল হিসাবে পেশ করে না।

কিন্তু কুরবানী আসলে নবীজির সর্বদার আমল বাদ দিয়ে সাহাবায়ে কেরামের খণ্ডখালিন সময়ের বা কোনো কোনো সময়ের আমলকে দলিল হিসাবে পেশ করে। অতচ কুরবানির বেলায় যেখানে নবীজির স্পষ্ট আমল আছে যে, “নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর যখন থেকে কুরবানী করা শুরু করেন, তারপর থেকে আর কখনো বাদ দেননি। অর্থাৎ কোনো ঈদুল আযহার সময় কুরবানী না করে থাকেননি।” জামে তিরমিযী ১/১৮২

হিজরতের পর থেকে ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত কোনো বছরই কুরবানী বাদ দেয়নি, সর্বদা কুরবানি আদায় করেছেন। যা উম্মতের উপর ওয়াজিব হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটাকে তারা দলিল হিসাবে পেশ করে না। কারণ সবক্ষেত্রে হানাফিদের বিরোধিতা করতে হবে। তাই হানাফিরা যে আমলের কথা বলবে, যে হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করবে, সেটা দিয়ে দলিল পেশ করা যাবে না, সে আমলের দাওয়াতও দেওয়া যাবে না।

বাই দ্যা ওয়ে, অনেকে বলবেন অন্য মাযহাবে তো কুরবানী সুন্নতে মুআক্কাদাহ, তাহলে সমস্যা কী?.. তাদের জন্য আমার একটা লেখা আছে। লিংক কমেন্টে।

কুরবানী কি সুন্নাহ নাকি ওয়াজিব?

কুরবানি ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ
ইবাদত।কোরআন ও হাদিসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এমনিভাবে কুরবানী ইসলামের শিআরসমূহের অন্যতম। শিআর বলা হয় ইসলামের মৌলিক নিদর্শনগুলোকে। যেমন,মসজিদ, নামায, রোযা, রমযান, হজ্ব পালন, যাকাত প্রদান, ঈদ, কুরবানী করা- এজাতীয় মৌলিক নিদর্শন ও আলামত গুলোর মধ্য দিয়ে ইসলামের রূপ ও অবয়বটি প্রকাশ পায়। এই শিআরগুলোর অন্যতম হল, আল উযহিয়্যা তথা কুরবানী।

কুরআন,সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মতের আলোকে কুরবানীর বৈধতা প্রমাণিত। হাদিস শরীফে এসেছে যে, “নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর যখন থেকে কুরবানী করা শুরু করেন, তারপর থেকে আর কখনো বাদ দেননি। অর্থাৎ কোনো ঈদুল আযহার সময় কুরবানী না করে থাকেননি।” জামে তিরমিযী ১/১৮২

ইবনে কুদামা রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘সকল মুসলামনগণ কুরবানীর বৈধতার ব্যাপারে একমত। ইবনে হাজার আসকালানী রহ.বলেন, কুরবানী ইসলামের শিআর হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই।’

قال ابن قُدامة في المغني(13/360) (أجمع المسلمون على مشروعية الأضحية) . وقال ابن حجر في الفتح (10/3) (ولا خلاف في كونها من شرائع الدين)

◉ “কুরবানী কি সুন্নাহ নাকি ওয়াজিব?”এ বিষয়ে মুজতাহিদ ফকিহদের মাঝে দুইটি মত রয়েছে।

প্রথম মত: সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব। ইমাম আওযায়ি, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রমুখের মত এটা। আর এর উপরই হানাফী মাযহাবের ফতোয়া। আর ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদের একটি মতেও কুরবানি ওয়াজিব। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মতেও কুরবানী করা ওয়াজিব।

দ্বিতীয় মত: কুরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বা অত্যন্ত তাকিদপূর্ণ সুন্নাহ। এটা ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ, ইবনে কুদামা, ইবনে হাযম রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখসহ একদল ফকীহদের মত। আর এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম মালিকের মতেও সুন্নতে মুয়ায়াক্কাদাহ।

