07/08/2016
বন্ধু, আমরা ভাল আছি তোরা ভাল থাকিস
(বন্ধু দিবস- যে বন্ধুদের হারিয়েছি তাঁদের স্মরণে )
বদরুদ্দজা পেয়ারা, জিল্লুর রহমান লিটা এবং অনুপম কুমার সাহা রায় অনু। আমাদের হাই স্কুল (এম এন একাডেমী নগরকান্দা, ফরিদপুর, এস এস সি ব্যাচ ১৯৮২) জীবনের তিন বন্ধু যাদের দুজন কে আমরা হারিয়েছি, আর এক জন অনেক মানুষের ভিরে নিজে নিজে হারিয়ে গেছে। আজ শুধু লিটা আর পেয়ারার কথা বলব। অনুর কথা অন্য সময়ে অন্য প্রসঙ্গে লিখব।
জিল্লুর রহমান লিটা আমাদের সাথে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। ওর বাবা ছিলেন আমাদের থানার (এখন উপজেলা) সমাজকল্যাণ অফিসার। তিন ভাইয়ের মধ্যে ও ছিল সবার বড়। ওর ছোট ভাই আনিসুর রহমান টিটিস (আমি তাকে দুষ্টমি করে বলতাম ইটিস) খুব ভাল নজরুল গীতি গাইতে পারত। ওর মা বাবাও আমাদের খুব আদর করতেন। আমরা স্কুল শেষ করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হই (উল্লেখ্য উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়ার জন্য কলেজটির খুব নামডাক ছিল এবং তখন বৃহত্তর ফরিদপুরের সব জেলা থেকে মেধাবী ছাত্রগণ এখানে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে আসতেন)। লিটা এখানে ভর্তি হতে না পেরে সরকারী রাজবাড়ী কলেজে ভর্তি হয়। ইতিমধ্যে ওর বাবা অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ার জন্য ওর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। আমি দেশের বাইরে পড়তে চলে যাই যার ফলে ওর সঙ্গে অনেক দিন আমার কোন যোগাযোগ ছিলনা। ১৯৯৫ সালের প্রথম দিকে আমি তখন মালিবাগে একটি ক্লিনিকে কাজ করি। একদিন বিকেলে কাজ করে ফেরার পথে ওর সাথে দেখা। ও নিজেই এসে আমার সাথে কথা বলে। প্রায় ১০-১১ বছর পর দেখা। ও মতিঝিলে একটা কোম্পানিতে কাজ করে প্রোগ্রামার হিসেবে, বিয়ে করেনি, ছোট দুভাই পড়াশুনা করে, বাবা অবসরে ফরিদপুরে থাকেন। এরপর আরও দু একবার কথা হয়েছে। ঐ বছরের শেষের দিকে একদিন আমাদের বন্ধু ডাঃ হাফিজ (ও ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কাজ করে) ফোন করে আমাকে জানাল যে কয়েক দিন আগে লিটা হটাত করে মারা গেছে এবং লিটার আম্মা ওর অফিসে এসে খুব কান্না কাঁটি করেছেন।
বদরুদ্দজা পেয়ারার সঙ্গে আমরা ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে এক সঙ্গে পড়াশুনা করেছি। পেয়ারা অত্যন্ত মেধাবী এবং সুদর্শন ছেলে ছিল। চার ভাইয়ের মধ্যে পেয়ারা মেঝ ছিল। ওর বাবা ও খুব মেধাবী ব্যক্তি ছিলেন। পাকিস্থানের প্রথম দিকে তিনি এম এ পাশ করেন এবং তাঁদের গ্রামের প্রথম এম এ পাশ ব্যক্তি ছিলেন। আমার মার কাছে শুনেছি ওর বাবা যখন এম এ পাশ করে গ্রামে আসেন তখন তাঁকে পাল্কিতে করে আনা হয়েছিল (সম্মান দেখিয়ে)। উনি পশিম পাকিস্থানে চাকুরী করতেন পরবর্তীতে দেশে এসে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পেয়ারার সঙ্গে