27/01/2026
সন্তানের সাফল্য নাকি আখিরাতের ক্ষতি?
আজকের আলোচনার শুরুতে কিছু দৃশ্যপট কল্পনা করুন...
দৃশ্যপট-১
ভোর পাঁচটা। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে সেই চিরচেনা সুর ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’। ঘুমের চেয়ে সলাত উত্তম।
আপনি জেগে উঠলেন। ওজু করলেন। এরপর পাশের রুমে গিয়ে দেখলেন আপনার কলিজার টুকরো সন্তানটা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। চাদরটা গায়ের ওপর টেনে দিয়ে আপনি ভাবলেন, আহারে! রাত জেগে পড়াশোনা করেছে, এখন ডাকলে সারাদিন টায়ার্ড থাকবে। শরীর খারাপ করবে। থাক, আর একটু ঘুমাক।
দৃশ্যপট-২
রমাদান মাস এসেছে। বাইরে খাঁ খাঁ রোদ্দুর। আপনার কিশোর সন্তানটি প্রবল আগ্রহ নিয়ে রোজা রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু আপনি আঁতকে উঠলেন। আপনি জোর করে তাকে রোজা ভাঙতে বাধ্য করলেন। আপনার যুক্তি? এত কষ্ট করবে কেন? দুর্বল হয়ে যাবে তো। সামনে পরীক্ষা, শরীর ঠিক না থাকলে পড়বে কীভাবে?
দৃশ্যপট-৩
আপনার আদরের মেয়েটি বড় হচ্ছে। সে যখন বোরকা পরে বাইরে বের হতে চায়, আপনি তাকে জোর করেই সাজিয়ে-গুজিয়ে আধুনিক পোশাকে বের করেন। কেউ হয়তো সলজ্জভাবে মনে করিয়ে দিল, ভাই, মেয়েটা তো বড় হয়েছে, এবার একটু পর্দা বা শালীনতার শিক্ষা দিলে হতো না?
আপনি হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, আরে ভাই, ও তো বাচ্চা মানুষ! এখন থেকেই যদি বোরকা-হিজাব দিয়ে আটকে রাখি, তবে তো ওর কনফিডেন্স নষ্ট হয়ে যাবে। সোসাইটিতে ও স্মার্টলি মুভ করতে পারবে না। আগে ক্যারিয়ারটা গড়ুক, দ্বীনদারি তো বুড়ো বয়সেও করা যাবে।
দৃশ্যপট-৪
ছেলের বিয়ের কথা হচ্ছে। আপনার সামনে দুটি প্রস্তাব। একটি মেয়ে অত্যন্ত দ্বীনদার, সচ্চরিত্রবান এবং পর্দানশীন। অন্য মেয়েটির পরিবার অতটা দ্বীনদার নয়, কিন্তু তাদের অঢেল সম্পদ আর সমাজে বিশাল প্রতিপত্তি।
আপনি দ্বিতীয়টিই বেছে নিলেন। মনে মনে ভাবলেন, ছেলের বউ বড়লোক ঘর থেকে আসলে ছেলের লাইফটা সেটেল হয়ে যাবে। একটু আধটু বেপর্দা? ওসব বিয়ের পর ঠিক করে নেওয়া যাবে।
দৃশ্যপট-৫
আপনার সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা ঘুষ দিলেন। মনে মনে ভাবলেন, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য এটুকু তো করতেই হয়। তারপর চাকরি পেতে আবারও লাখ টাকার দুর্নীতি। আবার ভাবলেন, সন্তান তো প্রতিষ্ঠিত হোক, এর চেয়ে বড় কী আছে?
এই যে প্রতিটি পদক্ষেপ, আপনি কি সত্যিই সন্তানের ভালো করছেন? নাকি নিজের মনের সান্ত্বনার জন্য, নিজের দুনিয়াবী সফলতার সংজ্ঞা সন্তানের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন?
আসুন একটু জানার চেষ্টা করি...
মুসলিম প্যারেন্টিং: আসল উদ্দেশ্য কী?
আমাদের সমাজে প্যারেন্টিং মানেই এখন প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়। কার সন্তান কত বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হলো, কার ছেলে কত লক্ষ টাকা বেতনের চাকরি পেল, এটাই যেন সফলতার একমাত্র মানদণ্ড।
সসম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ, আসুন আমরা একটু ভাবি। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের প্যারেন্টিং এর উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত? ডাক্তার বানানো? ইঞ্জিনিয়ার বানানো? কোটিপতি বানানো?