কিন্তু এ মতের প্রবক্তারা আবার বলেছেন, “সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি পরিত্যাগ করা মাকরুহ। যদি কোন জনপদের লোকেরা সামর্থ্য হওয়া সত্ত্বেও সম্মিলিতভাবে কুরবানি পরিত্যাগ করে তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। কেননা, কুরবানি হলো ইসলামের একটি শিয়ার বা বৃহৎ নিদর্শন।”
(আহকামুল উদহিয়্যাহ, পৃ.214 )

لكن صرح كثير من أرباب هذا القول بأن تركها يكره للقادر، ذكره أصحابنا، نص الإمام أحمد وقطع به في الإقناع، وذكر في ((جواهر الإكليل شرح مختصر خليل)) . أنها إذا تركها أهل بلد قوتلوا عليها؛ لأنها من شعائر الإسلام.
كتاب أحكام الأضحية والزكاة [ابن عثيمين] المكتبة الشاملة الحديثة 214-215

কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, কুরবানির দিনগুলোতে যথাসম্ভব কুরবানি করা জরুরি এবং এর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না দেওয়া অন্যায়। কেননা নবী করিম সা.এর ভাষ্যমতে কুরবানির দিনগুলোতে কুরবানির রক্ত প্রবাহের চেয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে অধিক প্রিয় কোন আমল নেই।

জাওয়াহিরুল ইকলিল শরহু মুখতাসারে খালিল
গ্রন্থে “ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে যে,যদি কোনো শহরের সমস্ত লোক কুরবানী ছেড়ে দেয় তবে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। কেননা কুরবানী ইসলামের শিআর।” (রাসায়িলে ফিকহিয়্যা লিশ শায়খে ইবনে উসাইমিন রহিমাহুল্লাহ ৪৬, আহকামুল উদহিয়্যাহ, ইবনে উসাইমিন পৃ.214 )

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ হাফি. বলেন,

“এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, ওয়াজিব এবং সুন্নতের স্তর নির্ধারণ নিয়েও বিভিন্ন মাযহাবে ভিন্নতা আছে। কোনো কোনো মাযহাবে ফরযের পর ওয়াজিবের স্তরই নেই, পরের স্তরটি হচ্ছে সুন্নত। কোনো কোনো মাযহাবে (হানাফী মাযহাব) ফরযের পর ওয়াজিবের স্তর তারপর সুন্নতের স্তর। কিন্তু যেসব মাযহাবে ওয়াজিবের স্তরটি নেই তারাও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতগুলোর ক্ষেত্রে আমল করেন ওয়াজিবের মতই। এর একটি উদাহরণ হল, বিতিরের নামায। এই বিতিরের নামায হানাফী মাযহাবে ওয়াজিব। কিন্তু যেসব মাযহাবে সুন্নত, তাদের ক্ষেত্রেও এটা সাধারণ সুন্নত নয়, বিতির ছুটে গেলে তাদের ফিকহ অনুযায়ীও কাযা করতে হয়। অথচ সাধারণ সুন্নত ছুটে গেলে কাযা করতে হয় না। তার অর্থ হল, বিতিরের নামায তাদের কাছে সুন্নত হলেও সাধারণ সুন্নত নয়। গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। আর সফর অবস্থায় সুন্নত না পড়লেও চলে, কিন্তু বিতিরের নামাযকে যারা সুন্নত বলেন, তারাও বলেন, সফর অবস্থায় বিতিরের নামায ছাড়া যাবে না। দেখুন, শিরোনাম বা পরিভাষা দুটি হলেও আমলের ক্ষেত্রে কাছাকাছি। যারা ওয়াজিব বলছেন এবং যারা সুন্নত বলছেন- আমলের ক্ষেত্রে উভয়েই প্রায় একই রকম গুরুত্ব দিচ্ছেন।