স্কুল শেষ করে একসঙ্গে আমরা সরকারী রাজেন্দ্র কলেজে পড়েছি। এর পর ও ঢাকা কলেজে কেমিস্ট্রিতে অনার্সে ভর্তি হয়। ও লেখা পড়ার সাথে সাথে কারও প্ররোচনায় ব্যাবসা শুরু করে। ওর বড় ভাই তখন মধ্যপ্রাচ্যে থাকতেন তিনি ওকে মূলধন দেন। কথায় আছে বিদ্যার দেবী সরস্বতী আর অর্থের দেবী লক্ষ্মী এক পিঁড়িতে বসেন না। ওর বেলায়ও তাই হল। ব্যাবসায় লোকসান করে, মূলধন তুলতে না পেরে হতাশ হয়ে বাড়িতে চলে গেল। বাড়িতে গিয়ে ওর হতাশা আরও বেড়ে গেল। ১৯৯৫-৯৬ এর দিকে ঢাকায় এসে কিছু একটা কাজ করত। আমি তখন পাশ করে একটি ক্লিনিকে কাজ করতাম এবং বিকেলে মহাখালি ওয়ারলেসগেটে মাঝ মধ্যে একটি চেম্বারে বসতাম। খুব একটা রোগী হত না । দিনে তিন থেকে পাঁচটি রোগী দেখতাম। ও প্রায়ই আসত। মাঝে মধ্যে অন্য বন্ধুরাও আসত। সবাই মিলে আড্ডা দিতাম, চা সিঙ্গারা খেতাম। ও সবার শেষে যেত, যাবার সময় আস্তে করে বলত কিছু টাকা দিতে পারবি। আমার রিক্সা ভাড়া রেখে ওকে বাকি টাকাটা দিয়ে দিতাম। ওকে দেখে আমার মনে হত ও যেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তি (আংশিক)।
অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
-----------------------------
-----------------------------
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।
মাঝখানে ওর সাথে যোগাযোগ নেই, এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম যে ও বাড়িতে চলে গেছে। এর কিছুদিন পর জানতে পারলেম যে ও বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গেছে, কোথায় গেছে কেউ জানেনা। শত শত মানুষের মাঝ থেকে পেয়ারা চির দিনের জন্য হারিয়ে গেল।
ওদের দুজনের সাথে আমাদের অনেক স্মৃতি। আমরা একসঙ্গে খেলাঘর করেছি, বিজ্ঞান ক্লাব করেছি, আবৃতি করেছি, বিতর্ক করেছি, দিনের পর দিন নাটকের রেহারসেল করেছি, নাটক করছি। আমরা তখন প্রতি বছর জেলা পর্যায়ে কবিতা আবৃতি, বিতর্ক, গান, রচনা প্রতিযোগিতা ও বিজ্ঞান মেলায় অংশ গ্রহন করতাম। একবার বাংলা একাডেমী আয়োজিত প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে আমি রচনা প্রতিযোগিতায় ১ম আর লিটা অন্য একটি বিষয়ে ১ম হয়ে (ইভেন্টের নাম মনে নেই) বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ গ্রহন করার জন্য ঢাকা গিয়েছিলাম। আমরা যখন স্কুলে পরতাম তখন থেকেই আমরা এক সাথেই ছাত্র রাজনীতি শুরু করি।
আমরা কেউ চাকুরী, কেউ ব্যবসা, কেউ রাজনীতি করছি। আমাদের সবাই বাব মা হয়েছে, কেউ কেউ দাদা-দাদি, নানা-নানি। শত ব্যস্ততার মাঝেও তোরা আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাসনি। আমাদের পুনর্মিলনীতে, আমাদের আড্ডায়, আমাদের পরিবার পরিজনের মাঝে তোরাও বেঁচে আছিস। তোরা সব সময়ই আমাদের হৃদয় মাঝে আছিস, থাকবি। প্রিয় বন্ধু, আমরা ভাল আছি, তোরাও ভাল থাকিস।
ডাঃ কাজী ম মকিদুর রহমান
আগস্ট ৭, ২০১৬
টরেন্ট, কানাডা