না!
মুসলিম প্যারেন্টিং এর আসল উদ্দেশ্য হলো সন্তানকে একজন সৎকর্মশীল বান্দা হিসেবে গড়ে তোলা। যার আচরণ হবে প্রশংসনীয়, যার নৈতিকতা হবে সর্বোত্তম, যে হবে আল্লাহর প্রকৃত দাস।
এবং এই পথে আমাদের আদর্শ, আমাদের রোল মডেল একজনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি কীভাবে সন্তানদের সাথে আচরণ করতেন? কীভাবে তাদের দ্বীন শিখাতেন? কীভাবে তাদের চরিত্র গঠন করতেন? এটাই আমাদের শিখতে হবে।
সন্তান: নেয়ামত নাকি পরীক্ষা?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা। (সূরা কাহফ: ৪৬)
হ্যাঁ, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহা নেয়ামত। কিন্তু আমরা মুসলিম প্যারেন্টসরা বারবার একটা মৌলিক সত্য ভুলে যাই। এই সন্তান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমানত!
আমানত মানে কী? আমানত মানে, এটা আপনার নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি নয়। এটা আল্লাহ তা'আলা আপনার কাছে গচ্ছিত রেখেছেন। তিনি দেখতে চান আপনি এই আমানতের হক আদায় করেন কি না।
এবং আরও বড় কথা এই সন্তান আপনার জন্য পরীক্ষা!
আল্লাহ তা'আলা বলেন: আর জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো এক পরীক্ষা। আর নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁরই কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা আনফাল: ২৮)
আবারও তিনি বলেছেন: তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ; আর আল্লাহ, তাঁরই কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা তাগাবুন: ১৫)
মানুষ সুন্দর বাগান পছন্দ করে, সুন্দর বাড়ি পছন্দ করে, আর সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে তার সন্তানকে। আল্লাহ এই সত্যটা জানেন। কিন্তু তিনি সাথে সাথে আমাদের সতর্কও করেছেন। সূরা আনফাল এবং সূরা তাগাবুনে তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, এই সন্তান তোমাদের জন্য একটা ফিতনা বা পরীক্ষা।
পরীক্ষা কেন?
কারণ, এই সন্তানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই শয়তান আপনাকে দিয়ে হারাম খাওয়াবে। এই সন্তানের মায়ার দোহাই দিয়েই আপনি ফজরের সলাত কাজা করবেন। এই সন্তানের ফিউচার গড়ার নাম করেই আপনি আপনার নিজের আখিরাত বিসর্জন দিবেন।
অন্যদিকে আমানতের খেয়ানত করা তো মুনাফিকের কাজ। আল্লাহ তা'আলা আপনার কাছে একটা নিষ্পাপ আত্মা আমানত দিয়েছেন। আপনি কি তাকে কেবল দুনিয়া ভোগ করার যন্ত্র বানাচ্ছেন, নাকি জান্নাতের যাত্রী বানাচ্ছেন?
দেখুন কী হয় আমাদের সাথে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সন্তান দেন। আমরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাই। কিন্তু সেই খুশিতে আমরা যাকে ভুলে যাই, তিনি হলেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা যিনি এই নেয়ামত দিয়েছেন!
সন্তানের জন্য আমরা এতটাই পাগল হয়ে যাই যে:
• আখিরাতের কথা ভুলে যাই
• জান্নাত-জাহান্নামের কথা ভুলে যাই
• হালাল-হারামের সীমারেখা মুছে ফেলি
• আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পাশ কাটিয়ে যাই
শুধু একটাই লক্ষ্য থাকে সন্তানকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেভাবে হোক! কিন্তু এই "যেভাবে হোক" এর পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা নিজেদের জান্নাত ধ্বংস করে ফেলছি। আস্তাগফিরুল্লাহ!
🌳 কিয়ামতের দিন সন্তান আপনার কী কাজে আসবে?
এবার আসুন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যটির দিকে। যে সন্তানের জন্য আপনি:
• হারাম পথে অর্থ উপার্জন করলেন
• ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়ালেন
• নামাজ-রোজা থেকে দূরে রাখলেন
• দ্বীনী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করলেন
• আখিরাতকে কোরবান করলেন
সেই সন্তান কিয়ামতের দিন আপনার কী কাজে আসবে?
আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন: তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোন উপকার করতে পারবে না। (সূরা মুমতাহিনা: ৩)
আবার বলেছেন:
যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না। (সূরা শু'আরা: ৮৮)
কল্পনা করুন সেই দিনটির কথা। হাশরের ময়দান। ভয়াবহ বিচারের দিন। চারদিকে ভয় আর আতঙ্ক।
আপনি যে সন্তানের জন্য জীবনভর পাপ করলেন, সেই সন্তান কি এসে বলবে, ইয়া আল্লাহ! আমার বাবা-মা আমার জন্য অনেক গুনাহ করেছে। আপনি ওদের ক্ষমা করে দিন?
না! বরং সেদিন: নিশ্চয় যারা কুফরী করে, আল্লাহর নিকট তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না এবং এরাই আগুনের ইন্ধন। (সূরা আলে-ইমরান: ১০)
এমনকি পরিস্থিতি এমন হবে যে, সন্তান তার বাবার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবে, হে আল্লাহ! আমার বাবা আমাকে দুনিয়াতে অনেক টাকা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তোমার কথা বলেনি, দ্বীন সম্পর্কে জানায় নি। আজ আমার এই অবস্থার জন্য ওরাই দায়ী!
যাকে খুশি করতে গিয়ে আপনি স্রষ্টাকে নারাজ করলেন, সেই সন্তানই সেদিন আপনার বিপদের কারণ হবে। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?
আল্লাহ তা'আলা বলেন, আল্লাহর শাস্তি মোকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোন কাজে আসবে না; তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। (সূরা আল-মুজাদালাহ: ১৭)
🌿 সবচেয়ে বড় ক্ষতি
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে আয়াতটি প্রত্যেক মুসলিম প্যারেন্টের হৃদয়ে গেঁথে রাখা উচিত: হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা মুনাফিকুন: ৯)
আয়াতটি পড়েছেন? আবার পড়ুন। আবারও পড়ুন।
আল্লাহ বলছেন, তোমার সন্তান যেন তোমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল না করে।
কিন্তু আমরা কী করছি?
সন্তানের জন্য ফজরের সলাত ছাড়ছি। সন্তানের জন্য হালাল-হারাম ভুলে যাচ্ছি। সন্তানের জন্য দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
এবং আল্লাহ বলছেন, যারা এরূপ উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।
ক্ষতিগ্রস্ত কারা? যারা লসে আছে। আপনি আপনার সন্তানের জন্য ১০ তলা বাড়ি করলেন, দামি গাড়ি কিনলেন, কিন্তু তার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় গেঁথে দিলেন না, বিশ্বাস করুন, আপনি লসে আছেন। আপনি তাকে বিদেশের নামী ইউনিভার্সিটি থেকে পড়িয়ে আনলেন, কিন্তু সে 'বিসমিল্লাহ' বলে খাওয়া শিখলো না আপনি চরম লসে আছেন।
সসম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ, এখনও সময় আছে। আল্লাহর রহমতের দরজা এখনও খোলা। সন্তানকে ভালোবাসুন। তাদের জন্য সর্বোত্তম চেষ্টা করুন। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে।
মনে রাখবেন:
১. আপনার সন্তান আপনার ব্যক্তিগত প্রপার্টি নয়, আল্লাহর দেয়া আমানত।
২. হারাম পথে অর্জিত সাফল্য কখনো বরকতময় হয় না।
৩. সন্তানকে নামাজি বানানো মানে তাকে শুধু পরকালের জন্য নয়, দুনিয়ার জন্যও একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
৪. কিয়ামতের দিন আপনার আমলনামায় আপনার সন্তান 'সদকায়ে জারিয়া' হতে পারে, আবার 'বোঝাও' হতে পারে।
৫. সন্তানের প্রকৃত সফলতা দুনিয়াবী ডিগ্রি নয়, বরং আখিরাতের নাজাত।
৬. দ্বীন থেকে দূরে রেখে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা মানে তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেওয়া।
তাই আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিন:
• সন্তানকে হালাল পথে প্রতিষ্ঠিত করবেন
• দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন
• নামাজ-রোজায় অভ্যস্ত করবেন
• আল্লাহর স্মরণে মশগুল রাখবেন
কারণ প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার চাকচিক্যে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের সন্তানদের সৎকর্মশীল বান্দা হিসেবে গড়ে তোলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
✍️ জাহিদ হাসান হাফিজাহুল্লাহ
শিক্ষক, লেখক, কিডস্ এন্ড প্যারেন্টিং অ্যাক্টিভিস্ট
#প্যারেন্টিং #সন্তান #ইসলামিকপ্যারেন্টিং