কুরবানী করার বিষয়টিকে কোনো কোনো ফিকহে সুন্নতে মুআক্কাদা বলা হয়েছে। কোনো কোনো ফিকহে (ফিকহে হানাফী) ওয়াজিব বলা হয়েছে। কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে যারা সুন্নত বলেছেন, তারাও গুরুত্বের ক্ষেত্রে অনেক জোর আরোপ করেছেন। কুরবানীর গুরুত্ব এবং মাসাইলের প্রতিটি ধাপ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনাও করেছেন। আর যদি দলীল দেখেন তাহলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে আপনার কাছে।”

কুরআন-সুন্নাহে কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার দলিলসমূহ। এখানে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি দলিল উল্লেখ করবো।


• আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ‎. فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‎

অনুবাদ,“নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন। ” (সূরা কাউসার:১-২)

মুফাসসিরীনে কেরাম বলেছেন, এই আয়াতের মর্ম হচ্ছে, ‘ঈদের নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।’ আমাদের নবী, ইনসানিয়াতের রাহবার হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কুরবানী করেছেন, মানুষকে কুরবানী করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

• হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে-

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْربَنّ مُصَلّانَا

“সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।”

সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১২৩; সুনানে দারাকুতনী, হাদীস ৪৭৪৩ [হাদীসটি ‘মারফ‚’ ও ‘মাউক‚ফ’ উভয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত হাদীসবিষারদ যফর আহমাদ উসমানী রাহ.-সহ বহু মুহাদ্দিস উভয় বর্ণনাকেই ‘সহীহ’ বলেছেন। আর হাদীসের শব্দ ও মর্ম দেখেও তা ‘মারফ‚’ বলেই মত প্রকাশ করেছেন। (দ্র. ইলাউস সুনান, খ. ১৭, পৃ. ২১২-২২৫)]

• হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত-

اخبرني ابو الزبير انه سمع جابر بن عبد الله يقول صلى لنا النبي صلى الله عليه وسلم يوم النحر بالمدينه فتقدم رجال فنحروا وظنوا ان النبي قد نحر فامر النبي صلى الله عليه وسلم “من كان نحر قبله ان يعيد بنحر آخر، ولا ينحروا حتى ينحر النبي صلى الله عليه وسلم (رواه مسلم رقم الحديث ١٩٦٤ )

“হযরত জাবের রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনাতে ঈদের নামায পড়িয়েছেন। কিছু লোক নামাযের পূর্বেই কুরবানি করে ফেলেছেন এ ধারণায় যে, হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালামও কুরবানি করে ফেলেছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেন যারা নামাযের পূর্বে কুরবানি করেছে তারা অবশ্যই পূনরায় কুরবানি করতে হবে। তোমরা কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্বে কুরবানি করবে না।”(সহীহ মুসলিস-১৯৬৪)

কুরবানী যদি ওয়াজিব না হয়ে সুন্নত-ই হতো, তাহলে তো পূনরায় কুরবানির নির্দেশ দিতেন না।

• হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন-

أَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللّهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي كُلّ سَنَةٍ.

“নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার
দশ বছরের প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন।”(জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৯৫)

ফিকহের পরিভাষায় নবীজীর এমন নিয়মিত আমল কে বলা হয়-
مواظبة النبي صلى الله عليه وسلم

(রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়মিত আমল) এই নিয়মিত আমল- এটাও আমলটি ওয়াজিব হওয়ার বা আবশ্যকীয় হওয়ার আলামত। সুনানে তিরমিযীসহ হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস রয়েছে কুরবানী সম্পর্কিত।

• মিখনাফ বিন সুলাইমান রা. হতে বর্ণিত-

أَخْبَرَنَا مِخْنَفُ بْنُ سُلَيْمٍ قَالَ وَنَحْنُ وُقُوفٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- بِعَرَفَاتٍ قَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِى كُلِّ عَامٍ أُضْحِيَةً وَعَتِيرَةً أَتَدْرُونَ مَا الْعَتِيرَةُ هَذِهِ الَّتِى يَقُولُ النَّاسُ الرَّجَبِيَّةُ. (ابو داود ٢٧٨٨ الترمذي ١٥١٨ )

“মিখনাফ বিন সুলাইম রা. বলেন, আমরা আরাফাতের ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উকুফ করছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করেন, হে মানুষ সকল! প্রত্যেক পরিবারের কর্তার উপর প্রতি বছর কুরবানি করা আবশ্যক এবং আতিরাও।” (আবু দাউদ হাদিস-২৭৮৮)

এ হাদীসে উল্লিখিত “আতিরা” সর্বসম্মতিক্রমে রহিত হয়ে গেছে। কুরবানির বিধান বলবৎ।

• হযরত জুনদুব আল বাজালি রা. বলেন,

قال شهد رسول الله صلى الله عليه وسلم يوم اضحى ثم خطب فقال من كان ذبح قبل ان يصلي فليعد مكانها…. ومن لم يكن ذبح فليذبح بسم الله (رواه مسلم رقم ١٩٦٠)

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের খুতবাতে ইরশাদ করেন, যারা নামাযের পূর্বে কুরবানি দিয়েছো তারা তার পরিবর্তে অবশ্যই পুনরায় কুরবানি করো। আর যারা তখন কুরবানি করোনি তারা আল্লাহর নামে কুরবানি করো।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৯৬০)

• এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন-

أَوَاجِبَةٌ هِيَ؟ فَقَالَ: ضَحّى رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَالمُسْلِمُونَ، فَأَعَادَهَا عَلَيْهِ، فَقَالَ: أَتَعْقِلُ؟ ضَحّى رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَالمُسْلِمُونَ.

“কুরবানী কি আবশ্যকীয় আমল? তিনি উত্তর দিলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানরা কুরবানী করেছেন। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি এবার বললেন, তুমি কি কিছু অনুধাবন করতে পারছ- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানরা কুরবানী করেছেন।” -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৬

এখানে দেখা যাচ্ছে, প্রশ্নকারী যে ভাষায় প্রশ্ন করেছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. অন্য ভাষায় তার উত্তর দিলেন। তিনি নবীজী এবং মুসলমানদের আমলের কথা বললেন। প্রশ্নকারী তখন প্রশ্নটি দ্বিতীয় বার করলেন। তখন ইবনে উমর রা. রাগত ভাষায় বললেন-

أَتَعْقِلُ؟

তুমি কি কিছু অনুধাবন করতে পারছ? তিনি আবার আগের উত্তর দিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানরা কুরবানী করে এসেছেন। এখানে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কুরবানী মুসলমানদের মাঝে সুন্নতে মুতাওয়ারাছা (নিয়মিত হয়ে আসা আমল) এটা দ্বীনের একটি শিআর।

শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানি হাফি. তাকমিলাতু ফাতহুল মুলহিমে বলেন:

قال شيخنا في تكملة فتح الملهم : 'ظاهر جواب ابن عمر انه اراد الدلالة على الوجوب لان السائل انما سأله عن الوجوب فلو كانت الاضحية غير واجبة لنفي الوجوب صراحة ولكنه ذكر مواظبة النبي صلى الله عليه وسلم والمسلمين وهو مما يدل على الوجوب، ولم يصرح بالوجوب كي لا يظن تحتمه كتحتم الفرائض ( التكملة ٣ / ٣٠٩)

“অনুবাদ,ইবনে উমর রা. এর জবাবে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেননা, তাঁকে কুরবানি ওয়াজিব কি-না? এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিলো। যদি সত্যিই কুরবানি ওয়াজিব না-ই হতো, তবে তিনি স্পষ্ট ওয়াজিব নয় বলতে পারতেন। তিনি তা না করে রাসূল সা. এর আমলের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করেছেন, যা ওয়াজিব হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করে। আর স্পষ্ট ওয়াজিব বলেননি যাতে কেউ ফরজ ভেবে না বসে।” (তাকমিলাতুল ফাতহুল মুলহিম: ৩/৩০৯)

• শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মাজমাউল ফাতাওয়া গ্রন্থে রয়েছে

واما الاضحية ، فالأظهر وجوبها ، فانها من اعظم شعائر الاسلام وهي النسك العام في جميع الامصار، والنسك مقرون بالصلاة في قوله : قُلْ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
وقد قال تعالى: فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ. فامر بالنحر كما امر بالصلاة.

“অর্থাৎ কুরবানির ব্যাপারে সর্বাধিক স্পষ্ট মত হল, তা ওয়াজিব। কেননা তা ইসলামের সর্ববৃহৎ নিদর্শন। এটা গোটা উম্মতের জন্য ওয়াজিব হওয়ার-ই দাবী রাখে।
দ্বিতীয়ত কুরবানিকে আল্লাহ তায়ালা নামাযের সাথে যুক্ত করেই পেশ করেছেন, যা ওয়াজিব হওয়ার উপরই প্রমাণ বহন করে।” যেমন-

قوله : قُلْ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
وقد قال تعالى: فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ. فامر بالنحر كما امر بالصلاة.

মাজমাউল ফাতাওয়া ১২/৯৩

তাই ওয়াজিব-সুন্নত নাম যা-ই দেন, কুরবানী থেকে পালিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ফুকাহায়ে কেরাম পরিভাষা কী ব্যবহার করেছেন, তার চেয়ে বড় ব্যাপার হল যুগ যুগ ধরে চলে আসা মুসলমানদের আমল এবং আমলের توارث বা পরম্পরা দেখা। মাযহাবী পরিভাষার বিতর্কে না গিয়ে আমরা কুরবানীর ক্ষেত্রে সব যুগে মুসলমানদের আমল দেখলে বুঝতে পারব যে, কুরবানী আবশ্যকীয় একটি আমল এবং ইসলামী শরীয়তের একটি শিআর।

◉ দ্বিতীয়ত প্রতি বছর কুরবানীর সিজন আসলেই “অনেক সেকুলারপন্থী বুদ্ধিজীবীরা -এবার কুরবানী না করে বিকল্প কিছু করার প্রস্তাবও তারা দিয়ে থাকেন।” যদিও ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতা তাদের এসব কথায় কান দেয় না। ইসলামী শরীয়ত মতে ওয়াজিব কুরবানির অর্থ অন্যত্র ব্যবহার করলে কুরবানি আদায় হবেনা। কুরবানী না করার কারণে গুনাহগার হতে হবে। কারণ‘কুরবানী ইসলামের শিআর : করোনা বা বন্যার্তদের অজুহাতে এতে ছাড়ের সুযোগ নেই।’

• কুরবানী কিংবা অন্য কোনো ইবাদতের অর্থ বন্যার্ত কিংবা গরিবদের খাতে দেওয়ার প্রস্তাবনার প্রয়োজন নেই, ইসলামের বিধানেই যাকাত-সদাকাসহ সাধারণ দানের বহু খাত বরাদ্দ আছে, নির্দেশনাও আছে। বিত্তবান নাগরিকদের উদ্যোগে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্য থেকে সেসব খাতে দান করতে হবে। ইসলামী অনুশাসন যথাযথভাবে অনুসরণ করলে গরিবকে সহযোগিতা করার যেসব উৎস ও খাত রয়েছে তারা সে সম্পর্কে জানতে পারবে।

•কুরবানী-হজ্ব ইত্যাদি ইবাদতের অর্থ বন্যার্ত বা গরিবের মাঝে দান করে দেওয়ার ‘বিকল্প’ প্রস্তাব না দিয়ে তারা বরং ইসলামে দানের যে স্বতন্ত্র বিধান রয়েছে, সেটার ওপর আমল করুন। কুরবানী বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা না করে সেই নফল দান তাদের করতে দেখা যায় না কেন?

•তাই কুরবানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নিয়ে ‘বুদ্ধিজীবীদের’ এসব অন্তঃসারশূন্য ও নৈরাজ্যকর মতামতের কোনো মূল্য নেই। এবং তাদের এসব মতামতের পেছনে কোনো সুফল বা সদুদ্দেশ্যও নেই।

হানাফী ফিকহ-Hanafi Fiqh
Khairul Islam 20/07/2022

Want your school to be the top-listed School/college in Feni?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Dhaka Chittagong Highway
Feni
3900